অভিমান

অভিমান

” আমি আপনাকে কত করে বলব। এসব ভালবাসা আমার দাঁড়া হবে না। আমি খুব একটা ভদ্র ছেলে। আমি এসব ভালবাসা বিশ্বাস করি না। ” এই কথা বলে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। আমি হিমু। আমার কাজ শুধু ডাকপিয়ন। ডাকপিয়ন হিসাবে দায়িত্ব পালন করা। আমার মাঝে খুব অভাব। কষ্ট করে জীবনযাপন করি। কয় টাকার বেতন পাই। তার মধ্যে সংসার করা প্রশ্নই আসে না। আমি একটা ফ্ল্যাটে থাকি। এই ফ্ল্যাটে প্রায় ১০ টা পরিবার থাকে। তার মধ্যে আমি একজন। মা- বাবা গ্রামে থাকেন। উপরের কথাগুলো একটা মেয়ে কে বললাম। মেয়ে টা নাকি আমাকে তার মনের মধ্যে জায়গা করে দিয়েছে। মেয়ে টা অবুঝ। দেখতে একদম সহজসরল। মেয়ে টা কে যে কেউ সাথী করে নিবে। আমার থেকে অনেক ভালো ছেলে পাবে। মেয়ে টা কে দেখলাম এই কথা গুলা বলার পর আমার কাছে আসল। আমার কপালের দিকে চেয়ে বলে ” সারাদিন এতো কঠোর পরিশ্রম করেন কেন? বাসায় তো বউ নেই। আপনি তো নিজে রান্না করে খান। আমাকে নিলে তো আর নিজে রান্না করা লাগবে না। ” আমি কথায় এই মেয়ের সাথে পারব না। মেয়েটার মাথায় অনেক বুদ্ধি আছে। আমি কোনো কথা না বলে চলে আসলাম। আমার কাছে কোনো যুক্তি নেই।

পরের দিন সকাল বেলা দেখি আমার দরজার মধ্যে কে যেন কলিংবেল বাজাচ্ছে। আমি আস্তে আস্তে করে দরজা টা খুললাম। দরজা টা খুলে মেয়ে টা কে দেখতে পেলাম। মেয়ে টা আমার দিকে লাজুক চোখে তাকিয়ে বলে ” আপনার জন্য করে নিয়ে আসলাম। আপনার তো আজ জন্মদিন। তাই ভাবলাম আপনাকে তো তেমন কিছু উপহার দিতে পারব না। এরজন্য পায়েস করে নিয়ে আসলাম। ” আমি মুচকি হাসি দিয়ে বললাম ” আপনি জানেন আমার জন্মদিন আজ? মেয়ে টা মাথা নিচু করে বলে ” পছন্দের মানুষের জন্মদিন কি কখন ভুলা যায়। ” আমি ভিতরে গেলাম। ভিতরে গিয়ে একটা বাসনের মধ্যে পায়েস রেখে দিয়ে মেয়েটার বাসন নিয়ে আসলাম। মেয়ে টা কে বললাম ” আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। ” মেয়ে টা মাথায় উড়নো দিয়ে চলে গেল।

হাত-মুখে ধুয়ে পায়েস খেতে শুরু করলাম। পায়েস খুব ভালো হয়েছিল। আমি সব খেয়ে বাসার ছাদের উপর গেলাম। ছাদে গিয়ে ভাবলাম মেয়ে টা অনেক ভালো। আমার যত্ন করে। আমার জন্য রান্না করে। মেয়ে টা কি সত্যি আমাকে ভালবাসে। নাকি অভিনয় করে। আমি কিছুই বুঝতে পারি না। তবে মেয়ে টা অন্য ৫-৬ টা মেয়ের মতো না। একটু লাজুক। আমাকে অনেক সম্মান করে। আমি আকাশের দুই টা পাখি কে দেখতে পেলাম। তারা আকাশের মধ্যে উড়ে যাচ্ছে। আমি কাঁধ ঘুরিয়ে যখন নিচে নামতে যাব তখন দেখি মেয়ে টা আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে।
মেয়ে টা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে ” আমাদের বাসায় আজ আপনার দাওয়াত। আমাকে জামাই পক্ষ দেখতে আসবে। আপনি তো আমাকে পছন্দ করেন না। তাই আমি আপনার সংসারে যেতে পারব না। ” মেয়ে টা এই কথা বলে নিচে নেমে গেল। আমি একটু ভাবলাম। মেয়ে টা কে কষ্ট দেওয়া যাবে না। মেয়ে টা আমাকে খুব ভালবাসে। মেয়ে টার মনের কথা আমাকে বলে দিয়েছে। আমি এতো নিষ্ঠুর হতে পারি না। আমি বাসার ছাদ থেকে নেমে যাব এমন সময় দেখলাম বাসার একজন দাদি আমাকে ডাক দিলেন। আমাকে বললেন ” এই রকম মেয়ে নাকি ভাগ্যবান ছেলেরা পেয়ে থাকে। ” আমি দাদির কাছে গিয়ে বললাম ” মেয়ে টা আমাকে ভালবাসে কেন? ” দাদি আমার কপাল হাতিয়ে বলেন ” ছেলে টা তো বোকামো রকম। তাই মেয়ে টা খুব পছন্দ করে। ” আমি রুমে গিয়ে আয়নার মধ্যে মুখ টা দেখলাম। দেখতে এতো টা কিউট না তবে একটু মায়া আছে। আমি নিজে কে প্রশ্ন করলাম ” মেয়ে টা কে ভালবাসি কিনা? ”
ভিতর থেকে উত্তর আসল। চেষ্টা করতে পারি। আমি একটা পাঞ্জাবি পরলাম।
পাঞ্জাবী পড়ে নিজে কে একবার দেখে নিলাম।

মেয়েটার বাসায় কত মানুষ। সবাই আমাকে দেখে অবাক হলো। আমি তো ডাকপিয়ন। ডাকপিয়ন কে মানুষ একটু সম্মান করে। আমি ইচ্ছা করলেই সকলের চিঠি পড়তে পারি। তাই মানুষ ভাবে আমি সকলের চিঠি পড়ি। আমি মেয়ে টা কে দেখতে ভিতরে গেলাম। মেয়েটা কে বললাম ” ছেলে যাতে আপনাকে পছন্দ না করে তেমন করে সাজবেন। ” মেয়ে টা আমার প্রশ্নর উত্তর বুঝে গেল। মেয়ে টা মুচকি হাসি দিয়ে বলল ” ছেলে যদি আমাকে পছন্দ করে তাইলে বাবা বলছেন বিয়ে দিয়ে দিবেন।

আমি কিছু বললাম না। খাবার টেবিলে বসলাম। মানুষ খাবারের প্রশংসা করছে। আমি একটা সময় পর দেখলাম মেয়ে টা ট্যাড়া ভাব নিয়ে জামাই পক্ষের সামনে এসে বসল। জামাই বাবাজি একদম বেহুশ। মনে হচ্ছে তার পেটের ভিতর কেউ লাল মরিচ ঢুকিয়ে দিয়েছে।
রাতে ফোন আসল মেয়ে তাদের পছন্দ হয় নি।

আমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাসায় আসছি। এমন সময় দেখলাম রাস্তায় একজন বিক্রেতা ফুল বিক্রি করছে । আমি একটা গোলাপ ফুল কিনলাম। গোলাপ হাতে করে বাসায় আসলাম। আমার সামনে মেয়ে টা কে দেখতে পেলাম। মেয়ে টা কে দেখতে পেলাম শাড়ি পড়ে আছে। আমি মেয়ে টার দিকে একবার তাকিয়ে মাটির নিচে তাকালাম। মেয়ে টা বুঝতে পারছে।
মেয়েটা বুঝতে পারছে আমি লজ্জা পেয়েছি।
মেয়ে টা আমাকে বলে ” আমাকে শাড়ি পড়ে কেমন লাগছে? ”
আমি মেয়েটার কপালের দিকে তাকিয়ে বললাম ” টিপ হলে ভালো হতো। ”

মেয়ে টা রুমের ভিতর গেল। রুমের ভিতর গিয়ে একটা টিপ নিয়ে আসল। আমাকে বলে ” পড়িয়ে দেন আমাকে। ”
আমি হাত কাঁপা হাত নিয়ে মেয়ে টার কপালে টিপ পড়িয়ে দিলাম। মেয়ে টা কে অদ্ভুত সুন্দর লাগল। আমি পকেট থেকে গোলাপ টা বের করে মেয়ে টার কানের নিচে পড়িয়ে দিলাম। এমন সময় মেয়ে টার চোখ বরাবর আমার চোখ টা পরল। মেয়ে টা মুচকি হাসি দিয়ে ভিতরে চলে গেল।

সকালবেলা দাঁত ব্রাশ করতে বাহিরে বের হলাম। ও মা মেয়ে টা দেখি আমার জন্য পানি নিয়ে আসল। আমাকে বলে
” দাঁত কি ভিতরে ব্রাশ করা যায় না? ”

আমি দাঁত ব্রাশ করতে করতে বললাম হাওয়া খাওয়ার জন্য বাহিরে আসলাম। ”
মেয়ে টা মনে হয় আমার কথায় বিরক্ত হলো । তাই দীর্ঘ শ্বাস নিল। মেয়ে টা আমাকে বলে ” আজ কিন্তু আমাকে ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে। ” আমি ঘামছা দিয়ে হাত ধুইতে ধুইতে বললাম ” শুক্রবারে নিয়ে যাব। ” মেয়ে টা কে দেখতে পেলাম একটা ঝাড়ি দিয়ে চলে গেল। তারপর আমি ভিতরে চলে আসলাম।

বাহিরে বের হতেই মেয়ে টা আমাকে একটা ডাক দিল ” এই টা কাজ শেষ করে খাবেন। ” এই কথা বলে একটা দৌড় দিয়ে চলে গেল। আমি দেখতে পেলাম কিছু রান্না করা তরকারি আর ভাত। আমি চুপ করে চলে আসলাম।

আজ শুক্রবার। মেয়ে টা আমার দরজায় এসে বলে ” কি নবাব সাহেব মনে আছে? ”
আমি দরজার মধ্যে হাত রেখে বললাম

” আমার তো কিছু মনে নাই। ” মেয়ে টা কোমরের মধ্যে হাত রেখে রাগি মুখ নিয়ে বলে ” ঘুরতে যাওয়ার কথা। ” আমি মাথায় হাত দিয়ে বললাম ” ও বাবা আমার তো মনেই ছিল না। ঠিক আছে আপনি এখানে দাঁড়ান আমি তৈরি হয়ে আসছি। ” আমি গোসল করতে চলে গেলাম। গোসল করে এসে দেখতে পেলাম আমার সব কিছু গোছালো। আমার খুব ভালো লাগল। মেয়েটা আমার কাছে এসে বলে ” আর কয়দিন অপেক্ষা করতে হবে? ”

আমি হাসি দিয়ে বললাম ” ঘুরতে যাই তারপর আপনাকে সাথে করে নিয়ে বাসায় আসব। ” মেয়ে টা হাসতে হাসতে বাহিরে চলে গেল।

আকাশের দিকে চেয়ে রইলাম। মেয়ে টা আমার পাশে বসে আছে । চারদিকের মানুষ আমার দিকে তাকাচ্ছে। আমি খুব অদ্ভুত। যে ছেলে টা মেয়েদের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকতো সে ছেলে টা আজ একটা মেয়ে কে ভালবাসে। মেয়ে টা আমার দিকে চেয়ে বলে ” ভালো লাগছে কি? ” আমি চোখের ইশারা দিয়ে বললাম ” খুব। ”

মেয়ে টা আমার কাঁধে মাথা রাখল। আমি মেয়েটার মাথায় হাত দিয়ে ঘুমিয়ে রাখতে চেষ্টা করলাম। মেয়ে টা রিক্সার চাকার দিকে চেয়ে বলে ” এভাবে সারাজীবন রাখতে পারবে? ” আমি আমার ঠোঁটে ঠোট লাগিয়ে একটা হাসি দিলাম। রিক্সা থেকে মেয়েটি কে নামিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলাম। আমি অন্য দিন কফি খেয়ে চলে আসি। কিন্তু আজ অন্য কিছু খেতে ইচ্ছা করছে।
হ্যা খেলাম মেয়েটির পছন্দের খাবার।

রাস্তায় খুব রোদ। মেয়ে টা কে দেখতে পেলাম। ব্যাগ থেকে কি যেন বের করছে। হ্যাঁ একটা ছাতা বের করল। ছাতা টা বের করে আমাকে বলে আসেন ছাতার নিচে আসেন। বাহিরে খুব রোদ।

আমি কিছু না বলে ছাতার নিচে আসলাম। মেয়ে টি আমাকে বলে ” সব সময় ছাতা নিয়ে চলাফিরা করবেন। তাইলে রোদ আপনাকে পাবে না। ” আমি ছাতার নিচ থেকে বললাম ” আপনি পাশে তাকলে ছাতার কি দরকার? ” মেয়েটি কে দেখলাম আমার দিকে চোখ মোটা করে তাকিয়ে রইল।

বুঝতে পারলাম। মেয়ে টি রাগ করছে।
রাগ করুক তাতে আমার। এখন তো মেয়ে টি রাগ করবে। অভিমান করবে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত