জানি আবার দেখা হবে

জানি আবার দেখা হবে

তখন H.S.C পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। যাওয়ার সময় রিলেটিভের সাথেই গিয়েছিলাম কিন্তু আসার সময় একা আসছিলাম।

এখন মুল ঘটনায় আসা যাক গাবতলি থেকে বাসে উঠে সিট খুঁজে পাচ্ছিলাম না! কারন আমি জানালার পাশে সিট নিয়েছিলাম কিন্তু জানালার পাশে সব সিট বুক। পরে খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম,তবে সমস্যা হল আমার সিটে একটা মেয়ে বসে আছে বয়সে আপনার চেয়ে বড় ই হবে। কিন্তু এখন উঠাই দিবো কি করে ভাবছিলাম!

হঠাৎ মেয়েটা বলল ” এক্সকিউজ মি’ আপনার কি ১৮ নাম্বার ছিট?” আমি ছোট্ট করে উত্তর দিলাম “হুম” মেয়েটা এবার সরে গিয়ে বসে বলল “আচ্ছা তাইলে আপনি ভিতরে গিয়ে ছিটে বসেন,আমার ১৯ নাম্বার সিট।” আমি একটু হাসি মুখে বললাম “আচ্ছা ধন্যবাদ।” মেয়েটা কিছু বলল না শুধু একটু মুচকি হাসি দিল। কিছুক্ষন পরেই বাস ছেড়ে দিল,আমি পকেট থেকে হেডফোন বের করে কানে দিয়ে গান শুনেছি আর জানালা দিয়ে বাইরের প্রকৃতি দেখছি। কিন্তু প্রকৃতি দেখায় ছেদ পড়লো মেয়েটির ডাকে!

“আচ্ছা আপনি কই যাবেন?”(মেয়েটি)
“যশোর। আপনি? “(আমি)
“তাইলে ভালই হল আমিও যশোর যাচ্ছি,আপনি গান শুনেছেন?”
“হুম”
“কি গান?”
“হৃদয় খানের ভেবে ভেবে”
“উফ গানটা আমার জোস লাগে! হেডফোনের একটা আমার কাছে দিন তো!”

আমি ভ্যাঁবাচ্যাঁকা খেয়ে খেলাম কিন্তু পরে বাম কানের টা খুলে তার হাতে দিলাম। মেয়েটি কানে লাগিয়ে আমার দিকে কিছুটা সরে আসলো। আমি আবার জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ফোনে তখন আরফিন রুমি আর পড়শীর “তোমার পরশ” গানটা চলছে। লিষ্টের গান গুলো চলছে আর মেয়েটি আমার গাঁয়ে গাঁ লাগিয়ে গান শুনেছে। রাতে আমার ভাল ঘুম হয়নি তাই গান শুনতে শুনেতে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম জানিনা! ঘুম ভেংগে দেখি বাস আরিচাই,ফেরির উপর। মেয়েটি দেখি আমাকে দেখে হাসছে! আমি রাগে রাগে বললাম “এমন পেত্নির মত হাসছেন কেন?”

“উল্লুক দেখেছেন?”
“না তো!”
“আচ্ছা এখনি দেখতে পাবেন জাস্ট ওয়েট। ”

মেয়েটি দেখি ব্যাগ থেকে মেক-আপ বক্স বের করলো,তারপর মেক-আপ বক্সের আয়না আমার সামনে ধরলো! আমি তো বেকুব প্রায়,আমার চুল গুলা লম্বা ছিল তাই বাসের সিটে ঘুমিয়ে সব উল্লুকের মত হয়ে গেছে। কিন্তু উল্লুক কি সেটা বুঝলাম না! তারপর চুল গুলা ঠিক করে নিয়ে বাস থেকে নেমে ফেরিতে গেলাম। মেয়েটি নামেনি ও বাস এ বসে আছে তাই ভাবলাম ২ প্যাকেট চিপস আর ২ টা আইস-ক্রিম নিয়ে যাই।

“এই যে ধরেন!”(আমি)
“ধন্যবাদ। আপনি কি করে বুঝলেন আমার আইস-ক্রিম খেতে ইচ্ছা করছে তা?”(মেয়েটি)
“বুঝিনাই তো এমনি আনছি।”
“যাইহোক আমি বিন্দু আপনি?”
“কনক,পড়েন কিসে?”
“H.S.C দিলাম এবার। ছোট চাচার বাসায় বেড়াইতে গেছিলাম উত্তরা ।”
“তাইলে আমরা সেইম ইয়ার! আমি তো ভাবছি আপনি আমার চেয়ে বড় হবেন। আমি এক দাদুর বাসায় বেড়াইতে গেছিলাম মালিবাগে।”
“তাইলে ভালই হল।”
“হুম”

আমি বিন্দুর দিকে তাকিয়ে আছি ওর চুল গুলো বাতাসে উড়ছে আর ও ছোট পিচ্চিদের মত করে আইস-ক্রিম খাচ্ছে। হঠাৎ বিন্দু আমার দিকে তাকিয়ে বলল..

“আপনি আইস-ক্রিম খাবেন না?”
“হুম”
“তাইলে হাতে ধরে আছেন কেন? গলে যাচ্ছে তো।”
“ও তাই তো।”
“হি হি হি”

আসলে আমি বিন্দুর দিকে তাকিয়ে ছিলাম তাই আইস-ক্রিমের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। মনে মনে নিজের পাগলামির কথা ভেবে একটু হাসলাম। তারপর জানালার দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলাম বাস তখন আরিচা পার হয়ে খুব দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে। হঠাৎ কাধে উষ্ণ কিছুর ভর বুঝে তাকিয়ে দেখলাম বিন্দু ঘুমিয়ে পড়েছে আমার কাধে মাথা রেখে। তাই আমি একটু ওর দিকে সরে বসলাম চুল গুলো সব ওর মুখের উপর এসে পড়েছে ইচ্ছা করছিল হাত দিয়ে সরিয়ে দিতে কিন্তু দিলাম না। আচ্ছা ঘুমালে কি রুপবতী মেয়েদের রুপ বেড়ে যায়? খুব জানতে ইচ্ছা করছিল এর প্রশ্নের উত্তরটা।

জানালার গ্লাস পুরোটা সরিয়ে দিলাম যেন বাতাস এসে বিন্দুর চুল গুলো এলো-মেলো করে দিয়ে যায়। বিন্দুর মুখে বাতাস লাগতেই ও আমার বাহু জাপ্টে ধরলো আমি মুচকি হাসি দিয়ে সিটে মাথা রেখে চোখ বুজে কল্পনার জগৎ এ চলে গেলাম।

কল্পনাতে বিন্দুকে ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম জানিনা! বাসের কড়া ব্রেকে ঘুম ভেংগে গেল,বিন্দুর মাথা আমার বুকের উপর। আমি ওর মাথায় হাত দিয়ে বললাম “কি এত ঘুম পড়ছেন যে?” বিন্দু চোখ ডলতে ডলতে বলল “রাতে ভাল ঘুম হয়নি তো তাই। বিন্দুকে এই মুর্হুতে অনেক বোকা বোকা লাগছিল। চুল গুলো এলো-মেলো দেখে আমি বললাম “চুল গুলো ঠিক করে নেন।”
“হুম,আচ্ছা একটু উপকার করবেন?”
“হুম,বলেন।”
“আমার চুলে একটু চিরুনি করে দিবেন?”

আমি কিছু না ভেবেই বলে দিলাম “আচ্ছা ব্যাগ থেকে চিরুনি দেন।” বিন্দুর চুল গুলো খুব সিলকি ছিল তাই চিরুনি করতে কোন সমস্যা হচ্ছিল না। আমি ওর চুলের কাছে নাক নিয়ে গেলাম,মাতাল করা একটা মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছিলাম চুল থেকে তাই নিজে থেকে চোখ যেন বুজে আসছিল। কিন্তু বেশি সময় নিলে আবার ধরা খেয়ে যাবো তাই নাক সরিয়ে নিলাম। চিরুনি করা শেষ হতেই বিন্দু চুল বেধে নিল। আমি মাঝে মাঝে ওর দিকে তাকাচ্ছিলাম আর জানালা দিয়ে বাইরের প্রকৃতি দেখছিলাম।

“আচ্ছা আপনি চোখে কাজল দেন?” (আমি)
“হুম মাঝে মাঝে। কেন বলেন তো?” (বিন্দু)
“না মানে আমার কাজল কালো চোখ অনেক ভাল লাগে।”
“হুম,আচ্ছা আপনার আর কি কি ভাল লাগে?”
“অনেক কিছুই তো ভাল লাগে। কি সম্পর্কে বলবো?”

বিন্দুর মুখ থেকে উত্তরের অপেক্ষা করেছিলাম। কিন্তু উত্তর না এসে অন্য কিছু আসলো। মেঝাজটা খারাপ হয়ে গেল রাগী চোখে ওর দিয়ে তাকিয়ে বললাম “এইটা কি করলেন আপনি? আপনি যে বমির রুগী এটা আগে বললে তো আমি জানালার ধারে বসতাম না!” বিন্দু আহত পাখির মত আমার দিকে তাকিয়ে বলল “সরি! আমার এমন হয়না তো তাই বলিনি। আমি সত্যি অনেক সরি!” মেঝাজটা খুব খারাপ তারপর ও বিন্দুর মায়াবী চাহুনিতে ফেঁসে গেলাম। বিন্দুকে কিছু আর বলতে পারলাম না। শার্ট,প্যান্ট আর ‘হাতের দিকে তাকালে কান্না আসছে কিন্তু কি আর করার শার্ট খুলে একটা পলিব্যাগে ভরে ব্যাগের ভিতর রাখলাম। মনের মধ্যে অস্তিরতা বিরাজ করছিল এমন সময় বাস মুগুরায় একটা তেল পাম্পে এসে থামলো। বুঝলাম তেল নিবে তাই আমি বাস থেকে নেমে পাম্পের বাথরুম থেকে ফ্রেস হয়ে নিলাম আর বাসে এসে ব্যাগ থেকে কালো টি-শার্ট বের করে পড়ে নিলাম।

বাস চলছে,রাস্তার দু’পাশের গাছ গুলো অনেক সুন্দর লাগছে,বিন্দু এবার জানালার পাশের সিটে বসেছে। ওর দিকে তাকাচ্ছিলাম খুব অসহায় লাগছে ওকে তাই ব্যাগ থেকে পানির বোতল টা বের হতে বিন্দুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম “এই নিন পানি দিয়ে একটু মুখটা ধুয়ে ফেলুন ভাল লাগবে।” বিন্দু আমার হাত থেকে পানির বোতলটা নিয়ে মুখ ধুয়ে নিল। ওর ব্যাগে তোয়ালে ছিল সেটা বমি সাফ করতে চলে গেছে তাই আমি পকেট থেকে রুমাল টা বের করে ওর দিকে বাড়িয়ে দিলাম। বিন্দু মুখ মুছে রুমাল টা ওর কাছে রেখে দিল তাই আমি আর ফেরত চাইলাম না।

বিন্দু চুপ করে আছে হয়ত মন খারাপ হয়ে গেছে ওর, তাই আমি আর কথা না বলে চুপ করে বসে থাকলাম। বাতাসে বিন্দুর সামনের চুল গুলো দুলছে আর আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম ওকে কিন্তু বিন্দু চুপ! কোন কথা নেই ওর মুখে। বাস যখন যশোর নিউ মার্কেটে থামলো তখন বিন্দু আমার গায়ে খোঁচা দিয়ে বলল..

“এই কনক নামেন এইখানে?” “কেন এখানে কেন?”
“নামেন তো আগে তারপর বলছি। বাস থেকে নেমে বিন্দুর দিকে তাকিয়ে বললাম “কি এখানে” বিন্দু একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল..
“আমার সাথে দড়াটানা যাবেন,চলেন!”
“কেন? ওইখানে কি আপনাদের বাড়ি?”
“না! আমাদের বাড়ি ধর্মতলা।”
“ও,তাইলে দড়াটানা কি কাজ?”
“এত প্রশ্ন করেন কেন? ইজি বাইক ডাকেন!”

আর কিছু বলার সুযোগ পেলাম না। ইজি বাইকে করে বিন্দুর সাথে দড়াটানা চলে আসলাম। বিন্দু আমার হাত ধরে শপিং মলে ডুকে পড়লো। আমি আবাক হচ্ছিলাম বিন্দুর কান্ড দেখে! একটা দিনের পরিচয় কিন্তু মনে হচ্ছে আমরা দু,জন পুর্ব পরিচিত। আমি শপিং মলে এসে বিন্দুকে বললাম “এইখানে কেন?” বিন্দু চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “আপনি চুপ করে থাকেন,আমি যা করি সেটা দেখেন।” বিন্দুকে দেখে ঠান্ডা-শিষ্ট ভেবেছিলাম কিন্তু এখন দেখছি সে জ্যান্ত একটা ডাইনী।

আমি মেয়ে মূতি গুলোর পাশে দাড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে সামনের দোকানের গ্রাসে দেখছিলাম কেমন লাগছে। হঠাৎ বিন্দু একটা কালো শার্ট এনে আমার গাঁয়ে ধরলো আমি ওকে বললাম “এইটা কার শার্ট? বিন্দু চোখ বড় বড় করে বলল “আমার শার্ট হয়েছে? এই সাইজ তো ছোট আমি এক সাইজ বড় নিয়ে আসি।” আমি কিছুই বুঝলাম না! বিন্দু দ্রুত জেন্স ফ্যাশানের ভিতর ডুকে গেল। বুঝলাম না এই মেয়েটি বাসে শান্ত ছিল আর এখন দেখি ভয়ানক !

শপিং মলে ঘুরতে ঘুরতে দেখি একটা কসমেটিকের দোকানে সুন্দর একটা পায়েল ঝুলানো। কি জানি সেটা কিনে গোলাপী কাগজে মুড়িয়ে নিলাম। কিন্তু আমি কেন কিনলাম পায়েল, এইটা ভেবে নিজেই হঠাৎ অবাক হয়ে গেলাম। তারপর আবার জেন্স ফ্যাশানের সামনের দোকানে কালো মেয়ে মুর্তির পাশে দাড়িয়ে দেখছিলাম এদের পাশে আমাকে কেমন মানায়! কিন্তু সেটা বেশি ভাল করে দেখার আগেই বিন্দু ডাক দিল “এই বান্দর এদিকে আসেন।” বিন্দু জোরেই ডাক দিল আর বান্দর বলাতে অনেক লোক আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলো। আমি হাবলার মত হাসলাম তারপর বিন্দুর কাছে এসে শপিং মল থেকে বের হলাম।

তখন প্রায় সন্ধা তাই বিন্দু চলে যাবে। আমি দড়াটানা ব্রিজ পর্যন্ত ওর সাথে হেটে গেলাম। বিন্দু ব্রিজের পাশে কবুতর বিক্রি করে ওখানে গেল,আমিও গেলাম। দুইটা পাখি একটা খাচাঁয় দেখলাম হয়ত তারা স্বামী-স্ত্রী না হলে এত ভালবাসা কেন তাদের মধ্যে! যাইহোক বিন্দু আমার দিকে তাকিয়ে শপিং ব্যাগটা বাড়িয়ে দিল। আমি আবাক হয়ে বললাম..
“এইটা কি করবো? “যা পারেন করেন! আমি আপনার শার্ট ময়লা করেছি তাই এইটা কিনে দিলাম ভাল লাগলে পড়বেন না হলে ফেলে দিবেন।” আমি কিছু বলতে পারলাম না কারন বিন্দুর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস পাচ্ছিলাম না। পকেট থেকে গোলাপী কাগজে মোড়ানো পায়েলটি বিন্দুকে দিলাম। বিন্দু মুচকি হেসে বলল…

“কি এইটা ”
“বাড়ি গিয়ে দেইখেন”
“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি এখন যাই? টা টা।”
“আচ্ছা টা টা।”

বিন্দু চলে যাচ্ছে আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম। বিন্দুও মাঝে মাঝে পিছন দিকে তাকিয়ে আমাকে দেখছিল। তারপর একটা ইজি বাইকে করে বিন্দু চলে গেল, আমিও বাড়ি চলে আসলাম। কিছুদিন যেতেই আমার কেমন

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত