মেঘের আড়ালে সূর্য

মেঘের আড়ালে সূর্য

শীতের সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতেই ইচ্ছা করে না ৷ পাশে ঘুমিয়ে আছে আমার সম্মানিত স্বামী ৷ ঘুমালে তাকে বেশ লাগে ৷ দেখলেই মনের মধ্যে একটু প্রেম প্রেম পায় ৷ ঠিক তখনি একটা মেসেজ আসলো মাওলানা সাহেবের ফোনে, “আপনার ঘুমটা ভাঙলো? ”

মুচকি হাসি দিয়ে মেসেজের উত্তর দিলাম, “জ্বী রুমা ভাঙলো, জানো আজ আমার খুব প্রেম প্রেম পাচ্ছে ৷ ওপাশ থেকে মেসেজ আসলো, “তাই বুঝি”

” হ্যা আজ বেলাকে ভয়ংকর সুন্দর লাগছে ৷ অগোছালো চুল, ঘুমন্ত মুখ ৷ তুমি বলো বাসায় এতো সুন্দরী বউ থাকলে প্রেম প্রেম না পেয়ে থাকা যায় বলো? ”

মেসেজটা দিয়ে টানা দুই মিনিট হাসলাম ৷ রুমা এখন জ্বলে-পুড়ে খা খা করছে ৷ দেখা হলে গায়ে একটু জল ঢেলে দিবো, হি হি হি ৷ হাসির শব্দে মাওলানা সাহেব ঘুম থেকে উঠে বলল,
“বেলা এইভাবে অট্টহাসি শয়তানে দেয় ৷ এইভাবে হাসতে নেই ৷

নিজেকে যতটা সম্ভব গম্ভীর রেখে, আস্তে করে উঠে টয়লেটে চলে গেলাম ৷ এসে দেখি মাওলানা সাহেব ফোনটা হাতে নিয়ে বসে আছে ৷ তার পাশে বসতে বসতে বললাম
” মাওলানা সাহেবও পরকিয়া করে, ভাবা যায়?
” মানে কি বলছো এইসব?

” রুমা আপার সাথে আপনার এতো কিসের মেসেজ হুম ৷ আচ্ছা সে কি আগেও আপনাদের বাড়িতে আসতো ৷
কিছু না বলেই উঠে চলে গেলো ৷ শুধুই হাসলাম ৷ এই বুড়ো মাওলানাকেও কেউ এইভাবে ভালবাসতে পারে ভাবতেই পারি না ৷ শীতের সকালে সোনালী রোদ উঠতেই আশেপাশের লোকজন সবাই আসছে ৷ নতুন বউ দেখতে, ভিতর থেকে কিরকম খুশি খুশি লাগছে ৷ আগে আমিও নতুন বউ দেখতে যেতাম আর বউ কিভাবে লজ্জা পায় সেটা সবাইকে অভিনয় করে দেখাতাম ৷ তবে আজ আমাকে দেখতেও কত মানুষ আসতেছে ছোট বড় অনেক লোকজন আসছে, কিন্তু আমার লজ্জা পাচ্ছে না ৷ ছোট ছোট বাচ্চারা মাঝে মাঝে খোচাখুচি করছে ৷ শাশুড়ি মা বলতেছে ৷
” বউ তোমার চাচি শাশুড়়িকে পান বানিয়ে দাও ৷

বাধ্য মেয়ের মতোই পান বানাতে গেলাম ৷ গ্রামের মানুষের একটা কুসংস্কার আছে ৷ এটাকে ঠিক কুসংস্কার বলা চলে না, এই কাজের মাধ্যমে তারা বউ লক্ষী কিনা বা বউ কিরকম হতে পারে সেটা ধারণা করে ৷

পান কিভাবে সাজিয়ে দেয় ৷ পান সাজানো দেখে তারা বুঝে যায় ৷ আবার সুপারি কুচিকুচি করে কাটতে পারে কিনা ৷ আমি মনে মনে বললাম, ” আমাকে যাচাই করে লাভ নেই মাগো ৷ পান বানিয়ে যখন সবাইকে পান দিলাম ৷ সবাই খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, রাহেলার মা তোমার বউ একটা পাইছো লক্ষ্মীমতি ৷

আমি মাওলানা সাহেবের দিকে তাঁকালাম, মুচকি মুচকি হাসতেছে ৷ আমিও একটা চোখ টিপ মেরে বুঝিয়ে দিলাম ৷ আমার কত গুণ ৷ সবার মাঝেও আমি আরেকজনকে খুজছি, আর কেউ না জানলেও মাওলানা সাহেব ঠিকই বুঝেছে৷ তিনি রোদ পোহাচ্ছেন ৷ পান সাজানো শেষ করে উঠানে মাওলানা সাহেবের গা ঘেষে বসলাম ৷ তিনি ইতস্তত করে একটু সরে বসলো ৷ কিছুটা রহস্যের গন্ধ পেলাম ৷ যদিও সে বলেছে, “বেলা গ্রামের মানুষ উল্টাপাল্টা কথা ভাববে ৷ এইভাবে বসো না, নিজেই একটু সরে বসে আড় চোখে তাঁকিয়ে আছি সামনে বসা মেয়েটির দিকে ৷ মেয়েটাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে ৷ হ্যা এটাই রুমা ৷ একটু পর মেয়েটা সামনে এসে মাওলানা সাহেবকে বলল, “ভাইয়া আপনাকে শরবত দিবো, লেবুর শরবত?
এবার মাওলানা আমার দিকে তাঁকালো ৷
মুচকি হাসি দিয়ে বললাম,

” রুমা এই শীতে শরবত দিও না, যদি পারো লেবু চা করে নিয়ে এসো ৷
মেয়েটাও আর কথা না বাড়িয়ে রান্না ঘরে চলে গেলো ৷ মাওলানা সাহেব হাসি দিয়ে বলল, “দিন দিন খুব হিংসুটে হয়ে যাচ্ছো বুড়ি ”

বলি মাওলানা সাহেব রুমা আমার থেকে বেশি সুন্দরী ৷ তাহলে ওরে বিয়ে করলেন না কেনো?
” তোমার বেহায়াপনা বিদায় করার জন্যই বিয়ে করা ৷
ওমনি রুমা চা নিয়ে হাজির, চায়ে চুমুক দিতে দিতে রুমাকে বললাম,
” তোমার মেয়েটা কইগো? দেখতে কার মতো হয়েছে? ওর বাবার মতো ? নাকি তোমার মতো?

বাঁকানো হাসি দিয়ে বলল, “কার আবার তুর (আমার বরের নাম) ভাইয়ের মতো ৷ ওর হাসিটা একদম তুর ভাইয়ের মতো”

এবার মেজাজটা বিগড়ে গেলো, চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বললাম,
” তোমার লজ্জা করে না তুরকে এইভাবে প্রতিদিন মেসেজ করো, এবার তো বোঝা উচিত তোমার তুর ভাইয়ের বিয়ে হয়ে গেছে ৷ পছন্দ করো ঠিক আছে কিন্তু এখন তার বিয়ে হয়ে গেছে ৷ তোমারো একটা বাচ্চা আছে ৷
মেয়েটা আর কিছু বলল না, আমারো ভালো লাগছে না ৷ মাথা প্রচন্ড ব্যথা শুরু হইছে ৷ উঠে গিয়ে রুমে চলে আসলাম ৷ তুর ঠিকই বলে, সত্যি আমি হিংসুটে হয়ে যাচ্ছি দিন দিন ৷ এই মাওলানাকে যে এতো ভালবাসবো বুঝতেই পারি নি ৷ আসলেই বিয়ে হলে একটা মেয়ে অনেকটা পাল্টে যায় ৷ অনেকটা পাল্টে যায় ৷ বাবা যখন ঘরে এসে বলেছিলো, ভালো ঘর থেকে সমন্ধ আসছে ৷ লাখে একটা ছেলে, এমন ছেলে কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না ৷
আমি মনে মনে হাসলাম, এমন ছেলে তো অনেক আসছে কিন্তু কোনো কারন ছাড়াই অনেক সমন্ধ ভেঙেছে ৷ কোনো সোনার টুকরা ছেলে সেই ভাবে আসে নি ৷ যদিও পরে বিয়ে ভাঙার কারন জানতে পারি ৷ পাশের বাসার এক আন্টি বলাবলি করছিলো ৷ ওইরকম পাগল মেয়েকে কে বিয়ে করতে চায় শুনি ৷ সেদিন যখন পাত্রপক্ষ আসে, সুন্দর করে সাজিয়ে নিয়ে গেলো তাদের সামনে ৷ নিজেকে কোন পন্য মনে হচ্ছিলো ৷ যেটা সাজিয়ে রাখা হচ্ছে ৷ ক্রেতা ভালভাবে দেখে পছন্দ হলে নিজের করে নিয়ে যাবে ৷ আমিও ঠিক তাই, তবে যখন ওদের সামনে গেলাম ৷ মা বলেছিলো ছেলেও সাথে এসেছে ৷ কিন্তু রুমে ঢুকে সেইরকম কাউকে চোখে পরেনি ৷ কোন ছেলে আসে নি ৷ একজন মহিলা আর দুইটা লোক ৷ একজন বয়স্ক অন্যজন হুজুর ৷ মনে মনে ভাবলাম, কেমন পরিবাররে বাবা ৷ হুজুর নিয়ে আসছে সাথে করে ৷ একসাথে বিয়ে করাবে নাকি ৷ পরে জানতে পারি এটাই নাকি ছেলে ৷ এই বাবার সোনার টুকরা ছেলে ৷ যে কিনা একজন হুজুর ৷ করুন দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাঁকালাম ৷ মা তার চোখের ইশারায় বলল, “ভাল ছেলে মা, উল্টাপাল্টা কিছু বলবি না ” আমিও মনে মনে বলেছিলাম,

” দুঃখিত মা, আমার এই সুন্দর জীবনটা, সুবাহানাল্লাহ, নাউযুবিল্লাহ আর অাসতাগফিরুল্লাহ শুনে কাটিয়ে দিতে পারবো না ”

নিরবতা ভেঙে বললাম,
“বাবা আমি এমন দাড়ি-গোভওয়ালা ছেলেকে বিয়ে করবো না ৷
সবাই কিরকম হকচকিয়ে গেলেন, পাত্রীর মুখে এমন কথা ৷ বসার ঘরের সবাই একে অপরের দিকে তাঁকাচ্ছে ৷ বাবার দিকে তাঁকাতেই মাথা নিচু করলাম ৷ আড় চোখে মাওলানার দিকে তাঁকালাম ৷ এমন ভাবে তাঁকিয়ে আছে মনে হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বেহায়া মেয়ে তার সামনে বসে আছে ৷ বাবা দাতে দাত চেপে বলল,

” চুপ করো বেলা ৷
” শোনো বাবা যদি বিয়েই করতে হয় তাহলে বিয়ের প্রথম রাতেই আমি তার দাড়ি-গোভ কেটে ফেলবো ৷
ওমনি মাওলানা সাহেবের কাশি শুরু হলো ৷
আমতা আমতা করে বলল,
” টয়লেটটা কোন দিকে?
বাবা আমাকে উদ্দেশ্যে করে বলল,
” বেলা টয়লেটটা দেখিয়ে দাও ৷
মনে মনে বললাম, পেলো কাশি ধরলো টয়লেট? আজব!! আমি মাওলানা সাহেবকে টয়লেট দেখিয়ে দিলাম, টয়লেটে ঢুকতে ঢুকতে মাওলানা সাহেব বলল,
“আপনি যতটা সুন্দর তার থেকে হাজার গুন অসভ্য ৷ আল্লাহ্ আপনার হেদায়েত করুক ৷
মুখের উপর এমন অপমানিত করবে বুঝতেই পারি নি ৷

রাগে হাতের আঙুল চুলকানো শুরু হইছে ৷ আমার আবার রাগ উঠলে আঙুল চুলকায় ৷ মাথা ঠান্ডা করে গিয়ে আবার সোফায় গিয়ে বসলাম ৷ মাওলানা সাহেবও আসলো ৷ এবার সাথে থাকা লোকটি বলল,
” মা তুমি নিয়মিত নামাজ পরোতো? আর যাই হোক মেয়ে নামাজী হওয়া খুবই দরকার ৷
হাত চুলকাতে চুলকাতে বললাম,

” নামাজ? ও আল্লাহ!! এই শব্দটা আজ আমি প্রথম শুনলাম ৷

এবার মাওলানা সাহেব আমার দিকে এমন ভাবে তাঁকালেন, মনে হলো কোন এলিয়েন তার সামনে বসে আছে ৷ পরে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, আপনি এবার যেতে পারেন ৷ তারা চলে যাওয়ার আধা ঘন্টা পর বাবা মা আমার রুমে আসলেন ৷ শান্তভাবে মা বলল,

” পাত্রপক্ষের সামনে তুই ওই কথাগুলো কেনো বলেছিস? তোর বাবার একটা সম্মান আছে সেটা কি তুই জানিস ?
“মা আমি ওই দাড়ি-গোফওয়ালা লোকটাকে কিছুতেই বিয়ে করবো না”
” কেনো? দেখ বেলা এই ছেলেকে নিয়ে কোনো বাহানা শুনবো না ৷

” আহা মা বাহানা না ৷ এই ছেলেকে যখন জড়িয়ে ধরবো তখন দাড়িগুলো গলায় লাগবে আর তখন আমার সুড়সুড়ি লাগবে ৷

কথাটা বলে মনে হলো এটা বাবার সামনে বলা ঠিক হয় নি ৷ বাবা খকখক করে কাশি দিয়ে সেটা বুঝিয়ে দিলো ৷ বাবা গম্ভীর গলায় বলল, চলো রেহানা ৷ বলেই চলে গেলো ৷

আর আমি আয়নার দিকে তাঁকিয়ে শাড়ি ঠিক করে নিলাম ৷ চুল ঠিক করতেই দেখি মা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৷ পরিস্থিতি সামাল দিতে, পারফিউমটা হাতে নিয়ে মায়ের বগলের দিয়ে বললাম,

“এই কোমরে হাত দিয়ে আছো কেনো? কি বিচ্ছিরি গন্ধ বের হচ্ছে ৷
মা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “বেলা মাইর খাবি কিন্তু ৷
” আচ্ছা বাবা কি গন্ধ পায় না?
” কিসের গন্ধ পাবে ৷
” কি আবার, তোমার গায়ের গন্ধ ৷
” বেলা???
” হি হি হি… আচ্ছা মা একটা সত্যি কথা বলবে?
” কি?
” বাবা তোমাকে জড়িয় ধরলে গলায় সুড়সুড়ি লাগে না?
মায়ের এদিক ওদিক তাঁকানোটা আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে, বেলা তোর কপালে দুঃখ আছে ৷

ভেবেই নিয়েছিলাম আর যাই হোক ওই হুজুরের সাথে সমন্ধ ডিসমিস ৷ তবে না, সেটা হলো না ৷ বিয়েটা হয়ে গেলো এই বদ লোকটার সাথে ৷ বিয়ের রাতেই তাকে বলেছিলাম,

” আচ্ছা আপনি যদি সকাল বেলা উঠে দাড়িগুলো না দেখতে পান তাহলে কি খুব রাগ করবেন?
প্রশ্নটা করে নিজেই উত্তর ভেবে নিয়েছিলাম, এখন বলবে, নাওউজুবিল্লাহ !! কিন্তু না সে হেসে উত্তর দিলো ৷ “একবার ভেবে দেখেছো আমাকে এইভাবে দেখলে আশেপাশের লোকজন কি বলবে? ”
তার কি উত্তর দিবো ভেবে পাচ্ছিলাম না ৷

বিয়ের সব নিয়মকানুন মানার পর যখন ঘুমাতে যাবো তখন কানের কাছে এসে বলল ৷ “পেত্নির মতো লাগছে বুড়ি” বলেই লাইট বন্ধ করে বলল, ঘুমাও এতো রাতে পেত্নি দিকে তাঁকিয়ে থাকার কোন ইচ্ছা নাই ৷ বলেই ঘুমিয়ে গেলো ৷
এমন একটা হুজুরের মুখ থেকে এমন কথা মোটেও আশা করি নি ৷ সূক্ষ্ম ভাবে অপমান করা যাকে বলে ৷ চুপ করে থাকলাম কিছুক্ষণ ৷ একটু পর মাওলানা সাহেবের ফোনে মেসেজ আসলো ” তুর ভাইয়া আপনি বিয়ে করে ভালো করেছেন ৷ এবার অতীত থেকে বেড়িয়ে বর্তমান নিয়ে ভালো থাকেন শুভকামনা ”
এইরকম মাওলানা আবার প্রেমও করে? হায়রে দুনিয়া ৷

একদিন রাতে ঘুমিয়ে ছিলাম, হঠাৎ গভীর রাতে দেখি আমার সামনে কোন জ্বীন আমার দিকে ঝুকে আছে ৷ জ্বীন কখনো দেখি নি শুনেছি তবে সেটা আমার সামনে হাজির ৷ ও মা গো আমি কোথায় এসে পরলাম ৷ হঠাৎই হাচি দিতেই লাফ দিয়ে বসলাম ৷

” একি আপনি এখানে? এতো রাতে?
” না মানে বেলা, আমি তোমাকে দেখছিলাম ৷

তার কথা শুনে অনেক ভেবে চিন্তে উত্তর বের করলাম, যে লোকটা মাঝরাতে আমাকে চুপিচুপি দেখছিলো ৷ লুকিয়ে কপালে আদর দিতে আসছিলো ৷ আর আমি সেটাকেই জ্বীন ভেবেছিলাম ৷ যখন কপালে আদর দিতে আসছিলো ৷ তার দাড়ি নাকে লেগেই হাচি চলে আসলো ৷

ভাবতেই নিজের কপাল চাপরাতে ইচ্ছা করছে ৷ কত রোমান্টিক একটা মুহূর্ত তবে সেটা ভয়ংকর হাস্যকর হয়ে গেলো ৷ তাই আমিও কম না, ওই দাড়িগুলোর জন্য রোমান্টিক মুহূর্ত নষ্ট করবো না ৷ রাতে ঘুমানোর আগে রাবার ব্যান্ড দিয়ে তার দাড়িগুলো বেঁধে তারপর ঘুমাই ৷ এতে যদিও তার ঘোর আপত্তি ছিলো তবে সেটা আমার উপর প্রভাব ফেলে নি ৷ আস্তে আস্তে কখন যে তাকে ভালবেসে ফেলেছি বুঝতেই পারি নি ৷ তবে এর মাঝে রুমার বিষয়টা ক্লিয়ার হয়ে গেলো ৷ রুমার সাথে তার বিয়ে হবার কথা ছিলো কিন্তু বিয়েটা হলো না ৷ মাওলানা সাহেবের বয়ান ছিলো আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে আবার কিসের বিয়ে ৷ তবে আজ বুঝলাম এই মেয়েটা কত ভালবাসে আমার মাওলানা সাহেবকে ৷ প্রতিদিন সকাল বিকাল রাতে মেসেজ করে ৷ সে শুধু দেখে যায় আর মাঝে মাঝে মুচকি হাসে ৷ কথায় বলে “প্রেমের মরা জলে ডুবে না” সেটা রুমাকে দেখেই বুঝেছি ৷ বিয়ে হয়েছে বাচ্চা হয়েছে তাও কত অধিকার খাটায় তুরের সাথে ৷ গ্রামে আসার পর এখন বেশিবেশি ঘুরঘুর করে ৷ এটা আমার বিরক্ত লাগে ৷ আজতো মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে ৷ রুমার মেয়েটি নাকি আমার মাওলানা সাহেবের মতো হয়েছে ৷
ওমনি মাওলানা এসে বলল,

” বেলা মন খারাপ নাকি?
” জানোইতো বুড়ো, রুমা আজকাল মাথায় চেপে আছে ৷ বড্ড হিংসে হয় ৷ আমি কি তোমাকে ওইভাবে ভালবাসতে পারছি ?

তুর আর কোনো কথা বললো না ৷ শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ৷
“আমি ভালবাসতে চাই খুব করে ভালবাসতে চাই কিন্তু পারছি না কেনো?
তুর বুকের সাথে জড়িয়ে, ওর কপালের সাথে আমার কপাল ঠেকালো ৷ আরেক হাত দিয়ে গলার কাছ থেকে চুল সরিয়ে আরো কাছে টেনে নিলো ৷ শান্ত ভাবে বলল,
“সব ভালবাসা প্রকাশ করতে নেই বুড়ি”

এ কেমন ভালবাসা, ঘোরলেগে যায় ৷ পরম মমতায় চোখ বন্ধ হয়ে আসে ৷ ভালবাসা বুঝি এমনই হয়? কতক্ষণ চোখ বন্ধ করেছিলাম জানি না ৷ তুরের কথায় ঘোর কাটলো ৷

” কি গো বুড়ি, এখন বুঝি আমার দাড়িতে সুড়সুড়ুি লাগে না ?
কথাটা শুনে খেয়াল হলো মাওলানার দাড়ি কিছুটা আমার গলায় লাগছে ৷ এবার বড্ড সুড়সুড়ি লাগছে কিন্ত এমনভাবে জড়িয়ে আছে ছাড়ানোর শক্তি নেই ৷ ওমনি তুর বলল,
“তোমার অনুভূতি এতো লুইচ্চা কেনো?
কথাটা ঠিক বুঝলাম না, কপাল কুঁচকে তার দিকে তাঁকালাম ৷
ঠোটের কোণের বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
” আমার ছোয়া পেয়েই তোমার সুড়সুড়ি উধাও?

” হুহ!! এমন মানুষ আবার রোমান্টিক হয় সেটা দেখেই আমার অনুভূতি খানিকক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয় গেছে ৷
বাইরে তিতিক্ষার কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে ৷ তুর কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলো ৷ রুমে গিয়ে দেখলাম তিতিক্ষা অনবরতভাবে কেঁদে চলেছে ৷ তুর গিয়ে তিতিক্ষাকে কোলে তুলে নিলো ৷ রুমা আস্তে করে বলল,

” আপনি তিতিক্ষাকে মোটেও ভালবাসেন না ৷ সারাক্ষণ নতুন বউকে নিয়ে থাকেন ৷ বলেই চলে গেলো ৷ এই রুমার প্রতি বিরক্তির মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে ৷ তুরের দিকে তাঁকালাম ৷ তিতিক্ষা তুরের বুকের সাথে মিশে আছে ৷ সত্যি বলতে রুমা ঠিকই বলেছে তিতিক্ষা দেখতে অনেকটা তুরের মতো ৷ নাক আর কপালের দিকটা হুবহু তুরের মতো ৷
সে যাই হোক আমি আমার তুরকে কারো সাথে শেয়ার করতে পারবো না ৷
এটা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছি খেয়াল করি নি ৷

হঠাৎই মনে হলো কেউ আমার রুমে ঢুকলো ৷ কাছে এসেই মুখ চেপে ধরে ফিসফিস করে বলছে, “বুড়ি এইভাবে তুই আমাকে ভুলে থাকতে পারিস না ৷ তোর সারা মস্তিষ্কে শুধু আমার বসবাস ৷ সেখান থেকে এতো তাড়াতাড়ি মুছে দিতে পারিস না”

এমনভাবে মুখ চেপে আছে তাতে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে ৷ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না ৷ বাইরে জোৎস্নার আলোয়ে আবছা দেখা যাচ্ছে মুখটা ঠিক মতো দেখতে পাচ্ছি না ৷ হাত বাড়িয়ে তুরকে ধরার চেষ্টা করছি ৷ কিছুতেই পারছি না ৷
ওমনি তুর বলল,
” এই বেলা কি হয়েছে তোমার?
” জল, জল খাবো ৷

মাঝরাতে আবার সেই বাজে দুঃস্বপ্নটা ৷ গলাটা শুকিয়ে কাট হয়ে আছে ৷ বুকের মধ্যে ধরফরানিটা বাইরে থেকে শুনতে পাচ্ছি ৷ শীতের মধ্যে ঘেমে টেমে অবস্থা খারাপ ৷ তুর জলের গ্লাস হাতে দিয়ে বলল,
” আবার সেই স্বপ্ন?
” উমম ৷

তুর হাতে ধরে বিছানায় শুইয়ে দিলো ৷ মাথায় আলতোভাবে বুলিয়ে দিচ্ছে ৷
” ঘুমানোর চেষ্টা করো, আমি আছিতো তোমার পাশে ৷
কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না, “কে আমার সারা মস্তিষ্কে জুড়ে ছিলো? কাকে আমি এতো তাড়াতাড়ি ভুলে যাচ্ছি ৷ এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়েছি বুঝতেই পারি নি ৷

সকালে উঠেই মাকে ফোন দিলাম, জানতে পারলাম মায়ের খুব জ্বর ৷ এইদিকে আমারো মন ভাল লাগছিলো না ৷ তুরকে বললাম, উত্তরে জানালো, তুমি যাও আমি পরে যাবো ৷ তিতিক্ষা খুব অসুস্থ ৷ কিছুই বললাম না ৷ আমি যখন গাড়িতে উঠতে যাবো তখন, তুরের হাত শক্ত করে বলেছিলাম,

” আচ্ছা আপনি কি জানেন আমার মস্তিস্ক জুড়ে কে ছিলো? জানেন আমার আবছা মনে আছে ৷ কেউ একজন আছে যাকে আমি প্রচন্ড ভালবাসতাম ৷ কিন্তু কিছুতেই ঝাপসাটা পরিষ্কার হচ্ছে না ৷

তুর কিছু বললো না, হাতটা শক্ত করে বললো ” সাবধানে যাবে কাল আমি আসবো “ততক্ষণে তোমার ওই মস্তিষ্কে আমার জায়গাটা যেনো থাকে বুড়ি” কথাটা শুনেই টপটপ করে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরলো ৷ এতো কষ্ট লাগছে কেনো আমার ৷ মনে হচ্ছে এই কষ্টে আমি মরেই যাচ্ছি ৷ বাস ছেড়ে দিবে তুর চোখে জল মুছে দিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
” তুমি কি জানো কান্না করলে তোমায় মোটেও ভালো লাগে না ৷ সত্যি বুড়ি বুড়ি লাগে”

কথাটা আমি আগেও শুনেছি, তবে সেটা তুর বলে নি ৷ তাহলে কে? এতো ঝাপসা কেনো সব কিছু আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি ৷ পাগল? এই কথাটাও শুনেছি অনেকবার ৷ মাথার মধ্যে ভোঁ ভোঁ করছে ৷
আমি চলে আসলাম আমাদের বাড়িতে ৷
মায়ের শরীর আগের থেকে সুস্থ হয়ে গেছে ৷ খাটের পাশে চেয়ার টেনে বসলাম,
“আচ্ছা মা আমি কত দিন অসুস্থ ছিলাম?

মা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে উঠে বসলো, কথার প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, ” বেলা তোর হাতের চা খাওয়া হয় না কত দিন ৷ মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেলাম রান্না ঘরে ৷ মায়ের হাতে চা দিয়ে আমার রুমে চলে আসলাম ৷ পুরোনো জিনিস পত্র ঘেটে কিছু শোপিস, হাত ঘড়ি, পায়ের নুপুর, নীল কাচের চুরি, নীল শাড়ি আর শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে গয়না ৷ আর সাথে খয়েরী রংয়ের একটা ডায়েরী ৷ পাতার পর পাতা উল্টে যাচ্ছি ৷ এগুলো সবই আমার লেখা আমার মজার মজার কিছু ঘটনা, সাথে কিছু অনুভূতি ৷ ডায়েরীর মাঝপৃষ্ঠায় এসে থমকে দাড়ালাম, কিছু লেখা দেখে ৷ যেখানে লেখা ছিলো..

“”রাগি পন্ডিত, আমার মস্তিস্ক জুড়ে শুধু তোমার বসবাস ৷ আমার প্রতিটা স্পন্দনে শুধু তোমার অনুভূতি “”

মাথাটা ঝিমঝিম করছে ৷ ডায়েরী হাতে মায়ের কাছে গেলাম ৷ সবটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে ৷
মাকে বললাম,
” মা হিমাদ্রি কেমন আছে?
ওমনি মা ধরফর করে উঠে বসলো ৷
” বলো না মা ও কেমন আছে?
মা আর কিছু বলতে দিলো না, শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
” ওটা অতীত মা, তোর বর্তমান ওই অভিশপ্ত অতীতের থেকে হাজার গুন ভালো ৷

” আমি তো ভুলেই গেছিলাম মা ৷ হিমাদ্রি আমাকে ভুলতে দিচ্ছে না ৷ আমি আমার হিমাদ্রিকে ভুলে গেছি এটা কি করে মা? যে আমার অস্তিত্বে মিশে ছিলো তার কথা আমি কি করে ভুলে ছিলাম ৷ মাথাটা অসহ্য রকমের ব্যথা হচ্ছে ৷ মা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে ৷ মাকে ছাড়িয়ে বললাম,

” হিমাদ্রিকে আসতে বলো ওর দেওয়া নীল শাড়িতে সাজবো আজ ৷ বলেই মাকে রেখে রুমে চলে আসলাম ৷ পাশের রুম থেকে শুনতে পাচ্ছি মা কথা বলছে হিমাদ্রির সাথে হয়তো ৷ আজ হিমাদ্রির দেওয়া নীল রং সারা গায়ে মাখবো ৷

আয়নায় নিজেকে আরেকবার দেখে নিলাম ৷ হিমাদ্রি আজ চোখ ফেরাতে পারবে না ৷ পাগল ছেলে একটা, ওমনি কলিংবেল বেজে উঠলো ৷ দৌঁড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম ৷ তুর আসলো কেনো? তাহলে মা তুরকে ফোন দিলো? তুর মুচকি হাসি দিয়ে বলল,

“একটু চিমটি দাও তো বুড়ি ”
” আপনি এখানে?
” হ্যা, আগে চিমটি দাও ৷ আমি কি স্বপ্ন দেখছি না তো ৷ আমার পিচ্চি বুড়িকে আজ পরীর মতো লাগছে ৷
কি বলবো বুঝতে পারছি না ৷ আমার তো বিয়ে হয়ে গেছে ৷ হিমাদ্রি কি ভালো ভাবে নেবে ব্যপারটা? না আমার হিমাদ্রিকে ভালভাবে বুঝিয়ে বললে ঠিকই মেনে নেবে ৷ তার একটু পরই বড় ভাইয়া বাসায় আসলো ৷ আমাকে অবাক করে দিয়ে তুর বলল,

“হিমাদ্রির পছন্দ আছে বলতে হবে শাড়িটা বেশ মানিয়েছে তোমাকে ৷
কিছু বললাম না, আস্তে করে বললাম, বিশ্বাস করেন হিমাদ্রির ব্যপারটি আমার মনে ছিলো না ৷ আমি একটু অসুস্থ…
” আমি জানি বেলা ৷ তুমি মানুষিক হাসপাতলে ছিলে দুবছর ৷
হতভম্ব হয়ে বসে আছি ৷ কি করে জানে সে?

আমি অসুস্থ ছিলাম অনেকদিন ৷ যখন সুস্থ হই তখন দেখি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে গেছে দুইবছর ৷ মা বাবাকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতো,

” বড় রকমের অসুস্থ ছিলিস, উপরওয়ালার ইচ্ছায় তোকে আবার আমরা ফিরে পেয়েছি ৷ জানতেও চাইতাম না কখনো ৷ কারন অসুস্থতার কারনে প্রতিবেশির অনেক কথা শুনাতো ৷ এমন পাগল মেয়েকে কে বিয়ে করবে? ভালো ঘর থেকে কোনো সমন্ধ আসবে না ৷৷ এইসব কথা অনেক শুনেছে বাবা মা ৷ তাই জানতেও চাই নি কিন্তু পরে অবশ্য জানতে পেরেছি পাশের বাসার ভাবির কাছে ৷ বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেছিলো “বেলা ভালবাসার জন্য মানুষ পাগল হয় শুনেছি ৷ সত্যি চোখের সামনে এমনভাবে পাগল হতে দেখি নি ৷ নিজের কি হাল করেছো দেখেছো? এবার নিজেকে সামলে নাও ৷ জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না ৷

হেসে বলেছিলাম, আমার থেমে গেছে অনেকটা দিন ৷ জানার চেষ্টা করলে প্রচন্ড মাথা ব্যথা করতো খুব ৷ ভাবনায় ছেদ পরলো ভাইয়ার ডাকে ৷

” বেলা, এই বেলা
ভাইয়ার দিকে তাঁকালাম, করুণ দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে ৷ আস্তে করে বলল,
“কি রে বুবু, এইরকম করিস কেনো? তোর সামনেই তোর হিমাদ্রি….একটু ভেবে দেখ, দাদুকে তুই অনেক ভালবাসতি, সে যখন চলে গেছে কষ্ট পেয়েছিলি অনেক ৷ তাই বলে তার জন্য নিজেকে কষ্ট দিলে বাঁচবি কি করে? হিমাদ্রি এখন আর নেই ৷ তোর হিমাদ্রিকে আমরা অনেক খুজেছি পায় নি ৷
বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম, চারপাশটা কিরকম ঝিঝি করছে ৷ জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম ৷

“”সেদিন টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছিলো ৷ মাওয়াঘাটে বসে আছি আমি আর হিমাদ্রি ৷ একসাথেই বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম ৷ বৃষ্টি পাগল ছিলাম খুব, লঞ্চে নদী পার হচ্ছিলাম ৷ লঞ্চের ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম ৷ চুল ছেড়ে দিয়ে দুইহাত দুইদিকে মেলে ধরে চোখ বন্ধ করে অনুভব করছিলাম ৷ হিমাদ্রি ছাউনিতে দাঁড়িয়ে দেখছিলো ৷ হিমাদ্রি মাঝে মাঝে ডাক দিয়ে বলছে ৷ “ঠান্ডা লাগলে খবর আছে বুড়ি ”

হেসে বলতাম, ” যা খবর করবে বিয়ের পর করো তখন কিছু বলবো না পন্ডিতমশাই ” বলেই আমার মনযোগ দিলাম আকাশের দিকে ৷ খুব বাতাস, ঘনকালো আকাশ ৷

হঠাৎই লঞ্চটি দুলে উঠলো ৷ কিছু বোঝার আগেই জলে চারদিকে ভরে গেলো ৷ হাত বাড়িয়ে হিমাদ্রিকে ধরার চেষ্টা করছি কিন্তু স্রোতে অন্য দিকে নিয়ে যাচ্ছে ৷ কতক্ষণ ওইভাবে সাতার কেটেছি জানি না ৷ চারদিকে অনেক খুজলাম কিন্তু আমার পন্ডিত মশাইকে কোথাও খুজে পাচ্ছি না ৷ একজন লোক টেনে আমায় স্প্রিডবোডে তুললো ৷ চিৎকার করে বলছি, প্লিজ আমার হিমাদ্রিও এই জলের মধ্যে আছে ৷ ওরে কেউ খুজে দেন ৷ আমার হিমাদ্রি ওইখানে আছে ৷ ভালো করে খুজেন ৷ চারদিকে শুধু আহাজারি, কান্না আর কান্না ৷ চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে কত মানুষ কত বাচ্চা ৷ আস্তে আস্তে সব অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে “”

কাধের উপর কারো হাতের ছোয়ায় ঘুরে তাঁকালাম ৷ তুর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ৷ চোখের জল মুছে আলতো করে ওর বুকে জড়িয়ে নিলো ৷ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললাম, ” জানেন আমি আমার পন্ডিত মশাইকে বাঁচাতে পারি নি ”
মুচকি হেসে জবাব দিলো তুর, “তুমি তোমার পন্ডিতের অস্থিত্বকে বাঁচিয়েছো এটাই কম কি বলো?

” মানে?
” পন্ডিতের অস্তিত্ব জুড়ে শুধু তোমার বসবাস ছিলো না?
” হুম
” তাহলে? তার অস্তিত্বতো বাঁচিয়েছো তাই না? এতে নিশ্চই তোমার পন্ডিত খুশি হয়েছে ৷
” তাহলে ওই বাজে স্বপ্ন?

” ওটা তোমার পন্ডিত মেনে নিতে পারে নি, যে তুমি তোমার পন্ডিতরে এইভাবে ভুলে আছো ৷ তাইতো বার বার মনে করিয়ে দিতে আসতো ৷ এই বার মনে পরেছে আর স্বপ্নে আসবে না দেখে নিও ৷
তুর ঠিক পন্ডিতের মতোই যুক্তি দিয়ে কথা বলছে ৷

জানো বুড়ি ভালবাসা অনেকরকম হয়ে থাকে ৷ অতীত নিয়ে কখনো ভেবো না ৷ বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবো ৷

” উমম
” চলো আজ তোমাকে একটা সত্যির মুখামুখি নিয়ে যাবো ৷
কিছু না বলে তুরের কথায় সায় দিয়ে ওর সাথে গেলাম ৷
ফিরে চলেছি আমার বর্তমানকে আকড়ে শশুরবাড়ির পথে ৷ বাড়িতে ঢুকতেই তিতিক্ষার কান্না ৷ রুমা এসে তিতিক্ষাকে তুরের কোলো দিয়ে বলল,

” নাও তোমার মেয়ে ৷ কিছুতেই কান্না থামছে না তিতিক্ষার ৷ তুর কান্না থামানোর বৃথাই চেষ্টা করছে ৷ কিন্তু আমার কানে বাজছে, “এই নাও তোমার মেয়ে” পাশ থেকে আস্তে করে বললাম, ওটা আপনার কাজ না রুমার কাজ ৷ দিনতো আমার কাছে ৷ তিতিক্ষাকে তুলে নিলাম ৷ কিন্তু কান্না থামছে না ৷ ক্ষুধা লাগছে হয়তো ৷ তুরকে বললাম, রুমা এমন কেনো? মেয়েটাকে একটুও যত্ন নিচ্ছে না ৷ শুধু পারে অন্যের স্বামীর দিকে নজর দিতে ৷

“তিতিক্ষা আমার মেয়ে বেলা”
অবাক হয়ে তাঁকালাম, তুরের মেয়ে তিতিক্ষা? তাহলে রুমা কে?
” রুমা আমার চাচাতো বোন ৷ তমা চলে যাওয়ার পর তিতিক্ষাকে রুমাই দেখাশুনা করছে ৷
” তমা?? সেটা আবার কে?
” পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয় তমার সাথে ৷ বিয়ের কিছুদিন পর তমার আচরনে কিছুটা পরিবর্তন দেখা দিচ্ছিলো ৷ ফোনে কথা বলতো ৷ রাত জেগে ফেইসবুক নিয়ে পরে থাকতো ৷ তিতিক্ষার জন্মের পাঁচমাস পরই ওকে রেখে চলে যায় তার ভালবাসার কাছে ৷
” তারপর ওর একটা মা দরকার তাই বিয়ে করেছেন তাই না?? (আমি)
” হ্যা, ততা

” রাখেন আপনার তোতলামি, তা বিয়ের পর তো শুধু লুইচ্চামি করলেন ৷ মেয়ের কথা তো একবারও বললেন ৷
” তুমি কিভাবে নেবে তাই বলা হয় নি ৷ জানো তিতিক্ষার একটা মা দরকার ছিলো ৷ যে ওর মায়ের ভালবাসা দিতে পারবে ৷ যখন তোমার ভাইয়ের কাছে জানলাম, ভালবাসার জন্য দুইবছর মানুষিক হাসপাতালে ছিলে ৷ তখনই ভেবেছিলাম আমার তিতিক্ষার মা তুমি হতে পারবে ৷

তিতিক্ষা ততক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে ৷ কিরকম বুকের সাথে লেপ্টে আছে ৷ পরম যত্নে বুকের মাঝে আগলে রাখলাম ৷ তুর পাশে দাড়িয়ে হাসছে ৷ ওই হাসির মানে তিতিক্ষাকে তার মাকে ফিরিয়ে দিতে পেরে ৷ জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তিতিক্ষার বাবার দিকে তাঁকালাম ৷
সে শুধুই দুইদিকে মাথা নাড়ালো ৷

তিতিক্ষার দিকে তাঁকালাম, এমন একটা মুখের দিকে তাঁকিয়ে হাজার বছর পার করে দেওয়া যায় ৷ এই মেয়েকে ফেলে কি করে সুখী হবে অন্যের ঘরে তমা ? ওইটাকে কি ভালবাসা বলে? কি জানি, ভালবাসা অনেকরকম হয়ে, কেউ ভালবেসে বাবা মায়ের বাঁধন ছিড়ে যায় কেউ আবার ভালবাসার জন্য অপেক্ষা করে কাটিয়ে দেয় বহু বছর ৷ আবার অনেকে আছে, ভালবেসে বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে বিয়ে করে নেয় অারেকজনকে ৷ কেউ সুখী হয় ৷ কেউ মায়া কাটাতে না পেরে সব বাঁধন ছিড়ে পালিয়ে যায় ভালবাসার মানুষের হাত ধরে ৷ হায়রে ভালবাসা!! তবে একটা কথা মানতেই হবে ৷ কাউকে কষ্ট দিয়ে কখনো সুখী হওয়া যায় না ৷

 

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত