লাল রঙের ভালবাসা

লাল রঙের ভালবাসা

কোন এক প্রচন্ড অদ্ভুত মায়াময় সন্ধ্যার কথা। আকাশে ফকফকা চাঁদ। ছয়তালা বাসার ছাদের উপর
দাঁড়িয়ে জ্যোৎস্না দেখছি। আমার ধারণা সেদিনের জ্যোৎস্না ছিল আমার দেখা সবচেয়ে তীব্র জ্যোৎস্না! এর আগে পরে আমি কখনও এত তীব্র জ্যোৎস্না দেখি নি! কতটা তীব্র জ্যোৎস্না বলি। আমার ধারণা সেখানে হুমায়ুন স্যারের কোন বই আনলে অনায়াসে পড়া যাবে। হুমায়ুন কেন আসল সেটা বোধ করি আমার রূপা জানে। সেদিনের সন্ধ্যাটা একটু তীব্র মায়াময়ই। ঝিরঝির হাওয়া, বাতাসে অদ্ভুত একটা সুন্দর গন্ধ। কিসের গন্ধ ছিল আমি জানি না। কিন্তু বাতাসটা কেমন জানি ছিল! এমন অদ্ভুত বাতাস আমি জীবনে কখনও টের পাই নি। ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়ায়ে আছি। চিরপরিচিত ছাদ কিন্তু একেবারেই অচেনা পরিবেশ।

একদম অচেনা। আমি মোবাইল হাতে নিয়ে দাঁড়ায়ে আছি। কি মনে করে যেন হঠাত রূপাকে একটা ফোন দিতে ইচ্ছে হল। রূপা আমার বান্ধুবী। আমরা এক সাথে পড়ি। পড়ি বললে কি ঠিক হবে? পড়তাম। সে যাই হোক, রূপাকে জীবনে প্রথমবারের মত ফোন দিলাম। সত্যি কথা বলতে কোন কারণ ছাড়া কোন মেয়েকে জীবনে প্রথমবারের মতন ফোন দিলাম। কি এক অদ্ভুত অপেক্ষাময় সময়! মাত্র চারবার রিং হতেই তুই ফোন ধরলি। যখন ফোনটা ধরলি কি যে এক অদ্ভুত শিহরণ! বোঝাতে পারব না। সে যাই হোক, এক কথা দুই কথা বলতে বলতে ঠিক চার মিনিট আটত্রিশ সেকেন্ড কথা হল। কি কথা হল মাঝে মাঝে স্পষ্ট কানে বাজে। যখন ফোনটা ছাড়লি গায়ে যেন পুরো কাটা দিয়ে উঠছিল। ঠিক তার পরেও অনেকটা সময় ফোন কানে নিয়ে বসে ছিলাম! জ্যোৎস্না মাখা আলো আধারে ঘেরা পরিবেশটাকে কিরকম যেন লাগছিল। মনে হচ্ছিল সব কিছুই তোর জন্য সৃষ্টি হয়েছিল। সব কিছু। বিশ্বাস কর, চোখ বন্ধ করলে আমি এখনও সেই সময়টাকে স্পষ্ট দেখতে পাই।

এক সাথে ক্লাস করলে অনেক সময়ই অনেক কথা হয় বা হওয়াটা স্বাভাবিক। তুই জানতিস আমি মেয়েদের সাথে খুব কম কথা বলি। তাই তোর সাথেও কম কথাই বলা হয়েছিল। আর তাছাড়া তুই সবার মধ্যমণি ছিলি বলে সব সময় তোর বান্ধুবী দ্বারাই পরিবেষ্টিত থাকতি। তাই হয়ত তোর সামনে গিয়ে তোর সাথে কথা হত না। তুই যখন কাছে এসে কথা বলতি কিংবা যখন ফ্রি থাকতি কেবল মাত্র তখনি আমাদের কথা বার্তা হত। একেবারেই বন্ধু সুলভ কথা। বন্ধুর বাইরে তো একটা কথাও না। জানিস, তুই যেদিন আমার কাছে প্রথম কোন গল্পের বই পড়তে চেয়েছিলি কি ভালটাই না লেগেছিলি। একদিন মনে হত বাসার সব গল্পের বই এনে এনে তোকে পড়তে দিই। হয়ত দিয়েছিও অনেক। চোখ বন্ধ করলে আমি সব কিছু স্পষ্ট দেখতে পাই।

তুই আমার পাশে দাঁড়ায়ে আছিস আর আমি তোকে গল্পের বই দিচ্ছি! আমি জানি, তুই আমাকে বন্ধুর চেয়ে বেশি কোনদিন কিছু ভাবিস নি। আমার মত অতি তুচ্ছ একটা মানুষকে কেউ কিছু ভাববে না সেটা আমি ভাবিও না। কিন্তু কে জানে তোর প্রতি আমার অন্য রকম একটা এক্সপেক্টেশন ছিল বোধ হয়। হয়ত আমার মত তুচ্ছ একটা জীবকে তুই তুচ্ছ ভাববি না। হয়ত আপন করে নিবি মনের মাধুরী মিশিয়ে। এত কিছু যে কেন কিভাবে ভেবেছিলাম কে জানে। কি হাস্যকর চিন্তা ভাবনা বল। যাই হোক, মনে আছে প্রথম সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা দিতে বহু দেরী করে এক্সাম হলে এসেছিলাম। এক্সাম শেষ হয়ে বের হতে না হতেই তোর এসএমএস। কি ঝাড়ি দিয়ে বললি, কেন এক্সাম হলে দেরীতে এসেছি। জানিস, মোবাইল চেঞ্জের সাথে সাথে এসএমএস ডিলিট হয়ে গেছে কিন্তু মনের চিলেকোঠায় সেই এসএমএসটা আজও আটকে আছে। সারাটা জীবন যদি এমন করে ঝাড়ি দিতি খুব কি কষ্ট হত?? হা হা। কি হাস্যকর পাগলামী মার্কা চিন্তা ভাবনা আমার।

আচ্ছা রূপা বল তো, তোর সাথে আমার কোনদিন হাতে হাত রেখে ঘোড়া হয় নি। একই রিকশাতেও চড়া হয় নি। রাত জাগা জোনাক পোকার মত আমাদের মোবাইল ফোনে গল্পও করা হয় নি। তাও তোর প্রতি আমার এত মায়া কোথা থেকে আসল বল তো? চোখ বন্ধ করলে তোর মুখের হাসিই দেখতে পেতাম। তোর ঘাড় বেয়ে নেমে আসা খোলা চুলের অরণ্যে কতবার হারিয়েছি সে খবর আমার ঈশ্বর জানেন। ক্লাসের ফাঁকে কতবার তোর দিকে চেয়েছিলাম সেটা আর নাই বা বলি। চোখ বন্ধ করলে তোর আধো আধো পাগলামীগুলোই চোখে ভেসে উঠত।

রূপা, তুই কি জানিস তোর জন্য ফেসবুকে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতাম। কখন আসবি সেটা জানার জন্য কি অপেক্ষা। আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ কথাই হয়েছিল ফেবুর ম্যাসেজে। কি হাস্যকর কথা। বাস্তবের সবচেয়ে পরিচিত মানুষের সাথে ভার্চুয়েল জগতে কথা! সব কিছুর ডেফিনেশন আছে কিন্তু এগুলা কি হাস্যকরই না ছিল!! রূপা নামের মেয়েটা ক্লাসের সবচেয়ে প্রথম বেঞ্চে বসত আর আমি ক্লাসের সবচেয়ে পিছনের বেঞ্চে! ক্লাস লেকচার তোলার ফাঁকে ফাঁকে কতবারই না আলতো করে তোর মুখের দিক তাকায়ে থাকা হত! ভাগ্যিস, আমি সেমিস্টার ড্রপ খেয়েছিলাম! এখন আর তোর সাথে ক্লাস করতে হয় না। তুইও বেঁচে গেছিস। তোর অগোচরে কেউ আর তোর দিকে তাকায় না। কিংবা ঢাকা শহরে গ্রামীণ পরিবহনের সেই ছোট্ট বাসটির দিকেও গভীর আশা নিয়ে তাকায় না যে বাসে করে তুই ভার্সিটি যাতায়াত করতি। জানিস, ক্লাস শেষ করে বাসায় ফেরার সময় রাস্তায় যতগুলো গ্রামীণ বাস দেখতাম হা করে তাকায়ে থাকতাম। যদি অনেকগুলো বাসের কোন একটিতে করে তুই বাসায় যাস তাহলেই তো তোকে দেখতে পাব!! কি পাগলামিই না ছিল বল।

রূপা, জানিস ইউনিতে উঠার পর একটা এক্সামও তোর ছবি দেখা ছাড়া দিতাম না। প্রত্যেক এক্সামের আগে তোর ছবি দেখে এক্সাম দিতে যেতাম। আমার ল্যাপটপের ওয়াল পেপারে শুধু তোরই ছবি ছিল। ও ভাল কথা, কোন এক ভয়ঙ্কর মন খারাপ করা বিকেলে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশ ডেকে যাচ্ছিল তারস্বরে। কি নিঃসঙ্গটাই না লাগছিল তখন। আমার ছোট্ট মন খারাপ করা ঝুলবারান্দাটায় দাঁড়িয়ে যখন আকাশে ভেসে বেড়ানো নিকষ কালো মেঘদল গুলোকে দেখছিলাম মনে হচ্ছিল আমি বুঝি তোর সাথে ঝুম বৃষ্টিতে হেটে যাচ্ছিলাম। হঠাত মনে হল কিছু লিখে ফেলি। সাথে সাথে বসে একটা গল্প লিখে ফেললাম। বিশ্বাস কর, সেদিনের আগ পর্যন্ত আমি জানতাম না আমি কিছু লিখতে পারি। একদিন এই ফেসবুকের যুগে ফেসবুকের পেজে একটা গল্প লিখে দিয়ে দিলাম। অবশ্যই সেটা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দিয়ে। মানুষ গল্প পড়ল। কেউ কেউ ভাল বলল, কেউ বা বলল ফালতু। আমার কিছু যায় আসে না। আমি কি লেখক নাকি! কিন্তু সেই লেখায় যখন তুই কমেন্ট করলি তখন আমার আর খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেতে ইচ্ছে করল। যাকে নিয়ে লেখা লিখেছি সে পড়েছে। জানিস, সেদিনের মত আনন্দ আমি জীবনে কোনদিনই পাই নি।

তারপর থেকে যখনই তোর কথা মনে হত তখনি গল্প লিখে ফেলতাম। কিছু দিতাম ফেবুর পেজে কিছু ব্লগে। আর বাকিগুলো রেখে দিতাম আমার ডায়েরিতে। আমি লেখক না কাজেই আমার লেখা তেমন ভাল কিছুও না। হয়ত কেউ কেউ ভুলে পড়ে ফেলত। হয়ত বা মনের অজান্তে ভাল বলত! আমার কোন বন্ধু ছিল না। এখনও নেই। একটা চরম নিঃসঙ্গ মানুষের বন্ধু হতে পারে তার লেখা গল্পের চরিত্রগুলো। আমার পরিচিত মানুষের কেউই জানে না আমি লিখালিখি করতাম। কেউ না। হয়ত দুই একটা ছাইপাশ গল্প আমার নামে পেজে দেখে জানত আমি লিখি! রূপা জানিস, এক সময় প্রচন্ড একাকীত্ব নিয়ে তোকে মিস করে গল্প লিখে যেতাম আর ভাবতাম জীবনে যখন একদিন ম্যাচিউরিটি আসবে তখন তোকে আমার ভালবাসার কথা বলব। তুই আমাকে ফিরিয়ে দিবি না।

দেখতে দেখতে দুইটা বছর কেটে গেল। সেকেন্ড ইয়ার সেমিস্টার ফাইনাল দিয়ে কেন যেন মনে হল রেসাল্ট খুব খারাপ হবে। আমি হয়ত সেমিস্টার ড্রপ খাব। হলে থাকত ভাল লাগত না বলে বাসায়ই থাকতাম। তুই জানিস আমি তোর পুরো উলটা ক্যারেক্টার। আমি একদমই ইন্ট্রোভার্ট। হয়ত সেই সময় হলে থাকলে এক্সামে পাশ করে যেতাম। যাই হোক, একদম ভাল লাগত না বাবা মাকে ছাড়া তাই হলে আসা হয় নি। সেই সময় মনে হল আমার লাইফের একটা খুঁটি থাকা দরকার। যাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকতে পারব। যে আমাকে পৃথিবীর সব হতাশা থেকে বাঁচিয়ে রাখবে। যদি সত্যিই সত্যিই সেমিস্টার ড্রপ করি তাহলে তো লজ্জাতেই আর বাসায় থাকতে পারব না। আর যেই মা আমাকে প্রতিদিন মুখে তুলে ভাত খাইয়ে দিত, ভার্সিটি যাওয়ার আগে ড্রেস গুছিয়ে দিত হয়ত বা তাকে ছাড়াই আমার থাকতে হবে। বাবা মার একমাত্র ছেলে হলে যা হয় আর কি! কাপড় ধুয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে সব সব কিছুই মা করে দিত! যদি পরীক্ষায় খারাপ করি তাহলে সব কিছু দূরে চলে যেতে হবে। তখন আমি থাকব কিভাবে? আমি পারব না একটা দিনও বেঁচে থাকতে।

রূপা জানিস, ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় আমার আব্বু আমাকে সব সময় বাসে তুলে দিত। কি হাস্যকর না বল? এসব কিছু থেকে দূরে সড়ে গিয়ে বেঁচে থাকা একটা মুহুর্ত আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ঠিক সেই সময় মনে হল তুই আমার পাশে থাকলে সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। তাই স্বার্থপরের মতন তখন তোর হাত ধরতে চেয়েছিলাম। একেবারে স্বার্থপরের মতন। দোস্ত, আমি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সেলফিশ। যদিও আমি জানতাম তুই আমার চেয়ে সহস্রগুণ ভাল ছেলে ডিসার্ভ করিস, তাও। একেবারে সেলফিশের মতন তোর হাত ধরতে চেয়েছিলাম শুধু মাত্র বেঁচে থাকার জন্য।

রূপা, তুই যখন আমাকে ফিরিয়ে দিলি প্রথমে আমার মনে হয়েছিল এটাই স্বাভাবিক। আমার মতন একটা চূড়ান্ত মাত্রার বেকুব, গাধা বা ইমম্যাচিউরড ছেলেকে তুই কেন ভালবাসবি? তাও কেন যেন মনে হচ্ছিল তুই হয়ত আমাকে সামনাসামনি ফিরিয়ে দিতে পারবি না। কি ভুল ধারণাটাই না নিয়ে ছিলাম। তোর সাথে সামনাসামনি সব কথা ফাইনাল করার জন্য কতটা দীর্ঘ সময়ই না অপেক্ষা করেছি। চেয়েছিলাম তুই আমাকে ভালবাসিস না একবার আমার সামনে এসে বলিস। ফোনে না, ফেসবুকেও না। জাস্ট একবার ক্লাসের ফাঁকে কিংবা তোর কোন অবসর সময়ে। শুধু সামনে দাঁড়ায়ে একবার বলিস তুই আমাকে ভালবাসিস না। জাস্ট এই কথাটা শোনার জন্য তোর জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়ায়ে ছিলাম।

দোস্ত, জীবনে কারও জন্য এতটা অপেক্ষা করি নি। আমি তুচ্ছ আমি জানি। তাই বলে এত তুচ্ছ? যার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করব সে আমাকে এসে জাস্ট সামনাসামনি বলতে পারবে না? এমন তো না যে তোকে আমি হঠাত করে দেখেছি কিংবা ব্লা ব্লা ব্লা! দুই বছর একসাথে পড়ার পরও কি তুই আমাকে একটুও চিনতে পারিস নি?? দোস্ত, দুইটা বছর ধরে মনে মনে আমি এটাই জানতাম আমি পাগল হলেও, বদ্ধ উম্মাদ হলেও, পৃথিবীর সবার কাছে সবেচেয়ে অবহেলার পাত্র হলেও, সবচেয়ে আনস্মার্ট ছেলে হলেও, টাকা-পয়সা না থাকলেও, খুব খারাপ ছাত্র হলেও তুই আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারবি না। কারণ আমি তোকে পৃথিবীর সব কিছুর বিনিময়ে ভালবেসেছিলাম। জানিস, ঠিক ছোটবেলা থেকে দেখতাম আমি অবাঞ্ছিত। খেলতে গেলে কেউ খেলায় নিত না। প্রত্যেক এক্সামে প্রায় ফার্স্ট অথবা সেকেন্ড হওয়া সত্ত্বেও টিচাররা তাদের কাছে প্রাইভেট পড়তাম না দেখে দেখতে পারত না। সব কিছু মেনে নিতে আমার কোন আপত্তি নাই। বিশ্বাস কর একটুও না। কিন্তু তুই আমাকে ফিরিয়ে দিবি এটা মানতে পারি নি। কিংবা কে জানে এখনও মেনে নিতে পারি নি।

আরেকটা ইন্টারেস্টিং জিনিস জানিস? আমি জীবনে তিনটা জিনিসই চেয়েছিলাম। প্রথমটা হল সারাটা জীবন যেন বাবা মার সাথে থাকতে পারি। দ্বিতীয়টা হল বুয়েটে যেন পড়তে পারি। আর সর্বশেষটা হল তুই। মজার ব্যাপার হল এখন না আমি মা-বাবাকে ছাড়া থাকতে শিখে গেছি। কিংবা কে জানে আমার ঈশ্বর আমাকে থাকতে শিখিয়েছে। এখন তো প্রতি এক-দুই মাস পর পর যাওয়া হয়। ক্লাস, পার্ট টাইম অফিস, পড়ালেখা সব শেষ করে বাসায় যাওয়ার মতন সময় বের করাটা একটু কষ্ট বৈ কি। আরেকটা মজার জিনিস জানিস? বুয়েটে ভর্তি এক্সামের মাত্র তিনদিন আগে আসল ভয়ঙ্কর জ্বর। কি জ্বর রে বাপ। মাথা ঘুড়ে যাওয়া দশা। বেঁচে ছিলাম এটাই বড় কথা আর পরীক্ষা তো সেই বহুদূর! আর তুই… তুই তো আমার কেউ না রে। কেউ ছিলি না কেউ হবিও না।

দোস্ত, আমি তোর জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতাম। তুই ফিরিয়ে দিলেও তোর থেকে বহু দূরে সড়ে গিয়ে তোর জন্য অপেক্ষা করতাম। কিন্তু তুই আমার সামনে আমাকে উপেক্ষা করে অন্য কোন ছেলের সাথে ঘুড়বি এটা আমার সহ্য হত না। হোক সে তোর ফ্রেন্ড। তুই আমাকে ছোট ভাবতে পারিস এটা শুনে অথবা ভাবতে পারিস আমাকে ভাল না বেসে ভাল করেছিস। যা খুশি ভেবে নিস। আমার কিছু যায় আসে না। ওটা আমার সহ্য হবে না। কোনদিনও না। সরি। তাই আমি তোর থেকে দূরে চলে গেছি। তুই যদি ভাবিস আমি তোকে কোনদিনও ভালবাসি নি তা ভেবে নিস। আমার কিচ্ছু যায় আসে না।

জানিস দোস্ত, তুই যেদিন আমার সামনে তোর সবচেয়ে ভাল ছেলেবন্ধুর মোবাইল নিয়ে গেমস খেলতি তখন খুব খারাপ লাগত। তখন ভাবতাম আমার যদি একটা মোবাইল থাকত তুই বুঝি আমার মোবাইল নিয়েই খেলতি! যাই হোক, আমি বেশ কিছু আগে একটা গ্যালাক্সী এন্ড্রোয়েড কিনেছি! টাচ চালানো শিখলামই এই এন্ড্রয়েড কিনে! পুরাই রক্ত বেচা টাকা। রক্ত বেচা বললাম এইজন্য যে সকাল আটটা থেকে দুইটা পর্যন্ত ক্লাস করে বিকাল চারটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত অফিস! প্রথম চাকরীটা করতে চেয়েছিলাম কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকার জন্য। তোর ভূত মাথা থেকে নামানোর জন্য। যাই হোক, ইদানিং কখন দিন যায় রাত আসে জানিই না দোস্ত। সময় কোন দিক থেকে কেমনে যায় বলতে পারি না। দোস্ত, কিভাবে যে সময় কাটছে সেটাও জানি না।

ও ভাল কথা, এরই মধ্যে একটা মেয়ের সাথে রিলেশন হয়েছে। পরিচয়ের ঘটনা শুনবি? তোকে নিয়ে যে গল্পটা লিখেছি সেটার মাধ্যমে। ভালো তো ভাল না? আমি তো পরিচিত মানুষদের সাথেই কথা কম বলি আর অপরিচিত কারও সাথে কেমনে কথা হল কে জানে! হয়ত তোর মত কাউকেই খুঁজে গেছি মনের অজান্তে! জানিস, মেয়েটা না হুবহু তোর মত। তোর মত রাগী, তোর মত জেদি, তোর মত হাসিখুশী। যেন তোর একটা ডুপ্লিকেট ভার্সন। তোর সাথে ওর একটাই অমিল সেটা হল ও আমাকে পাগলের মতন ভালোবাসে। জানিস রাতে ওকে ফোনে ঘুম না পাড়িয়ে দিলে ওর ঘুম আসে না! একদিন রাতে আমি ফোন সাইলেন্ট করে ঘুমায়ে গেছিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি ষাট-সত্তরটার বেশী মিস কল!! আরেকদিন আমি ওর সাথে কি কারণে যেন একটু খারাপ ব্যবহার করেছিলাম প্রায় আটটার মত ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছে! এত ভালবাসা মানুষ কেমনে বাসতে পারে রে?

শুনলাম বাসা থেকে ওর বিয়ের কথা চলছে। এত আগেই কেন বিয়ে দিবে বুঝতে পারছি না। সমস্যা নেই। ও আমাকে অনেক ভালবাসে। হয়ত বিয়েটা ও দুই এক বছর পেছাতে পারবে। আর সব কিছু ঠিক থাকলে দুই বছর পর আমার পড়ালেখা শেষ হলে দেন আমরা বিয়ে করব। যদি ও রাজী থাকে আর কি। ও চাইলে আমরা এখনি বিয়ে করে সংসার করতে পারি। আব্বু আম্মুর টাকায় না। আমার চাকরীর টাকায়। প্লাস ও যদি টুকটাক কিছু করে মোটামোটি বেশ ভাল চলবে আমাদের। ওর ফ্যামিলি থেকে যেই ছেলে ঠিক করা হয়েছে সে অবশ্য ম্যাজিস্ট্রেট। ভাবসাবই আলাদা। হয়ত ও বিয়ে আটকাতে পারবে। আর না আটকাতে পারলে বুঝে নেব আমার সব কিছুই ভুল ছিল। ভুলের স্রোতে আমি সব কিছু ভুলে যাব, সব কিছু ভাল কথা, তোর চিন্তা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য চাকরী বাকরি করছিলাম। এখন টাকা পয়সা কেমন জানি নেশা হয়ে যাচ্ছে। মাসে মাত্র পনেরো বিশ হাজার টাকা পাই। সব টাকা উড়াই। টাকা উড়াতে খারাপ লাগে না। যদি জীবনে অনেক টাকা হয় সেগুলোও উড়াব। টাকা উড়ানোর মজাই আলাদা। ঠিক যেমন গোল্ডলিফের ধোঁয়া উড়ানোর মতই মজার।

আগে জ্বর আসলে ঘোরের মধ্যে বিড়বিড় করে রূপা রূপা করতাম। আর এখন জ্বরই আসার সময় নাই!! ঘোর তো অনেক পরের কথা। পাঁচটা লিফ টানলে মাথাটা একটু ঘুড়ে, কিংবা মাঝে মাঝে কেরুর হাফ লিটারের একটা ক্যান খেলে একটু ঝিমানো লাগে। তোর কথা মনে হয় না রূপা। কারণ তুই আমার কেউ না। কেউ না। তোর জন্য টিউশনির টাকা জমিয়ে কেনা বই পুড়ায়ে ফেলেছি। কিচ্ছু নেই, কিচ্ছু নাহ।

জানিস রূপা, জীবনে এত্ত অবাক হয়েছি এখন অবাক হওয়ার ক্ষমতা কেন যেন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এত এত অবাককৃত ঘটনা গত বছরের অলমোষ্ট এই সময়ে ঘটেছে আমি পুরাই নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম। চরমভাবে অবাক হওয়ার মত ঘটনা একটা ঘটলে মানা যায়, দুইটা ঘটলেও হয়ত মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু যখন সিরিয়ালি ঘটতে থাকে তখন আর মেনে নেওয়ার প্রশ্ন উঠে না। সেমিস্টার ড্রপ, তোর চলে যাওয়া, সাধের একমাত্র ল্যাপটপ নষ্ট হওয়া, একটা মাত্র চাইনীজ মোবাইল ফোন হারায়ে ফেলা… ঘটনা ঘটতে থাকুক। আমি চুপচাপ উপভোগ করি!! এটাই মজা।

রূপা তুই ভাল থাক। অনেক ভাল। পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল। জানিস আমার যখন একটু মন খারাপ হত আমি আজাইড়া হিজিবিজি লেখালেখি করতাম। ঠিক এক বছর আগে তুই যখন আমাকে ফিরায়ে দিলি তখন থেকে আর লেখতে ভাল লাগে না। আমার প্রচন্ড মন খারাপ গুলো আমার কাছে থাকে। ঠিক এক বছরের পর যখন তোকে নিয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছা করল। কিন্তু আমি সত্যিই লেখালেখি ভুলে গেছি রে শুভ জন্মদিন আমার হারিয়ে যাওয়া লাল পরী! ঈশ্বরের কাছে একটাই চাওয়া, জীবনে কোনদিন একটু দুঃখও যেন তোকে স্পর্শ না করে। এই রকম হাসিখুশি থাকিস সারাটা জীবন।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত