শুকনো পাতা

শুকনো পাতা

“স্যার আমি আপনাকে ভালোবাসি।” অবন্তীকে (আমার ছাত্রী) অংক করাচ্ছিলাম। হুট করে ওর মুখ থেকে এমন একটা কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। বুকটা ধুক করে উঠলো। ছাত্রীর মুখ থেকে এমন কথা শুনবো আশা করিনি। কি বলব বুঝতে পারছিনা। নিজেকে একটু কোনরকম ঠিক করে বললাম….

–অংকটা বুঝতে পেরেছো?
-স্যার প্লিজ…(কাঁপা কাঁপা গলায়)
–কিছু বলবা অবন্তী?
-স্যার আমি আপনাকে কিছু বলেছি….
–দেখো অবন্তী, তুমি কিন্তু ইদানীং পড়াশোনায় মনোযোগ দিচ্ছনা।
-স্যার এমন করবেন না।
–তুমি অংকটা কি বুঝতে পারছো?
-স্যার আপনি কি কিছুই বুঝতে পারেননা?
–কি বুঝবো?
-স্যার, আমি আপনাকে সত্যিইই ভা….
–দেখো অবন্তী তুমি ভুলে যেওনা আমি তোমার শিক্ষক। আর একজন শিক্ষকের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেটা কি তোমায় নতুন করে শিখিয়ে দিতে হবে?

-কিন্তু স্যার আমি….
–অবন্তী স্টপ ইট কথাটা একটু জোড়েই বললাম। যারফলে পাশের রুম থেকে অবন্তীর মা চলে আসলেন। বললেন….

–কি হয়েছে রুবেল…
-না আন্টি ও কিছুনা।
–অবন্তী কিছু করেছে?
-আরেনা, আসলে আন্টি হয়েছে কি আমি একটু অসুস্থ তাই হঠাৎই একটু কেমন জানি লাগছে।
–ও আচ্ছা।

আন্টি চলে গেলেন। আমি হাফ ছেরে বাঁচলাম। অবন্তীর দিকে তাকিয়ে দেখি ও মাথা নিচু করে বসে আছে। অবন্তীকে কোনরকম পড়িয়ে চলে আসলাম। অবন্তী আমার ছাত্রী। ক্লাস টেন এ পড়ে। লম্বা, চওড়া সব দিকক দিয়ে সুন্দরি বলা চলে। কিন্তু একটা সমস্যা হয়েছে। কিছুদিন যাবত মেয়েটি আমার সাথে অদ্ভুত আচরণ করছে। সে আকারে ইঙ্গিতে অনেকবার বুঝিয়েছে যে সে আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু আমার দারা এটা সম্ভব না। অবন্তীকে আমি শুধু একজন ছাত্রীর চোখেই দেখি। এর বেশি কিছু না। অনেক্ষণ যাবত পার্কে বসে আছি। কিন্তু তাসমিয়ার আসার কোন নাম গন্ধ নেই। অনেকবার ফোন দিলাম, ফোন ওয়েটিং। তাসমিয়ার সাথে আমার প্রায় ৬ মাসের রিলেশন। প্রথমদিকে রিলেশন ভালো থাকলেও কয়েকদিন থেকে কেমন জানি হয়ে গেছে। তাসমিয়াকে সবসময় ওয়েটিং দেখায়। অনেক্ষণ যাবত কল করার পর তাসমিয়া কল রিসিভ করল। বলল….

–কি সমস্যা তোমার? এত ফোন দিচ্ছ কেনো?
-কার সাথে কথা বললা এতক্ষণ ?
–তার কৈফিয়ত কি তোমাকে দিতে হবে?
-এভাবে কথা বলছো কেনো? আমি জাস্ট জানতে চাইছিলাম।
–কত ফ্রেন্ডই তো থাকে, তাদের সাথে বলি।
-ফ্রেন্ডসদের সাথে এত কিসের কথা তোমার?
–তুমি কি আমায় সন্দেহ করছো?
-সন্দেহ কখন করলাম? আমি জাস্ট জানতে চাচ্ছি।
–দেখো রুবেল এত ফালতু প্যাঁচাল পারার সময় আমার নেই। ফোন কাটলাম….
-শোন?
–হ্যা বলো….
-আজকে আমাদের দেখা করার ছিলো।
–আমি পারবনা, বায়….

বলেই তাসমিয়া কল কেঁটে দিলো। মেয়েটার কি হয়েছে কে জানে। যে মেয়েটা আমার সাথে দেখা করার জন্য পাগল ছিলো। কল একটু ওয়েটিং পেলে ঝাড়ি দিত আর সে কিনা আজ! ভাবতেই অবিশ্বাস্য লাগছে। আচ্ছা মানুষ কি তাহলে এভাবেই পরিবর্তন হয়ে যায়? তাসমিয়া কি অন্য কারো সাথে রিলেশনশিপে ইনভল্ব হলো নাকি? না ওতো এমন নয়, তবে কি! রাতে অনলাইনে তাসমিয়াকে এক্টিব দেখে মেসেজ দিলাম। সময় যায় কিন্তু সিন হয়না। অনেক্ষণ পর সিন হলো। কিন্তু নো রিপ্লে। আমি বললাম….

–কি হলো সিন করে রিপ্লে দিচ্ছনা কেনো?
-কি সমস্যা তোমার?
–সমস্যা আমার না তোমার? মেসেজ দিলাম সিন করোনা, আবার সিন করলে রিপ্লে দাওনা।
-ভালো লাগছেনা, বায়….
–তোমার কি শরীর খারাপ?
-(সিন, নো রিপ্লে)

এভাবে আরো অনেক মেসেজ দিলাম। কিন্তু তাসমিয়া কথা বলছেনা। বুকের ভিতর চিনচিন ব্যথা অনুভব হচ্ছে। কিছু একটা হারানোর ভয়ে বুকটা ধুকধুক শব্দ করছে। প্রিয় মানুষ গুলোর একটু অবহেলা যে এতটা কষ্টের জানা ছিলনা। আচ্ছা কষ্টের রং কেমন? লাল নাকি নীল? নীল তো বেদনার রং, তাহলে কষ্টের রং কি? রাত ১২ টায় অবন্তীর আম্মুর নাম্বার থেকে কল আসলো। এত রাতে ফোন দিলো কেনো? কলটা রিসিভ করে বললাম….

–হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম আন্টি….
-আমি আন্টিনা, অবন্তী।
-এত রাতে ফোন করছো কেনো?
-বিরক্ত হচ্ছেন?
–কিছু বলবা?
-কি করছেন?
–তুমি মজা করার জন্য ফোন করেছো?
-স্যার আপনি এমন কেনো? একটু ভালোভাবে কথা বলতে পারেননা?
–আচ্ছা আমি ফোন কাটলাম।
-স্যার প্লিজ কল কাটবেননা। শুনুন…
–হুমমম বলো?
-কালকে আপনার নীল পাঞ্জাবিটা পরে আসবেন।
–কেনো?
–জানিনা….
-আচ্ছা রাখি….
–হ্যালো স্যার, শু….

অবন্তীকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে কলটা কেঁটে দিলাম। এই বয়সের মেয়েরা অনেকটা আবেগপ্রবণ হয়। অবন্তীও তেমন। আমি চাইনা ওর সাথে এমন কিছু হোক যেটা আমার জন্য সুখকর নয়। রাতে আরেকবার তাসমিয়ার নাম্বারে কল দিলাম। নাম্বার ওয়েটিং, কারো সাথে কথা বলছে। বুঝতে আর বাকি রইলনা, মেয়েটা হারিয়ে গেছে। সকালে একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠলাম। ফ্রেস হয়ে খাওয়া দাওয়া করলাম। রাতের অবন্তীর সাথে কথাটা মনে পরে গেলো। নীল পাঞ্জাবীটা গায়ে দিলাম। আবার কি মনে করে যেন পাঞ্জাবী খুলে টি-শার্ট পরে রওনা হলাম অবন্তীদের বাসায়। অবন্তীদের বাসার কলিংবেল বাঁজালাম। সাথে সাথে অবন্তী দরজা খুলে দিলো। মনে হয় আমার অপেক্ষাতেই ছিলো। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো অবন্তীকে আজকে অন্যরকম লাগছে। নীল শাড়ি, কপালে কালো টিপ, মুখে হালকা মেকআপ, মেয়েটাকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছে। আমি ব্যাপারটা তেমন একটা তোয়াক্কা করলাম না। বললাম….

–আন্টি কোথায়?
-রনিকে (অবন্তীর ভাই) নিয়ে মার্কেটে গেছে।
–আচ্ছা কখন আসবে?
-জানিনা।
–আচ্ছা তুমি পড়তে বসো….
-স্যার একটা কথা বলব?
–বলো…
-আপনি নীল পাঞ্জাবীটা পরে আসেননি কেনো?
–মনে ছিলনা….
-ওহ (মন খারাপ করে)। আচ্ছা এবার বলুন আমাকে কেমন লাগছে?
–হুম খুব সুন্দর।
-রিয়েলি? (অনেক খুশি)
–আচ্ছা এবার পড়তে বসো।
-স্যার আজকে পড়বনা।
–মানে?
-আজকে পড়তে ইচ্ছে করছে না। চলুন আজকে কোথাও ঘুরতে যাই…
–দেখো অবন্তী বাড়াবাড়ি হচ্ছে কিন্তু।
-ধ্যাত, আপনি শুধু সবসময় পড়া পড়া করেন কেনো?
–তুমি কি পড়তে বসবা, নাকি আমি চলে যাব?
-স্যার আমি কি দেখতে এতটাই খারাপ? আমাকে কি আপনার একটুও ভালো লাগেনা?
–অবন্তী তুমি আমার….
-হ্যা আমি আপনার ছাত্রী, তো কি হয়েছে? আমি আপনাকে ভালোবাসি ব্যাস…প্লিজ স্যার এমন করবেননা। আমাকে রেখে যাবেননা।

বলেই অবন্তী আমার হাত চেপে ধরলো। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। ঠিক তখনই অবন্তীর মা রনিকে নিয়ে রুমে প্রবেশ করলেন। তখনও অবন্তী আমার হাত চেপে ধরে আছে। আন্টির সামনে এমন অপ্রিতিকর একটা ঘটনা ঘটবে ভাবতে পারিনি। আন্টি আমাদের দিকে অবাক হয়ে তাকালেন। অবন্তী হাত ছেড়ে দিয়ে মাথা নিচু করে ফেললো। তারপর আস্তে করে চলে গেলো। আমি আর আন্টি মুখোমুখি বসে আছি। কেউ কোন কথা বলছিনা। এদিকে লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে। আমিই বললাম….

–আসলে আন্টি হয়েছে….
-থাক বাবা আমি বুঝতে পেরেছি।
–আসলে আন্টি আপনি যেটা ভাবছেন সেটা না।
-দেখো বাবা, আমার মেয়েটার অল্প বয়স। এখনো অতকিছু ভালো করে বোঝেনা।
–জি আন্টি।
-আর হ্যা, আমি চাই তুমি ওকে আর না পড়াও। এই নাও তোমার টাকা….
–আন্টি….
-প্লিজ রুবেল।

আন্টি আমার হাতে ছোট একটা খাম দিয়ে চলে গেলেন। অবন্তী জানালার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখের পানি টুপটুপ করে পড়ছে। আমি দীর্ঘ একটা শ্বাস নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে আসলাম। রাস্তায় তাসমিয়া একটা ছেলের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। একটু পর ওরা দুজন রিকশায় পাশাপাশি বসে পরলো। আমার আর বিষয়টা বুঝতে বাকি রইলোনা। ব্যস্ত নগরীর পিচঢালা রাস্তার উপর দিয়ে হেটে যাচ্ছি। দিনদিন সূর্যের উত্তাপ টা কেমন জানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমার মনের উত্তাপটাও যে কমছেনা। কিছুটা সাদৃশ্য বটে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত