নেহা

নেহা

ঘুমানোর আগে মোবাইল সাইলেন্ট করতে ভুলে গেছিলাম।রাত প্রায় তিনটা বাজে, একটানা তিন টা মেসেজের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। পুরোপুরি ভাঙ্গেনি, যতটুকু ভেঙ্গেছে তাতে ঘুমের বারোটা বেজে গেছে। এখন বিশ মিনিট চেষ্টা করেও ভালোভাবে ঘুম আসবেনা।

একরাশ বিরক্তি নিয়ে চোখ খুলে বালিশের পাশ থেকে মোবাইলটা নিলাম। ঘুম ঘুম চোখে লক খুললাম। এত রাতে আবার কে মেসেজ দিলো! মেসেজ ওপেন করে প্রথম মেসেজটা দেখলাম লেখা, “জরুরি মুহৃর্তে মিনিট লোন পেতে ডায়াল *123*##*1#” মনে মনে বললাম, শালা আমাকে ভিখারি মনে হয়? লোন নিয়ে কথা বলবো কোন দুঃখে? বলবোটাই বা কার সাথে? দ্বিতীয় মেসেজটাও রবি অফিস থেকে এসেছে। মনে মনে দুই তিনটা গালি দিয়ে তৃতীয় মেসেজের দিকে তাকালাম। তৃতীয় মেসেজের দিকে চোখ যেতেই চোখে অবশিষ্ট যা ঘুম ছিলো সব উড়ে গেলো। শোয়া থেকে উঠে বসে পড়লাম। নেহা এত রাতে মেসেজ দিয়েছে? আমাকে মেসেজ দিয়েছে? এত রাতে আজেবাজে স্বপ্ন দেখতেছি না তো আবার? মেসেজটাতে ক্লিক করে ওপেন করলাম, “গুড নাইট” লেখা। তোমার নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে এটা দেখেই আমার নাইট গুড হয়ে গেছে। গুড নাইটের যায়গায় যদি কোনো গালি দিতা নাইট গুড’ই হতো। লক্ষ্য করলাম আমি কাঁপতেছি। খুশিতে? পরে মনে পড়লো এখন শীতকাল আর আমি খালি গায়ে খাটের উপর মুখে মাছি ঢোকার মত বড় হা করে বসে আছি।

সকালে আবার ঘুম ভাঙ্গলো মোবাইলের ডাকে। চোখ বন্ধ রেখেই বালিশের পাশ থেকে মোবাইল নিয়ে রিসিভ করলাম। ওই পাশ থেকে একটা মেয়েলি যান্ত্রিক কন্ঠ বলে যাচ্ছে “আসসালামু আলাইকুম আমি রবি কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস থেকে রিয়া মজুমদার বলছি” তারপর তাহসান এর একলা হতে চাই, মিনারের আমি যাবো চলে গানের দুই লাইন করে বাজলো, গান শেষে যান্ত্রিক কন্ঠটা আবার বলা শুরু করলো “এমন আরো জনপ্রিয় গান আপনার গুনগুন হিসেবে সেট করতে এক চাপুন” আমি ঘুম ঘুম চোখে এতক্ষণ ধৈর্য সহকারে সবটা শুনলাম। রাতে নেহার মেসেজ পেয়ে এমনিতে মন খুব ভালো আছে।

কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে তোমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ কি? আমি চোখ বন্ধ করে কোনো কিছু না ভেবেই বলে দিবো ঘুমানো। সাধের ঘুম নষ্ট করাতে ওইসব মন ভালো হওয়া ভুলে গিয়ে বলা শুরু করলাম “ঘরে বাপ ভাই নাই? অন্য একজন মেয়ের হবু জামাইকে এভাবে সকাল সকাল ডিস্টার্ব করেন কেন? লজ্জা শরম কিছু নাই…” আমার কথা শেষ না হতেই ওই পাশ থেকে বলল “আপনাকে বিরক্ত করার জন্য খুবই দুঃখিত স্যার, আপনার নাম্বারে গুনগুন সেট করতে 8080 তে কল দিয়ে…” ততক্ষণে আমার হুশ ফিরেছে। কন্ঠটা যান্ত্রিক না। ওইপাশ থেকে কেউ একজন আমার সাথে! আমার সাথে কথা বলতেছে। রাতের মত আবারো শোয়া থেকে উঠে বসে পড়লাম। চোখ থেকে ঘুম উড়ে হাওয়া হয়ে গেলো। নিজেকে কোনরকম সামলে নিয়ে বললাম “আমার একটা হেল্প লাগবে” মেয়েটা বলল “জ্বী বলুন স্যার” জীবনের প্রথমবার মনে হলো আমাকে কেউ এত সম্মান দিতেছে। তারউপর সে আবার মেয়ে। শেষবার সুমি স্যার বলে ডেকেছিলো। আমার স্টুডেন্ট। মাসে পনেরো’শ টাকা বেতনে প্রাইভেট পড়াই। এলাকার ছোট ভাই গুলাও আজকাল সালাম দেওয়া ভালো খারাপ জিজ্ঞেস করা দুরে থাক সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দেখেও না দেখার ভান করে চলে যায়। এদিকে হেল্প লাগবে বলেও বিপদে পড়ে গেলাম। এখন কি হেল্প এর কথা বলি? কিছু একটা তো বলতে হবেই। যা মনে পড়তেছে সব লজিক বিহীন। অনেক ভেবে বললাম,

– বিদেশে কথা বলার জন্য কোনো অফার আছে?

– দুঃখিত স্যার, আমি শুধুমাত্র গুনগুন সেট করার ক্ষেত্রে হেল্প করতে পারবো। তবে এক্ষত্রে আপনার ফোন যদি স্মার্টফোন হয় তাহলে ডাটা প্যাক কিনে ইন্টারনেট এর মাধ্যমে বিভিন্ন এপস ব্যবহার করে কথা বলতে পারেন।
– কি কি এপ্স ইউজ করা যাবে??

মেয়েটা একটু চুপ থেকে বলল, “ইমু, হোয়াট্সএপ…
এভাবে প্রায় সাতাশ মিনিট কথা বলার মনে পড়লো আমি মেয়েটার নাম ভুলে গেছি, জিজ্ঞেস করলাম “আপনার নামটা কি যেন?” মেয়েটা বলল,

– আমি রবি কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস থেকে রিয়া মজুমদার বলছি।
– আপনার পারসোনাল নাম্বার পাওয়া যাবে? মানে আরো অনেক সমস্যা আছে এখন মনে পড়তেছে না, পরে যখন মনে পরবে তখন কল দিয়ে জেনে নিবো।
মেয়েটা বলল,

– দুঃখিত স্যার, পারসোনাল কোনো কিছু শেয়ার করতে নিষেধ আছে।
আমি মন খারাপ করে অবশেষে বত্রিশ মিনিট সতেরো সেকেন্ড কথা বলে বিদায় নিলাম। আর শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করলো না। শোয়া থেকে উঠে ব্রাশ নিয়ে বাথরুমে চলে গেলাম।

ফ্রেস হয়ে এসে মোবাইলের লক খুলে দেখলাম মেসেজ বক্সের উপর 2 উঠে আছে। মানে ২টা মেসেজ এসেছে। কে মেসেজ দিয়েছে এখন আবার? ওপেন করে দেখলাম প্রথম মেসেজটা একটা আননোন নাম্বার থেকে এসেছে, ওই মেসেজের উপর ক্লিক করে দেখলাম লেখা “মানুষ এত কথা বলে কিভাবে? কম কথা বলবেন আয়ু বাড়বে। জ্ঞানী মানুষ রা বেশি কথা বলতে পছন্দ করেনা। আর হ্যা, আমি বিবাহিত (রিয়া মজুমদার)”। কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস এর মেয়েটার মেসেজ। মেয়েটা কি তাহলে আমার উদ্দেশ্য বুঝে ফেলেছে? বুঝে ফেলার’ই কথা। কোনো সুস্থ্য স্বাভাবিক মানুষ কাস্টমার কেয়ার সার্ভিসে শুধু শুধু বত্রিশ মিনিট সতেরো সেকেন্ড কথা বলে না। সিম কোম্পানি থেকে কল আসলেই মানুষ এড়িয়ে যেতে চায়। এদিকে মেসেজটা পড়ার পর মনে হচ্ছে মনটা ভেঙ্গে তিন টুকরা হয়ে গেছে। বিয়ে করার আগে মনে ছিলো না আমার মত কোনো একটা ছেলের সাথে তার কথা হতে পারে। খামোখা আমার ইমোশন নিয়ে খেললো!

রিয়া মজুমদারের মেসেজ থেকে বেরিয়ে এসে পরের মেসেজের দিকে তাকিয়ে দেখি নেহার নাম্বার। নেহা আবার মেসেজ দিয়েছে কেন? পটে গেলো নাকি? ভাঙ্গা তিন টুকরা মন আবার জোড়া লাগালাম। খুশি খুশি মনে মেসেজটা ওপেন করার পর দেখলাম লেখা “সরি তানভীর, রাতে সোহান কে মেসেজ পাঠাতে গিয়ে ভুলে তোমার কাছে চলে গেছে ,কিছু মনে করোনা”। মেসেজটা পড়ার পর শুধু একটা কথা’ই মনে পড়লো, এই জীবনটা আমার সিঙ্গেল থেকেই কেটে যাবে। একসাথে দুই দুইটা ছেকা খেয়েছি, ভাবা যায়?

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত