অতঃপর ভালবাসি

অতঃপর ভালবাসি

আমার যখন বিয়ে হয়েছিল তখন আমার বয়স ছিলো মাত্র ১৮। আর আমার স্বামীর বয়স ছিল ৩৬ বছর; অর্থাৎ, আমার বয়সের দ্বিগুণ। এ বিয়েতে আমার একদমই মত ছিলো না। কিন্তু বাবার মুখের উপর কথা বলারও সাহস ছিলো না। তাই বাধ্য হয়ে বিয়েতে মত দিয়েছিলাম। আমার সহজ সরল মা-কে সেই প্রথম দেখেছিলাম বাবার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে। কিন্তু তাও কিছুই আটকায় নি। মা কাঁদত আর বলত, “আমার ফুটফুটে মেয়েটার কপালে এরকম অসম বয়সী স্বামী জুটলো, ওই লোক তো আমার মেয়ের স্বাদ আহ্লাদ কিছুই পূরণ করতে পারবে না। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে যা হয় সাধারনত, কোনো ভালো ঘর থেকে বিয়ের প্রস্তাব এলে অভিভাবকরা তড়িঘড়ি করে সেখানে বিয়ে দেওয়ার জন্য উতলা হয়ে যান। আমার বাবাও তেমনটাই করেছিলেন।

বিয়ের দিন বান্ধবীরা আমাকে সাজিয়ে দিতে এসে আমার ভবিষ্যত নিয়ে আফসোস করছিলো আর আমি বাবার উপর ক্ষোভ নিয়ে কাঁদছিলাম। ওরা বলেছিলো, “তুই পালিয়ে যা, আমরা সাহায্য করব। তোর জায়গায় আমরা হলে এ বিয়ে করতাম না কখনোই।”আমিও পালানোর কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু আমার কোনো প্রেমিকও ছিলো না যাকে নিয়ে পালানো যেতে পারে। বাসর ঘরে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলাম আসন্ন সময়ের কথা ভেবে। ভেবেই নিয়েছিলাম যে উনি এসেই আমার উপর ঝাপিয়ে পড়বে নিজের পুরুষত্ব ফলাতে। কিছুক্ষণ পর দরজা আটকানোর শব্দে বুঝতে পারলাম উনি এসেছেন। নিজেকে মানসিকভাবে শক্ত করলাম সব মেনে নিতে।

কিন্তু উনি আমাকে সম্পূর্ণ চমকে দিয়ে দূরে দাড়িয়েই সালাম দিলেন। আমি এতটাই অবাক হয়েছিলাম যে সালামের উত্তর দিতেই ভুলে গিয়েছিলাম। উনি হয়তো আমার অবস্থা বুঝতে পেরেই একটু মুচকি হাসলেন, তারপর বললেন, “কেউ সালাম দিলে সেটার উত্তর দিতে হয়।”আমি লজ্জিত হয়ে একটু হেসে সালামের উত্তর দিলাম। উনি আমাকে বললেন, “পুরুষদের জন্য আল্লাহ্-র পক্ষ থেকে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ, আকর্ষণীয় আর আনন্দদায়ক পুরষ্কার হলো তার স্ত্রী। আর আজকে আমি সেটা পেয়ে গেছি। তাই শুকরিয়া আদায় করে নফল নামাজ পড়ব এখন। তুমি কি নামাজে আমার সঙ্গী হবে?” যদিও আমার এমন কোনো পরিকল্পনা ছিলো না, তবুও কেন যেন মন সায় দিলো আর আমিও রাজি হয়ে গেলাম। নামাজ পড়ার পর বুঝতে পারলাম উনার প্রতি আমার বিদ্বেষী মনোভাবটা বেশ কমে গেছে।

সেদিন পুরো রাত আমরা গল্প করেই কাটিয়েছিলাম। অনেক কিছুই জেনেছিলাম উনার ব্যাপারে। বাবা মা মারা যাওয়ার পর সংসারের বড় আর একমাত্র ছেলে হিসেবে উনার উপরই দায়িত্ব বর্তায় ছোট বোনদের বড় করার। নিজের পড়াশুনা স্থগিত রেখে ওদের পড়াশুনা করিয়েছেন। কোথাও কোনো কাজ খুঁজে না পেয়ে ছোটখাট ব্যবসার উদ্যেগ নিয়েছিলেন। তারপর একসময় ব্যবসায় নিজের একটা পোক্ত অবস্থান করে নিয়েছিলেন। ততদিনে বোনরাও বিয়ের উপযুক্ত হয়ে গিয়েছিল। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কখন যে নিজের বিয়ের বয়সটাই পেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে সেটা আর খেয়ালই করেন নি।

তারপর ছোট বোনরাই উদ্যেগ নিয়ে ভাইয়ের জন্য মেয়ে খুঁজতে লাগলেন। উনি বলেছিলেন , “ধুর, আমার কি আর এখন বিয়ের বয়স আছে,এভাবেই থাকি সমস্যা কি?” কিন্তু বোনরা কেউ উনার বারন শোনে নি। তাদের কথা ছিলো ভাই আমাদের জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করেছে। সুতরাং আমাদেরও তো একটা দায়িত্ব আছে। সবসময় পাশে থাকার জন্য কাউকে তো লাগবেই।”এরপর তো এই বিয়ে সবকিছু শুনে উনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গিয়েছিলো। তাও মনের মধ্য একটু খুঁতখুঁতে ভাব রয়েই গিয়েছিল। বিয়ের কিছুদিন পর সব আত্মীয়স্বজনরা চলে গিয়েছিল। তখন বাসায় ছিলাম শুধু আমরা দুজন। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে দেখি উনি ঘর গুছিয়ে রাখার কাজ করছে। আমি অবাক হয়ে বললাম, “আমি থাকতে আপনি এসব করছেন কেন? এগুলো তো মেয়েদের কাজ।”উনি ভ্রূ কুঁচকে বললেন, ” এগুলি মেয়েদের কাজ এটা কে বললো? যেখানে আমাদের নবীজি (সঃ) নিজ হাতে ঘরের কাজকর্ম করতেন, সেখানে আমি কেন পারব না করতে?”
উনার কথা শুনে আমি আর কিছু বললাম না।

কিছুক্ষন চুপ থেকে উনি বললেন, “আমরা বোনরা যখন ছোট ছিলো তখন ঘর গুছিয়ে রাখা, রান্নাবান্না করা এসব আমিই করতাম। তাই অভ্যাস আছে।”তারপর একটু হেসে বললেন, “তোমার যদি কাজ করতে ইচ্ছা হয়ে থাকে, তাহলে চট করে দু কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসো।”আমি কিছু না বলে হাসিমুখে চলে গেলাম রান্নাঘরে। চা খেতে খেতে উনি বললেন, “এখন থেকে তো আমি ব্যবসার কাজেই ব্যস্ত থাকবো বেশিরভাগ সময়। তোমার একা একা ভয় লাগবে না তো? তুমি তো আবার পিচ্চি একটা মেয়ে” বলেই হেসে ফেললেন। আমি পিচ্চি নই এটা বুঝানোর জন্য মিথ্যা করে বললাম, “সমস্যা নেই, আমি ভীতু নই এতটাও।” কিন্তু মনে মনে ঠিকই ভয় পাচ্ছিলাম।উনি বললেন, “আচ্ছা, বই পড়ো তুমি?”আমি বললাম, “হ্যা, খুব ভালো লাগে বই পড়তে। বই পেলে তো আমার আর কিছুই লাগে না।”

সেদিন রাতে উনি বাসায় ফিরলেন একটা মোটা বই হাতে। আমি তো দারুণ খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম বইটার নাম “ছহীহ্ বোখারী শরীফ”, তখন আমার মন খারাপ হয়ে গেলো। আমি ভেবেছিলাম কোনো রোমান্টিক উপন্যাস সমগ্র হয়তো। উনি আমার মুখ দেখে বুঝতে পারলেন যে, আমি খুশি হই নি। রাতে খেতে বসে উনি আমাকে বললেন, “আমি জানি তুমি এমন বই আশা করো নি, তবে আমার অনুরোধ তুমি একবার পড়া শুরু করে দেখো। যদি ভালো না লাগে তাহলে আর পড়তে হবে না এটা।”এরপর দিন উনি কাজে যাওয়ার পর আমি বইটা পড়া শুরু করলাম অনিচ্ছা আর বিরক্তি নিয়ে। কিন্তু অদ্ভূত ব্যাপার হলো পড়া শুরু করার কিছুক্ষণ পর আমি ওই বইতেই বুদ হয়ে গেলাম। পুরোটা পড়ার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠলাম। কিভাবে যেন সময় ফুড়িয়ে যেত আর আমিও অনেক দরকারি বিষয়ে জ্ঞানলাভ করতে পারলাম।

এরপর উনার কাছ থেকে এরকম আরো বই উপহার পেয়েছিলাম। তার মধ্যে “উম্মুল মু’মিনীন”, “জান্নাতি দশ রমণী” বিশেষ উল্লেখযোগ্য।যত সময় যেতে লাগলো ততই আমি আমার স্বামীর প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ছিলাম। এখন আর উনার প্রতি আমার বিদ্বেষী মনোভাবটা নেই। বরং আছে শ্রদ্ধা, ভালোলাগা। আমার বান্ধবীরা, প্রতিবেশিরা, আত্মীয়রা আমাদের দুজনকে নিয়ে আফসোস করে, আবার টিটকারিও দেয়। কিন্তু আমি সেসবকে পাত্তা দেই না। বিয়ে তো আল্লাহ্-ই ঠিক করেছেন। কিসে আমাদের ভালো হবে এ বিষয়ে আমরা নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌-র চেয়ে অধিক জ্ঞানী নই।

এরই মধ্যে আমার এক বিবাহিত বান্ধবীর সাথে ফোনে কথা হওয়ার সময় ও জানালো যে, ওর স্বামী ওকে প্রায় সবসময় রোমান্টিক কথা বলে, আদর করে বিভিন্ন নামে ডাকে। এসব শুনে আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেল। কই উনি তো কখনো আমাকে রোমান্টিক কিছু বলেন নি। অবশ্য আমি নিজেও কখনো বলিনি। উনি আমাকে প্রায় সবসময় ‘পিচ্চি’ বলে ডাকেন। এটা কি কোনো আদরের ডাক হলো?! সেদিন রাতে উনি বাসায় ফিরে আমার মুখ দেখে কি বুঝলেন কে জানে। খেতে বসে আমাকে বললেন, “হা কর।” কি আশ্চর্য! উনি তুই করে বলায় আমার একটুও রাগ হলো না! বরং অদ্ভূত ভালোলাগায় মন ছেয়ে গেলো। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিন উনি আমাকে খাইয়ে দিতেন। তবে ‘তুই’ করে বলতেন হুটহাট করে। আমার খুব ভালো লাগত ওই ডাকটা।

হঠাৎ একদিন আরেক বান্ধবীর থেকে জানলাম আমার সেই বিবাহিত বান্ধবীর স্বামীর নাকি অবৈধ সম্পর্ক আছে কোনো এক বিবাহিত মহিলার সাথে। আমার স্বামী আমাকে কখনো রোমান্টিক কথা বলে নি, অশ্লীল কৌতুক বলে নিজে বিকৃত আনন্দও নেয় নি। তবে মাঝে মাঝে কৌতুকপূর্ণ কথা বলে, যা শালীন এবং আমাদের দুজনের জন্যই আনন্দদায়ক। রাতে ঘুমানোর সময় উনি নিজেই আমার মাথাটা উনার বুকে টেনে নিয়ে চুলে বিলি কেটে ঘুম পারিয়ে দেয়। তখন আমার নিজেকে মনে হয় সবচেয়ে সুখী কারন উনার বুকে মাথা রাখার অধিকার একমাত্র আমারই আছে। এ অধিকার আমি কখনো কারো সাথে ভাগ করতে পারব না। দেখতে দেখতে আমাদের বিয়ের আড়াই-টা বছর কেটে গেছে। যদিও আমি এখনো সেই ‘আপনি’ ডাকেই আবদ্ধ আছি, কিন্তু আমাদের সংসারে ভালবাসার কমতি নেই। অবশ্য আমরা এখনো কেউ কাউকে ‘ভালবাসি’ কথাটা বলি নি।

আজ আমি শাড়ি, কাজল পরে সেজেছি আমার স্বামীর জন্য। এখন শুধু উনার জন্য অপেক্ষা করার পালা উনি এসেছেন বুঝতে পেরে আমি দরজা খুললাম। ভিতরে পা রাখা মাত্রই এই প্রথম আমি নিজে থেকে উনাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “একসময় আপনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা এই আমি আপনাকে খুব বেশি ভালবেসে ফেলেছি।” তারপর উনার একটা হাত নিয়ে রাখলাম আমার পেটে। উনি প্রথমে ভীষণ চমকে গেলেন। তারপর আমার কপালে একটা চুমু খেয়ে দুহাতে আমার গাল ধরে বললেন, “আমার পিচ্চি বউটার থেকে এত বড় উপহার পেয়ে আমি সত্যিই ভীষণ খুশি।”এরপর আমাকে জড়িয়ে ধরলেন শক্ত করে। একটু পর টের পেলাম আমার কাধ আর পিঠ ভিজে যাচ্ছে উনার চোখের পানিতে। ততক্ষণে আমার চোখেও পানি চলে এসেছে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত