কাঁজল পরী

কাঁজল পরী

মাত্র এক মাসের মত আগে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারে বিএসসি কম্পিলিট করেছি।চাকরীর জন্যে এখনো ঘুরাঘুরি শুরু করিনি।আম্মু ফোন করে হোষ্টেল থেকে বাসায় আসার জন্যে বলতেছে। তাই আমারো একটু ইচ্ছা হলো, কয়েকদিন আম্মুর সাথে সময় কাটিয়ে তার হাতের মজার রান্না খাওয়ার!

তাই ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে বাসার দিকে রওনা দিলাম।তখন সূর্য্যটা অনেকখানি হেলে ৮৫ ডিগ্রি কোণে রুপান্তিরিত হয়েছে।বাস এ উঠে জানালার পাশেই একটা সিট এ বসলাম।হালকা মৃদু বাতাস সাথে সূর্য্যটারো তীব্র শক্তিটা বিকাল হওয়ার সাথে সাথে কমিয়ে দিয়েছে।বাসের ভিতরে স্লো সাউন্ডে একটা রবীন্দ্র সংগীত বাজছে।আমার পাশেই সিটে একটা ছোট নিষ্পাপ বাচ্চা তার আম্মুর সঙ্গে দুষ্টুমিতে মাতিয়ে আছে। এতো সুন্দর পরিবেশের মধ্য দিয়েই বাসটা চলেছে রংপুরের উদ্দেশ্যে। হেল্পারের ডাকে কল্পনার ঘোর কাটলো।রংপুর সাত মাথা, সাত মাথা বলে ডেকে যাত্রি নামিয়ে দিচ্ছে।আমারো বাসা এখানেই।আম্মুর কিছু প্রিয় খাবার আর আমার ভাগ্নিটার জন্যে কিছু চকলেট কিনে নিলাম। অহ! আপনাদের তো বলাই হয়নি! আমার আম্মু একা থাকতে বোরিং ফিল করে বলে আমার ভাগ্নিটাকেও আমার আম্মুর সাথে রেখেছি।

_কেমন আছো আম্মু?(আমি)
_এই তো বাবা আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।তুই কেমন আছিস? (আম্মু)
_আলহামদুলিল্লাহ আমিও ভালো আছি আম্মু।আম্মু খুশি কোথায়?(খুশি আমার ভাগ্নির নাম)
_ওর রুমে বসে আছে।
_আচ্ছা আম্মু আমি তাইলে ফ্রেশ হতে গেলাম।
_ওকে বাবা যা।আমি খাবার রেডি করতেছি।

ব্যাগপত্র আমার রুমে রেখে ওয়াশরুমে ঢুকলাম। ফ্রেশ হতেই খেয়াল করলাম তোয়ালেটা ওয়াশরুমে নিতে ভুলে গেছি! ওয়াশরুম থেকে তাই খুশিরে ডাক দিলাম। খুশি তোয়ালে একটু নিয়ে আসো তো?! আচ্ছা মামা নিয়ে আসতাছি বলে জবাব দিলো তার রুম থেকে। কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুমে নক করলো।একটু দরজা খুলে দেখি অপরিচিত একটা কন্ঠে তোয়ালে নেয়ার জন্যে বললো।বুঝলামনা মেয়েটা কে।মেয়েটা চলে গেলো আর আমি ওয়াশরুম থেকে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে খুশির রুমে গেলাম।গিয়ে তো আমি অবাক! দেখলাম হলুদ ড্রেসে লম্বা এলোচুলে, চোখে ঘন করে কাজল দেয়া একটি মেয়ে খুশির পড়ার টেবিলে উপন্যাস পড়ছে।কি অবাক দৃষ্টিতে, মন কারা চাহনিতে বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে যেনো কোনো শিল্পির আঁকা তার নিজের ইচ্ছা মত দেয়া সৌন্দর্য্যের পরী। তার রুপের বেশির ভাগ গড়িয়ে পরছে তার কাজল রাঙ্গা চোখ থেকে। আমি এক মনে তাকিয়ে আছি তার চোখের দিকে। হঠাৎ মেয়েটার কথায় আমার ঘোর কাটলো।

_এই যে মিষ্টার চোর! এভাবে চুরি করে কারো চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা কি ঠিক?(মেয়েটি)
_চোর?! আমি চোর হবো কেনো? আমি তো আপনার পড়া উপন্যাস এর বই টার নাম দেখার চেষ্টা করছিলাম(মিথ্যা কথা বললাম লজ্জায়)
_থাক আর মিথ্যে বলতে হবেনা চোর!যান গায়ে কিছু কাপড় পরেন?হিহিহি

এবার আমি সত্যিই লজ্জা পেয়েছি।আর খেয়ালি করিনাই যে আমি খালি গায়ে আসছিলাম। আর কে জানে খুশির জায়গায় এই রুমে অন্যকেউ বসে আছে এই রুমে?! তাই মেয়েটির কথায় তারাতারি নিজের হাতের তোয়ালেটা দিয়ে নিজের ঘারের উপর দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম।মেয়েটির হাসির আওয়াজটা এখনো এই রুম থেকে শুনতে পাইতেছি।কি নিষ্পাপ হাসি মেয়েটার। রুমে এসে ড্রেস পড়তেই আম্মু খাবার খেতে ডাকলো। আমি ড্রেস পড়ে খাবার খেতে গেলাম।গিয়ে দেখি মেয়েটাও খেতে বসেছে।আমায় দেখার সঙ্গে সঙ্গে মুচকি হাসতেছে। আরেকটা প্রবলেম হচ্ছে মেয়েটার চোখটা যে এতো সুন্দর কেনো! চোখের দিকে তাকালেই সব কিছু যেনো ভুলে যাই।

_কেরে দাড়িয়ে থাকলি যে?! বস, পরিচয় করায়া দেই।(আম্মু)
_জ্বি আম্মু বসতাছি।(আমি)
_ওর নাম কাঁজল। তোর আপুর মামা শশুরের মেয়ে।এইচএসসি পরিক্ষা দিলো এইবার।
_হ্যা বুঝতে পারছি আম্মু…
_ওকে তাইলে খা এখন।

খাওয়া শেষে রুমে এসে ল্যাপটপ অপেন করে ফেবুতে ঢোকার জন্যে ল্যাপটপ নিতে গিয়ে দেখি ল্যাটটপ টা নেই।
খুশির রুমে গিয়ে দেখি ওরা আমার আইডি তে ঢুকে ফেবুর চ্যাটিং দেখতেছে।

_এই তোমরা কি দেখো হুম?পারমেশন ছাড়া কারো আইডিতে ঢোকা কি ঠিক?
_ঠিক বেঠিক বুঝিনা।কিন্তু এতো দূর লেখাপড়া করেছেন কিন্তু এখন পর্যন্ত একটা গার্লফেন্ডও দেখি নাই।সব মেয়েরে খালি ভাব ই দেখাইছেন।
_মনের মত কাউকে পাইনি।তাই তো প্রেম করিনি এখনো।
_আপনার প্রোফাইলের বায়ো তে যে লেখা- কাঁজল ওয়ালা চোখের পাপড়ি ছুয়ে দিতে চেয়েছেন? সেটা কোন মেয়ের চোখ?
_ঐটা কল্পনায় ভেবে নেয়া একটি চোখ ছিলো!তবে সেটা হয় তো পেয়ে গেছি।
_তাই নাকি? কে সে?
_হ্যা..সময় হলেই বলে দিবো।

কথাটি বলে ল্যাপটপেটা নিয়ে চলে আসলাম। মেয়েটার নাম যেমন কাঁজল তার সাথে চোখে লাগানো কাজলের কেমন যেনো একটা নিভির সম্পর্ক রয়েছে।ভাবনার আকাশে কেমন যেনো বারবার কড়া নারতেছে। কিছুক্ষণ ফেসবুকিং করে ঘুমিয়ে পরলাম। সকালে একটি মিষ্টি ডাকে ঘুম ভাংলো।চোখ খুলে দেখি কাঁজল চা এর কাপ নিয়ে দাড়িয়ে আছে। জানালা থেকে আসা হালকা বাতাসে, কাঁজলের মাথার সিল্কি চুল গুলো উরে পুরো মুখে লেপ্টে যাচ্ছে। তার মুখটা দেখে মনে হচ্ছে মেঘের আড়ালে থেকে উকি দেয়া এক পূর্ণিমার চাঁদ। এই যে চা নেন, বলে হাত বাড়িয়ে দেয়ায় কাজলের ডাকে বাস্তবতায় ফিরলাম। নাহ, এই মেয়েটা আমায় প্রতিটা সময় ঘোরের মাঝে রাখছে।

_আচ্ছা তোমার চোখ গুলো এতো মায়াবী কেনো?আর চোখের মাঝে কাঁজল দিলে এতো মায়াবীতা বাড়িয়ে যায় তা তোমায় দেখার আগ পর্যন্ত বুঝতে পারিনি।সত্যিই তোমার তুলনা তুমি নিজেই(আমি)
_আপনার ধারণার চোখটাই হয় তো এতো সুন্দর। তাই তো বেশি সৌন্দর্য্য দেখতে পাচ্ছেন।.কাঁজল কথাটি বলেই চা এর কাপটা হাতে দিয়ে চলে গেলো।মেয়েটা অনেক লজ্জা পেয়েছে মনে হয়।.

১ এ ডিসেম্বর!আমার আজ জন্মদিন।আপু দুলা ভাই সহ আরও অনেকে এসেছে।সবাই অনেক সুন্দর সাজে সজ্জিত।পুরো বাড়িটা আজ অনেক রং বেরং এর বেলুন আর রঙ্গিন বাতিতে সাজানো হয়েছে।প্রতিবারের চেয়ে এবার বেশি আয়োজন করে সাজানো হয়েছে কিন্তু কারণটা আমারো অজানা।

সবাই ড্রয়িং রুমে হাজির।কিন্তু কাঁজল রে কেনো জানি খুজে পাচ্ছিনা।কেক টেবিলের পাশে সবাই হাজির শুধু কাঁজল ছাড়া।তাই কাঁজলকে খোজার জন্যে সিড়ির দিকে যাইতেই দেখি; কাঁজল সিড়ি বেয়ে নিচে নামছে। লাল রং এর একটা শাড়ি পরেছে আজ।চোখে মোটা করে কাজল দিয়ে, কাজলের শেষের অংশটা একটু বাকিয়ে দিয়েছে।
আমার কল্পনার চোখের চেয়ে এই চোখটা আরও সুন্দর।(মনে মনে কথাটি বললাম)

_একটা নাম দিতে চাই তোমার, যদি অনুমতি দাও?(আমি)
_কি নাম? (মুচকি হেসে)
_আজ থেকে তোমার নাম “কাঁজল পরী” ।সত্যিই তুমি এই আমার দেয়া নামের চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর।
_যান!কেক কাটেন।আর নামটা পচন্দ হয়েছে।থ্যাংকু (লজ্জার হাসি)

কেক কাটা শেষ।হঠাৎ দুলা ভাই সবার দৃষ্টি আকার্ষণ করে,কিছু বলার জন্যে ইঙ্গিত করলো। কথাটি শুনে আমি খুশিতে কান্না করবো না লুঙ্গি পড়ে এসে লুঙ্গি ডান্স দিবো বুঝতে পারছিনা। যেটাকে বলে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি আর কি। দুলা ভাই আমার সাথে কাঁজল এর বিয়ের রেজিষ্ট্রি করে রাখতে চায়।একবছর পর আমাদের বিয়ে হবে। আর আমার একবছরের মাঝে ভালো একটা চাকরীও হয়ে যাবো।কারণ অনেক চাকরীর অফার ইতিমধ্যে পেয়েও গেছি। অনেক খুশি কথাটি শোনার পর থেকে।সবাই খাওয়া দাওয়া সেরে যে যার বাসার চলে যাচ্ছে আর আমি গেলাম কাঁজল পরীর কাছে!

_এই যে মিষ্টার! আজকের পর থেকে সকল আন নন মেয়েদের সাথে চ্যাটিং করা নিষেধ! করলে খবর আছে(কাজল)
_বিয়ে না হতেই এতো বড় আদেশ?(চুপসে গিয়ে)
_জ্বি স্যার..।আর আপনার পাসওয়ার্ডটা বলেন তো?
_পাসওয়ার্ড দিয়া কি করবা?
_দাও বলতাছি(ঝারি দিয়ে)
_অকে দি তা তা তাছি(তোতলিয়ে)
_আমার বাবুটা দেখি অনেক ভয় পেয়েছে!
_জ্বি না। মটেও পায়নি (দুষ্টুমি করে)
_কি ভয় পাওনি?দাড়াও মজা দেখাইতেছি।
_পেয়েছি পেয়েছি মজা করলাম বিল্লি।
_কি তুমি আমারে বিল্লি বললা? ইদুর, গরু, তেলাপোকা
_হইছে হইছে! চলো আজ বাহিরে ঘুরবো দেন ফুচকা খাবো?
_সত্যিই?
_জ্বি লক্ষী!
_লাভ ইউ সোনা চলো.

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত