নিয়তি

নিয়তি

-মানুষ ভালোবাসে কেন? মনির কথাটা শুনে অবাক হলাম!
-জানি না তো আপু!
-নিলু ভাবি তোমারে এতো ভালোবাসে কেন ভাইয়া?
-জানি না রে আপু!
-আচ্ছা ভাইয়া তুমি ভাবিকে ভালোবাসো না?
-এটাও তো জানি না রে আপু!
-ভাবি আজকেও খুব কান্না করলো আর আমাকে বললো মুনি মুনি ও মুনি তোমার ভাইয়া কে বলো না আমাকে বিয়ে করতে! আমাকে যেন তোমার ভাবি করে আনে! আমি হেসে হেসে বলেছি তুমি তো আমার ভাবিই! ভাইয়া তুমি ভাবিকে বিয়ে করবে না কেন?

-তোমার ভাবির জন্য রাজ কুমার আসবে রে আপু!!!!
-আচ্ছা ভাইয়া তুমি কি রাজ কুমার না?
-না রে আপু আমি তো তোর ভাইয়া রাজ কুমার হতে যাবো কেন?
-আচ্ছা ভাইয়া রাজ কুমার হতে কি কি লাগে!!!!
-ওমমমমম আমি তো রাজ কুমার না তাই জানি না রে আপু!!!
-আচ্ছা ভাইয়া জানো ভাবি আমাকে অনেক চকলেট কিনে দেয়! আমাকে বলেছে তুমি বিয়ে করলে আরও অনেক চকলেট কিনে দিবে! ভাইয়া করো না বিয়ে অনেক চকলেট পাবো আমি! ওর কথা শুনে হাসি পেলো!!!

-পাগলি আমি তোকে চকলেট এনে দিই না?
-হুমমমম দেও তবে এগুলো ভালো লাগে না তো! ভাবি যেইগুলো দেয় অনেক মিষ্টি আর এত্তো বড় বড় চলকেট!!!!
-তোর ভাবির অনেক টাকা তাই ভালো চকলেট কিনে দেয় আমার তো টাকা নেই রে আপু!
-ভাইয়া তোমার টাকা নেই কেন?
-জানি না তো আপু!
-তুমি খুব পচা যেটাই বলি বলো জানি না ভাবি কত সুন্দর করে সব বলে যাও তোমার সাথে আড়ি!!! বলেই মুখটা অন্য দিকে ঘুরে নিলো! একটু পর আবার বললো,,,

-ভাইয়া ভাবি কে বিয়ে করবে?
-আমি তো রাজ কুমার নয় রে আপু
-কে বলছে তুমি রাজ কুমার না???? এই যে কত বড় বড় চুল!
-পাগলি বড় বড় চুল হলেই কি রাজকুমার হয়?
-হুমমমমম হয় তো রাজকুমারের ছবি দেখলাম ওর বড় বড় চুল ছিলো! তুমিও রাজ কুমার ভাবিকে বিয়ে করো ভাইয়া আমি চকলেট খাবো!!!

-মুনি এখন অনেক রাত হইছে ঘুমাও!
-হুমমমম আমাকে ঘুমিয়ে দিয়ে তো তুমি আর ঘুমাও না! সারারাত ওই ভাবির জানালার দিকে তাকায় থাকো! তাহলে বিয়ে করছো না কেন ভাবি কে?? মুনির কথা শুনে ওর দিকে তাকালাম! আমার ঘর থেকে নিলুর জানালাটা দেখা যায়!!!! কিন্তু মুনি এইসব কেমন করে জানলো?

-কে বলছে আমি তাকাই থাকি!!!!??? কে আবার বলবে আমি বলছি আমি তো রাতে উঠে উঠে দেখি!
-হইছে আর পাকামো করতে হবে না এখন ঘুমাও আপু!

-ভাইয়া আমি তোমার কোলে ঘুমাই????
-হুমমমমম ঘুমা!!!
-ভাইয়া?
-কি রে আপু!
-কালকে একটা জামা কিনে দিবে?
-কেন আপু?
-পরি একটা সুন্দর জামা কিনছে ওটা আমার খুব পছন্দ হইছে আমাকে কিনে দিবে ভাইয়া????

-হুমমম দিবো এখন ঘুমাও!!

এই হলো আমার জীবন মুনি আমি আর,,, না আর কেউ না আমাদের মাঝে আর কাউকে ডুকাতে চাই না! মুনির বসয় কেমন ৬ বছর! না কোন রক্তের সম্পর্কের শিকলে বাধা নেই আমরা!! আমরা বাধা আছি মমতার শিকলে! আমি নিলয়। এতিম! মা কে জানি না বাবা কে জানি না! এতিম খানায় মানুষ! এতিম খানার মালিক আমাকে খুব ভালোবাসতো তাই লেখাপড়া শিখেছি! পড়ে আমাকে তার বাসায় নিয়ে আসে! আমি তাকে চাচা বলে ডাকি!!! চাচা অনেক ভালো মানুষ!আমাকে লেখাপড়া শিখালো! নিজের বাসায় রেখে! আমাকে একটা রুম দিয়েছিলো! সেখানেই আমি থাকতাম! চাচার নিজের সন্তানের মতই মানুষ করলো!

সেখানেই পরিচয় নিলুর সাথে! চাচার বড় মেয়ে! নিলু আমাকে খুব ভালোবাসে! আমিও বাসি কি না জানি না! তবে আমি জানি যদি ভালোবাসি সেটা আমার অন্যায় হবে! তাই দুরে সরে আসলাম! চাচাকে বললাম চাচা আমাকে একটা ঘর বানায় দিবেন সেখানেই থাকবো আমি! চাচা আমার কথাটা রাখলেন! একটা ঘর বানায় দিলেন! চাচার সাহায্যেই একটা টিউশনি পেলাম!!! নিলুর কাছে থেকে দুরে চলে আসলাম!! তবুও মেয়েটা আমাকে ছেড়ে যায় নি! বরং ভালোবেসেই গেছে! এখনো ভালোবাসে! আমি বললে ও সবাইকে ছেড়ে চলে আসবে কিন্তু আমি সেটা চাই না কারন যে চাচা আমাকে নিজের সন্তানের মত মনে করে তাকে কেমন করে ধোকা দিই? এতিম হলেও বিবেকে আমার বাধে!

আমরা গরীর আমাদের জন্য ভালোবাসা না সেটা আমি জানি! আমি মাটিতে থেকে আকাশের চাঁদ ধরতে চাই না!! মুনিকে নিয়েই বেচে আছি! মেয়েটাকে কুড়িয়ে পেয়েছি! মানে একদিন রাস্তায় বসে কাদছিলো দেখে খুব মায়া হলো!!! তাই নিয়ে আসলাম! দুই তিনটা টিউশনি করাই! তাতে কোন রকম যায়! পরি পাশের বাসার বড়লোকের মেয়ের নাম! কালকে একটা জামা কিনছে! সেইটা আমার মুনির ভালো লাগছে! কিনে দিতেই হবে! মেয়েটা কখনো আমার কাছে কিছু চায় নি আজকেই প্রথম চাইলো! মুনি ঘুমাচ্ছে আমার কোলে মাথা দিয়ে! সকালে উঠে ফুতফাত থেকে দুইটা রুটি আনলাম! একটা মুনি একটা আমি এতেই চলে যাবে একদুপুর তবে মুনির জন্য কয়েকটা চকলেট!! ভালো চকলেটের অনেক দাম! তাই কিনতে পারি না।

-ভাইয়া!!!
-কি আপু?
-প্রতিদিন রুটি খেতে ভালো লাগে না তো! আমার নিজেই ভালো লাগে না ওই ছোট মেয়েটার কেমন করে ভালো লাগবে! ওর কথা শুনে চোখে পানি চলে আসলো!জানি না কেমন করে চোখের পানিটা দেখে নিলো পাগলিটা!

-না না ভাইয়া অনেক মজা তো রুটিতে অনেক মজা! আমি এমনি বললাম! সত্যি ভাইয়া! এই যে দেখো আমি খাচ্ছি! আমার চোখের পানি ও সহ্য করতে পারে না তাই,,,, মুনিকে বললাম আপু আমি তোর জন্য পরির মত জামা আনতে যাচ্ছি! কথাটা শুনে মুনি লাফাতে লাগলো আনন্দে! পরির বাসায় গেলাম! নক করতেই চাচি দড়জা খুলে দিলে!

-আরে নিলয় তুমি কিছু বলবে?
-না মানে চাচি মুনি বললো পরির জন্য নাকি একটা জামা আনছেন!!! তাই দেখতে এলাম!
-ও এটা? হ্যা কিন্তু কেন?
-না পরির খুব ভালো লাগছে ওটা তাই! চাচা পরিকে ডাক দিলো আসলেই খুব সুন্দর জামা!
-চাচি এর দাম কতো?
-৩৫০০ টাকা! দামটা শুনেই মাথাটা ঘুরে গেলো!
-আচ্ছা চাচি ভালো থাকবেন!

বলেই চলে আসলাম! রাস্তায় হাটছি! এতো টাকা???? কোথাই পাবো? মাথাই কিছু আসছে না কি করবো! যদি না দিয়ে যেতে পারি ও খুব কান্না করবে! বাচ্চা মেয়ে তাই টাকার মর্মটা বোঝে না যদি বোঝতো জামাটা কখনোই চাইতো না! হাটছি উদ্দেশ্য সিমুদের বাসা! আমার ছাএীর বাসা!

-আন্টি একটা কথা বলতে আসলাম!
-বলো বাবা!
-মাস তো প্রায় শেষ যদি আজকেই টাকাটা দিতেন খুব ভালো হতো!

-আজকে তো হবে না বাবা তুমি কালকে নিও! তোমার আংকেল নেই! চলে আসলাম নিরুপায় হয়ে! সব জায়গায় খুজলাম কিন্তু কাজ হলো না! বাধ্য হয়ে খালি হাতেই ফিরছি বাসায়!!! পকেটে মাএ ৩৯৫ টাকা! ৪০০ টাকা ছিলো দুপুরে ৫ টাকার একটা বিস্কিট খাইছি! বোর্ডে দেখলাম বিরানি ভান্ডার! ভাবলাম জামা নিতে পারি নি তাই মুনির জন্য বিরানি নিই! হাতে বিরানির প্যাকেট! মনটা খুব খারাপ মুনির আশাটা পুরোন করতো পারলাম না! ধিরে ধিরে আমার ঘরের দিকে গেলাম যেতেই মুনি আমাকে জড়িয়ে ধরলো,,,,,

-ভাইয়া আমার জামা,,, ওর কথাটা শেষ করতে দিলাম না!
-আপু আজকে না কালকে তোকে জামাটা কিনে দিবো রে! আজকে তোর জন্য বিরানি আনছি! চল দুইজন একসাথে খাবো!

-ভাইয়া আমার জামা তো কিনছি!
-কে কিনে দিলো রে আপু!
-কেন নিলু ভাবি!
-নিলু??????
-হুমমমমম সকালে আমাকে বললো তোমার ভাইয়া কই?

আমি বললাম আমার জামা কিনতে গেছে! আমাকে চকলেট দিয়ে চলে গেলো আবার দুপুরে এসে বললো আপু তোমার ভাইয়া কি জামা আনছে দেখি! আমি বললাম ভাবি ভাইয়া তো এখনো আসে নি! দেখো না কত সময় পার হয়ে গেছে! ভাবি আমাকে বললো কি জামা কিনতে গেছে তোমার ভাইয়া? আমি বললাম ওই যে পরি যেটা কিনছে! ভাইয়াকে বললাম ভাইয়া বললো যাবো আর কিনে আনবো দেখো না এখনো আসছে না!!! তারপর ভাবি আমাকে দোকানে নিয়ে গেছিলো!!!!

-তোর নিলু ভাবি কই রে আপু?
-ঘরে বসে আছে তোমার জন্য! ঘরে যে দেখি নিলু বসে আছে!
-ধন্যবাদ
-কেন?
-মুনিকে জামাটা কিনে দেওয়ার জন্য!আসলে টাকা জন্য অনেক দৌড়ালাম পেলাম না তবে চিন্তা করো না কালকেই টাকা দিয়ে দিবো!! কালকে টিউশনি থেকে টাকা দিবে! নিলু আমার কথা শুনে দৌড়ে এসে আমার জামার কলার ধরলো!

-আমি কি তোমার কাছ থেকে টাকা চেয়েছি? আমি শুধু তোমাকে চাই আর কিছু চাই না!
-দেখো নিলু,,,,
-কি দেখবো হুমমমম ডাইরিতে তো সব লেখে রাখছো!!! তাহলে কেন আমাকে ভালোবাসো না?
-ইচ্ছা থাকলে সব হয় না!
-কেন হয় না?
-তুমি বড়লোকের মেয়ে পারবে সারাদিন একটা রুটি খেয়ে থাকতে? পারবে একটা কাপড়ে বছরের পর বছর কাটাতে? জানি পারবে না!
-পারবো!আমি সব পারবো তোমার জন্য তবুও আমাকে বউ করে আনো!!!
-না নিলু তুমি আমাকে ভুলে যাও!
-কি ভুলে যাবো?কাল পযর্ন্ত সময় দিলাম যদি আমাকে ভালোবাসার কথা না বলো তবে আমি এই জীবনই রাখবো না! বলেই কাদতে কাদতে চলে গেলো! পাশে দেখি মুনি দাড়িয়ে আছে!!!

-ভাইয়া রে!!
-কি আপু? চোখের পানি মুছতে মুছতে বললাম
-তুমি ভাবীকে এতো কাদাও কেন ভাইয়া তুমি অনেক পচা!
-জানি রে আপু! চল খেতে বসবো! তোর তো অনেক খিদা পাইছে তাই না রে?
-না ভাইয়া ভাবি আমাকে অনেক জিনিস খাইয়েছে!!!
-আর খাবি না?
-খাবো তো তুমি তুলে খাওয়ালে!
-আচ্ছা চল তুলেই খাওয়াচ্ছি! মুনিকে খাওয়াচ্ছি!
-ভাইয়া????
-কি আপু?
-বিরানির অনেক দাম তাই না?
-না রে আপু এখন থেকে আমরা প্রায় বিরানি খাবো!

-না ভাইয়া খাবো না!

এটার অনেক দাম ভাবি বলেছে! তোমার অনেক কষ্ট হবে ভাইয়া! আমরা রুটিই খাবো প্রতিদিন! আমার তো রুটি খেতেই খুব ভালো লাগে ভাইয়া! বিরানি একটুও ভালো লাগে না আমার! আর কোন দিন এনো না ভাইয়া! ওর কথা শুনে চোখে পানি চলে আসলো! ডাক্তারের কথায় ঘোর কাটলো! আমার মুনি এখন হাসপাতালে! আজকেই অপারশনের শেষ তারিখ! আজকে অপারেশন করতে না পারলে আমার মুনি আর আমার থাকবে না!

কথাটা মনে হলেই বুক চিরে কান্না আসছে! সেইদিন রাতে মুনির পেটে প্রচুর ব্যথা উঠে!!! কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না! তারাতারি কোলে করে হাসপাতালে নিয়ে আসলাম! আজকে সাত দিন মুনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে! আর আমি টাকার জন্য ছোটাছুটি করছি! ডাক্তার বলেছে অনেক টাকা লাগবে! এতো টাকা আমি কই পাবো? সবার কাছে টাকা চাইলাম! এমনকি পায়ে পযর্ন্ত ধরলাম! তবুও কেই টাকা দিলো না! মুনির মুখের দিকে তাকাতে পারছি না! নিঃশ্বপাপ মুখটার দিকে তাকালে কলিজা ফেটে যাচ্ছে! ইচ্ছা করছে চিৎকার করে কাদি! মুনি আমাকে হাতের ইশারা করে ডাকছে! ওর কাছে গেলাম,,,,

-ভাইয়ারে আমার মনে হয় আর চকলেট খাওয়া হবে না!

আর তুমি কাদছো কেন ভাইয়া? তুমি জানো না তোমার কান্না আমি সইতে পারি না! ভাইয়া ভাবী বলেছিলো তুমি ভাবিকে বিয়ে করলে অামাকে অনেক চকলেট কিনে দিবে! আমার আর চকলেট খাওয়া হবে না তাই না ভাইয়া?

-হবে মুনি হবে! দেখিস তুই আবার অনেক চকলেট খাবি! তোর কিছু হবে না আপু! আমি আছি তো!
-না রে ভাইয়া শুনলে না ডাক্তার কি বললো

অনেক গুলো টাকা লাগবে! ভাইয়া আমার না খুব বাচতে ইচ্ছা করছে! ভাইয়া আমার ব্যাংককে ৩৮ টাকা আছে ওটা এনে ডাক্তারকে দেও না ভাইয়া তবুও আমাকে যেন আবার আগের মত করে দেয়!

-তুই চিন্তা করিস না মুনি আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলবো!
-তুমি এতো টাকা কই পাবে ভাইয়া?

আচ্ছা ভাইয়া তুমি ভাবিকে বিয়ে করবে না? তখন তো করলে না ভাইয়া এখন আর আমি চকলেট খেতেই পারবো না!জানো ভাইয়া ভাবি তোমার জন্য অনেক কাদে! ওর কথা শুনে হাউমাউ করে কেদে দিলাম!

-করবো মুনি করবো তারপর তোকে অনেক চকলেট এনে দিবে!

-না ভাইয়া আমার না খুব কষ্ট হচ্ছে!

আর খুব ঘুম পাচ্ছে! আমাকে একটু তোমার কোলে ঘুমাতে দিবে? মুনিকে কোলে নিলাম! মুনি আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে গেলো! আর উঠলো না! মুনি ও মুনি দেখনা আমি কাদছি আমাকে থামতে বলবি না? ও মুনি বলনা একবার থামতে! এই দেখ না তোর জন্য কত চকলেট আনছি খাবি না?? একটা বার ভাইয়া বলে ডাকনা আপু! ওই মুনি মুনি আপুরে,,,,মুনির মুখটা আমার চোখের সামনে আমার মুনি আর কথা বলছে না! ওর কথা গুলো কানের কাছে বাজতে লাগলো,,, ভাইয়া বিরানির অনেক দাম তাই না? ভাইয়ারে তুমিও তো রাজকুমার, এই যে বড় বড় চুল,! ভাইয়া ভাবীকে বিয়ে করো অনেক চকলেট খাবো!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত