ফিরে পাওয়া ভালবাসা

ফিরে পাওয়া ভালবাসা

কিরে দোস্ত? কেমন আছিস? অনেকদিন দিন হল তকে দেখছি না, থাকিস কোথায় সারাদিন?

:আর বলিস না, বাড়িতেই ছিলাম, কাজ ছিল বাড়িতে। বের হতে পারছিলাম না, আজ একটু সময় পেয়েছি তাই বের হলাম।
:তুই কি বিয়ে করেছিস নাকি? সময় পাস না মানে?
:শালা প্রেমই করতে পারলাম না, আবার বিয়ে!!
:তরে প্রেম করতে মানা করছে কে?
:কেউ না।
:তাইলে?
:তাইলে কিছু না, মনের মত পাইনা তাই করি না।
:তাই?
:হুম, একটা খুঁইজা দিবি দোস্ত?
:তর কেমন পছন্দ আমি জানব কেমনে?
:তর যেমন পছন্দ, তুই তো আর খারাপ পছন্দ করবি না, তর পছন্দ হলেই আমার পছন্দ।
:শালা! প্রেম কি আমি করব? তুই বল কেমন মেয়ে

তর পছন্দ? তারপর না হয় খুঁজে দেখব। কথা বলেছিলাম আমার ক্লোজ ফ্রেন্ড হাবিবের সাথে। আর আমি আসিফ। আমরা ছোটবেলা থেকেই এক সাথে লেখাপড়া করেছি, এই গ্রামেই বড় হয়েছি। সব দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়েছি। চলার পথে অনেক বাধা বিপত্তি এসেছে, সবকিছু একসাথে মোকাবিলা করেছি।

সব মিলিয়ে সে আমার খুব ভাল বন্ধু। দু জন দু জনকে খুব বিলিভ করি, সবকিছু শেয়ার করি। পরেরদিন বিকালবেলা, আমি আর শাওন আড্ডা দিচ্ছি রেললাইন এ বসে, বাড়ির পাশেই রেললাইন। আরও কয়েকজন বন্ধুর আগমন ঘটল। সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছি, ভালোই লাগছে। কিন্তু কেমন জানি একপাশ খালি খালি লাগছে, মনে পড়ল হাবিবের কথা, সে তো এখনো আসে নি। কিন্তু প্রতিদিন বিকালবেলা সবার আগে রেললাইনে আসে। আজ কেন আসে নি? মনে প্রশ্ন জাগল। ওর কথা চিন্তা করছি, একটু অন্য মনস্ক হয়ে গেছি। পাশ থেকে বলে উঠল, কিরে! কথা বলছিস না যে। হুম বলে পকেট থেকে ফোনটা বের করে হাবিবকে কল দেব এমন সময় সে এসে উপস্থিত!

আমি: কিরে, আজ দেরি করলি যে। কোথায় গিয়েছিলি?

হাবিব: তর কাজে।

আমি: (অবাক হয়ে) আমার কাজে? বল দেখি কি কাজ?

হাবিব: তুই বলেছিলি না একটা মেয়ে দেখতে?

আমি: আরেহ! সেটা তো আমি ইয়ার্কি করে বলেছি।

হাবিব: কি বলিস? আমি তো এদিকে মেয়েকে রাজি করিয়ে ফোন নাম্বার দিয়ে আসলাম। বড্ড ভালো মেয়ে, তর সাথে বেশ মানাবে।

আমি: তদের পাগলামি দেখে আমি নিজেই পাগল হয়ে যাই।

হাবিব: তার মানে তুই প্রেম করবি না? না করে দেব?

আমি: আচ্ছা ঠিক আছে, না করার দরকার নেই। দে ফোন নাম্বার।

হাবিব: তর ফোন নাম্বার দিয়ে এসেছি, রাতে ফোন দেবে বলল।

আমি: আচ্ছা ঠিক আছে। এবার বল কেমন আছিস? এত কথার ভিড়ে কেমন আছিস এটাই জানা হয় না।

হাবিব: ভালো, তুই?

আমি: আমিও। দুপুরে খেয়েছিস?

হাবিব: হুম, তুই?

আমি: হুম। ভাবির খবর কী?

হাবিব: ভালোই, তর ভাবিই মেনেজ করে দিয়েছে অনন্যাকে।

আমি: ওর নাম অনন্যা?

হাবিব: তুই চিনিস নাকি?

আমি: আরে নাহ!

হাবিব: ও আচ্ছা।

কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। গ্রামের ছেলে বলে সন্ধ্যার পর বেশিক্ষণ বাইরে থাকি না। বন্ধুরা সবাই যার যার মত চলে গেলাম। রাত অপেক্ষা করছি তার (অনন্যা’র) ফোনের। রাত ১০ টা বেজে গেল, ফোন দিচ্ছে না, চিন্তায় অস্থির হয়ে যাচ্ছি। কখন ফোন দেবে। শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ অপরিচিত একটা নাম্বার থেকে ফোন আসল। ভয়ে ভয়ে রিসিভ করলাম।

আমি: হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম। মেয়ের কণ্ঠে! ওয়ালাইকুম আস সালাম।

আমি: কে?

মেয়ে: আপনি কি আসিফ?

আমি: জ্বি, কিন্তু আপনি কে?

মেয়ে: আমাকে চিনতে পারবেন না। কেমন আছেন?

আমি: ভালো, কিন্তু পরিচয়টা দিলে ভালো হয়।

মেয়ে: কী আজব মানুষ, একবার জানতেও চাইলেন না আমি কেমন আছি? পরিচয় দেব ভাবছেন?

আমি: সরি, কেমন আছেন?

মেয়ে: হুম ভালো। কী করছেন?

আমি: শুয়ে আছি, আর আপনি?

মেয়ে: এত তাড়াতাড়ি শুয়ে পরছেন? আমি পড়তেছি।

আমি: তাড়াতাড়ি কোথায়? রাত তো অনেক হয়েছে। আর আপনি পড়ছেন কোথায়? আপনি তো আমার সাথে কথা বলছেন।

মেয়ে: এই যে, আপনি কথায় কথায় ভুল ধরেন কেন? একটু মিষ্টি করে কথা বলতে পারেন না?

আমি: না, পারি না। পরিচয় দেন, নয়তো কথা বলব না।

এভাবে কথা বলতে বলতে প্রায় ৪০ মিনিট পার হয়ে গেল। জীবনে প্রথম অপরিচিত কারো সাথে এত লম্বা সময় কথা বললাম। তাও আবার মেয়ে!! কান গরম হয়ে গেছে। প্রথম দিন থেকেই ঝগড়া। পরিচয় দিতে চায় না, আমিও নাছোড় বান্দা। পরিচয় নিয়েই ছেড়েছি। নাম অনন্যা, অনু বলেই ডাকে সবাই। ক্লাস নাইনে পড়ে। মা-বাবা’র একমাত্র মেয়ে। মোটামুটি ধনী ঘরের মেয়েই বলা যায়। প্রতিদিন নিয়মিত ভাবে কথা বলতাম। এভাবে কয়েকমাস পার হল। খুব ভালই কাটছে দিনগুলো। মাঝেমাঝে দেখা করতাম, একটু ঘুরাঘুরি করতাম। ৩/৪ মাস হয়ে হয়ে গেছে এখনো বাড়ি চিনি না, আর চিনার প্রয়োজনও মনে করি নি। হারানোর ভয় ছিল না। কোনদিন প্রেম করি নি তাই হারানো কি জিনিস ঠিকমত বুঝিও না। হঠাৎ ২/৩ দিন কথা বন্ধ, সেও ফোন দেয় না, আমিও না। আর থাকতে পারছি না, অস্থির অস্থির লাগছে, ফোন দিলাম কিন্তু বন্ধ পেলাম। মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। এখন বন্ধুদের সাথে তেমন আড্ডাও দিতে যাই না, দুই তিন দিন আমাকে না পেয়ে হাবিব বাড়িতে আসল খোজ নিতে। এসে দেখল মন খারাপ করে বসে আছি।

হাবিব: কিরে? মন খারাপ করে বসে আছিস যে, নাকি শরীর খারাপ?

আমি: জানি না, নিজেকে কেন জানি অসহায় মনে হচ্ছে, খুব একা লাগছে।

হাবিব: কেন? কি হল আবার? অনন্যার সাথে কথা হয় না?

আমি: না, ৫ দিন হবে কথা হয় না, ফোন অফ।

হাবিব: বলিস কি? কিছুই জানায় নি?

আমি: নারে দোস্ত। একটু খোজ নিয়ে দেখবি?

হাবিব: আরে ইয়ার, তর বলতে হবে না, আমি আজই খোঁজ নিচ্ছি।

আমি: আচ্ছা ঠিক আছে, আমাকে জানাস।

হাবিব: আচ্ছা, এবার যাই।

আমি: আচ্ছা, যা।

হাবিব চলে গেল, একটু ধৈর্য ধরলাম, দেখি ফল কি হয়। অনেক্ষণ হয়ে গেল, এখনো কিছু জানালো না, আমিই ফোন দিলাম হাবিবকে। সে বলল কিছু জানতে পারে নি। আমি হতাস হয়ে বসে রইলাম। কিছুদিন মন খারাপ ছিল, আস্তে আস্তে মন ভাল হতে লাগল, তাকে ভুলতে শুরু করলাম। যখন মনে পড়ে তখন খুব খারাপ লাগে। এখন প্রায় ভুলেই গেছি। আর মনে পড়ে না, খুব ব্যস্ত থাকি সারাদিন। সময় পেলে আড্ডা দেই বন্ধুদের সাথে আবার আগের মত। এখন কেউ আর মন খারাপ দেখে না। যখন একলা থাকি তখন মনে পড়ে, নিরবে কাঁদি। কেউ শুনে না সেই কান্নার আওয়াজ। কারণ আজও তাকে ভুলতে পারি নি। আর ভুলবই বা কিভাবে? আমি যে তাকে ভালবাসি, ভালবাসলে কখনো ভুলা যায় না। হয়তো একদিন ভুলে যাবো, কিন্তু স্মৃতিগুলো রয়ে যাবে।

দেখতে দেখতে ৫ মাস কেটে গেল। এখনো ওর নাম্বারে ট্রাই করি, যদি ফোন খুলা পাই। কোন লাভ হয় না, এখনো ফোন অফ। কেউ জানে না সে কোথায় আছে, সবখানে খোজ নেওয়া শেষ। বাকি ছিল তাদের বাড়ি, আসলে সে নানির বাড়ি থাকত। সেখানেও খোজ নিলাম। কেউ থাকে না সেই বাড়িতে। সে কি হারিয়ে গেল আমার জীবন থেকে? নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না। কোন অপরাধ করিনি, মনের মানুষ কোন কারণ ছাড়াই হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়াটা খুব কষ্টের এবং বেদনাদায়ক। এত কষ্টের মাঝেও একটু বিশ্বাস নিয়ে বেচে আছি তার আশায়, যদি ফিরে আসে। জানি যে যায় ফিরে আসে না, তবুও আশা ছাড়িনি। বিকালবেলা প্রতিদিনকার মত আজও রেললাইন এ বসে আড্ডা দিচ্ছি। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। পরিচিত নাম্বার। অনন্যা। হাত কাঁপছে। ফোন রিসিভ করলাম।

অনন্যা :হ্যালো, আসিফ? আমি অনন্যা। চিনতে পেরেছ আমাকে?

আমি: অনন্যা!! কি বল? তোমাকে চিনব না? আর কোথায় ছিলে এতদিন? জানো তোমায় কত্ত খুঁজেছি?

অনন্যা: সরি, তোমাকে বলে যেতে পারি নি, ভুল আমারি, মাফ করবে কিনা জানি না, তবুও মাফ চাচ্ছি। আমাকে কিছু বলবে না, আমাকে প্লিজ মাফ করে দাও। (কাঁদো কাঁদো হয়ে)

আমি: আরে কি হয়েছে বলবে তো, কাঁদছ কেন? অনন্যা সব খুলে বলল। সে এতদিন হাসপাতালের বেডে শুয়ে ছিল, অপারেশন করা হয়েছিল। এখন সুস্থ। আমাদের সম্পর্ক নষ্ট হয় নি, আগের মতই আছে। মাঝখানে বয়ে গেছে অনেক ব্যথার নদী। তাকে ফিরে পেয়ে সব ব্যথা ভুলে গেছি। কিন্তু এখন তাকে হারানোর ভয় করে। যদি আবার হারিয়ে যায়!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত