আজ অভির বিয়ে

আজ অভির বিয়ে

অভি বিব্রত অবস্থায় আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে, তবে চুপচাপ। আমিও কথা বলছি না। ওর হাতে ওর বিয়ের কার্ড। বিয়ে আগামীকালই। শেষ সময়ে হঠাৎ বিয়ের দাওয়াত দিতে আসলো। অবশ্য বিয়েটাও হঠাৎ ঠিক হলো ওর।

অভি আর আমার গত সাতবছর যাবৎ প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। দু’মাস আগে হঠাৎ ব্রেকাপ হয়ে গেল। ব্রেকাপটা সামান্য কারণে তবে মনে হয় ব্রেকাপটার দরকার ছিলো আমাদের। দুজনেই দুজনকে ভালোবাসতাম তবে চাওয়ায় হয়তো ঘাটতি ছিলো কোথাও। তাই ওই ধরে বেঁধে সম্পর্ক রাখিনি আমরা। দু’জনেই এডাল্ট আমরা, তাই সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করিনি। সাতটা বছর একসাথে পেরিয়ে এসে সম্পর্কটার প্রতি আমাদের অনীহা চলে এসেছিলো হয়তো।

সম্পর্ক ভেঙ্গে যাবার পরও অভি যোগাযোগ রেখেছে নিয়মিত। গত সপ্তাহে হঠাৎ দেখা করে বললো ওর বিয়ে। প্রথমে খারাপ লাগলেও পরে নিজেকে বুঝিয়ে নিয়েছি। আজ ও কথাই বলছে না দেখে আমি বলে ফেললাম,
–কি ব্যাপার?দাওয়াত দিতে এসে চুপ থাকলে চলে?

অভি চমকে উঠলো এমনভাবে যে মনে হলো ও কোনো গভীর চিন্তার ভিতর ছিলো। কোনোমতে বললো, কাল বিয়ে। যাবে তো?

আমি হা হা করে হেসে উঠলাম।
-তোমার বিয়েতে যাবোনা তা কি হয়? অবশ্যই যাবো। এমন সৌভাগ্য ক’জনার হয় বলোতো? প্রিয় মানুষটাকে সুখী দেখার আনন্দটাই আলাদা।

ও ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো আমার হাসি আর কথা শুনে। চিন্তিত কণ্ঠে বললো, সত্যি তুমি যাবে নীতু?

-হুম। অবশ্যই যাবো। তবে একটা কথা আছে। রাখবে?
>হুম। বলো।
-খুব বেশি কিছুনা। আমি সাথে একজনকে নিয়ে যাবো। সমস্যা নেইতো?
>সমস্যা নেই। তবে তুমি সত্যি যাবেতো?
-তিন সত্যি। তোমার নীতু তোমাকে কখনো মিথ্যা বলেছে?

কথাটা শেষ করেই অন্ধকারের ভিতরও স্পষ্ট বুঝলাম অভি কাঁদছে নিঃশব্দে।
আমি ওর হাত থেকে কার্ডটা নিয়ে বললাম, মন খারাপ করো না। তুমি চাইলেই আমরা বিয়েটা করতে পারতাম। তুমি কেনো জানি চাওনি আমাকে। আমিও আজীবন তোমাকে স্বাধীনতা দিয়ে এসেছি। জোর করে তোমার ঘাড়ে চাপলাম না। মুক্তিতেই নাহয় সুখ খুঁজে নিও। আমরা আসলে কেউ কাউকে চাওয়ার মতো করে চাইনি কখনো।

ও একটা শব্দও করছে না। অন্ধকারে প্রিয় মানুষটার দিকে তাকালাম। চোখে বড্ড ঝাপসা দেখলাম। মৃদু কণ্ঠে বললাম, বাসায় ফিরে যাও। রাত জেগো না। কাল অনেক ঝামেলা যাবে তোমার উপর দিয়ে। সকালে দেখা হবে।
হঠাৎ প্রশ্ন করে ফেললাম, বিয়ে নিয়ে তুমি খুশি তো?

উত্তর না দিয়ে অভি অপরাধীর মতো বলে ফেললো, চলো বিয়ে করি।
আমি খানিকটা হেসে বললাম, সময়টা পেরিয়ে গিয়েছে অভি। আমরা আলাদা হয়েও ভালো আছি, তাই ধরে নিতে পারো আমরা অন্য কারো জন্যই জন্মেছি। শুভকামনা রইলো।

>প্লীজ নীতু।
-না। বাসায় যাও।

অভি গেটের কাছে পৌছাতেই আমি বলে ফেললাম, মিস করবো তোমাকে খুব।
ও থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো, তারপর গেটের বাইরে পা রাখলো। তারপর বেরিয়ে গেলো।

কী জানি তখন ওর চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা পানি গাল বেয়ে মাটিতে পড়েছিলো কিনা!

আমি ছুটতে ছুটতে ছাদে উঠে গেলাম। অভিকে আমার দেখতেই হবে। ছাদে উঠে দ্রুত কোণায় এসে দেখলাম অভি বাইকের উপর বসেছে। এখনি চলে যাবে। আমি শেষবার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আমার অভিকে দেখলাম প্রাণ ভরে। কাল থেকে অভি আর আমার না। এই প্রথম অভিকে হারানোর ভয়ে আমার অস্থির লাগলো। ও আমাদের বাড়িটার দিকে শেষবার তাকিয়ে বাইক নিয়ে চলে গেলো দৃষ্টিসীমার বাইরে। আমার হাত পা কাঁপতে শুরু করলো। অভি কি সত্যিই পর হয়ে গেলো আমার?

ঘন্টাখানেক ছাদে দাঁড়িয়ে থেকে রুমে এসেই অনিককে কল করলাম। ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে সরকারী চাকরীতে সদ্য জয়েন করেছে। পাশেই ওর বাসা।

কল যেতেই ওপ্রান্তে সাড়া পেলাম।
-অনি?
>বল।
-আমার বাসায় এখন আসতে পারবি?
>মন খারাপ?
-হুম।
>কি জন্য?
-পরে বলবো। আর শোন? কাল আমি একটা বিয়েতে বরযাত্রী যাবো। তোকেও যেতে হবে। সকালে তুই এসে আমাকে পার্লারে নিয়ে যাবি। কোন ড্রেস পরবো তাও তুই ঠিক করে দিবি।
পারবি?

>সব পারবো, তবে কার বিয়ে? আমি দাওয়াত ছাড়াই যাবো?
-তোর কথা বলে রেখেছি। সমস্যা নেই।
>বিয়েটা কার?
-কাল অভির বিয়ে।

অনিক জোরে বলে উঠলো, মানে কি? তুই কি পাগল হয়েছিস নীতু?
মানতে পারছি না ব্যাপারটা।

-খুব সাধারণ জিনিস। আমাদের সম্পর্কটা শেষ হয়েছে বলে ও কী চিরকুমার থাকবে? আজব কথা।
>তুই কাল সত্যিই যাবি?
-হুম।যাবো। তোর হাত ধরে নাচতে নাচতে যাবো। ও যদি দুঃসাহস দেখিয়ে ওর বিয়ের কার্ড আমাকে দিতে আসতে পারে তো আমিও ওর বিয়েতে যেতে পারি।
>পরে কষ্ট পাবিনাতো?
-তুই আছিস না? তোর টিশার্টে নাক মুছতে দিস। তাহলেই হবে।

>পাগলী। মন ভালো নেই তোর, সাথে ব্রেনও। আমি সবেমাত্র মাছের বাজার থেকে ফিরেছি। মাছ কিনে আনলাম। মাছের গন্ধ তুই সহ্য করতে পারবি না। গোসল করেই আসছি। বিশ মিনিট দে।
-আচ্ছা। লেট করিস না।

কলটা কেটে যেতেই নিজেকে ব্যস্ত রাখতে কিচেনে ঢুকলাম। অনি এসেই কিছু খেতে দে, খেতে দে করবে। বড্ড খাই খাই স্বভাব ছেলেটার।

নুডুলস রেডি হতেই অনির সাড়া পেলাম। সোজা বেডরুমে ঢুকেছে এসে। এই বাসায় আমি একাই থাকি। মা, বাবা আপাততো সিলেট আছে বাবার চাকরির জন্য। বাবার পোস্টিং গতবছর সিলেটে হয়ে যাবার পর মাকেও ওখানে পাঠিয়ে দিয়েছি।

ওর খাবারটা এনে টেবিলের উপর রেখে ওর পাশে বসতেই বললো, সত্যি তুই কাল যাবি?
-হুম যাবো। এক প্রশ্ন এতোবার করিস না তো। রাগ হবে। উঠে গিলে নে।
>আজ খেতে চাইনি তো!
-ডাস্টবিনে ফেলবো?
>এতো সিরিয়াস হচ্ছিস কেনো সোনা?
-জানি না। খেয়ে নে। ছাদে যাবো।

অনি চুপচাপ খেয়ে নিলো। তারপর ছাদে এসে দাঁড়ালাম দু’জন। অনি আর আমি পাশাপাশি বসে পড়লাম। ওর কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে বললাম, একটা গান শোনাতো।

হঠাৎ ও চমকে আমার মুখের দিকে তাকালো। চাঁদের আলোয় খুব কাছ থেকে আমি ওকে দেখলাম। কখনো দু’জনে বন্ধু ছাড়া কিছু ভাবিনি একে অপরকে। তবে অনির দৃষ্টি আজ বন্ধুত্বের কথা বলছে না। অন্য কিছু বলছে। ও একটা ঘোর লাগা দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি চোখ সরিয়ে নিতেই ও বললো, প্লীজ। তাকিয়ে থাক একটু। আমার ভালো লাগছে।

আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, তোর কি হলো রে? কাল সকালে চলে আসিস। আমি পার্লারে যাবো।
অনি অবাক হয়ে বললো, মানে কি? তুই যাবি পার্লারে? সত্যি তো?
– হুম সত্যি।
>হঠাৎ এই প্রথম পার্লারে যাবি?
-অভির বউ কাল খুব সাঁজবে। আর আমি সাঁজবো না?
>তুই সত্যি করে বল তো কি জন্য যাচ্ছিস কাল?
-কাল শেষবারের মতো হাসিমুখে অভির সামনে ঘুরবো। শান্ত চোখে ওর মুখে কবুল বলা দেখবো। চোখের সামনে দেখবো ও কিভাবে চিরতরে পর হয়ে যায়।

অনির টিশার্ট ভিজতে থাকলো আমার চোখের পানিতে। মনে হলো চাঁদের আলোয় বিচ্ছিন্ন এক জগতে বসে জোছনার বৃষ্টিতে ভিজছি আমরা দু’জন। অনি একটা গান গাইছে। গানটা বিরহের। ওর কণ্ঠেও মলিনতা, আচ্ছা, ওর টিশার্টের ভিতরে ঢাকা হৃদয়টাও কি ভিজে যাচ্ছে এখন?

হয়তো ভিজছে।

সকাল হতেই রেডি হবো ভেবে দশ পনেরোটা ড্রেস বের করে বসে আছি। কোনটা পরবো ভাবছি। এমন সময় অনির আগমন।
-অনি? দেখতো কোন ড্রেসটা পরবো?
>এতো জমকালো পোশাক পরবি?
-ও মা। বিয়েতে যাবো তো!
>কালো পর।
-নাহ। কালো শোকের রং। আজ শোক দিবস না আজ মুক্তি দিবস। আমি জমকালো ড্রেস পরবো।
>গোলাপিটা পর? বা নীল?
-ওকে। নীলই পরবো। ড্রেসটা অভির গিফ্ট করা।

অনি অবাক হয়ে বললো, তোর মাথা ঠিক আছে? তুই প্রেমিকের বিয়েতে তারই দেওয়া পোশাক পরে যাবি?

-হুম যাবো। কাল তুই আমার প্রেমিকের মতো বিহেব করবি অভির সামনে। আমাকে বিয়ের কার্ড দেওয়ার হিসাবটা বুঝিয়ে দিবো।

অনি একটু অন্যভাবে তাকিয়ে বললো, কাঁদবি তুই। না গেলে হয় না?
-হয় না। ড্রেসটা পরে চল পার্লারে যাই।

অভির হবু শশুরবাড়ি আমি আর অনি ঘুরছি। ঘুরতে ঘুরতে কনের ঘরে ঢুকে দেখি সেই রকম সাজগোজ চলছে। মেয়েটা এমনিতেই ফর্সা আরো ফর্সা লাগছে। দেখতে বেশ। মানাবে দু’জনকে ভালো।

অভিকে সুন্দর দেখাচ্ছে তবে আমি সামনে পড়তেই ওর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে। তাই ওর সামনে কম যাবো কিনা ভাবছি। অনির হাত ধরে ঘুরছি। দৃশ্যটা দেখে অভি কেমন রাগী চোখে তাকাচ্ছে। তাতে আমার কি? ও তো বিয়েই করে নিচ্ছে।

কনের কবুল পড়ানোর পর অভির কবুল পড়ার সময়ে আমি ঠিক ওর চোখের সামনে গিয়ে দাড়ালাম। আমার দিকে কয়েকবার তাকিয়ে ফ্যাকাসে মুখে আমার অভি কবুল পড়ে ফেললো। আমি স্থির দৃষ্টিতে দেখলাম।
মনে মনে বললাম, তোমাকে আজ শেষ শাস্তিটা দিয়ে দিলাম কবুল বলার সময় চোখের সামনে থেকে। ক্ষমা করে দিও আর ভালো থেকো।

অনি পাশে এসে দাড়াতেই ওর বামহাতটা জাপটে ধরে বললাম, আমি আর থাকবো না। আমরা এখনই ফিরবো। তুই যাবি?

অনির সাথে ফিরে এসেছি বাসায়। আবারও সন্ধ্যা নেমেছে শহর জুড়ে, পৃথিবী জুড়ে। সবেমাত্র চাঁদের আলো ছড়াতে শুরু করেছে। আধো অন্ধকার। ফিরে এসে পোশাক চেঞ্জ করিনি। অনিও করেনি। ও আমার রুমে বসে আছে। টিভি দেখছে।

ছাদে দাঁড়িয়ে জোছনার বৃষ্টিতে ভিজছি। দু’চোখও ভিজছে সেই সাথে। অদ্ভুত শূণ্যতা ঘিরে ধরছে আমাকে। এ শূণ্যতা প্রিয় মানুষটিকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার। আমার ভিতরটা যন্ত্রনায় দগ্ধ হচ্ছে। চারিদিকে এতো আলোর মাঝেও তীব্র অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছি আমি একটু একটু করে। মনের পর্দায় ভাসছে একটাই মুখ, অভি। অভির শূণ্যতা আমাকে মেরে ফেলছে। গত সাতবছরের স্মৃতি আজ হানা দিচ্ছে মনের কোণায়। কতো হাজার মুহূর্ত একসাথে কাটিয়েছি দু’জনে সব আজ আমাকে অস্তিত্বহীন করে তুলতে চাইছে। আমি ব্যর্থ। আমি পারিনি আমার প্রেমিককে স্বামী রূপ দিতে। আমি ডুবে যেতে চাই অন্ধকারে, তীব্র অন্ধকারে।

হঠাৎ কাঁধে কারো হাত পড়তেই পিছনে ফিরে দেখলাম অনি। আমার দু’চোখ মুছিয়ে দিয়ে বললো, খুব তো সাহস করে বিয়েতে গিয়েছিলি এখন কাঁদছিস কেনো পাগলী?

-জানি না।
>খুব কষ্ট হচ্ছে?
-হুম।
>আমাকে জড়িয়ে ধরতো।
-কেনো?
>জড়িয়ে ধরে কিছুটা কাঁদ। হালকা লাগবে।

আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম, অভি খুব সুখী হবে তাই না?
-হুম। হবে। তোকেও সুখী হতে হবে।
>আর সুখ?
-হতাশা না। অভি তোকে ছাড়াই সুখে থাকবে তুই কেনো নয়?
>জানি না। আমার খুব যন্ত্রনা হচ্ছে। এই শহরের এতো আলো আমার সহ্য হচ্ছে না। এতো আলো থেকে ছুটি চাই আমার। আমি বাঁচতে চাই।

অনি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো, আমিও বাঁচতে চাই। তোকে ঘিরে বাঁচতে চাই। দু’জনেই নাহয় একসাথে বাঁচবো।

আমি অবাক হয়ে বললাম, মানে কি?
ও বললো, জানিস?তোকে ভালোবাসি বলতে বড্ড ইচ্ছে হয়।

-তাহলে বলিস না।
>কেনো?
-কারণ কাউকে ভালোবাসি বলতে মন চাইলে বলবি না। বলার কি দরকার?
>আজব মেয়ে তুই।
-ভালোবাসি বলতে বড্ড মন চাইলে কখনো বলিস না, হৃদয় দিয়ে ভালোবাসিস। আমি অনুভব করে নেওয়ার চেষ্টা করবো।

অনির মুখটা ঝকমক করে উঠলো খুশিতে। প্রাপ্তির আনন্দে ও পূর্ণ।
আমিও আজ কান্নাভেজা দু’চোখ মেলে আমার বেস্ট ফ্রেন্ডটাকে দেখলাম। বুঝলাম চোখের পানিতে শুধু ওর টিশার্টই না, হৃদয়টাও ভিজেছে।

অদ্ভুত দৃষ্টিতে খেয়াল করলাম অনি কবে কবে বন্ধু থেকে পুরুষে পরিণত হয়েছে বুঝতেই পারিনি। জীবনে প্রথম বারের মতো মনে হলো অনি গোপনে গোপনে প্রেমিক পুরুষ হয়ে উঠেছে, ও আর বন্ধু নেই। ও আমার প্রয়োজন না, ও আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

হঠাৎ বললাম, এতো আলো আমাকে অন্ধ করে দিচ্ছে। নিচের রাস্তা দেখিয়ে বললাম, হাটবি আমার হাত ধরে?
আজ হাটতে মন চাইছে।

নিয়ন আলোর রেখা ধরে অনির হাতটা শক্ত করে ধরে হাটছি। অনেকগুলো সন্ধ্যা অভির হাতের মুঠোয় সঁপে দিয়েছিলাম এই রাজপথে। আজ অভি সুখী হতে পেরেছে। আজ অনি হাটছে। কেউ তো থাক। যে আমার প্রয়োজন না অভ্যাসে মিশে থাকবে। আজীবন থাকবে।

অনি?
>হু। বল।
-অভিরা ফিরে এসেছে তাই না?
>এসেছে হয়তো।
তুই ওকে প্রচণ্ড ভালোবাসতি তাই না?
-হুম। বাসি।

>তাহলে ও সুখী হয়েছে ভেবে নিজেও ভালো থাক। আমাকেও ভালো রাখ। আমি তোর ভালোবাসাকে শ্রদ্ধা দেখিয়ে গত সাত বছর তোকে ভালোবাসার কথাটা বলিনি। কারণ তুই অভিকে নিয়ে ভালো ছিলি। মেনে নিতে শেখ বাস্তবতাটাকে। নিজের ভালো থাকার ব্যবস্থা নিজেকেই করে নিতে হয় পাগলী। আমি পাশে থেকে সবসময় আগলে রাখবো তোকে। দিনশেষে ভেবে নিবি অনি তোর। একটা অভি চলে গেল বলেই তো অনি তোর হলো। ভেবে নে এটাই হবার ছিলো। তোর আমার হাতে কিছু ছিলো না। সবকিছু চাইলেই পাই না আমরা। মনে কর সেই না পাওয়ার খাতায় অভি নামটা যুক্ত হলো। মেনে নে সব। স্বাভাবিক হ। আমি জানি তুই ভিতরে ভিতরে মরে যাচ্ছিস। এটা ঠিক না। অভি তোর জন্য ছিলো না। অভি অন্য কারো জন্য জন্মেছে।

অনির হাত আঁকড়ে ধরে আবারো কেঁদে ফেললাম। কষ্ট হচ্ছে খুব। দূরে কোথাও হই হুল্লোড় চলছে। ভালো লাগছে না এসব। মন বলছে মুক্তি চাই। এই ঝকমকে শহরের প্রতিটি আলো আজ অভির ফুলশয্যার ঘরের আলোকবাতি বলে মনে হচ্ছে আমার। আমি আজ সত্যি অন্ধকারে ডুবে যেতে চাই।

অনি সত্যি আমাকে ভালোবাসে তা গত সাতটা বছরে বুঝেছি। নিজে যে কষ্ট পাচ্ছি তা আর ওকে পেতে দিবো না। ওর সাথেই বাঁচবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।

অনিকে বললাম, হাতটা ছাড়বিনাতো?

>না। ছাড়ার বয়স চলে গিয়েছে। তাছাড়া সাতটা বছর অপেক্ষা করেছি।আজ থেকে তোর প্রতিটা মুহূর্ত আমি দখল করে রাখবো। দিবি?

-হুম। ভালো রাখতে চাইছিস?
>খুব চাইছি।
-পারবি?
>আপ্রাণ চেষ্টা করবো।
-আমাকে চাস তুই জীবনে?

একটু না, খুব করে চাই। আমার জীবনে তোকেই চাই। তুই আমার জীবন জুড়ে থাক। তুই চাইলে কালই বিয়ে করে নিবো আমরা।

-হুম।

আবারো ওকে দেখলাম। কান্নাটা বেড়ে গেলো। অনির চোখে স্পষ্ট ভালোবাসা দেখতে পাচ্ছি।
অনি বললো, কাঁদিস না। একটা অভিকে হারিয়ে একটা অনিকে পেয়েছিস। আয় সুখী হই। ভালোবাসিতো।

শক্ত করে অনির হাতটা ধরতেই সমস্ত চিন্তা ম্লান করে মাথার ভিতর বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই কথা, আজ অভির বিয়ে।

কথাটা নতুন করে বাঁচার প্রেরণা দিচ্ছে আমাকে। সে পারলে আমি কেনো নয়? আমি অনির সাথে নতুন করে বাঁচবো, মনের কোণে আবারও উকি দিচ্ছে একটি কথা, আজ অভির বিয়ে।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত