টিচার থেকে আম্মু

টিচার থেকে আম্মু

শুক্রবার সকাল,তারপরেও রিয়াদ তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে সকালের নাস্তা তৈরি করে নিজে খেয়ে নিল এবং টেবিলে আর একজনের জন্য খাবার গুছিয়ে রেখে দিয়ে বাসা থেকে বেড় হতে যাবে তখনই

রুবাঃ কোথায় যাচ্ছ বাবা?

রিয়াদঃ এইতো মামনী একটু কাজ আছে, তোমার জন্য খাবার রেখে দিয়েছি টেবিলের উপরে। খেয়ে নিও।

রুবাঃ শুক্রবার দিনও তোমার এত কী কাজ?

রিয়াদঃ সামান্য একটা কাজ। আধা ঘন্টার মধ্যেই চলে আসবো।

রুবাঃ হুহ।

রিয়াদঃ আমার মামনীর অভিমান হয়েছে? রুবা রিয়াদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল।

রিয়াদঃ এত অভিমান মামনী কোথায় লুকিয়ে রেখেছে দেখি!!

রুবাঃ দেখাবো না।

রিয়াদঃ কেন?

রুবাঃ ফ্রীতে কিছুই দিব না।

রিয়াদঃ আচ্ছা? এর মূল্য কী মামনী?

রুবাঃ এত্তগুলা চকলেট।

রিয়াদঃ ( দুই হাত দুইদিকে বাড়িয়ে দিয়ে) এত্ত গুলা?

রুবাঃ হ্যা

রিয়াদঃ আচ্ছা নিয়ে আসবো। দেরী হয়ে যাচ্ছে। আমি তাড়াতাড়িই চলে আসবো। তুমি দরজা লক করে নিও কেমন?

রুবাঃ আচ্ছা বাবা।

এই হল রিয়াদ। স্মার্ট ছেলে। বয়স ২৮ ব্যাংকে চাকরী করে। রুবা তার একমাত্র মেয়ে। রিয়াদের স্ত্রী ডেলিভারির সময় মারা যায়।কিন্তু তাকে ফুটফুটে একটা মেয়ে দিয়ে যায়। রিয়াদের স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে সে আর বিয়ে করেনি। কারন তার ধারনা,যদি সে বিয়ে করেও নেয় তবে সেই স্ত্রী যে রুবার খেয়াল রাখবে তার নিশ্চয়তা নেই। আর রুবাকে ঘিরেই রিয়াদের সমস্ত পৃথিবী। চলতে চলতে রুবা ৮ বছরে পা দিয়েছে।২য় শ্রেণীর ছাত্রী। বয়সের তুলনায় সে বেশিই বুদ্ধিমতী। রিয়াদ নিজের বাইকটা নিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে বেড় হয়ে গেল। রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামের কারনে আটকে আছে। আর একটু চিন্তায়ও আছে। আধা ঘন্টার মধ্যেই সে বাসায় যাবে এমনটা রুবার কাছে বলে এসেছে। একজন দরিদ্র মানুষ এসে সবার কাছে টাকা চাইতে চাইতে এসে তার সামনে দাঁড়ালো। রিয়াদ ওয়াল্লেট থেকে ৫০০ টাকার নোট বেড় করে ভিখারির হাতে ধরিয়ে দিল।

ভিখারিঃ স্যার,খুচরা নেইতো…

রিয়াদঃ লাগবে না,নিয়ে যান।

ভিখারি খুশী হয়ে চলে গেল। ভিখারি যতটা না খুশী হয়েছে,তার থেকেও বেশি খুশী হয়েছে রিয়াদের পাশে থেমে থাকা বাসের এক মহিলা যাত্রী। সে রিয়াদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো জ্যাম কেটে যাওয়ার পরে রিয়াদ দ্রুত কাজ শেষ করে বাসায় ফিরল। বাসায় ফিরে কলিং বেল এ রিং করতে লাগলো। দরজা খুলে গেল। রিয়াদ একটু অবাক হলো, দরজা খুলে দিল অথচ কেউ নেই কেন? সে আস্তে আস্তে ঘরের ভিতরে ঢুকলো।  পিছন থেকে “ ভু…” রিয়াদ পিছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখলো রুবা। তারপর হেসে দিয়ে রুবাকে কোলে তুলে নিল।

রুবাঃ তুমি ভয় পাওনি বাবা?

রিয়াদঃ হ্যা পেয়েছিতো।

রুবাঃ (খুব খুশী হয়ে) বাবা আমার চকলেট?

রিয়াদঃ (মনে মনে) এই রে, চকলেট নিয়ে আসতে তো মনে ছিল না।

রুবাঃ কী হলো বাবা?

‘রিয়াদঃ চকলেট তো নিয়ে এসেছিলাম মামনী কিন্তু তোমার আম্মু উপর থেকে বললো যে চকলেট খেলে দাতে পোকা হয়।

রুবাঃ মিথ্যা কথা।

রিয়াদঃ তুমি জানো কীভাবে?

রুবাঃ কারন আম্মুতো নেই।

রিয়াদঃ কে বলেছে নেই? তোমার আম্মু সবসময় তোমার সাথে,আমার সাথে থাকে।

রুবাঃ তাহলে দেখতে পাই না কেন?

রিয়াদঃ (রিয়াদের কাছে উত্তর নেই তারপরেও) কারন তোমার আম্মু তোমার মধ্যে আর আমার মধ্যে থাকে।

রুবাঃ ওওও…

রিয়াদঃ তুমি খেয়েছ?

রুবাঃ হ্যা বাবা।

রিয়াদঃ চলো তাহলে আমরা এখন টিভি দেখবো।

রুবাঃচলো বাবা।

টিভি দেখতে দেখতে রিয়াদ সব কাজ করে নিল। দুপুর গড়িয়ে আসলো। দুজনে গোসল করে খেতে বসলো। খাওয়া শেষ হলে রুবাকে নিয়ে রিয়াদ ঘুমাতে গেল।কিছুক্ষন পরে রুবা ঘুমিয়ে গেল। রিয়াদ কোন প্রকারে শব্দ না করে রুম থেকে বেড়িয়ে আসলো। বাসা থেকে বেড়িয়ে কাছাকাছি একটা দোকান থেকে অনেক চকলেট কিনে নিয়ে আসলো। তারপর রুবার বালিশের পাশে রেখে দিল। সন্ধ্যার কিছুক্ষন আগে রিয়াদ নাস্তা রেডি করছিল। এর মধ্যেই রুবা দৌড়ে এসে রিয়াদকে জড়িয়ে ধরলো। রিয়াদ রুবাকে কোলে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো “কী হলো জননী?”

রুবাঃ তুমিই চকলেট এনেছ তাই না?

রিয়াদঃ মামনীর আবদার,না এনে উপায় ছিল?

রুবাঃ (রিয়াদের গালে চুমু খেল)

রিয়াদঃ ( রুবার গালে চুমু খেয়ে) তুমি গিয়ে পড়তে বস, আমি আসছি।

রুবাঃ আচ্ছা বাবা। রাত্রে পড়া শেষ করে বাবা-মেয়ে রাত্রের খাবার খেয়ে নিল। প্রতিদিনের মতই রিয়াদ ও রুবা ছাদে গেল।

রুবাঃ বাবা, আম্মু কোথায়?

রিয়াদঃ ঐ যে,আকাশে তারা দেখতে পাচ্ছ? ওখানেই তোমার আম্মু আছে।

রুবাঃ কিন্তু এতগুলো তারার মধ্য থেকে আমি আম্মুকে খুজবো কীভাবে?

রিয়াদঃ সবচেয়ে বড় ও উজ্জ্বল যে তারাটা দেখতে পাবে সেটাই তোমার আম্মু।

রুবাঃ আম্মু কি আমাদের দেখতে পায়?

রিয়াদঃ হুম পায় তো। আচ্ছা মামনী, কালকে স্কুল আছে,ঘুমাতে হবে না?

রুবাঃ হুম বাবা।

রিয়াদঃ তাহলে আম্মুকে Good night বল।

রুবাঃ ( আকাশের দিকে তাকিয়ে ) Good night আম্মু।

রিয়াদ ও রুবা ঘুমাতে গেল। সকালে রিয়াদ নাস্তা রেডি করে রুবাকে স্কুলের সামনে পৌছে দিয়ে অফিসে চলে গেল।
রিয়াদের অফিস এবং রুবার স্কুল একই সময় ছুটি হয়।আসার সময় রুবাকে নিয়ে এক সাথে বাসায় ফেরে তারা। প্রতিদিনের মত রুবাকে নিয়ে রিয়াদ খেতে বসলো।

রুবাঃ বাবা জানো? আমাদের আগের যে ক্লাস টিচার ছিলেন তিনি এই স্কুল থেকে বদলি হয়ে অন্য স্কুলে গিয়েছেন।

রিয়াদঃ তাই?

রুবাঃ হুম,আর তার বদলে নতুন একজন টিচার জয়েন করেছেন যিনি আমাদের এখন ক্লাস টিচার।

রিয়াদঃ তাহলে তো ভালই হলো।নতুন টিচারের সঙ্গে পরিচিত হওয়া গেল।

রুবাঃ আগামীকালকে প্যারেন্টস মিটিং, তোমাকে যেতে হবে।

রিয়াদঃ আচ্ছা যাব।

পরের দিন রিয়াদ অফিস থেকে ছুটি নেয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু তার ছুটি হয়নি।তাই সে মিটিং এ ও উপস্থিত হতে পারলো না।অফিস ছুটি হলে রুবাকে নিতে স্কুলের দিকে গেল। দূর থেকে দেখতে পেল রুবার সাথে আরেকজন মানবী দাঁড়িয়ে আছে। রুবার সামনে গিয়ে থামা মাত্রই রুবা মুখ ঘুড়িয়ে নিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রইলো।

রিয়াদঃ মামনী,অফিস থেকে ছুটি দেয়নি তাই আসতে পারিনি।

রুবাঃ আগের বারও তুমি প্যারেন্টস মিটিং এ আসোনি।হুহ

রিয়াদঃ আচ্ছা কান ধরছি,ভুল হয়েছে।এরপরের বার আসবই।

রুবাঃ promise?

রিয়াদঃ promise

রুবাঃ আর বাবা,তোমাকে আমাদের নতুন ক্লাস টিচারের কথা বলেছিলাম না? (পাশে থাকা মানবীর দিকে ফিরে) এই আমাদের নতুন ক্লাস টিচার।

রিয়াদঃ good afternoon

ক্লাস টিচারঃ good afternoon.. আমি নুপুর। আপনি?

রিয়াদঃ রিয়াদ, ব্যাংক এ জব করি।

নুপুরঃ আপনি প্যারেন্টস মিটিং এ জব এর কারনে আসতে পারেননি কিন্তু রুবার আম্মুকে তো পাঠিয়ে দিতে পারতেন।

রিয়াদঃ ওর আম্মু নেই…

নুপুরঃ ওহ সরি।

রিয়াদঃ কোন ব্যাপার না। ( রুবার দিকে তাকিয়ে) টিচারকে bye বল।

রুবাঃ bye টিচার।

নুপুরঃ bye…

নুপুরের একটু খারাপ লাগছে তাছাড়া একটু অবাকও ।রুবার মত মিষ্টি একটা মেয়ের আম্মু নেই এই ব্যাপারটা ভেবে খারাপ লাগছে। আর অবাক লাগছে এই জন্য যে সেদিন বাসে করে এখানে আসার সময় যে লোকটিকে একজন ভিখারিকে ৫০০ টাকার নোট দিতে দেখেছিল সে রুবার বাবা। তখন লোকটিকে দেখে নুপুরের মনে হয়নি যে তার ৮ বছরের একটা ফুটফুটে বাচ্চা থাকতে পারে। রুবার সাথে রিয়াদের সময় খুব সুন্দর ভাবেই কেটে যায়। আজকেও এর বিপরীত কিছু ঘটেনি। প্রতিদিনের মতই সব চলতে লাগলো। পরের দিন রিয়াদ অফিসে আর রুবা স্কুলে। রুবার স্কুলে টিফিনের সময় দিল। রুবা ক্লাস থেকে বেড় হওয়ার সময় নুপুর ডাক দিল “রুবা”

রুবাঃ জি টিচার

নুপুরঃ তুমি টিফিনের জন্য কিছু নিয়ে এসেছ?

রুবাঃ জি টিচার

নুপুরঃ ওটা রেখে দাও। তুমি আমার সাথে চলো। আজকে তুমি আর আমি একসাথে টিফিন করবো।
রুবা নিজের টিফিন রেখে নুপুরের সাথে টিফিন করতে চলে গেল। দুইজন একসাথে টিফিন করছে। এক সাথে বলতে রুবাকে নুপুর খাইয়ে দিচ্ছে।

রুবাঃ জানেন টিচার? আমি আমার আম্মুকে কখনও দেখিনি। যখনই বাবাকে আম্মুর কথা বলি তখনই বাবা আকাশের সবচেয়ে বড় তারাটি দেখিয়ে বলে যে ওখানে আমার আম্মু আছে।

নুপুরঃ আছেইতো। তোমার দাদা-দাদী বেড়াতে আসেন না?

রুবাঃ তারাও আম্মুর কাছে চলে গেছেন।

নুপুরঃ নানা-নানী?

রুবাঃ তাদের কথা বাবাকে অনেক বারই জিজ্ঞেস করেছি।কিন্তু বাবা কিছুই বলেন না।

নুপুরঃ কেন?

রুবাঃ বাবাকে নাকি তারা পছন্দ করেন না।

নুপুরঃ তুমি তোমার নানু বাড়ি কখনও বেড়াতে যাওনি?

রুবাঃ না । বাবাকে নিয়ে যেতে বলি কিন্তু বাবা বলেন যে নানু বাড়ি গেলে তারা রাগ করবেন।

নুপুরঃ রাগ করবেন কেন? তারাতো তোমাকে আরও বেশি আদর করবেন।

রুবাঃ বাবা নিয়ে যেতে চান না।

নুপুরঃ আচ্ছা,আমি তোমার বাবাকে বলবো। নাও,খাবার শেষ করে নাও।টিফিনের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ার পরে রুবাকে তার বাবা নিতে আসলো। আজকেও নুপুরের সাথে রুবা দাঁড়িয়ে আছে।
রিয়াদ রুবার সামনে বাইক থামিয়ে,চলো মামনী।

রুবাঃ বাবা,টিচার প্রতিদিন আমাকে নিয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকেন। তুমি তাকে thanks জানাও না কেন?

রিয়াদঃ ভুল হয়েছে মামনী।আর কখনও হবে না। (নুপুরের দিকে তাকিয়ে) ধন্যবাদ।

নুপুরঃ Its ok, রুবাকে কখনও বেড়াতে নিয়ে যেতে পারেনতো।

রিয়াদঃ প্রত্যেক শুক্রবারই ওকে নিয়ে ঘুরতে যাই,শুধু এই শুক্রবার যাওয়া হয়নি।

নুপুরঃ পার্কে,মেলায় ইত্যাদি যায়গায় ঘুরতে নিয়ে গেলেই যে ও খুশী হবে এমনতো নয়। মাঝে মাঝে relatives দের বাড়িতেই বেড়াতে যেতে হয়।

রিয়াদঃ আসলে…

রুবাঃ বাবা, টিচার প্রত্যেকদিন আমার সাথে দাঁড়িয়ে থেকে বাস মিস করেন। আজকে আমরা টিচারকে তার বাসায় পৌছে দেই?

নুপুরঃ নাহ নাহ আমি চলে যেতে পারবো।

রুবাঃ না টিচার চলুন না।

রিয়াদঃ উঠে বসুন।

রুবা এবং নুপুর উঠে বসলো। নুপুরকে তার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিল।

নুপুরঃ ভিতরে আসুন না।

রিয়াদঃ ধন্যবাদ। অন্য কোন দিন।

রুবাঃ bye টিচার।

নুপুরঃ bye আম্মু। রিয়াদ ও রুবা বাসায় ফেরার পথে

রুবাঃ জানো বাবা? আজকে টিচার আমাকে খাইয়ে দিয়েছেন,আমার জন্য তিনি টিফিন নিয়ে এসেছিলেন।

রিয়াদঃ তাই???

রুবাঃ হুম!! আর টিচারের রান্না অনেক ইয়াম্মি!!!

রিয়াদঃ তাই বলে টিচারকে দিয়ে প্রতিদিন টিফিন আনিও না।

রুবাঃ আমিতো নিয়ে আসতে বলিনি।টিচার নিজেই নিয়ে আসছেন।

রিয়াদঃ নিজেই?

রুবাঃ হুম!

রাত্রে রুবা তার বাবার কাছ থেকে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লো। রিয়াদের ফোন বেজে উঠলো। একটা আননোন নাম্বার থেকে কল এসেছে। সে ফোন রিসিভ করলো…
রিয়াদঃ হ্যালো…

 

ওপাশ থেকেঃ জি আমি রুবার ক্লাস টিচার,নুপুর।

রিয়াদঃ ওহ হ্যা বলুন

 

নুপুরঃ রুবা কি ঘুমিয়ে পড়েছে?

রিয়াদঃ হ্যা,কেন?

নুপুরঃ না এমনি,আপনারা খেয়েছেন?

রিয়াদঃ হ্যা আপনি?

নুপুরঃ হুম, একটা কথা বলবো কিছু মনে করবেন নাতো?

রিয়াদঃ নাহ বলুন

নুপুরঃ কালকে স্কুল ছুটির পরে রুবাকে কি আমার বাসায় নিয়ে আসতে পারি?

রিয়াদঃ কেন?

নুপুরঃ কেন মানে? বেড়াতে নিয়ে আসবো।তাছাড়া রুবাও বাসায় একা একা কাটায় আর আমিও। দুজনে একসাথে

সময়টা কেটে যাবে।

রিয়াদঃ ওহ আচ্ছা।

নুপুরঃ আর আপনিও আপনার বাইরের কাজ-বাজ শেষ করে এসে রুবাকে নিয়ে যাবেন।

রিয়াদঃ ঠিক আছে।

নুপুরঃ thanks,good night.

রিয়াদঃ good night…

পরের দিন রুবাকে তার টিচার নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল। রুবা আর তার টিচার দিনটা প্রায় আনন্দেই কাটিয়ে দিয়েছে।

রুবাঃ টিচার

নুপুরঃ আম্মু,তুমি আমাকে সবসময় টিচার বলে ডাকো কেন? আন্টি বলে ডাকবে।

রুবাঃ আচ্ছা টিচার। সরি আন্টি।

নুপুরঃ হুম এবার বলো

রুবাঃ আপনি তো এখানে ভাড়া বাড়ি থাকেন তাই না?

নুপুরঃ হুম কেন?

রুবাঃ আমাদের পাশের বাড়িতেও তো বাড়ি ভাড়া দেয়া হয়।আপনি ঐ বাড়িতে চলুন না।

নুপুরঃ ঐ বাড়িতে গেলে কী হবে?

রুবাঃ তাহলে আমি আপনার কাছে সবসময় আসতে পারবো। দরজায় কেউ নক করছে।

নুপুরঃ আম্মু,১ মিনিট,তুমি বসো আমি আসছি।

রুবাঃ আচ্ছা নুপুর দরজা খুলে রিয়াদকে দেখতে পেল।

নুপুরঃ আপনি,আসুন আসুন ভিতরে আসুন।

রিয়াদঃ নাহ ঠিক আছে। রুবা কোথায়?

নুপুরঃ রুবা ভিতরে আছে।আপনি আসুন। রিয়াদ ভিতরে ঢুকলো।

নুপুরঃ আপনি বসুন আমি আসছি। রিয়াদ বসলো।

রুবাঃ বাবা

রিয়াদঃ মামনী,বাড়ি ফিরতে হবে না?

রুবাঃ যাব তো।

রিয়াদঃ তাহলে চলো

নুপুরঃ আগেরদিন কিছু না খেয়েই চলে গিয়েছিলেন। আজকে কিছুতো খেয়ে যেতে হবে।

রিয়াদঃ আরে আপনি আবার এসব…

নুপুরঃ নিন। আমি একটু আসছি।

রিয়াদঃআচ্ছা নুপুর ভিতরের রুমের দিকে গেল।

রিয়াদঃ (রুবার দিকে তাকিয়ে) হা করো মামনী।

রুবাঃ বাবা আমার পেট ভরে গেছে। আন্টি সেই তখন থেকে খাইয়েই এসেছেন।

রিয়াদঃ টিচার থেকে আন্টি???

রুবাঃ হুম

রিয়াদঃ আচ্ছা মামনী,আমার কথা তোমার একবারও মনে পরেনি?

রুবাঃ নাহ

রিয়াদঃ সত্যিই????

রুবাঃ হ্যা…

রিয়াদঃ দুইদিনেই আন্টির সাথে মিশে আমাকে ভুলে গেলে?

রুবাঃ ভুলে যাইনি তো। আন্টির সাথে থাকতে অনেক ভাল লাগে।বাবা,আমি কি আন্টির বাসায় প্রতিদিন বেড়াতে আসতে পারি?

রিয়াদঃ প্রতিদিন আসলে আন্টির কষ্ট হয়ে যাবে।

নুপুরঃ একদমই কষ্ট হবে না।এমন একটা মিষ্টি মেয়ের সাথে থাকতে কীসের কষ্ট?

রিয়াদঃ আপনিও তো কাজ করেন। কাজ করে অনেক ক্লান্ত হয়ে যাবেন তারউপরে আবার রুবা…

নুপুরঃ নাহ কিছু হবে না। বরং ওর সাথে খুব ভাল লাগে।

রিয়াদঃ আচ্ছা আজ তাহলে আসি। (রুবাকে উদ্দেশ্য করে) চলো মামনী।

রুবাঃ bye আন্টি।

নুপুরঃ bye আম্মু।

এরপর থেকে স্কুল ছুটি হলে রুবা নুপুরের সাথে তার বাড়িতে যেত।আর সন্ধ্যার সময় রিয়াদ তাকে নিয়ে আসতো। রুবা স্কুলে যাবে তাই রিয়াদ তাকে রেডি করে দিয়েছে। রুবাকে রেডি করে দিয়ে রিয়াদ রেডি হতে গেছে। রুবা বসে আছে। দরজায় নক দেয়ার শ্বব্দ শুনে রুবা দরজা খুলে দেয়। দরজা খুলে দেখতে পেল নুপুর দাঁড়িয়ে আছে।

রুবাঃ আন্টি তুমি!!!!!

নুপুরঃ হ্যা আম্মু আমি।তোমার বাবা কোথায়?

রুবাঃ বাবা রেডি হচ্ছেন,কিন্তু তুমি এত সকালে কীভাবে?

নুপুরঃ আমার আম্মু একটা আবদার করেছিল,না রেখে পারতাম কীভাবে?

রুবাঃ কী আবদার?

নুপুরঃ মনে কর দেখ

রুবাঃ উম!! তুমি পাশের বাসাতে বাসা ভাড়া নিয়ে এসেছ!!!!?

নুপুরঃ বাহ! আমার আম্মুটা তো অনেক বুদ্ধিমান!

রিয়াদঃ(হাটতে হাটতে এসে) মামনী! মামনী! (নুপুর কে দেখে) আরে আপনি,এত সকালে?!!

নুপুরঃ আপনাদের পাশের বাসাতে এসেছি…

রিয়াদঃ ওয়াও,অনেক ভাল খবর!!!

নুপুরঃ কেন?

রিয়াদঃ না মানে,রুবা আপনার সাথে ভালভাবেই সময় কাটাতে পারবে।

নুপুরঃ হ্যা তাতো

রিয়াদঃ আপনি স্কুলে যাবেন না?

নুপুরঃ হুম, তাইতো মামনীকে নিতে এসেছি।

রিয়াদঃ ওহ,আপনারা দুজনে একসাথে যাবেন?

নুপুরঃ হুম,চাইলে আপনিও আমাদের সাথে যেতে পারেন

রুবাঃ না না আন্টি,বাবা একা চলে যেতে পারবেন,তুমি আর আমি চলো।

রিয়াদঃ হা হা হা,হ্যা আপনারা যান,আমি আসছি।

রুবাঃ আন্টি চলো নুপুর আর রুবা চলে গেল স্কুলের দিকে এবং রিয়াদ চলে গেল অফিসে। একদিন বিকালে রুবা নুপুরের সাথে নুপুরের ঘরে খেলা করছে। নুপুর ও রুবা হাসাহাসি করছে। তখন রিয়াদ এসে,”এহেম! আসতে পারি?”

নুপুরঃ ওহ আপনি!!? আসুন আসুন,অনুমতি নেয়ার কী আছে?

রিয়াদঃ নাহ,মা ও মেয়ের মাঝে অনুমতি না নিয়ে ঢোকা কি ঠিক হবে?

নুপুরঃ তাও ঠিক

রিয়াদঃ হা হা হা

নুপুরঃ কী নিবেন? চা না কফি?

রিয়াদঃ না ঠিক আছে

নুপুরঃ আমার বাসায় আপনি কখনও কিছু খেতে চাননা কেন?

রিয়াদঃ সবসময়ই তো খাই

নুপুরঃ কোথায় সবসময়? কালকে আসছিলেন তখন খেয়েছেন,তারপরে আর খেয়েছেন?

রিয়াদঃ (চোখ কপালে তুলে) নাহ খাইনি। যান নিয়ে আসেন।

নুপুরঃ (খুশী হয়ে) আপনি বসুন,আমি আসছি…

রিয়াদঃ হুম

রুবাঃ আন্টি আমিও আসছি

নুপুরঃ না আম্মু,তুমি বাবার কাছে বস।

রুবাঃ বাবার কাছে তো সারা রাতই থাকি

নুপুরঃ তাও এখনও থাকবে, এমনিতেও সকাল বেলা বাবা তোমাকে রেখে যান আর তারপর ঘুমানোর সময় ছাড়া আর কাছে পান না।

রিয়াদঃ আচ্ছা সমস্যা নাই। আমার মামনীর খুশিতেই আমি খুশী।

রুবাঃ Thank you বাবা।

রিয়াদঃ হুম মামনী।

রাত্র বেলা,রিয়াদের পাশে রুবার নিষ্পাপ মুখটা ঘুমিয়ে আছে আর রিয়াদ তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে ভাবছে যে মা হারা হয়ে তার মামনী কতটাই না কষ্টে আছে। মায়ের একটু আদরের জন্য সে কতটা তৃষ্ণার্ত। কথাটা ভেবে রিয়াদের মন কেদে উঠলো। তার অজান্তেই চোখ থেকে জল গড়িয়ে পরলো। রুবার দিকে মায়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর মনে মনে তার স্ত্রীর কাছে প্রশ্ন করলো,”কেন তুমি আমার মামনীকে একা রেখে চলে গেলে? দেখো,প্রতিটাদিন সে কীরকম কাটাচ্ছে!? সে যখন অন্য বাচ্চাদের মায়েদের আদর করতে দেখে তখন সে এক অপলক দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।সেও চায় যে তার আম্মু তার জন্য অপেক্ষা করুক যে কখন তার স্কুল ছুটি হবে আর তার আম্মু তাকে হাত ধরে বাসায় নিয়ে যাবে। জানো? আগে সে যতটা একাকীত্ব অনুভব করতো এখন আর ততটা করে না।কারন সে নতুন একজন সাথী পেয়েছে। আর সেই সাথী মামনীকে খুব ভালবাসে। শুধু সে একা নয়, তোমার মামনীও তাকে খুব ভালবাসে। মনে হয় আমার থেকেও বেশি তার সাথে সময় কাটাতে চায়। এখন আমি সবসময়ই রুবার হাসি মুখটা দেখতে পাই।“ এসব বলতে বলতে রিয়াদের ফোন বেজে উঠলো। নুপুর কল দিয়েছে। রিসিভ করে,

রিয়াদঃ হ্যালো

নুপুরঃ এত রাতে ডিস্টার্ব করার জন্য সরি। আম্মু কি ঘুমিয়ে পরেছে?

রিয়াদঃ কোন ব্যাপার না। হুম মামনী ঘুমাচ্ছে।

নুপুরঃ একটা কথা জিজ্ঞেস করার জন্য কল করেছিলাম।

রিয়াদঃ হ্যা বলুন

নুপুরঃ আম্মুর জন্ম তারিখটা বলবেন?

রিয়াদঃ ১৮ই আগস্ট

নুপুরঃ oww,great!

রিয়াদঃ কেন?

নুপুরঃ নাহ এমনি,ঘুমিয়ে পরুন।কালকে তো আপনার অফিস আছে।শুভ রাত্রি।

রিয়াদঃ শুভ রাত্রি।

সকালে আবারও যে যার কাজে চলে গেল। বৃহঃ বার বলে রুবা এবং নুপুর আগেই বাসায় চলে আসলো। রিয়াদও অফিস থেকে ফিরলো। দরজা আনলক করতে যাবে তখন মনে পরলো যে রুবার তো একটু শরীর খারাপ ছিল।অবশ্য চিন্তার কিছু নেই। সেতো নুপুরের কাছেই আছে। তারপরও জিজ্ঞেস করার জন্য নুপুরের বাসায় গেল।
রিয়াদকে দেখতে পেয়ে,

নুপুরঃ আসুন ভিতরে আসুন

রিয়াদঃ নাহ ঠিক আছে, রুবা কেমন আছে? সকালে তো ওর শরীর একটু খারাপ ছিল।

নুপুরঃ এখন একদম ঠিক আছে।

রিয়াদঃ আচ্ছা ।তাহলে পরে আসবো।

নুপুরঃ আরে পরে কেন? অফিস থেকে আসছেন। এখন আপনি অনেক ক্লান্ত। এখন কষ্ট করে রান্না করা,গোছগাছ করা অনেক ঝামেলা। তার থেকে আপনি আমার বাসায় খেয়ে যান।

রিয়াদঃ সমস্যা নেই। আমার কষ্ট হবে না।

নুপুরঃ টিচারের কথা না শুনলে তারা কিন্তু পানিশমেন্ট দিতে জানে।

রিয়াদঃ আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে।

নুপুরঃ (হাসলো) ফ্রেশ হয়ে আসুন।

রিয়াদঃ ওয়াশরুম কোনদিকে?

নুপুরঃ এইদিকে রিয়াদ ফ্রেশ হতে চলে গেল।ফ্রেশ হয়ে এসে খেতে বসলো। রিয়াদ খাবার মুখে দিয়ে বুঝতে পারলো যে আসলেই তার মামনী ঠিক কথা বলেছে। অনেক ভাল করে রান্না করতে জানে।রিয়াদ অনুভব করছে,এই খাবারের স্বাদ অন্য কারও হাতে রান্না করা খাবারের সাথে মিল রয়েছে । সে বুঝতে পারলো যে ঝুমুরের (রিয়াদের স্ত্রী) হাতে রান্না করা খাবারের সাথে মিল রয়েছে।

রিয়াদঃ আপনি এই খাবার রান্না করা কার কাছে শিখেছেন?

নুপুরঃ আমার আম্মুর কাছে।

রিয়াদঃ ওহ,আন্টিতো তাহলে অনেক ভাল রান্না করতে জানে।

নুপুরঃ আপনার খাবার পছন্দ হয়েছে?

রিয়াদঃ হুম।

নুপুরঃ ধন্যবাদ।

রিয়াদঃ ধন্যবাদ তো আমার দেয়ার কথা।

নুপুরঃ কেন?

রিয়াদঃ এমনি…অনেক খেয়েছি।আর পারবো না।

নুপুরঃ এইটুকুই তো খেয়েছেন, আরও খেয়েনিন।

রিয়াদঃ সত্যিই আর পারবো না।

নুপুরঃ হুম…আচ্ছা হাত ধুয়ে নিন।

রিয়াদঃ হুম।

রিয়াদঃআচ্ছা আমি বাসায় যাচ্ছি। অনেক কিছুই গোছাতে হবে।

নুপুরঃ হুম রিয়াদ বাসায় গিয়ে দরজা খুলে সব দেখে অবাক হয়ে গেল। সবকিছু এতো সুন্দর ভাবে গুছিয়ে রেখেছে। সে সবদিকে হেটে আসলো আর দেখলো যে সবকিছুই গুছিয়ে রেখেছে যেমনটা ঝুমুর গুছিয়ে রাখতো। সবকিছু দেখে নিয়ে রিয়াদ বিশ্রাম নিতে গেল।

এইদিকে নুপুর খাবার রুম গুছিয়ে রাখতে গিয়ে টেবিলের উপরে একটা ওয়াল্লেট দেখতে পেল। রিয়াদের হবে ভেবে সে ওয়াল্লেটটা একটা ভাল জায়গায় রাখতে যাবে তখনই ওয়াল্লেটের মধ্য থেকে একটা কিছু পরলো। সে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলো একটা ছবি। নিচু হয়ে ছবিটা তুললো। ছবিটা দেখে নুপুর কিছুক্ষণ নিস্তব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ছবিটা আর কারও নয়,ঝুমুরের। ঝুমুর এবং রিয়াদের এক সাথে নেয়া একটা ছবি। নুপুর রিয়াদের বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল কিন্তু রুবার কথা মনে পরলো। রুবা কোথায়? নুপুর নিজের রুমে গিয়ে দেখলো রুবা ঘুমিয়ে আছে। তাই সে রিয়াদের বাসায় চলে গেল। দরজায় নক করলো,কেউ দরজা খুলছে না। তাই নুপুর কল দিল। রিয়াদের ফোন বেজে উঠলো। রিয়াদের ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে দেখলো ফোন বাজছে। ফোন তুলে দেখলো নুপুর।

রিয়াদঃ হ্যালো?

নুপুরঃ আপনি কোথায় আছেন?

রিয়াদঃ বাসায় কেন?

নুপুরঃ দরজা আনলক করুন।

রিয়াদঃ আচ্ছা রিয়াদ এসে দরজা খুললো।

নুপুরঃ (ছবিটা রিয়াদের সামনে তুলে ধরলো) আপনার সাথে কী সম্পর্ক?

রিয়াদঃ (কিছুক্ষণ চুপ রইলো) রুবার আম্মু।

নুপুরঃ কিন্তু আমি তো জানি যে আপুর বিয়েই হয়নি…

রিয়াদঃ আপু??

নুপুরঃ হ্যা আমার আপু। আপু আমার কাছে বাবা-মায়ের থেকেও বেশি ছিল।কিন্তু একদিন বাবার কাছে কল দিয়ে যখন আপুর কথা জিজ্ঞেস করলাম যে আপু কোথায় তখন তিনি বললেন যে আপু নাকি রোড এক্সিডেন্টে (কাঁদতে শুরু করলো)বাইরের দেশে ছিলাম বলে আমার আপুকে শেষ বারের মতও দেখতে পারিনি।

রিয়াদঃ আপনার আপুর রোড এক্সিডেন্ট হয়নি। আপনার বাবা আপনাকে সত্যিটা বলেনি। রিয়াদের এরূপ কথা শুনে নুপুর রাগ করে নিজের বাসায় চলে গেল। রিয়াদও মন খারাপ করে দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে রইলো। পরের দিন সকালে,

রিয়াদঃ মামনী চলো

রুবাঃকিন্তু বাবা আমিতো আন্টির সাথে যাই…

রিয়াদঃ আজকে মনে হয় তোমার আন্টি আসবেন না।

রুবাঃ কেন বাবা?

রিয়াদঃ তোমার আন্টি রাগ করেছেন।

রুবাঃ কেন? রিয়াদের পিছনে নুপুর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এতক্ষন সব শুনছিল।

নুপুরঃ কারন তোমার বাবা একটা Stupid. আম্মু চলো।

রুবাঃ বাবা,আমার আন্টি আমার উপরে কখনই রাগ করে থাকতে পারেন না।বুঝলে তুমি?

রিয়াদঃ জি জননী বুঝলাম।

নুপুরঃ আমার আম্মুটা অনেক বুদ্ধিমতী। তোমার বাবাও যদি এতটা বুদ্ধিমান হতো!

রিয়াদঃ ধন্যবাদ।

নুপুরঃ হুহ… চলো আম্মু।

রুবাঃ চলো আন্টি। রিয়াদের ফোন বাজছে। এতো কাজের চাপের মধ্যে সে ফোন তুলতে পারছে না। ৩ বারের বার ফোনটা তুললো।

রিয়াদঃ হ্যা বলুন

নুপুরঃ আজকে আপনি একটু তাড়াতাড়ি আসবেন। আজকে তো আমার আর রুবার হাফ ডে ছিল তাই আমরা তাড়াতাড়ি চলে আসছি।আপনিও আসার চেষ্টা করুন।

রিয়াদঃ কিন্তু কেন?

নুপুরঃ আজকে রুবার বার্থডে!!!!!!!!!!!!!!!!!!

রিয়াদঃ ওহ হ্যা, না! ওহ শিট। আমি আসছি।

নুপুরঃ হুম। আম্মুর জন্য গিফট নিয়ে আসবেন।

রিয়াদঃ তাতো আনবোই। রিয়াদ অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বড় দেখে একটা গিফট নিয়ে গেল। সন্ধ্যার সময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। অনুষ্ঠান শেষে,

নুপুরঃ আজকে রুবা আমার কাছেই থাক?

রিয়াদঃ আচ্ছা।

নুপুরঃ আর শুনুন, কালকে তো শুক্রবার। একটু সকাল সকাল উঠবেন। রুবাকে আর আপনাকে নিয়ে ঘুরতে যাব।

রিয়াদঃ রুবাকে নিয়ে যান না।আমার কি যাওয়ার দরকার আছে?

নুপুরঃ হ্যা দরকার আছে বলেই বলছি।

রিয়াদঃ আচ্ছা দেখি।

নুপুরঃ দেখি না!!!! যেতেই হবে।

রিয়াদঃ আচ্ছা

নুপুরঃ শুভ রাত্রি

রিয়াদঃ আপনাকেও।

রিয়াদ রেডি হয়ে গিয়ে নুপুরের বাসায় অপেক্ষা করছে। আর নিজে নিজেই বলছে,মেয়েদের এই আরেকটা সমস্যা। মঙ্গল গ্রহে গিয়েও আরেকটা জাতি সৃষ্টি করে পৃথিবীতে এসে যদি জিজ্ঞেস করা হয় আর কতক্ষন লাগবে?? তখনও বলবে আর ৫ মিনিট। এর মধ্যে রুবা আসলো। রিয়াদ তার দিকে তাকিয়ে আছে,তাকে একদম পরির মতই লাগছে।

রিয়াদঃ মামনী,এই ড্রেসটা কোথায় পেলে?

রুবাঃ আন্টি কিনে দিয়েছেন।

রিয়াদঃ wow! তোমার আন্টির পছন্দ আছে দেখছি।

রুবাঃ আমার আন্টি বলে কথা।

রিয়াদঃ হুম। ৩ জনে একসাথে ঘুরতে বেড় হইলো। নুপুর যেদিকটাতে নিয়ে যাচ্ছে ,রিয়াদের জায়গাটা চেনা চেনা লাগছে।

রিয়াদঃআমরা কোথায় যাচ্ছি?

নুপুরঃ গেলেই দেখতে পাবেন। তারা একটা বাড়ির সামনে এসে থামলো।

রিয়াদঃ আমরা কোথায় এসেছি?

নুপুরঃ আমাদের বাড়িতে।

রিয়াদঃ মানে?

নুপুরঃ মানে আপনার শ্বশুর বাড়ি…

রিয়াদঃ কেন?????????

রুবাঃ তারমানে আমার নানু বাড়ি?

নুপুরঃ হ্যা আম্মু।

রুবাঃ আমার নানা-নানীকে দেখতে পাবো?

নুপুরঃ হ্যা

রিয়াদঃ আপনি আর রুবা যান,আমি যাব না।

নুপুরঃ কেন?

রিয়াদঃ তারা হয়তো আমাকে সহ্য করতে পারবেন না।

নুপুরঃ আমি বলছি তো চলেন। আর তারা যখন জানতে পারবে যে তাদের এইরকম ফুটফুটে এক নাতনি আছে,তখন আর কিছু বলবেন না।

রিয়াদঃ তাহলে আগেই মেনে নিতেন।

নুপুরঃ এত কথা না বলে আপনি চলুন তো! রিয়াদের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। ভিতরে ঢুকে,

নুপুরঃ মা!!??

মাঃ কে??

নুপুরঃ আমি!!!

মাঃ ওমা নুপুর??? দাঁড়া মা আমি আসছি। নুপুরের মা তাদের কাছে আসতে আসতে,

মাঃ না বলেই চলে (রিয়াদকে দেখে থেমে গেলেন)

নুপুরঃ মা,এই হলো রিয়াদ। আর (রুবাকে সামনে নিয়ে এসে) এই হলো রুবা। তোমার একমাত্র নাতনি।

মাঃ (খুশিতে) বাবা তুমি এসেছ! বসো বসো। দাঁড়িয়ে আছো কেন? বসোনা। আর আমার আপু!! তুমি আমার কাছে এসো। রুবা তার নানীর দিকে এগিয়ে গেল। আর তার নানীকে জড়িয়ে ধরলো। তার নানী কেঁদে দিল।

নুপুরঃ মা! এই প্রথমবার ও ওর নানু বাড়ি এসেছে, আর তুমি এভাবে কাঁদছো?

মাঃ ওহ হ্যা তাইতো। আর কাঁদব না। আপু, তুমি আমার সাথে এসো। আর নুপুর তুই রিয়াদকে ফ্রেশ হতে নিয়ে যা।

নুপুরঃ হ্যা মা। রিয়াদ চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার কাছে অবিশ্বাস্ব মনে হচ্ছে।

নুপুরঃ বলেছিলাম না?

রিয়াদঃ আমি ভাবতেও পারিনি যে তিনি এতটা খুশী হবেন।

নুপুরঃ হুম।বাবা এর থেকেও বেশি খুশী হবেন। এখন চলুন ফ্রেশ হয়ে আসবেন। ফ্রেশ হয়ে তারা সবাই খেতে বসলো।

রিয়াদঃ বাবা আসবেন না?

রুবাঃ কীহলো নানী-আপু? নানু আসবেন না?

মাঃ আসবেন তো। বিকালে আসবেন। এখন তো অফিসে আছেন তোমার নানু।

রিয়াদঃ ওহ

মাঃ তোমরা খেয়ে নাও। তার সাথে রাত্রে একসাথে খাবে।

রিয়াদঃ আপনিও বসুন না। একসাথেই খাব।

রুবাঃ হ্যা নানি-আপু।বসো না! আমি তোমাকে খাইয়ে দিব??

মাঃ উলে আমার আপুরে!!! আসো,আমিই তোমাকে খাইয়ে দিচ্ছি।

রিয়াদঃ (নুপুরের দিকে তাকিয়ে) আপনিও বসুন না?

নুপুরঃ হুম। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দিনটা খুশিতেই কাটালো! অনেক হাসি-ঠাট্টা, রুবার দুষ্টমীর মধ্যেই দিনটা পার হয়ে গেল। বিকালে নুপুরের বাবা আসলো।  রিয়াদ আর রুবা বাহির থেকে এসে যখন বাসায় ঢুকলো তখন তাদেরকে দেখে নুপুরের বাবা অনেক রাগারাগি করলেন।

বাবাঃ তুমি??? তুমি এই বাড়িতে কোন সাহসে ঢুকেছ?এই বাড়িতে আসার অনুমতি তোমাকে কে দিয়েছে??? বেড়িয়ে যাও!!!!!!

রিয়াদঃ কিন্তু বাবা…

বাবাঃ কে তোমার বাবা? তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক আছে? তোমার ওই মুখে বাবা ডাক মানায় না। আমাকে আর রাগিও না।এখনই বেড়িয়ে যাও। রিয়াদ একবার নুপুরের মায়ের দিকে তাকালো। নুপুরের মা কান্না করছেন। তার দিকে তাকিয়ে রিয়াদ একটু হাসলো। রুবার দৌড়ে তার নানুর কাছে গেল।

রুবাঃ নানু

বাবাঃ বলো

রুবাঃ তুমি অনেক লম্বা, একটু নীচু হবে? নুপুরের বাবা ইতস্তত করে নীচু হলো। রুবা তার চশমাটা ঠিক করে পরিয়ে দিল এবং গালে চুমু খেল।

রুবাঃ বুড়ো হয়ে গিয়েছ এখনও ঠিকমত চশমাই পরতে জানো না??? এভাবে পরবে।আসি নানু। রুবার ব্যবহারে নুপুরের বাবার একটু মায়া হলো।কিন্তু রাগের কারনে সেই মায়াটাও চাপা পরে গেল। রিয়াদ ও রুবা তাদের বাড়িতে ফিরে আসলো। রিয়াদের পাশে রুবা শুয়ে আছে।

রিয়াদঃ মামনী?

রুবাঃ জি বাবা

রিয়াদঃ সবথেকে বাজে বার্থডে ছিল তাই না?

রুবাঃ না বাবা। সবথেকে ভাল বার্থডে ছিল। আজকে আমি আমার নানীকে আর নানুকে দেখতে পেয়েছি।আমি অনেক অনেক হ্যাপি। আর নানুকে রাগ করতে দেখে আরও বেশি ভাল লাগছে। রাগ করলে নানুকে একদম বোকার মত লাগে, আর আমার তো হাসি পাচ্ছিল।

রিয়াদঃ হা হা হা। আচ্ছা ঘুমিয়ে পরো।কালকে স্কুল আছে আর বাবার অফিস আছে।

রুবাঃ হুম। সকালে রিয়াদের ঘুম ভাঙলো ফোন রিং হওয়ার শব্দে।

রিয়াদঃ হ্যালো…

নুপুরঃ সরি

রিয়াদঃ কেন?

নুপুরঃ আপনি যেতে চাননি তারপরেও নিয়ে গেলাম আর তারপর বাবার ওইরকম ব্যবহার।

রিয়াদঃ নাহ না। তার ওই ব্যবহারের মধ্যেও ভালবাসা রয়েছে। তিনি যে আমাকে নিয়ে কথা বলেছেন এইটাই অনেক।

নুপুরঃ হুম হয়েছে। এবার উঠুন, রেডি হয়ে নিন। আর রুবাকেও ঘুম থেকে উঠিয়ে দিন।আমি সেই কখন থেকে রেডি হয়ে বসে আছি।

রিয়াদঃ সে কি!!!! আপনি বাড়ি থেকে চলে এসেছেন?

নুপুরঃ হ্যা,আম্মুকে ছাড়া ভাল লাগছিল না।

রিয়াদঃ এতদিন পরে বাড়ি ফিরেছিলেন। মা কত খুশী হয়েছিলেন।

নুপুরঃ তিনি আমার জন্য না,রুবার জন্য খুশী ছিলেন। তাই আমি কালকে রাত্রেই চলে আসছি।

রিয়াদঃ তারপরেও…

নুপুরঃ আপনি এত বক বক করেন কেন? উঠুন!! দেরী হয়ে যাবে।

রিয়াদঃ হুম। সবাই রেডি হয়ে বাসা থেকে বেড় হবে এমন সময় কেউ একজন বললো,”দাড়াও!!” তারা তাকিয়ে দেখলো নুপুরের বাবা-মা।

বাবাঃ নুপুর,রুবাকে নিয়ে তোমার বাসায় যাও।

নুপুরঃ কেন বাবা?

বাবাঃ যেতে বলেছি যাও। নুপুর আর রুবা চলে গেল।

বাবাঃ (রিয়াদের দিকে তাকিয়ে) তুমি আমার বড় মেয়েকে ভালবাসতে,তাকে বিয়ে করেছিলে। তখন আমাদের সাথে তোমার সম্পর্ক ছিল ।আর আজ আমার মেয়ে নেই,তাই তোমার সাথে সম্পর্কও নেই। তাই আজ আমি এক কঠিন সিদ্ধান্তে পৌছেছি।

রিয়াদঃ কী কঠিন সিদ্ধান্ত?

বাবাঃ আমার নাতনিকে আমার কাছে ফিরিয়ে নিব।

রিয়াদঃ ফিরিয়ে নেয়ার কী আছে বাবা? সেতো আপনারই।

বাবাঃ আমি তোমাকে এখনও বাবা ডাকার অধিকার দেইনি। আর সে আমার না,কারন আমাদের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই।তাই সম্পর্ক গড়তে এসেছি।

রিয়াদঃ মানে?

বাবাঃ (গম্ভীর ভাবে) আমার ছোট মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিতে এসেছি।

রিয়াদঃ কিন্তু…

মাঃ কোন কিন্তু নয় বাবা। দেখো,আমাদের রুবারও তো আম্মু নেই। সে একজন আম্মুও পেয়ে যাবে। তাছাড়া নুপুরের অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে গেলে তখন আর রুবা তার সাথে এভাবে মিশতে পারবে না।একজন আরেকজনকে ছাড়া থাকতে পারবে না। এই দেখো না, রুবা ছিল না বলে নুপুর কালকে রাত্রেই বাসা থেকে চলে এসেছে। তার থেকে তুমি রাজি হয়ে যাও বাবা।

বাবাঃ রাজি হলে আমাকে বাবা ডাকার অধিকার পাবে।

রিয়াদঃ আমাকে একটু সময় দিন।

বাবাঃ কোন সময় দিতে পারবো না।এখনই সিদ্ধান্ত নাও।

মাঃ রাজি হয়ে যাও বাবা।

রিয়াদঃ আমি নাহয় রাজি হলাম কিন্তু নুপুরের মতামতেরও দরকার আছে।

নুপুরঃ আমি রাজি……

বাবাঃ তোমাদের যেতে বলেছিলাম না?

নুপুরঃ আমার মতামতের প্রয়োজন ছিল তো।

রিয়াদঃ তাহলে আপনারা যা মনে করেন তাই হবে বাবা।

রুবাঃ নানু

বাবাঃ বলেন বুড়ি

রুবাঃ আমি বুড়ি না। তুমি বুড়ো!!! নুপুরের বাবা ইচ্ছা করেই চশমাটা একটু অন্যরকম পরেছিল।

রুবাঃ একি!!? সেদিন না চশমা পরতে শিখিয়ে দিয়েছিলাম? (চশমা ঠিক করে দিয়ে) এভাবে পরতে হয়। এরপর থেকে ঠিকভাবে পরবে তো?

বাবাঃ (রুবার নাক টেনে) পাকা বুড়ি একটা!!! তুমি আছোতো ঠিকভাবে পরিয়ে দেয়ার জন্য।আমাকে কেন পরতে হবে?

রুবাঃ আমিতো সবসময় তোমার সাথে থাকবো না তাই।

বাবাঃ কে বলছে থাকবে না? এরপর থেকে স্কুলে যাওয়া,তোমাকে নিয়ে আসা, দুইজনে একসাথে বাজার করা।সব করবো।

রুবাঃতাই???জানো নানু, আন্টি প্রথমে আমার টিচার ছিলেন আর তারপর টিচার থেকে আন্টি।

বাবাঃহা হা হা,আর এখন টিচার থেকে আম্মু।

রুবাঃ সত্যি???

বাবাঃ তিন সত্যি।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত