চিলেকোটার প্রেম

চিলেকোটার প্রেম

ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মাঝে কিছু সময় পর পর বাজ পড়ছে৷ ছুটির দিনের সকাল৷ ভেবেছিলাম জমিয়ে ঘুম দিবো৷
আমার জমিয়ে ঘুম দেয়ার ইচ্ছেটার অবসান ঘটে রুমের দরজায় টুকটুক আওয়াজে৷
ঝিম ধরা সকালে আমার চিলেকোটার দরজায় টুকটুক আওয়াজ শুনে অবাক হলাম৷
বিছানা ছেড়ে দরজা খোলামাত্রই দারোয়ান চাচার পানসে হাসিটা দেখে দ্বিতীয়বারের মত অবাক করে আমাকে৷
এমনিতে এই বেটার সাথে আমার সম্পর্ক ভালো না৷
ভালো না বলতে একদমই ভালো না৷

“বাবাজি এটা তোমার জন্য”
দারোয়ান চাচা তার হাতের বাটিখানা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন৷ তাও আবার হাসি মুখে৷
চোখ দু’টো ভালোভাবে কচলে নিয়ে আবার তাকাই চাচার দিকে৷
তার কাষ্ঠমুখে এখনো মিষ্টি হাসিখানা ঝুলছে৷
এতক্ষণে নিশ্চিত হলাম ঘটনা সত্য৷
-কে দিয়েছে এই বাটি?
-ঐ যে টুম্পা মামনী দিয়েছে৷ তোমার জন্য!
চাচার কপালে হাত দিয়ে দেখলাম৷ না জ্বর আসেনি৷ শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক আছে৷
-চাচা মজা নিচ্ছেন? ঐ মেয়ে আমার জন্য বিরিয়ানী দিবে৷ তাও আবার এত সুন্দর বাটিতে?
চাচা এবার একটু বিরক্ত হলেন৷ এতক্ষণ মুখে ঝুলিয়ে রাখা হাসিখানা গায়েব হয়ে গেল৷
মুখের কাষ্ঠভাবটা আবার ফুটে উঠছে৷
আর কিছু জিজ্ঞেস না করে চাচার হাত থেকে বাটিখানা নিয়ে ভিতরে চলে আসি৷
বাটির ঢাকনা খুলতেই বেহুশ করে দেয়া বিরিয়ানী সুগন্ধি ছড়ালো৷
এক লোকমা মুখে দিতে যাবো হাত না ধুঁয়ে৷
ঠিক তখনই মনটা কুহু ডেকে উঠলো৷
৩য় তলায় থাকা টুম্পা নামের সুন্দরী আর বদমেজাজি মেয়েটার সাথেও আমার সম্পর্ক তেমন ভালো না৷
বারকয়েক ঝগড়া হয়েছে এরইমধ্যে৷

৫তলা ফ্লাটের ছাদের কোণের চিলেকোটায় যেদিন উঠেছিলাম৷ ঠিক তারপরের দিনই মিষ্টি চেহারার ভয়ংকর রাগী মেয়েটার সাথে লেগেছিল একচোট৷
আমার অপরাধ ছিল তার ফুলগাছের ফুল ছেড়া৷
নারীর সাথে ঝগরায় পুরুষরা কখনো জয়ী হতে পারে না৷
তারা হয় ঠোঁটে জিতবে নয় চোখের পানিতে৷
আমিও সেই ধারা ভাঙতে পারিনি৷
পরেরদিন সকালের পর অবশ্য তার ফুলগাছের অস্তিত্ব রাখিনি ছাদে৷

তারপরের কিছুদিন পর আবার বাজলো আরেকচোট৷
গুলুগুলূ গালের বাচ্চা দেখলে আমার হাত নিষফিষ করে সেই ছোটবেলা থেকেই৷
পাশের বাসার বাচ্চাগুলোর গালের উপর অমানবিক অত্যাচার চালিয়ে এসেছি অনেকদিন ধরে৷
সেদিন বিকেলে যখন টুম্পার হাত ধরে তার ভাইয়ের পিচ্চিকরে মেয়েটা ছাদে আসলো৷
আমি আর লোভ সামলাতে পারিনি৷
বেহায়ার মতো গিয়ে টুপ করে গাল দু’টো টেনে দিয়েছিলাম পিচ্চিটার৷
টুম্পা অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে৷
আমি মুচকি হেসে যখন চলে আসছিলাম৷
টুম্পা পেছন থেকে বলেছিল “দেখে নিবো জনাব”
সেই দেখে নিবো জনাব কথাটা টুম্পার সামনাসামনি পড়লেই আপনাআপনি কানের পাশে বাজতে থাকে৷

পুরো ফ্ল্যাটে আমি একমাত্র ব্যাচেলর হলেও সবার সাথে আমার সম্পর্কটা যথেষ্ট ভালো৷ এমনকি বাড়িওয়ালা চাচার সাথেও খুব ভালো সম্পর্ক৷

অলস দিনে যখন আমার চুলোয় আগুন জ্বলে না৷ সেদিন ও আমার হোটেলে খেতে হয় না৷
বাড়িওয়ালা চাচার সাথে ঘন্টাখানেক বেহুদা আলাপ করলেই খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যায়৷
মাঝে মাঝে মনে হয়, বাড়িওয়ালা চাচার একটা মেয়ে থাকা খুব দরকার ছিল৷
সুযোগ বুঝে পটিয়ে ফেলা যেতো৷
আর পটলেই কেল্লা ফতেহ৷

টুম্পার দেয়া বিরিয়ানীগুলোর দিকে আফসোস করছিলাম কেন বাড়িওয়ালা চাচার মেয়ে নেই?
সেই আফসোসের অবসান ঘটালো আবারো কাষ্টমুখা দারোয়ান চাচা৷
আমী বিরক্তমুখে দরজা খুললাম৷
চাচা আবারও হাসি দিলেন৷
এই ব্যাটা আজকে এতো হাসছে কূন?
নিশ্চই কুমতলব আছে৷
তার হাতের কাগজখানা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
-আমি যায়৷
আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই চলে গেল৷

কাগজটাতে বড় বড় করে লেখা
“বিরিয়ানিটা গিলতে পারো নির্দ্বিধায়৷ আমার হাতে বানানো৷
কোনো ভেজাল নেই ছেলে৷
বিকেলে আসবো তোমার চিলেকোটায়৷
প্রেম করতে নয়
বাটি ফেরত নিতে”
ইতি, টুম্পা!

বিরিয়ানীর বাটিটা ঢাকনা দিয়ে ভালোভাবে চেপে দিয়ে টুম্পার দেয়া কাগজখানা হাতে নিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়৷

মিনিট দুয়েক পর্যবেক্ষণ করে দেখলাম, কোনো এঙ্গেলেই নিজেকে ভিন্ন মনে হচ্ছে না৷
যা দেখে টুম্পা নামক মেয়েটা হুট করে প্রেমে পড়ে যাবে!
যদিও সে বলেছে, প্রেম করতে নয়৷ বাটি ফেরত নিতে আসবে!
বাটি তো দারোয়ান চাচাও ফেরত নিয়ে যেতে পারে৷
কিন্তু টুম্পা আসবে কেন?
ভাববার বিষয়৷
ভাবনা শুরু করার আগেই বাজ পড়ার শব্দে ভাবনার ইতি ঘটলো৷
সাথে গত বিকেলের ঘটনাটাও মনে পড়েছে৷
আজকাল সব ভুলে যাচ্ছি৷

গতবিকেলে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির বেগটা হুট করে বেড়ে গিয়েছিল৷
বৃষ্টিতে ভেজাটা চিরকালই আমার কাছে অষ্টাদশী বালিকার ন্যাকামো ছাড়া কিছুই মনে হয়নি৷
কিন্তু কাল হুট করেই ইচ্ছে হলো বৃষ্টিতে ভিজি৷
যেই ভাবা সেই কাজ৷
চোখ দু’টো বন্ধ করে আকাশের দিকে মুখ দিয়ে যখন ভিজছিলাম৷
অদ্ভূত এক ঘোরলাগা অনূভূতি সৃষ্টি হয়েছিল আমার নিউরনে৷
সেই ঘোরটা ভাঙে বাজ পড়ার বিকট শব্দে৷
বাজ পড়ার সাথে সাথে আমার শূন্যবুকে হালকা জোরে ধাক্কা অনূভব করি৷
ঘোরের মধ্যে ভেবেছিলাম বাজটা বুঝি আমার বুকেই পড়েছে৷
ঘোর সামলে চোখ মেলতেই পিলে চমকে উঠি৷
বাজ পড়ার শব্দে যতটা চমকাইনি! তার চেয়ে বেশি চমকেছি টুম্পা নামক বদমেজাজি মেয়েটা আমার সামনে জবুতবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷
ভেজা চুলগুলো মায়াবী মুখে লেপ্টে আছে৷
এক মূহূর্তের জন্য মনে হল, গালগুলো আলতৈ পরশে ছুঁয়ে দিই৷
পরে ভাবলাম না থাক৷
ভেবেছিলাম একটা ধন্যবাদ পাবো৷
সেই ভাবনায় জল ঢেলে দৌঁড়ে পালালো টুম্পা৷
আর এত প্রেমময় একটা মূহূর্ত কিনা একদিনের ব্যবধানে আমি দিব্যি ভুলে গেছি৷
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবার কথাটা মনে করলাম “আমি উন্নত শ্রেণীর খাটাশ”৷
যা মনে রাখা দরকার তা রাখিস না৷ আর যা কিছু দরকারের মধ্যে পড়ে না সেসব তোর মনে থাকেনা৷
আসলেই মনে থাকে না৷
নয়তো বাড়িওয়ালার মেয়ে না থাকার ভাবনাটা মাথায় থাকলেও, গতকালের প্রেম হওয়ার মতো মূহুর্তটা ভুলে গিয়েছিলাম৷

দরজায় টুকটুক শব্দ করে বিকেল নাগাদ যখন টুম্পা আমার চিলেকৌটায় এসে হাজির হয়৷
তখন আমার হাঁড় কাঁপানো জ্বর৷
নিদারুণ কষ্টে মাঝে মাঝে চোখ দু’টো যখন মেলি আমি৷
তখনই দেখি, টুম্পা নামের বদমেজাজি মেয়েটা আমার শিয়রে উৎসুক চোখে বসে আমার কপালে জলপট্টি দিয়ে চলেছে৷
মুখে তৃপ্তির হাসি এসে হাজির হয়৷
আমার হাসি দেখে টুম্পা কপট রাগ দেখিয়ে বলে,
যা সহ্য করতে পারোনা৷ তা করতে যাও কেন?
কে বলেছে বৃষ্টিতে ভিজতে৷ অতো রোমান্টিকতা আমার পছন্দ নয়” বুঝেছো ছেলে?
আমি ধরা গলায় বলি,
না ভিজলে কি আর এতো সহজে তোমার ভালোবাসায় সিক্ত হতাম বলো?
উত্তর দাও মেয়ে৷

টুম্পা মিনিট খানেক চুপ থাকে৷ তারপর কানের কাছে মুখ এনে ফিশফিশিয়ে বলে” কে বলেছে আমি কালই প্রেমে পড়েছি? পড়েছিতো সেই কবেই৷

যেদিন সাতসকালে দেখেছিলাম, চিলেকোটার বদ ছেলেটা আমার সাথে ঝগরা লাগিয়ে চুপি চুপি সব ফুল ছিড়েছে৷
আমার বাসার দরজায় কলিং বেল বাজিয়ে পালিয়েছে৷

বদ ছেলেটার বদ কাজগুলো আমার মনে ধরেছে বড্ড৷
ভালোবাসি অকারণে৷”
চোখ মেলে হাসার চেষ্টা করি একবার৷
টুম্পা মুখে রাগী ভাব এনে, তার নরম হাতের আঙুল দিয়ে আমার ঠোঁট দু’টো চেপে ধরে বলে,
হাসবেনা বদ ছেলে৷ অকারণে ভালোবাসিনা৷ বদছেলের মুচকি হাসিটাই সর্বনাশ করেছে আমার৷
পরেরবার থেকে মুচকি হাসিটা শুধু আমার সামনেই দিবে৷
আর সবার সামনে দাঁত কেলানো বিশ্রি হাসি দিবে” বুঝেছো ছেলে?
থাক উত্তর দেয়ার দরকার নেই৷
চুপ থাকো৷

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত