মেয়ে হুজুর বউ

মেয়ে হুজুর বউ

গাড়ি থেকে মেয়ের বাড়ির গেটের সামনে নামতেই তাজ্জব বনে গেলাম। এটা কি বিয়ে বাড়ি! না কি আমার হবু শ্বশুরমশাই কিপ্টে? একটা লাইটও জ্বালায় নি বিয়ে উপলক্ষে। বাড়ির ভিতর গিয়ে আরও বড় ধরনের টাসকি খেলাম। এটা মরা বাড়ি না তো? গানবাজনার কোন চিহ্ন তো নাই ই সাথে মেয়ের বাড়ির সবার পড়নেই বোরখা না হয় হেজাব ।

বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি উনি হয়তো প্রচণ্ড রকমের খুশি আর বাদ বাকি সবাই কানাঘুষা করছে। এসব দেখে মনে হচ্ছে নিজেকে নিজেই খুন করি। এটা কোন বিয়ে হলো? বন্ধুরা বিশ হাজার টাকা দিয়ে ক্যামেরাম্যান ঠিক করেছিলো বিয়ের ভিডিও করার জন্য। বিয়ের মুহূর্ত যেন স্মৃতি হিসেবে রাখা যায় অথচ মেয়ের বাবা ভিডিও করতে সরাসরি মানা করে দিলো। কাজি সাহেব কবুল বলতে বলেছেন এই দিয়ে দু’বার হলো অথচ আমার মুখ দিয়ে কথাই বের হচ্ছে না। তিন বারের বার কাজি সাহেব বললেন, ‘বাবা, কবুল বলো’। আমি করুণ চোখে বাবার দিকে তাকাতেই দেখি তিনি রক্ত চক্ষু দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি বাবার এমন চোখ দেখে ভয়েই কবুল বলে দিলাম। বাড়ির সামনে মস্ত বড় স্টেজ করা হয়েছে। এখানে আমাকে আর আমার বউকে বসিয়ে সবাই  দেখবে আর ছবি তুলবে সেজন্য। তবে বর্তমান দৃশ্য একদম ভিন্ন। আমার সদ্য বিয়ে করা বউ কালো বোরখা, হাতে মোজা পড়ে স্টেজে বসে আছে। চোখটাই শুধু কোন রকম দেখা যাচ্ছে।

আর ছবি তোলা তো একদম নিষেধ। তবুও সেই আইনকে ভঙ্গ করে কিছু পুচকে ছেলে-মেয়ে ভয়ে ভয়ে নতুন বউয়ের পাশে গিয়ে ছবি উঠছে। আগত সব মেহমানরা এমন দৃশ্য দেখে অষ্টম আশ্চর্য যে হয়েছেন এটা তাদের মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে। সবাই বউকে দেখতে উৎসুক তবে দেখার মতো কোন উপায় নেই। বড় অবাক করা কথা এই যে, আমার মা-বাবা ছাড়া মেয়ের চেহারাটা আমিও দেখি নি। এক প্রকার রাগ অথবা নেকামো ভেবেই হয়তোবা আগত মেহমানরা তাড়াতাড়িই যে যার মত বাড়ি ফিরে গেলেন৷ আর আমি ছাদে এসে একটার পর একটা সিগারেট ফুৃঁকছি। রাগে আমার গা কাঁপছে। বাবার জন্যই আজ আমি সবার কাছে ছোট হয়ে গেলাম। এই কি আমার ইচ্ছে ছিলো? কপালে কি বিধাতা এই লিখে রেখেছিলেন? আমি আরাফাত। মা-বাবার একমাত্র ছেলে। পড়াশোনাতে ভালো হওয়ায় বাবা (আশরাফ সাহেব)আমাকে চীনে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। পড়াশোনা শেষ করে সপ্তাহ খানেক হলো দেশে ফিরেছি। দেশে ফিরে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে মজা- মস্তি করে কাটানোর প্ল্যান ছিলো কিন্তু হলো তার বিপরীত। বাবা বিয়ে ঠিক করলেন। বিয়ে ঠিক করলেন ভালো কথা তাই বলে হুজুর মেয়ে! “হুজুর” কথাটি মনে পড়তেই ব্যাপক অসস্তি লাগছে ।

লাগবে না ই বা কেন? আমার ইচ্ছা বিয়ে করলে কোন এক আধুনিকা রুপসী মেয়েকেই করবো। যে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলবে। কিন্তু তা আর হলো কই? বাবা হুটহাট করে এমন একটা বিয়ে ঠিক করলেন ভাবতেই মেজাজ খারাপ হচ্ছে। যেদিন মা বললেন, বাবা না কি আমার বিয়ে ঠিক করেছে সেদিন এতটাও রাগ লাগে নি যতটা লেগেছিলো পরে যখন শুনলাম মেয়ে হুজুর। বিয়ের আগে তো বন্ধুরা ফোন দিয়ে খুব মজা লুটছে হুজুরের স্বামী বলে। বাবার মুখের উপর কোনদিন কথা না বললেও সেদিন বলেছিলাম, বিয়ে করবো না। তবে বাবার একটাই কথা এই মেয়েকেই বিয়ে করতে হবে। কারও হাতের ছোঁয়া পেয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম। চেয়ে দেখি বাবা আর মা। বিরক্তি নিয়ে মুখটা আবার ঘুরিয়ে নিলাম। সব কিছুই অসহ্য লাগছে। ‘বাবা, জানি তুমি আমার উপর অনেক রাগ করেছো। বিয়ে নিয়ে সবারই একটা স্বপ্ন থাকে। তবে বাবা, আমরা সব সময়ই তোমার ভালো চেয়েছি। তাই তোমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহারটা দিলাম। মেয়ে টা অনেক ভালো। মডার্ন হলেই ভালো মেয়ে হয় না বাবা, তাকে পর্দাশীল, আল্লাহভীরু আর সংসারীও হতে হয়। আমার মনে হয় তুমি বুঝেছো আমার কথা। যাও নিচে যাও, নতুন বউকে বসিয়ে রেখে বাহিরে থাকতে নেই’।

ঘরে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা না থাকলেও বাবা আর মায়ের কথাতে একরাশ বিরক্তি নিয়ে রুমে প্রবেশ করলাম। খাটের কাছে যেতেই কালো বোরখা পড়া আমার সদ্য বিয়ে করা বউ আমাকে সালাম দিলো। তবে মেজাজ ভালো না থাকায় উত্তর দেয়ার কথা চিন্তাও করলাম না। ‘আপনি কি মুসলিম’? নতুন বউয়ের মুখে এমন কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। বিরক্তি নিয়েই বললাম, ‘বিয়ে করার আগে শুনেন নি আমি মুসলিম কি না’? ‘মুসলিম হলে অবশ্যই সালামের উত্তর দিতেন কারণ, সালামের উত্তর দেয়া ওয়াজিব’। তারপর আবার বললো, ‘যেহেতু আপনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে তাই আমি আপনাকে স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছি। আমাদের দু’জনের নতুন জীবন শুরু করার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করার্থে দু’রাকাঅাত নফল নামাজ আদায় করতে চাই। আসুন একসাথে আদায়করে নেই’। ‘দেখুন, এমনিতেই আমার মন-মেজাজ ভালোনেই। দয়া করে চুপ থাকুন’।

‘আমি তো বেশি কথা বলি নি, শুধু নামাজ আদায় করতে বলেছি ‘। ‘পড়বো না নামাজ’। ‘আপনি আল্লাহ কে বিশ্বাস করেন না’? ‘করি’। ‘তাহলে আপনার নামাজ আদায় করতেই হবে’। বিরক্ত লাগলেও মনের বিরুদ্ধে ওযু করে এসে দু’রাকাঅাত নামাজ আদায় করে নিলাম। তারপর কি করবো ভাবছি তখনই সদ্য বিয়ে করা বউ বললো,’আমি জান্নাতুল আয়েশা। বাবা-মা আয়েশা বলেই ডাকে। আপনিও তাই বলেই ডাকবেন’। এতটাই বিরক্ত লাগছিলো যে কিছুই বলতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পর বউ মানে আয়েশাই বললো,’আপনি কি বিরক্ত না কি ঘুম পাচ্ছে ‘? আমি তবুও চুপ করে রইলাম। ‘দেখুন আপনি যেহেতু আমার স্বামী তাই আপনার কাছে আমার কিছু চাওয়ার আছে। যেমন, আপনাকে অবশ্যই প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতের সাথে আদায় করার চেষ্টা করতে হবে। তারপর দাড়ি রাখতে হবে অবশ্যই।

কারণ, দাড়ি নবীজী (সাঃ) এর সুন্নাত। এরপর অবশ্যই আপনাকে উত্তম চরিত্রবান হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সদা সত্য বলতে হবে, মা- বাবাকে ভালোবাসতে হবে। কোন প্রকারনেশাকরা চলবে না’। ‘চুপ করুন। আমি কি করবো না করবো সেটা একদম আমার একার ব্যাপার। আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাবেন না। আপনার মনের মত কখনোই হবো না। খারাপ জেনেও কেন বিয়ে করতে রাজি হলেন আমাকে, হ্যাঁ’? চিৎকার করে কথাটা বললেও অপরদিকের মানুষটার আচরণের কোন পরিবর্তন দেখলাম না৷ ‘আমার আপনার মত ছেলেকে বিয়ে করার বিন্দুমাত্রও ইচ্ছা ছিলো না। শুধু মাত্র আপনার বাবা- মায়ের জন্য বিয়ে করা। আর বিয়ে যেহেতু করেছি তাই আপনাকে আমার স্বামী হিসেবেও একদম মেনে নিয়েছি’। এ’কথা বলার পর দু’জনেই চুপচাপ বসে রইলাম। সে খাটে আর আমি সোফায়। মাথার ভিতর নানান চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। ফজরের আজানের ধ্বনিতে ভাবনার ছেদ পড়লো।

একটু পর আয়েশা নামাজ পড়ার জন্য ওজু করেএসে আমাকে বললো, ‘আজান হয়ে গেছে, ওযু করে আসুন। আর আজই শেষ দিন বাসায় নামাজ পড়ার। এরপর থেকে মসজিদে গিয়ে পড়বেন, কেমন’? বিরক্তি নিয়েই ওযু করতে চলে গেলাম। অবাক লাগছে খুব। একটা অপরিচিত হয়ে এতটা স্বাভাবিক আচরণ করা সম্ভব! আবার মেজাজ রাগে ভরপুর হলেও তার কথার অবাধ্য হতেই পারছি না। ওযু করে এসে দু’জনে পাশাপাশি নামাজ আদায় করে নিলাম। তারপর সে বললো, ‘সারারাত জেগেছেন। এখন একটু ঘুমান’। আয়েশার কথাতেই যেন ঘুম চলে এলো। রাগ অনেকটাই কমে গেছে তাই ঘুমানোর জন্য খাটে গিয়ে শুয়ে পরলাম।’এই যে, উঠুন মা ডাকছে’। কারও কথায় ঘুমটা ভেঙে গেলো। চেয়ে দেখি আয়েশা ঘর গোছাচ্ছে। ঘুমানোর জন্য কাত হতেই আবার বললো, ‘কি হলো উঠুন বলছি’। রাতে এমনিতেই ঘুমাই নি আবার এত তাড়াতাড়ি ডাকায় মেজাজ টা বিগড়ে গেলো। ‘কি পেয়েছেন কি হ্যাঁ? যা বলবেন তাই করবো’? ‘হ্যাঁ, তাই করবেন’।

মুখের উপর এমন কথায় আর জবাব দিতে পারলাম না। রাগ,বিরক্তি নিয়েই ফ্রেশ হয়ে আসলাম। তারপর খাবার টেবিলে বসতেই মা বললো, মেয়েটা কত্ত লক্ষ্মী! কাল বিয়ে হয়েছে আর আজই  সংসারটা একদম নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছে’। ‘আরাফাতের মা, এজন্যই তো ঘরে নিয়ে এসেছি। একদিনেই বাড়িটা জান্নাতের মত লাগছে’। আয়েশাকে নিয়ে মা-বাবার এত্ত গুণগান শুনে মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেলো। এক দিনেই মাথায় তুলে নাচছে? মন টা ভালো করার জন্য নাস্তা না করেই বাড়ির বাহিরে চলে এলাম৷ তারপর চায়ের দোকানে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতেই বাল্যবন্ধু হেলাল বললো, ‘ঘরে নতুন বউ রেখে বাইরে কি করিস ‘? ‘দেখছিস না কি করি’? ‘তা দেখছিই তো, তবে দোস্ত শেষমেষ তুই একটা হুজুরকে বিয়ে করলি! ভাবতেই অবিশ্বাস লাগছে । হেলালের কথায় রাগ করে আবার বাসায় চলে এলাম। আজ সবার কাছেই হাসির পাত্র আমি।

বিয়ে হয়েছে আজ দিয়ে এগারো দিন হলো। এর ভিতরই আয়েশা মা-বাবার মন খুব ভালো করেই জয় করে ফেলেছে। যদিও আমি ওকে কাছে ঘেষতে দেই না। তবুও আমাকে শাসনের ভেতর রাখে। বাবা অফিসেও যেতে দিচ্ছে না। বাসায় থাকাকালীন নামাজের সময় হলেই আয়েশা মসজিদে পাঠিয়ে দেয়। কেন যেন ওর কথা ফেলতেও পারি না৷ তবে রাগও লাগে। এদিকে লোকজনের হাসির পাত্র হয়ে গেছি আমি। যেই আমি বছরে এক, দু’দিন ছাড়া মসজিদমুখী হতাম না সেই আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতের সাথে আদায় করি। লোকে দেখে হাসে। রাগ লাগে এতে। তবে কাল ফজরের নামাজের পর ইমাম সাহেব যখন ডেকে বললো, ‘বাবা, আল্লাহ তোমাকে উত্তম স্ত্রী দিয়েছেন’।

তখন মনটা কেন যেন খুশি খুশি লাগলো। বিকেলে একটা কাজে শহরের দিকে গেছি তখনইবন্ধু রায়হানের ফোন। বললো ওদের সাথে আজ রাতে আড্ডা দিতে। বাসায় থাকতে থাকতে অরুচি ধরে গেছে আর অনেক দিন হলো আড্ডা দেয়াও হয় না তাই হ্যাঁ বলে দিলাম। কাজ শেষ করে বন্ধুদের সাথে যোগ দিলাম। তারপর সবাই মিলে একটা বারে বসে মদের আড্ডা জমালাম। দেখতে দেখতে কখন যে রাত প্রায় এক টা বেজে গেছে খেয়ালই করি নি। পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখি বাবার নাম্বার থেকে সাতাশ টা মিসকল। বাবার নাম্বার দেখে বন্ধুদের থেকে বিদায় নিয়ে বাসার দিকে ছুটলাম। ঘুম ঘুম চোখে দরজায় কয়েক টা টোকা দিতেই দরজা খুলে গেলো। তাকিয়ে দেখি আয়েশা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে খুব চিন্তিত সে। ‘এত রাত অবধি কোথায় ছিলেন? জানেন মা-বাবা, আমি কত চিন্তা করতেছি’? মাতাল থাকায় আমার এত কথা শোনার ইচ্ছা হলো না তাই বললাম, ‘পথ ছাড়েন রুমে যাবো’।

‘আপনি কি ড্রিংকস করেছেন’! ‘হ্যাঁ করেছি, সমস্যা ‘? ছি, আপনি জানেন না নেশা করা হারাম? মদ খেলে নামাজ হয় না এসব জানেন না’? মেজাজটা এতই খারাপ হয়ে গেলো যে ঠাস করে ওর গালে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগালি শুরু করে দিলাম। আমার গলার আওয়াজ শুনে পাশের ঘর থেকে মা-বাবা বেরিয়ে এলো। আমার এমন উগ্র আচরণে বাবা আমাকেও ঠাস করে চড় বসিয়ে দিলেন। ‘মেয়েটা তোর জন্য খাবার নিয়ে বসে আছে সেই কখন থেকে আর তুই এলি এখন! এখন এসেছিস ভালো কথা তাও আবার মদ খেয়ে, নেশা করে? যে মেয়েটা তোকে দ্বীনের পথে আনার জন্য এত চেষ্টা করে তার গায়ে হাত তুললি! আমার ভাবতেও ঘেন্না করছে যে তুই আমার ছেলে’। কথা গুলো বলেই বাবা আমার সামনে থেকে চলে গেলেন। মা, আয়েশাকে নিয়ে রুমে গেলো আর আমি সোফাতেই বসে রইলাম। নেশাটা কখন যে কেটে গেছে বুঝতেই পারি নি। অপরাধবোধ কাজ করছে খুব।

ওভাবে মারা টা হয়তো ঠিক হয়নি। ও তো আমার ভালোর জন্যই সব করছে। তবে নিজের দিকটাও মনে পড়ছে বারবার। আমি তো একটা সুন্দর জীবন চেয়েছিলাম। যুগের সাথে মানানসই বউ চেয়েছিলাম। সবার সাথে তাল মেলাতে চেয়েছিলাম। সারারাত আর ঘুমাতে পারলাম না। ভালো-খারাপ নিয়ে ভাবতে ভাবতেই রাত প্রায় পেরিয়ে গেলো। সকালের দিকে চোখটা লেগে আসাতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙতেই দেখি দুপুর প্রায় তিন টা বাজে৷ ফ্রেশ হয়ে মায়ের কাছে খাবার চাইতেই দেখি মা শুকনো মুখ নিয়ে বসে আছে। কয়েক বার খাবার চাওয়ার পরও যখন দিলো না তখন রাগ করে একাই খেতে বসে পড়লাম। খাচ্ছি তখন মা পেছন থেকে এসে বললো, ‘তোর বাবা আয়েশাকে ওদের বাসায় রেখে এসেছে’। কথাটা কানে যেতেই মন টা ভালো হয়ে গেলো। ভাবছি, এবার থেকে আর নামাজের জন্য সাত সকালে কেউ ডেকে বিরক্ত করবে না৷ সারাদিন হাদিস, কুরআন নিয়ে কানের কাছে বকবক করবে না কেউ।

এখন থেকে নিজের মত করে চলতে পারবো। কয়েকটা দিন চলে গেল আয়েশা বাসায় নেই। চারিদিকে কেমন যেন একটা শূন্যতা অনুভব করছি৷ ঘরে ঢুকলেই বিছানায় শ্যামলা গড়নের হেজাব পড়া মেয়েটাকে দেখা যায় না। খেতে বসলে কেউ খাবার তুলে দেয় না। কেউ বলেও না, যান নামাজ পড়ে আসুন। বড্ড খালি খালি লাগছে বাড়ি টা। ফজরের আজানের ধ্বনি তে ঘুম ভেঙে গেলো। কি মনে করে যেন উঠে ফ্রেশ হয়ে ওযু করে মসজিদে নামাজ পড়তে চলে গেলাম। নামাজ পড়ে এসে ভাবছি, কি হলে আমার? আমি তো এমনই থাকতে চেয়ে ছিলাম, তবে কেন যেন কোথাও ঘাটতি রয়েই যাচ্ছে। এটা কি আয়েশার ঘাটতি? চার দিন চলে গেলো আয়েশা নেই। কেমন যেন বিষন্নতায় ভুগছি৷ চঞ্চল সেই মেয়েটার কথাই শুধু মনে পড়ছে।

আমি কি আয়েশাকে মিস করছি? না কি ভালেবেসে ফেলেছি? সব কিছুই কেমন যেন উল্টাপাল্টা লাগছে। কিছুই ভালো লাগছে না৷ অনেক, অনেক ভেবে দেখলাম আমি আসলেই আয়েশা নামের মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমি সকাল হলেই “নামাজে যান ” কথাটা মিস করছি। ছোটখাট শাসন গুলোকে মিস করছি। থেকে থেকে বলা হাদিসের বাণী গুলো মিস করছি। আমার আয়েশাকে লাগবে। জীবনে পূর্ণতা পেতে ওকেই লাগবে। উপায় না পেয়ে ভয়ে ভয়ে মা’কে বললাম কথাটা। মা গিয়ে বাবাকে কথা টা বলতেই বাবা বললো,’এতোদিন মেয়েটাকে কষ্ট দিয়ে এখন এসেছে ভালোবাসা দেখাতে? ওমন পবিত্র, সুন্দর মেয়েকে এ বাড়িতে এনে আমি কষ্ট দিতে পারবো না। বরং একেবারে ওকে আলাদা করে দেবো।

তোমার ছেলে যেমন বউ চায় তেমনই যেন বিয়ে করে নেয়। আর একটা কথা, তোমার ছেলে যেন আয়েশার নাম মুখেও না নেয়’। বাবার মুখে এমন কথা শুনে খুব খারপ লাগছিলো আমার। এদিকে আয়েশাকে দেখার জন্য মনটা ছটফট ছটফট করছিলো। কিন্তু এই মুখ নিয়ে ওর সামনে কি করে দাঁড়াবো? আমি যে চরম অন্যায় করেছি। ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে হাত তুললাম। নিজেকে শুধরে নেয়ার জন্য আর আয়েশাকে পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলাম। তারপর ভাবলাম, এই মুখ নিয়ে তো ওর সামনে যেতে পারবো না, তবে ওর মনের মত হয়ে একবার সামনে গিয়ে দেখি।

যদি আল্লাহ চান তো আমি ওকে ফিরে পেতেও পারি। এরপর থেকে নিজেকে শুধরাতে শুরু করে দিলাম। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া শুরু করলাম। সাথে বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করি। যেখানেই থাকি না কেন নামাজ বাদ দেই না আর। আয়েশাকে পাওয়ার জন্য আর আল্লাহর পথে অবিচল থাকার আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করে দিয়েছি। আয়েশাকে দেখি না প্রায় দেড়মাস হয়ে এলো। এ কয়দিনে নিজেকে বদলাতে চেষ্টা করেছি। জানি না কতটুকু পেরেছি। মাগরিবের নামাজ আদায় করার পর আল্লাহর নাম নিয়ে আয়েশাদের বাসার দিকে রওনা হলাম। উদ্দেশ্য, আয়েশার কাছে মাফ চাওয়া আর ফিরিয়ে আনা।

শ্বাশুড়ি মা দরজা খুলে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি সালাম দিয়ে কেমন আছেন জানতে চাইলাম। উনি অবাক হয়েই সব উত্তর দিলেন। তারপর আমাকে বসতে বললে আমি আয়েশা কোথায় জানতে চাইলাম। বললেন ও নামাজ পড়ে মাত্র ছাদে গেলো। আমি দুরুদুরু বুকে বিসমিল্লাহ বলে বুকে ফুঁ নিয়ে ছাদে গেলাম। গিয়ে দেখি আয়েশা রক্তিম মেঘের দিকে অপলক চেয়ে আছে। পাশে গিয়ে সালাম দিতেই ও চমকে পিছে ফিরে আমার দিকে তাকালো। তাকানোর পর যা দেখলো তাতে হয়তো ও আরও বেশি চমকে গেলো। চমকানোরই কথা। দেড়টা মাসে অনেক পরিবর্তন এসেছে। শার্ট, প্যান্টের জায়গায় পান্জাবি পায়জামা এসেছে। মাথায় সব সময় টুপি দেয়া থাকে। মুখ ভর্তি বড় বড় দাড়িও হয়েছে। ‘সালামের উত্তর দিলেন না’? কথাটা বলতে না বলতেই ও তাড়াতাড়ি সালামের উত্তর দিলো। তবে ওর চোখমুখে আশ্চর্য স্পষ্ট।

‘অন্ধকার পথের মাঝে ছিলাম আমি। বখে গিয়ে ছিলাম খুব। নিজেকে সব সময় সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলাতাম। কখনও ভাবি নি আমার ধর্ম ইসলাম। আপনি জীবনে এসে আমাকে উপলব্ধি করিয়ে ছিলেন। আর এখন আল্লাহর রহমতে আমি দ্বীনের পথের পথিক হওয়ার চেষ্টায় আছি। জানি না কতটুকু পেরেছি। তবে সেদিনের আচরণে আমি লজ্জিত। আমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে মাফ করে দিন’।

কথা টা বলতে গিয়ে কখন যে চোখে পানি চলে এসেছে বুঝতেই পারি নি। মুখ তোলার সাহস টুকুও পাচ্ছি না। অনেক সময় হয়ে গেলো অথচ আয়েশার কিছু না বলাতে মনে মনে ভাবলাম হয়তো ওর আমাকে পছন্দ না। না হওয়াটা এখন স্বাভাবিক। তাই হতাশ হয়ে বললাম, ‘আমাকে মাফ করে দিয়েন। ভালো থাকবেন, আসসালামু আলাইকুম’। বলে পিছু ফিরে হাঁটা শুরু করতেই পেছন থেকে কান্না জড়িত কণ্ঠে শুনতে পেলাম, ‘আমাকে সাথে নিয়ে যাবেন না’? পিছে ফিরে তাকিয়ে দেখি আয়েশার চোখে জলটলমল করছে। কাছে এগিয়ে আসতেই কাঁপা কাঁপা হাতে ওর চোখের জল মুছে দিলাম। আলতো করে আমার হাতটা জড়িয়ে ধরলো ও। সব অপূর্নতাই হুট করে যেন পূর্ণতা পেয়ে গেলো।

আয়েশার বাবা, মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে রাতেই ওকে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। আমার সাথে আয়েশাকে দেখে মা-বাবা দু’জন কি যে খুশি তা বলে শেষ করতে পারবো না। এশার নামাজ আমি আয়েশাকে সাথে নিয়ে আদায় করলাম। তারপর মোনাজাত ধরে আল্লাহর কাছে লক্ষ, কোটি শুকরিয়া জানাচ্ছি আর ভাবছি, আল্লাহ আমাকে এমন নিয়ামত দান করেছেন যার শুকরিয়া করে হয়তো শেষ করতে পারবো না। এমন একটা নেককা্র স্ত্রী যার আছে তার জীবনে আর বেশি কিছু চাওয়ার থাকে না। জোছনা রাত, আয়েশাকে নিয়ে ছাদে বসে আছি। আল্লাহর নিয়ামত প্রকৃতি আজ অপার সৌন্দর্যে সেজেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি অপলক আর পাশে আমার সহধর্মিনী স্ত্রী। এত নিয়ামতের শুকরিয়া করে শেষ করতে পারবো না৷ তবুও মনটা একাই বলে উঠলো, যা পেয়েছি তার জন্য আলহামদুলিল্লাহ।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত