স্বার্থপর

স্বার্থপর

মণিকার সাথে আমার দুই বছরের সম্পর্ক ছিল। খুব চটপটে, স্মার্ট ছিল সে। হালকা পাতলা গড়নের মণিকা তেমন ফর্শা না। চোখ দুটি গাঢ় নীল। শুনেছিলাম, ওর বাবা নাকি বিদেশী বংশোদ্ভূত ছিলেন। মা এদেশীয়। মণিকার সাথে আমার প্রথম আলাপ হয়েছিল একটা পার্টিতে। আমি তেমন আমুদে না। অফিসের কলিগ রায়হানের সাথে তার কোনো এক বড় আত্মীয়ের পার্টি। সেখানে মণিকাও এসেছিল। পার্টির এক কোণে বসে ছিলাম আমি। হাতে জুস। মণিকা এসে হাজির হয়েছিল তখনি। আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল সে। পড়নে চকচকে পার্টি ড্রেস। চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল আমেরিকান কোনো মেয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি অপলক চোখে তাকিয়ে ছিলাম। আমার তাকানো দেখেই হয়ত মণিকা এগিয়ে এসেছিল কথা বলতে।

– হ্যালো।
আমি কোনো রকমে জড়তা কাটিয়ে হ্যালো বলেছি।
– পার্টিতে এসে এভাবে চুপ করে বসে আছেন যে!’
– আসলে আমি তেমন অভ্যস্ত না। তাছাড়া আমি মানুষ হিসেবে খুব বোরিং।
মণিকা লাস্যময় হেসে বলেছিল, বোরিং মানুষ গুলো কিন্তু খুব নটি হয়?

আমি লজ্জা পেয়ে হেসেছিলাম। এক কথায় দু কথায় অনেক কথা হয়েছিল। ও একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকুরি করে। বাবা নেই, মা বড় ভাইয়ের সাথে বিদেশে থাকে। দেশে বলতে গেলে কেউ নেই। আমরা নাম্বার বদলা বদলি করেছি। ও বলেছিল মাঝে মাঝে ফোন দিবে। আমি ভেবেছিলাম, একা থাকে ও। আমিও চাকুরির সুবাদে শহরে একাই থাকি। কিছুটা সঙ্গ দেওয়া হলো আর কি। ঠিক তার দু দিন পর ও দেখা করতে চাইলো। আমি অফিস ছুটির পর গেলাম বোটানিক্যাল গার্ডেনে দেখা করতে। সেদিন মণিকা সেজে এসেছিল । মুখে হালকা মেকাপ, কানে পাথরের দুল। হাতে নীল কাচের চুরি। আর সাদা পেড়ে নীল শাড়ি পরে এসেছিল। অপরূপ মুগ্ধতায় তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। ও লজ্জা পেয়েছিল কিছুটা। বলেছিল, ‘খারাপ লাগছে দেখতে আমায়?

-মনে হচ্ছে, রাশান পরি এসেছে এই সবুজের মাঝে।
আমার কথা শুনে মণিকা মাথা নিচু করে স্মিত হেসেছিল। আরো অবাক হওয়ার পালা ছিল আমার। যখন হঠাৎ ও আমাকে প্রপোজ করে বসলো। আমি বিস্মিত হয়ে গেছি। কোনমতে বলেছি,‘ যা তা কি করে হয়! তুমি তো আমায় তেমনভাবে চিনো না।

– প্রেমের মাঝে এমনিতেই চেনা হয়ে যাবে।
আমি কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গিয়েছি। এরকমভাবে যে প্রেমে পরে মানুষ জানতাম না। তারপর ভাবলাম হোক না যা হয়। প্রেমের মাঝেই না হয় চেনাপরিচয় হবে। তারপর আর কি চুটিয়েপ্রেম। আমি অফিস চুরি করে ওকে সময় দেই। আর ও আমায়। কখনো নীলক্ষেতে বইয়ের মাঝে ডুব দেই। কখনো বা চন্দ্রিমা উদ্যান। ওর বাসার কাছে পার্কটাতে যাওয়া আসা ডালভাত ছিল। মাঝেমাঝে ওর বাসায়ও যেতাম। মণিকা একটু অগ্রাসী হতে চাইতো। আমি এটা ওটা বলে এড়িয়ে যেতাম। তখন ও মুখ ঝামটে বলতো, ‘ কাম অন ম্যান, এখনি তো ইনজয় করার সময়।

ও আমাকে কাছে টানতে চাইতো। আমি বাধা দিতাম। বলতাম, ‘আরে আগে বিয়ে তো হোক নাকি?

মণিকা হতাশ মুখে বলতো, ‘ধুর, তুমি আসলেই বোরিং।
আমি হেসে বলতাম, ’ কেন, আমি তো আগেই বলেছি আমি খুব বোরিং। আর এখন দেখলে তো সব বোরিং ‘রা নটি হয় না।

মণিকা রেগে গিয়ে বলে, যাও তো। আর জ্ঞান দিতে হবে না।
আমি ওর রাগ দেখে হাসতাম।
মণিকার চাহিদা একটু বেশিই ছিল। খরচ করতো একটু বেশিই। প্রায় আমার কাছ থেকে টাকা চাইতো। মাঝখানে আমাদের কোম্পানি লস খাওয়ায় নিচের ব্রাঞ্চের সবাইকে আউট করে দেওয়া হলো। তার মাঝে আমিও পরে গেলাম। মণিকা বারবার বলতো, হাসিব তুমি একটা সরকারী চাকুরি করো না কেন? সেই সময়টাতে ও আমাকে খুব চাপ দিতো টাকার। দিনদিন ওর চাহিদা বাড়ছিলই। সপ্তাহ দুয়েক পরেই একটা কোম্পানিতে ফের জয়েন করলাম। পাশাপাশি সরকারী চাকরির জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছি। এভাবেই চলছিল, আমাদের সম্পর্কের দেড় বছরের মাথায় হঠাৎ করে একদিন বলল, ‘জানো একটা ছেলের সাথে বন্ধুত্ব করেছি।

-হুম ভালো তো।
-আরে শোনো না আগে, ও নাকি খারাপ। নেশা করে, আমাকে একদিন ফোন দিয়ে বলল, সে নাকি ভালো হতে চায়। আমাকে নাকি বন্ধু হতে হবে।
আমি হেসে বলি, তুমি কি মাদার তেরেসা নাকি! মানুষ ভালো করার কারখানা বসিয়েছ নাকি?
-এ কি ধরনের কথা হাসিব। কেউ যদি ভালো হতে চায় হোক না।
-ভালো হবে ভালো কথা। কিন্তু তুমিই কেন? আর চেনাজানা নেই কে একজন তোমায় ফোন দিচ্ছে, আমাকে একবার বলেছ তুমি?

-এতে বলাবলির কি আছে । আমরা জাস্ট বন্ধ এর বেশি তো কিছু না। আর আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার এটা ।
আমি সিরিয়াস ভাবে বলেছিলাম, ‘ দেখো, তোমার ব্যক্তিগত বা অব্যক্তিগত সেটা আমার জানার দরকার নেই। তুমি ওই ছেলের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দাও, এটাই আমার শেষ কথা।

তারপর ধীরেধীরে মণিকার সাথে কথা বলা কমে এলো আমার। ফোন দিলে কেটে দেয়। ব্যস্ত দেখায়। যদিওবা ধরে, ব্যস্ত আছি বলে কেটে দেয়। আমিও আর ফোন দেই না ও ব্যস্ত থাকে বলে। এভাবে ছয় মাস কেটে গেলো। হঠাৎ একদিন সন্ধ্যার আগে ও ফোন দিয়ে কাঁদোকাঁদো কণ্ঠে জানালো, ‘আমার সাথে নাকি প্রেম করা সম্ভব না। আমি কেন বলাতে ওর জবাব ছিল এইরকম, মণিকা যে ছেলের সাথে কথা বলতো, তার সাথে নাকি আজকে দেখা করেছে। তারপর ছেলেটি জোড় করে।

মণিকার কথা শুনে আমি চুড়ান্ত ভাবে হতবাক হয়ে গেছি। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না কথা গুলো। মনণিকা তখন আবোলতাবোল অনেক কিছুই বলেছিল। আমি কিছুই শুনিনি। ফোন কেটে দিয়েছিল সে। ওর বাসায়ও গিয়েছি। কিন্তু বাসার মালিক জানায় মণিকা নাকি সপ্তাহ খানেক আগে বাসা ছেড়ে দিয়েছে। এর পরে অনেক ট্রাই করেছি ওর ফোনে। কিছুদিন নাম্বার খোলা থাকলেও পরে বন্ধ পেয়েছি।

মণিকার সাথে ব্রেকাপের তিন বছর পর হঠাৎ একদিন বসুন্ধরায় আমার সেই কলিগের দেখা। অনেক কথা হয়েছিল সেদিন ওর সাথে। কথায় কথায় হঠাৎ বলল, ‘ হাসিব মণিকার কথা মনে আছে তোমার?’

– কে মণিকা?
– ওই যে তোমার সাথে যার সম্পর্ক ছিল। তাকে নাকি কোনো এক ছেলে তাকে জোড় করে।
-‘ও হ্যা, মনে পরেছে। হঠাৎ এতদিন পর তার কথা কেন?
– ‘তুমি কি জানো, সব কিছু ভুয়ো ছিল। আসলে মণিকা আগে থেকেই ওই ছেলের সাথে রিলেশন ছিল। মাঝকাখানে ব্রেকাপ হওয়ায় তোমার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। কিন্তু ওর এক্স বয়ফ্রেণ্ড কাম ব্যাক করায় আবার তার কাছে ফিরে যায়। সেই ছেলে আবার বিরাট বড় সরকারি অফিসার। এদিকে তোমাকেও সরাসরি ব্রেকাপের কথা বলতে না পারে। তাই মিথ্যে কথা বলেছিল তোমায়।

আমি কিছুক্ষণ বিস্মিত হয়ে থাকলাম। আমার চুপ হয়ে থাকা দেখে রায়হান আমার ঘারে হাত রেখে বলল, ‘দুঃখ পেয়ে কোনো লাভ নাই এখন। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।

আমি মনেমনে বলি, তোমার একটু কথায় আর কি দুঃখ পাবো! সব কথা জানি সেই কবেই। আজ তিনবছর ধরে তো এই দুঃখ নিয়েই আছি।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত