ফোনালাপ এবং অতঃপর

ফোনালাপ এবং অতঃপর

বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।আমি চোখ বন্ধ করে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছি কফির মগ হাতে,কানে ইয়ারফোনে গান বাজছে “আজ এই আকাশ কালো হয়ে বৃষ্টি ঝরে তোকে ধরে ছন্নছাড়া হয়ে আমি…!” হঠাৎ গান বন্ধ হয়ে গেল,বুঝলাম কেউ ফোন করেছে।রাত প্রায় সাড়ে বারটা।এত রাতে কে ফোন করতে পারে আমাকে,আর আমার এত সুন্দর মুডটা কে নষ্ট করলো এটা ভাবতে ভাবতেই প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই আমি বিষম খেলাম!আরেহ,আমার নাম্বার থেকেই আমাকে ফোন মানে…!

ভালো করে লক্ষ করে দেখলাম, নাহ!আমার ফোন নাম্বার আর এই নাম্বারটার সাথে দুইটা ডিজিটের পার্থক্য আছে।আমার কাছে এখন ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং লাগলো! আমি কলটা রিসিভ করলাম। আমি কোনো কথা বলছি না,ওপাশ থেকেও কেউ কথা বলছে না। কিন্তু,ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম আমি। ওপাশ থেকে আসা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর আমার জানালার বাহিরে বৃষ্টির শব্দ,এ দু’টো মিলে কি যে অদ্ভুত একটা পরিবেশ সৃষ্টি হলো তা বোধ হয় শুধু বলে প্রকাশ করা যাবে না। আমি এতখানিই উপভোগ করছিলাম ওই মুহূর্তটা যে আমার খেয়ালই হলো না ইতিমধ্যে ৭মিনিট পার হয়ে গেছে!

-আপনার শহরে বৃষ্টি হচ্ছে তাইতো?

অবশেষে নীরবতা ভেঙ্গে যে কন্ঠস্বর ভেসে এলো ওপাশ থেকে তাতে আমি আরো অবাক হলাম! কন্ঠটা যেন বহু কালের চেনা,কি যেন এক মায়া ওই কন্ঠস্বরে!নিজেকে সামলে নিয়ে খুবই স্বাভাবিকভাবে নিরস ভঙ্গিতে বললাম,
-জ্বি।আপনার শহরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর আমার শহরের বৃষ্টির শব্দ,এ দু’টো মিলে কি যে অদ্ভুত একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তা বোধ হয় শুধু বলে প্রকাশ করা যাবে না!

-বলে প্রকাশ করবেনই বা কেন!আমিও তো এতক্ষণ উপভোগ করছিলাম এই রহস্যময় অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশটা!ওপাশের বৃষ্টির শব্দ আমিও শুনছিলাম আর আমার এখানের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক…
-ওহ আচ্ছা!
-আপনি গান শুনছিলেন নাকি?
-জ্বি।কিভাবে বুঝলেন?
-আপনি ইয়ারফোন দিয়ে গান শুনছিলেন,এখনো ইয়ারফোন দিয়েই কথা বলছেন,আমি আপনার নিঃশ্বাসের শব্দও এতক্ষণ শুনছিলাম এই সাথে!মনে হচ্ছিলো আমার একদম সামনেই বসে আছেন আপনি!
-জ্বি?
-আপনি তো বেশ সুন্দর করে “জ্বি” বলেন।
-ওহ তাই?
-জ্বি।

-আপনার “জ্বি” বলা শুনে মনে হচ্ছে কোনো বাধ্য ছেলে ক্লাসে ম্যামের কথার সাথে তাল মেলাচ্ছে!
কথাটা বলেই আমার হাসি পেল কেন জানি না!আমি হাসলাম খানিকটা,আমার মনে একবারও চিন্তা আসলো না এতক্ষণে যে আমি কার সাথে কথা বলছি!কে ইনি!!
ওপাশে নীরবতা। খানিকক্ষণ বাদে আবার ওপাশ থেকে সেই অজ্ঞাত বললো,
-আপনাকে কি কেউ বলেছে আপনার হাসির শব্দটা সুন্দর?
-হাসিটা সুন্দর বলেছে কেউ কেউ,হাসির শব্দটা সুন্দর কিনা কেউ বলেনি।
-তাহলে আজ আমি বলছি, আপনার হাসির শব্দটা সুন্দর।
-উম…আচ্ছা!
-আচ্ছা,বৃষ্টি থেমে গেছে নাকি?

-নাহ,তবে কমে এসছে।
-বৃষ্টি ভেজা মা…
তার কথাটা শেষ হবার আগেই আমি বলতে শুরু করলাম,
-মাটির গন্ধটা কেমন নেশা ধরিয়ে দেয় যেন!ইচ্ছে করে ভেজা ঘাসের উপরে শুয়ে সেই গন্ধ নেই বুক ভরে!
-হ্যা একদম তাই।
আমি বুঝতে পারলাম,আমি হাসছি মিটিমিটি।আমার ভালো লাগছে,কি ভালো লাগছে কেন ভালো লাগছে জানি না।তবে আমার ভালো লাগছে। আমি চুপ করে আছি,ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে।গুনগুন শব্দ পেলাম।ওপাশ থেকে আবারো সেই অজ্ঞাত বলে উঠলো,
-কি গান শুনছিলেন আপনি?
-আজ এই আকাশ।
-ওহ!

“ওহ” বলেই অজ্ঞাত লোকটা গান গাইতে শুরু করলো।
-“আজ এই আকাশ কালো হয়ে বৃষ্টি ঝরে,তোকে ধরে ছন্নছাড়া হয়ে আমি খুঁজি তোরে আপন মনে…!”
আমি অজ্ঞাত ব্যক্তির গান শুনছিলাম চোখ বন্ধ করে,আমি অনুভব করছিলাম প্রতিটা শব্দ!অজ্ঞাত এবার গান থামিয়ে বললো,

-এই গানটাই তো?
-জ্বি।
-আপনি অনেক রাত অবধি জেগে থাকেন?
-জ্বি।
-কি করেন জেগে জেগে?
-গান শুনি,বই পড়ি,টুকটাক লিখতে চেষ্টা করি,ফেসবুকে থাকি এইতো।
-আচ্ছা,আপনি কি আমাকে চেনেন?
-আমার কি আপনাকে চেনার কথা?

-নাহ।
-তবে?
-আপনার আমার ব্যাপারে কোনো কৌতূহল হচ্ছে না?
-নাহ!
-কেন?কিছুই জানতে ইচ্ছে করছে না আমার ব্যাপারে?
-উঁহু।
-হোয়াট!
-জ্বি।আমার আপনার ব্যাপারে যতটুকু জানতে ইচ্ছে হচ্ছিলো ততখানি আমি ইতিমধ্যে বুঝে ফেলেছি।
-সেটা কি শুনি?

-উম…আপনি বাসার ছাদে বসে সিগারেট টানছিলেন।আপনি সিগারেট খেতে খেতে কিছু একটা নিয়ে ভাবছিলেন,যেকোনো কারণেই হোক আপনার মন ভালো নেই।আপনি সবসময় নিজেই নিজের মন ভালো করার চেষ্টা করেন তাই আজও সেই চেষ্টাস্বরূপই নিজের নাম্বারের সাথে মিল রেখে মাত্র দু’টা ডিজিট ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আপনি একটা নাম্বার ডায়াল করেন,আগেও এভাবে আর কোনো নাম্বারে ফোন দিয়েছেন হয়তো।যতবারই ফোন দিয়েছেন আননোন নাম্বারে ততবারই হয়তো কল রিসিভ করে কেউ না কেউ “হ্যালো” বলেছে।তবে আজ আমি ফোন ধরে চুপ করে রইলাম।আপনি ভাবছিলেন হয়তো আমিই আগে হ্যালো বলবো,আপনি এসব ভাবতে ভাবতে পরপর দুইটা সিগারেট শেষ করেন এবং একই সাথে অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশটা উপভোগ করছিলেন। ঠিক বললাম?

-জ্বি।আপনার গেসিং পাওয়ার তো ভয় পাবার মত,দুর্দান্ত! তবে এর আগে আর কাউকে এভাবে কখনো ফোন করিনি।
-আপনার বয়স পঁচিশের উপরে না।ঠিক বললাম?
-জ্বি।ঠিক বললেন।
-আপনি অবশ্যই গিটার বাজাতে জানেন।আপনি যথেষ্ট বইও পড়েন।
-জ্বি।

-আপনি আমাকে অবাক করতে চেষ্টা করেছেন প্রথমেই।ভেবেছেন আমি অতিবিস্মিত হয়ে যাব কিন্তু আমার স্বাভাবিক ভঙ্গি আর আপনার ব্যাপারে একদমই অনাগ্রহ আপনাকে বিচলিত করেছে এবং এই মুহূর্তে আপনি অবাক হয়েছেন বেশ!ঠিক?

-সবই তো বলে দিচ্ছেন।তবে আমিও আপনার মত খুব সহজেই অবাক হইনা কোনো বিষয়েই!
-আপনি কিভাবে জানলেন আমি অবাক হইনা খুব সহজে?
-কারন আপনার অবজার্ভ করার ক্ষমতা প্রশংসনীয়, আর আপনি অবাক হলেও সেটা লুকিয়ে রাখতে জানেন।
-আপনিও কম যান না তো।
আমি আবারো হাসলাম।দু’পাশে নীরবতা।অজ্ঞাত আবারো নীরবতা ভেঙ্গে বললো,
-আপনি কফি খাচ্ছিলেন?
-কফি খাওয়া যায় নাকি?
এবারে অজ্ঞাত ব্যক্তি হোহো করে হেসে উঠলো যেন এমন মজার কথা উনি আগে আর শোনেন নি।
আমি বললাম,

-কি হলো হাসছেন যে!
-আপনি কি কফি পান করছিলেন জনাবা?
-জ্বি।
-আপনার আকাশে আজ চাঁদ তারা কিছুই থাকবে না এটা স্বাভাবিক কিন্তু আমার আকাশেও আজ একটাও তারা দেখতে পাচ্ছি না!অদ্ভুত!
-মেঘে ঢাকা তারাদের দেখবেন কিভাবে!আর তাছাড়াও আপনি তো এতক্ষণ আকাশের দিকে লক্ষই করেন নি!
-আচ্ছা,মিস আপনার নামটাই জানা হয়নি!
-আমার নাম ইতিমধ্যে আপনি জেনে গেছেন।
-তাই নাকি!ওহ আচ্ছা!!!তাহলে তো দেখছি আকাশের সম্পদ আজ আমার কব্জায়!
-হাহাহা। আপনার নাম?

-আমার নামও আপনিই বলে দিয়েছেন তো!
-ওহ আচ্ছা?হুম।
-রাত বাড়ছে,হাজার বছরের পুরোনো রাত। নিজেকে সময় দেয়ার সময় চলে এসেছে।
-হু।
-আপনি আমাকে নিয়ে এখন ভাববেন না তো?
-আপনি আমাকে নিয়ে ভাবলে ধরে নিবেন আমিও আপনাকে নিয়ে ভাবছি!
-বেশ। ভালো থাকবেন।
-আপনিও।
-শুভরাত্রি তারাদের!
-শুভরাত্রি মেঘদলকে!

ফোনটা টুক করে কেটে গেল।অদ্ভুত নীরবতা চারিদিকে। নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ নিজেই শুনতে পাওয়া বেশ বিরক্তিকর। খুব বিরক্ত লাগছে এখন।বৃষ্টি নামছে আবারো…আকাশ কেঁদে ভাসাচ্ছে নাকি অন্যকারোর বেদনার খবর পৌঁছে দিচ্ছে আমার কাছে? এই আকাশ দেখতে ভালোবাসা প্রতিটি মানুষ খুব ভালো থাকুক!
থাকবে তো?!কিভাবে জানবো?!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত