প্রাক্তন

প্রাক্তন

গতকাল রাতে নেশার পরিমান বোধহয় একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিল। এখন সন্ধ্যা হয় হয় অবস্থা, গতকাল রাতের ঘোর এখনো কাটেনি। মাথাটা কেমন যেন হালকা হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে এখনি বুঝি বেলুনের মত উড়ে যাবে। উড়ে গিয়ে কোন সুঁচালো কিছুর সাথে লেগে ঠুস করে ফেটে যাবে।

আমি হয়তো এখন বিছানায় পড়ে থাকতাম, কিন্তু আমার মা জননী তা হতে দেননি। আমার গায়ে ফ্রীজের পানি ঢেলে দিয়ে আমার ঘুম ভাঙ্গালেন। গত একসপ্তাহ ধরে আমি শীতের ভয়ে গোসল করা থেকে বিরত থেকেছিলাম। তাই মা জননী আজ জোর করে ধরে আমায় ঘষে মেজে তকতকে করে দিয়েছে।

আয়নায় আজকে নিজেকে দেখে কেমন যেন নায়ক নায়ক মনে হচ্ছিল। তাই চিন্তা করলাম একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। সেই জন্যই এখন আমি এলোপাতাড়ি এলাকার অলিগলি হেঁটে বেড়াচ্ছি। খুব ভাল লাগছে হাঁটতে। ঘোরলাগা চোখে চারপাশের সবকিছুই মাতালের মত দুলতে দেখছি। অন্যরকম একটা অনুভূতি।

চারদিক অাস্তে আস্তে অন্ধকারের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। শেষ বিকেলের রক্তিম আভা ফুরিয়ে এসেছে। জানান দিচ্ছে যে তার যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। রক্তিম আভার পরিবর্তে এখন ধীরে ধীরে রাজত্ব শুরু করবে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। আমি নিশাচর, অন্ধকার আমার কাছে আশির্বাদ আর আলো আমার কাছে অপ্রয়োজনীয় পদার্থ।

একটা গলি পার হয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ খুবই নিচু কিন্তু তীক্ষ্ন কন্ঠস্বর আমার কানে ভেসে এলো। একটা মেয়ের কন্ঠ, তার কন্ঠে কেমন যেন এক অাকুতির ভাব। এই নিচু এবং তীক্ষ্ণ কন্ঠের বিপরীতে হঠাৎ একটু কেমন যেন খসখসে আর ধারালো কন্ঠ জেগে উঠলো। মিহি এবং মোটা কন্ঠের অধিকারীদের মধ্যে কথপোকথন হচ্ছে আর আমি গলির মাথায় দাঁড়িয়ে শুনছি।

— ভাইয়া প্লীজ আমাদের বাসায় যেতে দিন। বিশ্বাস করুন আমরা খারাপ কিছু করছিলাম না। আমি জাষ্ট একটু রাগ করেছিলাম। তাই ও আমার রাগ ভাঙানোর জন্যই! ( মিহি কন্ঠ)

— রাগ ভাঙানোর জন্য চিপায় নিয়ে আসছে? বাহ বাহ নতুন থিউরি শিখলাম। এই তোদের গার্লফ্র্যান্ড এখন থেকে রাগ করলে তাদের চিপায় নিয়ে যাবি রাগ ভাঙানোর জন্য। দেখবি রাগ গলে পানি হয়ে নেমে আসবে। ( মোটা কন্ঠ)
মোটা কন্ঠের অধিকারী নিশ্চয়ই তার আশেপাশে বেশ কয়েকজন অনুচর নিয়ে এক প্রেমিক যুগলকে বেষ্টন করে দাঁড়িয়ে আছে। অাবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে একটা মেয়ে আর একটা ছেলে মানববৃত্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কৌতুহলবশত গলির মাথায় দাঁড়িয়ে রইলাম আরো কিছু কথা শোনার জন্য। আমি নিরাশ হয়নি।

— এই মেয়ে কথা কম বলে তোমার বাবা মাকে ফোন দাও। আজকেই তোমাদের বিয়ে দিয়ে দেবো। তাহলে দেখবা চিপায় গিয়ে রাগ ভাঙানোর রোগ ভাল হয়ে গেছে। তোমার বাবার ফোন নাম্বার দাও। ( মোটা কন্ঠ)

— প্লীজ প্লীজ ভাইয়া আমার বাবা মাকে এই ব্যাপারটা জানাবেন না। উনারা জানলে আমাকে মেরেই ফেলবে। উনারা আমার আর ওর সম্পর্কের কথা জানে না। ( মিহি কন্ঠ)

— এই মেয়ে একটু আগে না বললা তোমার ফ্যামিলির সবাই তোমাদের সম্পর্কের কথা জানে। এখন আবার কি বলছো?

— আসলে ইয়ে ভাইয়া!
— তোর ভাইয়ার ***!
অতি উন্নতমানের অশ্রাব্য ভাষার একটা গালি মোটাকন্ঠের ছেলেটা মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো। গালিটা আমার কাছে অশ্রাব্য নয়, তবে পাঠকদের কাছে অশ্রাব্য। আমি কৌতুহল দমিয়ে রাখতে না পেরে এখন একটু গলির ভিতর ঢুকে গেলাম। যাতে মিহি এবং মোটা কন্ঠের কথপোকথন ভালভাবে শুনতে পারি।

— ভাইয়া আপনি প্লীজ গালাগালি করবেন না। আমরা এমন কোন কিছু করিনি যে! (মিহি কন্ঠ)
— ওই **** একেবারে চুপ। রাত বিরাতে পোলা নিয়া চিপায় ঢুকো আবার! এখনি বিশহাজার টাকা বের কর। নয়তো তোর বয়ফ্রেন্ডকে খাসি করে দেবো। জানিস তো খাসি কিভাবে করে?

— আমি জানি না।
— মোটকথা তোর বয়ফ্রেন্ডের অন্ডকোশ কেটে ফেলবো। তখন চাইলে বাসরঘরে যাওয়ার ক্ষমতাও থাকবে না। চিপায় যাওয়া তো দূরের কথা। টাকা বের কর এখনি।

— দেখেন ভাই আপনারা কিন্তু এবার বেশি বেশি বলছেন। ( বোধহয় মেয়েটার প্রেমিক)
— ওই *** একটা কথা বলবি না। ( এরপরেই ঠাস করে শব্দ হলো। নিশ্চয়ই মোটাকন্ঠের ডানহাতের কাজ এটা।)
এইসব ঘটনা শুনতে শুনতে কখন যে একেবারে তাদের সামনে চলে গিয়েছি তা মনে নেই। সামনে এগুতে এগুতে একটা টিনের কৌটার সাথে ধাক্কা খেলাম। মনে হচ্ছে রঙের ডিব্বা। নিস্তব্ধ গলির ভেতরে থাকা সবগুলো চোখ একসাথে বোধহয় আমার দিকে তাকালো।

— কোন শালায় রে এখানে দাঁড়িয়ে আছিস?

একটা মোটাতাজা মাঝারি সাইজের জলহস্তির সমান মানুষ আমার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে টর্চের আলো আমার চেহারায় ফেললো। মানুষটা আমার চেহারা দেখে তব্ধা মেরে গেল পুরোপুরি। সে হয়তো ভাবছে হায় হায় কাকে আমি শালা বললাম? তার তো বোনই নাই।

— আবির ভাই আপনি এইখানে কি করেন?
— তোর শালা হওয়ার জন্য এসেছি।

আবির নাম শোনার সাথে সাথেই প্রায় সবাই মোবাইলের টর্চের আলো ফেললো আমার চেহারায়। নিজেকে ওই মূহুর্তে কেমন যেন সেলিব্রেটি মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল অসংখ্য ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলছে আর নিভছে।

— আবির ভাই বুঝতে পারিনাই যে আপনি হবেন। ভুলে আপনারে!
— আরে ব্যাটা আমার বোন নাই। চাইলেও শালা বানাতে পারবি না। তা তোরা এখানে কি করছিস?
আমার এই প্রশ্নে হঠাৎ করেই এই ছোট্ট বখাটে পোলাপানের দল নিরব হয়ে গেল। নিরব হওয়ার কারণটা আমি ধরতে পারছি। তারপরেও এমন ভাব ধরছি যে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
— কিরে কথা বলিস না কেন? কি করতেছিস তোরা? আর ওই মেয়েটা কে?
— ভাই.. ভাই আমরা ফিটিং ধরছিলাম। এই মেয়ে আর এই ছেলেটা অন্ধকারের মধ্যে!

এতটুকু বলেই থেমে গেল ছেলেটা। অন্ধকারের মধ্যে ছেলে আর মেয়েটা কি করেছিল তা সে মুখে বলতে লজ্জা পাচ্ছে। কিন্তু একটু আগেও সে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করছিল। ওদের এমন পরিবর্তন দেখে কিছুটা খুশি আমি। আমাকে দেখেই ওদের ভদ্রসত্বা ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে।

“ফিটিং ধরা” ব্যাপারটা আসলে কি? এই জিনিসটা অনেকটা মানুষকে অপ্রীতিকর কোন পরিস্থিতিতে ফেলে কোনকিছু আদায় করে নেয়ার মত।

যেমন ধরুন একটা ছেলে আর একটা মেয়ে অন্ধকারের মধ্যে চুম্বন অথবা এরচেয়ে গভীর কিছু করা অবস্থায় এলাকার কিছু ছেলেদের হাতে ধরা পড়লো। তখন ছেলেগুলো কি করে জানেন? ছেলেগুলো ওই চুম্বনযুগলের কাছ থেকে টাকা পয়সা, মোবাইল এইসব রেখে দেয়। হুম জিনিসটা অন্যায় কিন্তু ওই প্রেমিকযুগল কিন্তু কিছুই করতে পারবে না। কারন তারা এমন একটা পরিস্থিতিতে ধরা খেয়েছে যেখানে কিছু বলার বা করার মত মুখ তাদের নেই। আমাদের এলাকায় “ফিটিং ধরা” এর ব্যাখা এমনই।

অনেক ব্যাখা দিয়ে ফেললাম এবার গল্পে ফিরে আসি। একসময় আমিও এলাকায় অনেক “ফিটিং ধরা” গল্পের জন্ম দিয়েছিলাম। এখন আমি ভাল হয়ে গিয়েছি। একেবারে ভাল হয়ে গিয়েছি।

— ফিটিং ধরেছিস? দেখি মেয়ে আর ছেলের চেহারায় লাইট মার। দেখি কাদের ধরেছিস!
আমার কথায় আমার চেহারার উপর থাকা ফ্ল্যাশলাইটগুলো হঠাৎ একযোগে সেই ধরা খাওয়া যুগলদের উপর গিয়ে পড়লো। এই আলোতে যেই দুজনের চেহারা আমার চোখে ভেসে উঠলো তাদের চেহারা দেখে আমি শিহরিত এবং অতিমাত্রায় আনন্দিত।

কামরুল এবং রোদেলা, এদের দুজনকেই আমি চিনি এবং খুব ভাল করেই চিনি। এদের মধ্যে কামরুল হচ্ছে আমার একসময়ের ড্রাগমেট, আর রোদেলা আমার!

বুঝতেই পারছেন রোদেলা এখন আমার প্রাক্তন। কামরুলের বাবা বিশাল ব্যবসায়ী আর কামরুল ইদানিং নাকি ভাল একটা চাকরিও করে। নেশা করা নাকি একেবারে ছেড়ে দিয়েছে। এই কারণেই বোধহয় রোদেলা আর কামরুল একসাথে। কারন রোদেলার মন বিশাল বড়। অনেকটা ফুটবল স্টেডিয়ামের মত। তাই তার মনে অনেক ছেলে একসাথে ঘুরে বেড়ায়। যাদের পকেটের অবস্থা ভাল তারাই একমাত্র রোদেলার মাঠে খেলার সুযোগ পায়।
যেমন কিছুদিন আগে আমি পেয়েছিলাম। বাবা বেসরকারি ব্যাংকে ভাল বেতনে চাকরি করতো। আর আমি সারাদিন নেশা করে আর রোদেলার সাথে ঘুরে বেড়াতাম। বাবার পকেটে টাকা থাকা মানে আমার পকেটেও টাকা থাকা। আর আমার পকেটে টাকা থাকা মানে রোদেলা আমার পাশে থাকা।

হঠাৎ একদিন আমার ক্রেডিট কার্ড বাবা হারিয়ে গেল। আমার পকেট পুষ্টিহীনতায় ভুগতে লাগলো আর রোদেলা নতুন ব্যাংকের খোঁজে বেরিয়ে পড়লো।

অনেক অতীত ঘাঁটলাম। এবার চলো বর্তমানের একটা সুরাহা করি। ফ্ল্যাশের আলোয় রোদেলার মায়াবতী রূপ দেখে আমার চোখে পানি চলে আসলো। বিশ্বাস হয়না এখনো আমি এই ছলনাময়ীকে ভালবাসি।

রোদেলা আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। কারন তার চোখের উপর লাইটের আলো। যাক এক হিসেবে ভালই হয়েছে। আমি রোদেলার উপকার করবো কিন্তু রোদেলা বুঝতে পারবে না। এটাই বোধহয় প্রকৃত ভালবাসা।

— এই ব্যাটা এদিকে সাইডে আয়।
— জ্বী ভাই বলেন।
— এই মেয়েটাকে আমি চিনি।
— বলেন কি ভাই? তাহলে এখনি ছেড়ে দিচ্ছি। ভাই বুঝতে পারিনি যে এই মেয়েটা আপনার পরিচিত।
— বেশি কথা বলিস। আমি কি বলেছি ছেড়ে দিতে?
— তাহলে ভাই?
— যা কিছু পাবি সবকিছু নিয়ে নিবি। মোবাইল, ঘড়ি, মেকআপ বক্স সবকিছু। আর ছেলেটাকে শুধু জাইঙ্গা পরিয়ে ছেড়ে দিবি। বাকি সব রেখে দিবি।

— আচ্ছা ভাই।
— আরেকটা কাজ করবি। মোবাইলে ভিডিও করবি। ওদের দুজনের সব কীর্তিকলাপ ফেসবুকে আপলোড করে ভাইরাল করে দিবি।

— আচ্ছা ভাই দোয়া করবেন।
একসময়ের ফিটিংবাজ হওয়ার সুবাদে ছোটভাইদের কয়েকটা ফিটিং টিপস দিয়ে দিলাম। এখন আর ওদের টাকা পয়সা নিয়ে টেনশন করতে হবে না। ওরাও একেকজন হয়ে উঠবে আমার মত ফিটিংবাজ।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত