সেরা ঈদ

সেরা ঈদ

“মা মা আমি বাজারে যাচ্ছি” কথা’টা বলছে দশম শ্রেনীতে পড়া পিতৃহীন এক ছেলে রাজু। পাশ থেকে তার মা বললো- কেনো বাবা? মা দরকার আছে। কী দরকার? কাল তো ঈদ, তাই একটু বাজারে ঘুরে ফিরে আসি। আজ বাজারে অনেক ভিড় থাকবে,তর যাওয়ার দরকার নাই। আমি আসছি মা। বলেই দৌড় দিলো রাজু। কে শুনে কার কথা। রাজু তার আপন মনে বাজারে গেলো। তার মূল উদ্দেশ্য হলো তার মায়ের জন্য একটা শাড়ি কেনা। ৩ বছর হলো তার বাবা মারা গেছেন।

মা’কে সেই থেকে দেখছে বছরে মাত্র দুইটা শাড়ি পড়েন। একটা ভিজে গেলে আরেকটা শুকিয়ে পড়েন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে ছেলেকে লেখাপড়ার খরচ চালান। রাজু তার টিফিনের কিছু টাকা জমিয়ে এই ঈদে মায়ের জন্য শাড়ি কিনবে বলে মনোবাসনা করেছে। তারও খুব ইচ্ছে করে মা’কে ঈদের সময় একটা শাড়ি দিবে। তার বন্ধু-বান্ধবের সবার মা ঈদে নতুন শাড়ি পরে। ধীরে ধীরে সে বাজারে গেলো। কয়েক’টা দোকানে গেলো, কিন্তু ঈদের বাজার বলে কথা। মানুষজনের জন্য ভিতরে ঢুকতে পারছে না।

কোনো রকম জোরাজোরি করে একটা দোকানে ঢুকলো। তার মায়ের পছন্দ মতো একটা শাড়ি বের করলো দোকানদার’কে বলে। ভাই এই শাড়িটার দাম কতো। ২ হাজার টাকা। ভাই কিছু কম হয়না। এই যা বেটা। এখন ঝামেলা করিস না। এটা কোনো কম হবে না।একদাম দুই হাজার টাকা হলে নিতে পারবে। আর না হলে এখান থেকে যা। এখন ঝামেলা করিছ না। রাজু পকেটে হাত দিয়ে হতাশ হয়ে দোকান থেকে বের হয়ে এলো। আরো দুই-একটা দোকানে দেখলো কিন্তু টাকার পরিমাপের কাছে হেরে গিয়ে আর কিনতে পারেনি। মনে মনে চিন্তা করলো হয়তো আর মায়ের জন্য এই ঈদে শাড়ি কেনা হবে না। বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো। হঠাৎ একটা হকারের দোকানে দেখলো তার মায়ের পচন্দের শাড়ি। তার মায়ের পছন্দের শাড়ি সাদার মধ্যে নীল টেরাকোঁটা। এটাই তার মায়ের পছন্দের শাড়ি। রাজু প্রায়সময় দেখতো, তার বাবা তার মায়ের জন্য এরকম শাড়ি কিনতো। সে ধীরে পায়ে দোকানের কাছে গেলো। দোকানদার’কে বললো- চাচা এই শাড়িটা একটু দেখাবেন।

দোকানদার তার উদ্দেশ্য করে বললো- কোন শাড়িটা। এই যে সাদা শাড়ি নীচগুলো নীল। এই নাও বাবা। রাজু শাড়িটা দেখছে, আর ভাবছে। ইস্ যদি মাকে শাড়িটা উপহার দিতে পারতাম। মা কত্তো খুশি হতো। ভাবতে ভাবতে তার মুখে একটুকরো হাসির ঝলক চলে এলো। দোকানদার তা লক্ষ্য করছেন। চাচা এটার দাম কতো ? ৯০০ টাকা। চাচা একটু কম রাখা যায় না। না বাবা কম রাখা যায় না। রাজু তার পকেটে হাত দিয়ে টাকাগুলো দেখে আবার পকেটে রেখে দেয়। কারন তার টিফিনে জমানো টাকার পরিমাপ খুব সীমিত। তার পকেটে আছে মাত্র ৪২৭ টাকা। হয়তো মায়ের জন্য আর শাড়ি কেনা হবে না। রাজু চোখ মুচতে মুচতে এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য রয়না দিলো। দোকানদার রাজুর কাজগুলো লক্ষ্য করছেন। রাজুর যাওয়ার পথে দোকানদার রাজুকে ডাক দিলেন।

এই ছেলে এদিকে আসো। জ্বী চাচা, আমায় বলছেন ? হ্যাঁ তোমায় বলছি। জ্বী চাচা বলেন ? তুমি এই শাড়িটা কার জন্য কিনবে। আমার মায়ের জন্য। তোমার কাছে কত টাকা আছে। আমার কছে ৪২৭ টাকা আছে।যা আমি আমার মায়ের শাড়ি কেনার জন্য টিফিনের টাকা জমিয়ে রেখেছিলাম। কথাটা শুনার পর দোকানদার তার দোকানে বসে থাকা নিজের ছেলের দিকে তাকালেন। দোকানদারে স্ত্রী মারা গেছেন কিছুদিন আগে। হয়তো আজ উনার স্ত্রী বেঁচে থাকলে উনার ছেলেও এই কাজ করতে পারতো। উনি রাজুকে বললেন- তুমি আমাকে ৪০০ টাকা দিয়ে দাও, আমি তোমাকে শাড়িটা দিচ্ছি। কিন্তু চাচা। আপনি একটু আগে বললেন কম হবে না। আর এখন বলছেন ৪০০ টাকায় হবে। আপনার তো লস হয়ে যাবে।

বাবারে গরিব হয়ে জন্ম নিয়েছি, সারা জীবন কাজ করে যেতে হবে।সারাজীবন ব্যবসা করে লাভ করা যাবে। আজ না হয় তর কাছে একটা শাড়ি লস করে বিক্রি করলাম। যে ছেলে টিফিনের টাকা জমিয়ে মায়ের জন্য শাড়ি কিনতে পারে। সে কখনও তার মা’কে কষ্ট দিবে না। তুই একদিন অনেক বড় হবি বাবা। তখন না হয় আমায় বাকী টাকা দিয়ে দিস। নে বাবা এই তুই নিয়ে নে। আমি তোকে শাড়িটা ফ্রীতে দিতে পারতাম। কিন্তু সেটা দান হয়ে যেতো। তুই যেহেতু তর টাকা দিয়ে কিনতে চাস। তাই তর কাছ থেকে টাকা কম নিলাম। রাজুর আর কিছু না বলে দোকানদারের পায়ে সালাম করে শাড়ি নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রয়না দিলো। পৃথিবীর সকল সুখ তখন রাজুর কাছে এসে ধরা দিলো। এতদিনে তার মনের আশা পূরণ হবে। ভাবতেই কেমন জানি লাগে। নাচতে নাচতে শাড়ি নিয়ে বাড়ি চলে এলো। এসেই মা’কে ডাক দিলো। মা মা এদিকে আসে। কেনো কি হয়েছে? আরে আসো না। হুম বল কী হয়েছে।

রাজু পেকেট থেকে শাড়িটা বের করে মায়ের হাতে দিলো। শাড়িটা দেখেই রাজুর মা স্বর্গের সুখ পেলেন। কারন এটা তার পছন্দের একটা শাড়ি। অনেকদিন পর এমন শাড়ি। হঠাৎ তিনি বললেন- রাজু তুই শাড়িটা কোথায় ফেলি। আমি কিনেছি। তুই টাকা ফেলি কোথায়। আমি টিফিনের১ টাকা ২ টাকা জমিয়ে কিনেছি। কত টাকা জমিয়ে কিনলি। ৪২৭ টাকা। কিন্তু এই শাড়ি তো ৪২৭ টাকায় দিবে না। তখন রাজু পূর্বে দোকানদারের সাথে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনা বললো। কিন্তু রাজু, তুই আমার জন্য শাড়ি কিনতে গেলি কেনো। আমার তো শাড়ি আছে। মা আমি জানি তোমার কয়টা শাড়ি আছে। তুমি দুইটা শাড়ি দিয়ে একবছর পার করে দাও। আর আমার জন্য ৩ মাস পর পর কাপড় বানিয়ে দাও।

তাতে কি হয়েছে,তুই তো আমার সব। তুমি বুঝি আমার সব না। আমারও ইচ্ছা হয় মা, তোমাকে একটা শাড়ি কিনে দেই। হুমম বুঝলাম তর ইচ্ছা হয়। কিন্তু তুই তো এখন উপার্জন করিস না। তুই যখন উপার্জন করবি প্রতিবছর না হয় আমাকে দুইটা শাড়ি কিনে দিবি। তখন আমি দুইটা শাড়ি না। প্রতি মাসে দুইটা শাড়ি কিনে দিবো। আচ্ছা ঠিক আছে কিনে দিবে। কিন্তু এখন আনতে গেলি কেনো। আমার খুব ইচ্ছা ছিলো তোমাকে কোনো কিছু উপহার দিবো।  তুই তো আল্লাহের দেওয়া আমার কাছে শেষ্ট উপহার। তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল।

তুমি ছাড়াও যে আমার আর কেউ নেই মা। রাজুর মা রাজু’কে জড়িয়ে ধরে রাখলেন বুকে। যেন সেই ছোট্ট বেলার রাজু। রাজুও মাকে জড়িয়ে ধরলো। হঠাৎ রাজু লক্ষ্য করলো তার মায়ের চোখে জল- মা তুমি কান্না করছো কেনো। এটা আমার দুঃখের কান্না না রে বাবা। এটা আমার সুখের কান্না। বলেই রাজুকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। এটাই হয়তো রাজুর জীবনের শ্রেষ্ঠ ঈদ। পৃথিবীতে সবথেকে মধুর ভালবাসা মা আর সন্তানের।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত