অফুরন্ত ভালবাসা

অফুরন্ত ভালবাসা

বসে আছি ইটের এক চেয়ারে। নাপার্কে না, এক বাসার ছাদে। মেয়ে দেখতে এসেছি। বিয়ের জন্য। ২৯ টা মেয়ে দেখেও যখন একটাও পছন্দ হয়নি তখন চিন্তা করলাম এই মেয়েটাকে না দেখেই বিয়ে করব। কিন্তু সে আর হল না। মেয়েটা আমাকে দেখা ছাড়া বিয়ে করবে না। কি আর করা। তাই তাদের বাসায় আসা। এসে সোফায় বসতে না বসতেই মেয়ের বাবা বলল যে ছাদে যাবার জন্য।

প্রশ্নালু চোখে তাকাতেই বলল, দিপ্তীর আদেশ। দিপ্তী, বায়োডাটায় যার ছবি দেখেছিলাম। নামকরা এক পাবলিক ভার্সিটিতে যে গণিতে তৃতীয় বর্ষে আছে। ছবিতে তো তাকে সুন্দরই মনে হয়েছে, কিন্তু আজ কালকার মেয়ে বলে কথা। ময়দা মাখিয়েই তবে যায় ছবি তুলতে। পাক্কা আধা ঘন্টা বসিয়ে রাখার পর আসে দিপ্তী। হুম, নিশ্চইয় ময়দা মাখাতেই দেরি হয়ে যায়। কিন্তু না, শব্দ শুনে যখন তাকালাম সবুজ শাড়িতে এক সবুজ পরী মানুষের বেশে হালকা নাস্তা নিয়ে আমারসামনের চেয়ারে বসে পড়ল। তার বসা দেখে আমি দাড়িয়ে গেলাম। প্রকৃতির সমস্ত সুন্দরের আভা যেন আমি তার মুখে পাচ্ছি। একনজরে চেয়ে রইলাম। ঘোর কাটল তার কথায়।

– কী ব্যাপার। হাঁ করে তাকিয়ে কী দেখছেন?
– না মানে আপনাকে।
– আমাকে দেখার কী আছে?
– আপনি কোন দিন আয়নার সামনে যান নি বুঝি?
– গেছি।
– তাহলে নিজের মুখটা বোধহয় কোনদিন দেখেননি।
– দেখেছি।
– আপনি তো দেখছি মিথ্যে বলতে জানেন।
– কেন?
– আয়নার সামনে একটু ভাল করে দেখবেন আজকে নিজেকে।
– আচ্ছা দেখব।

সেদিন সামান্য আর কিছু কথা বলে চলে আসি আমি। নাহ, এই মেয়ে আমাকে বিয়ে করবে না আর যতকিছুই হোক। এত সুন্দর, যেন হুরপরীর মতো একটা মেয়ে আমার মত বলদের সাথে ভাবতেই অবাক লাগে আমার। মেয়েটার পিছনে তো নিশ্চয়ই না জানি কত ছেলের লাইন লেগে আছে। আমি তো ওয়েটিং এ ও নাই। তাই বাসায় এসে মাকে বললাম অন্য আরেক মেয়ের খোঁজের জন্য। মা আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন,

– কেন? মেয়ে পছন্দ হয় নি?
– না তা না। আমার পছন্দ।

কিন্তু মেয়েটা আমার মতো কুৎসিতকে পছন্দ করবে না। এবার মা আমাকে যা বলল, তাতে আমি আজকের দিনের গত তিন ঘন্টায় দ্বিতীয়বার অবাক হলাম। মা যা আমাকে বলল তার সারমর্ম হল আমরা যেদিন প্রস্তাব পাঠাই তার পরের দিনই মেয়েটা রাজি হয়ে যায়। আজকে শুধু আমার সাথে কথা বলার জন্য ডাকে। একটু আগে ফোন দিয়ে তাই জানিয়েছে আমার হবু শ্বশুর বাড়ি থেকে। রাত্র ১১ টা। ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় বেজে উঠল মোবাইলটা। এত রাতে সাধারণত কেউ ফোন দেয় না। রিসিভ করার আগে দেখলাম অচেনা নাম্বার। ওপাশ থেকে একটা মিষ্টি কণ্ঠের মেয়ে বলে উঠল

– হ্যালো।
– জ্বী কে বলছেন?
– আমি দিপ্তী।

নামটা পরিচিত পরিচিত মনে হচ্ছে। হঠাৎ মনে পড়ল যার সাথে বিয়ে হবে তার নাম এটা। আমাকে চুপ থাকতে শুনে

– কী ব্যপার। আপনি কোন কথা বলছেন না যে?
– না। আসলে কিছুটা দ্বিধায় আছি। আপনার মতো এমন একজন সুন্দর মেয়ে আমাকে বিয়ের জন্য। আমি তো চিন্তা করেছিলাম যে আমি ওয়েটিং লিস্টেও নাই। কিন্তু এখন তো দেখছি প্রথম পুরস্কার টাই আমার।
– ফ্লার্ট হচ্ছে বুঝি?
– না তা কেন?
– দ্বিধায় থাকার দরকার নেই। কাল বিকেল ৫.৩০ টায় পার্কে আসবেন। বসবেন উত্তর কোণার চতুর্থ সিটে। অপেক্ষা করব আমি। পেয়ে যাবেন আপনার সব উত্তর। আচ্ছা এখন রাখি আমি। ঘুমিয়ে পড়ুন। কাল সকালে আপনার অফিস আছে।

– ওকে বাই।

মেয়েটা বুঝল কীভাবে যে তার অফিস শেষ হতে হতে প্রায় ৫ টা বেজে যায়। আর সেখান থেকে পার্কে যেতে আধা ঘন্টার মত লাগে। জানিনা, এদের বোঝা বড় দায়। ৫.২৭ যখন বাজে ঠিক তখনই আমি সেই চার নম্বরের সিটটায় বসি। ৫.৩২ এ সে ঠিক আমার পাশে এসে বসে। কমলা কালারের এক শাড়ি পড়ে যখন আমার পাশে বসে তখন মনে সামান্য সন্দেহ জাগে। এই মেয়ে আসলেই আমাকে বিয়ে করবে তো?

– কেমন আছেন? (দিপ্তী)
– জ্বী ভাল। আপনি?
– আমিও ভাল। আসলে আপনার কথা শুনে আমি বুঝছিলাম যে আপনি দ্বিধায় আছেন।
– অবাক হবার এত কারণ দিলে সামান্য দ্বিধায় পড়তেই হয়। তাই না?
– হুম। তা অবশ্য ঠিক।
– তা আপনি তো বললেন আমার উত্তর দিবেন। অবশ্য আপনি যদি না বলতে চান তাহলেও কোন অসুবিধা নেই।
– না বলব। কোন কিছু গোপন রাখা তাও আবার যার সাথে সারা জীবন কাটাতে হবে সেটা বড় ধরনের অন্যায়।
– তা ঠিক।
– তাহলে শুনুন।

বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে আমি। আমার ভরণ পোষণে কোন ধরণের কমতি রাখেন নি তারা। যখন যেটা চেয়েছি তখনি সেটা না দিতে পারলেও দুইদিন পরে হলেও জিনিসটা দিয়েছে। তাই তাদের মান রক্ষার্থে কোনদিন কোন অপরিচিত ছেলের সাথে কথা পর্যন্ত বলিনি আর ভালবাসা তো দূরে থাক। তাই বাবা মা যখন বললেন বিয়ের কথা রাজি হয়ে যাই। মানা করিনি আমি। কিন্তু সেখানেই বাধে বিপত্তি। ৩৬ নাম্বার ছেলেটাও যখন আমাকে দেখে চলে যায় তখন নিজের এই সুন্দরতাকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে চলি। কারণ শুধু একটাই তাদের বিশাল দাবি মানে যৌতুক। কেউ কেউ তো এক লেভেল এগিয়ে এসে বলে আগে শারীরিক সম্পর্ক তারপর বিয়ে।`এতটুকু বলে সে অঝোরে কেঁদে চলছে।

আমি ঠিক কি করব বুঝতে পারছিলাম না। অবশেষে সে নিজেকে সামলিয়ে আবার শুরু করে- ৩৭ নাম্বার হিসেবে যখন আপনাদের বাসা থেকে প্রস্তাব এল তখন চিন্তা করলাম বিয়েটা আপাতত বাদ দিয়ে দিব। পরে করে নেব। কিন্তু আপনি বললেন, মেয়েকে মানে আমাকে না দেখে এবং কোন ধরণের দাবি দাওয়া ছাড়াই বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন, তখন সামান্য একটু অবাক হয়েছিলাম। বুঝলাম এই পৃথিবীতে ভাল মানুষের অস্তিত্ব এখনও রয়েছে। তাই শর্ত দিয়েছিলাম যে দেখা ছাড়া কোন বিয়ে নয়। আসলে আমি ভাল মানুষের রূপটা একটু দেখতে চেয়েছিলাম যে তাদের গঠনে কোন ধরণের পরিবর্তন আছে কিনা। প্রথম দেখার পর আপনি যখন আমারপ্রশংসা করলেন তখন আমি বুঝলাম যে না আপনি আমার সব, আমার দুনিয়া, আপনি সেই যাকে শর্তহীন ভালবাসলে নিজেকে গর্বিত বলে মনে করব। জানেন এতগুলো শিক্ষিত ছেলের কাছে যখন এমন ধরণের প্রস্তাব পেয়েছিলাম তখন নিজেকে খুব অসহায় মনে করেছিলাম। কিন্তু আপনার সঙ্গ পাওয়ার পর জীবনটাকে নতুন করে বাঁচতে শিখেছি, চিনতে শিখেছি। করুণ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে শুধু এতটুকুই বলেছিল,

– ছেড়ে যাবেন না তো কোনদিন আমাকে? দীর্ঘ ৪ সেকেন্ড আমার মুখ থেকে কোন শব্দই বের হয়নি। কী বলব আসলে সে সময় আমি তা ভেবে পাইনি। মেয়েরা সুন্দর হলে আশেপাশের মানুষের সামান্য কিছুটা লোভ লালসার সামান্য কিছু সম্মুখীন হতে হয় সেটা জানি। কিন্তু এতটা নিচে নেমে যাবে আমাদের সমাজ তা কখনো ভাবিনি।

চুপ থাকতে দেখে সে বলল  দেখুন জোর করে কখনো কিছু আদায় করা যায় না। আর একসাথে এক ছাদের নিচে সারা জীবন তো নয়ই। তাই উত্তরটা ভেবে চিন্তে দিয়েন। আর আপনার যদি আমাকে বিয়ে করার কোন ইচ্ছে না থাকে তাহলেও বলেন। আবার অন্য কারোর সামনে আমাকে যেতে হবে। আর আপনি কালো বলে আপনার উপর আমি দয়া করছি সেটা আপনি কখনোই ভাববেন না। চেহারার সৌন্দর্য আমার কাছে মূল্যহীন। আসল সৌন্দর্য হল মনের ভিতর। মনটা সুন্দর হলে আর কোন কিছুরই দরকার নেই। আর এই কথাটা আমি গত ছয় মাসে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।

– তা ঠিক। আসল কথা তা নয়। আমি আসলে চিন্তা করছি আপনার হাত ধরে কবে সারাটা বিকাল হাঁটতে পারব? সে আর কোন কথা বলেনি। শুধু তার হাতটা আমার হাতে দিয়ে সেখান থেকে উঠে চলা শুরু করে।তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি শুধু আমার প্রতি তার সেই অগাধ বিশ্বাস আর অফুরন্ত ভালবাসা দেখতে পেয়েছিলাম।আমি ধন্য এমন একজন জীবন সাথীকে পেয়ে যে আমার গাত্র বর্ণ দেখে নয়, মনটাকে দেখে ভালবেসেছে। আমি গর্বিত এমন একজনের বিশ্বাস আমি অর্জন করেছি যে কিনা পৃথিবীর নিষ্ঠুর দিকটা পর্যবেক্ষণ করেছে, কিন্তু আমাকে কাছে পেয়ে বিশ্বাস জিনিসটা তার কাছে ফিরে এসেছে। আমি ধন্য, আমি গর্বিত

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত