এলোকেশীর অপেক্ষা

এলোকেশীর অপেক্ষা

“সম্ভবত দুপুর ঠিক ১২টা… আমি বরিশাল থেকে ঢাকা আসার জন্য বাস কাউন্টারে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ব্যস্ত… হঠাৎ একটি মেয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলো – ‘ঢাকা যাওয়ার বাস কাউন্টারটা কোথায় ??’ আমি মেয়েটার দিকে না তাকিয়েই বললাম একটু সামনে… তারপর মেয়েটা এমন ভাবে মাথাটা নাড়িয়ে সামনে গেলো তার সামান্য কিছু কেশ আমার নাকের সামনে দিয়ে বয়ে গেলো… অদ্ভুদ সুগন্ধ, আমার প্রেমে পড়তে এর চেয়ে বেশি সময় লাগেনি !!

মাথাটা ঘুরিয়ে মেয়েটার দিকে তাকালাম… বেশ যুবতী মেয়ে, সম্ভবত নতুন বরিশাল এসেছে… আমি মেয়েটার পিছু নিলাম… মেয়েটা কাউন্টারে চলে গেলো টিকিট কিনতে… আর আমি মনে মনে আশা করতে লাগলাম যাতে মেয়েটার সিট ঠিক আমার পাশেই যেন হয়… এসব কল্পনা করতে করতে হঠাৎ খেয়াল করলাম মেয়েটাকে আর দেখছি না… টিকিট কিনে কোথাও যেন হারিয়ে গেলো… চারপাশে খুঁজেও পেলাম না… আমার কিছুটা মন খারাপ !

মন খারাপ করেই বাস ছাড়ার দশ মিনিট আগেই বাসে উঠে জানালার পাশে আমার সিটটাতে বসলাম… আমি জানালা খুলে বাহিরে তাকিয়ে মেয়েটাকে খুঁজতেছি… বাস ছাড়ার সময় হয়ে গেলো তবুও মেয়েটাকে দেখতে পেলাম না… বাস এবার সত্যিই ছেড়ে দিলো, বাসের চারপাশ তাকিয়ে দেখলাম সবাই যার যার সিটে বসে আছে কিন্তু কোন সিটে সেই মেয়েটা নাই… ইতিমধ্যে লক্ষ করলাম আমার পাশের সিটটা এখনো খালি… তাহলে কি এটাই মেয়েটার সিট ?

আমার পুরো শরীরে ঝড় বয়ে যেতে লাগলো… কেমন যেন একটা অস্থিরতা অনুভব… হঠাৎ বাসটা থামিয়ে ফেললো… জানালা খুলে দেখলাম সেই মেয়েটাই দৌড়ে আসতেছে… আমি যেন খুশিতে অট্টহারা… ইচ্ছে করছে শাহরুখ সেজে গেটের সামনে গিয়ে মেয়েটাকে হাত ধরে বাসে উঠাই, কিন্তু যাই হোক এখন সেটা ঠিক হবে না… তারপর মেয়েটা বাসে উঠেই আমার কাছে ধীরে ধীরে আসতেছে আর আমার হার্টবিট বেড়েই চলছে… পরে মেয়েটা কাছে এসে বললো –

– এক্সকিউজ মি ভাইয়া ?
— জ্বী বলুন…
– আপনার সিটটা আমাকে দিবেন ??
— জ্বী অবশ্যই, বসুন…

মেয়েটা আমার সিটটাতে বসলো আর আমি তার পাশের সিটেই বসলাম… আমার পুরো শরীরে ঝড় বয়ে যেতে লাগলো… কি থেকে কি বলবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না… হঠাৎ মেয়েটা বললো –

– কোথায় যাবেন ??
— ঢাকায় যাবো… আপনি ??
– আমিও তো… ঢাকায় কোথায় ??
— জ্বী যাত্রাবাড়ী… আপনি ??
– ওহ, আমি গাবতলি…
— ওহ আচ্ছা…

তারপর মেয়েটা কিছুই বললো না আমিও আর কিছুই বললাম না… কিছুটা সময় চুপচাপ কেউ কিছুই বলছে না… বাস যতই সামনে আগাচ্ছে আমার হার্টবিট ততই বেড়ে চলছে… কিছুটা সময় পর মেয়েটা আবার আমাকে আবার বলে উঠলো –

– আচ্ছা আপনি কিছু মনে করেননি তো ??
— কেন ? মনে করার মতো কিছু হয়েছিলো কি ??
– এই যে আপনার সিটে আমি বসলাম আর আপনি আমার সিটে ??
— আরেহ নাহ, কিছুই মনে করিনি…
– যাক ভালো লাগলো শুনে… আসলে আমার জানালার পাশে বসতে ভালো লাগে…

আমি আর কিছুই বললাম না… আবার কিছুটা সময় চুপচাপ… বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসতেছে… হঠাৎ আমার মনে হলো মেয়েটা আমাকে পরপর দুইবার নিজ থেকেই কথা বলেছে এবার আমার কিছু তো বলা উচিত… এসব ভেবেই মেয়েটাকে বললাম –

— আচ্ছা আপনার বাসে উঠতে দেরি হলো কেন ?? আর একটু হলেই তো বাস মিস করতেন…
– ওহ, আমি নাস্তা কিনতে গিয়েছিলাম… তাই দেরি হয়ে গেছে…
— কেন দুপুরে খেয়ে আসেননি ??
– হা হা হা… খেয়ে তো আসছি ঠিকই, কিন্তু ঢাকা যেতে তো রাত হবে… পথের মধ্যে যদি খুদা পায় তাই কিনে রেখেছি…
— ওহ আচ্ছা…
– আপনি কিছু নিয়ে আসেন নাই ??
— না, মানে মনে ছিলো না…
– সমস্যা নাই, আমার কাছে যা আছে তা দু’জনের হয়ে যাবে…
— আচ্ছা ঠিক আছে…

মেয়েটা পরে হাসি দিলো আর কিছুই বললো না… আর আমি ভাবতেছি মেয়েটার খাবার খাওয়া ঠিক হবে কিনা ?? যতই ভালো হোক, মানুষটাতো অপরিচিত… পরে ভাবলাম খারাপ হবে না… কথাবার্তা ও ব্যবহার দেখে যা মনে হলো কোন ভদ্র ঘরের মেয়েই হবে… পরে ভাবলাম যাই হোক এর সাথে বন্ধুত্ব করা যেতে পারে… কিছুক্ষণ পর মেয়েটাকে বললাম –

— আপনার নামটা জানা হলো না…
– আমার নাম অরণী, আপনার ?
— সুন্দর নাম… আমি ইমু…
– বাহ, আপনার নামটাও সুন্দর…
— আচ্ছা আমরা পরিচিত হতে পারি ?
– অবশ্যই, পড়াশুনা করেন ?
— জ্বী অনার্স চতুর্থ বর্ষ… আপনি ?
– বাহ, আমি প্রথম বর্ষ…
— কোন কলেজ থেকে অনার্স করতেছেন ?
– তিতুমীর কলেজ… আপনি ?
— ওহ… আমি তেজগাঁও কলেজ…

আমাদের পরিচয় শেষে যে যার মতো করে বসে আছি… বাস তারমতো করে চলতেছে, সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত নেমে এলো… বাসের অধিকাংশ যাত্রীই ঘুমিয়ে আছে… আমার পাশে বসা মেয়েটাও ঘুমানোর জন্য চেষ্টা করতেছে, আমি শুধু একাই জেগে আছি… আমি চাইলেও ঘুমাতে পারছি না, ঘুম আসছে না… কেমন যেন অস্থিরতা মনে হচ্ছে অথচ এমন তো হওয়ার কথা ছিলো না !

কিছুক্ষণ পর লক্ষ করলাম মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়ছে… আর মাঝে মাঝে বাসের ঝাঁকুনিতে তার মাথাটা এপাশ ওপাশ কাত হয়ে পড়তেছে… ব্যাপারটা আমার ভালো লাগেনি… আমি চাইলেও তার মাথাটা ধরে এক সাইড করে দিতে পারি না, সে অধিকার এখনো আমার হয়নি… কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না… আমার পুরো মনোযোগটাই যেন মেয়েটার উপর !

হঠাৎ মেয়েটার মাথাটা এসে আমার কাঁধে এসে পড়লো আর মেয়েটাও ঘুম থেকে চমকে উঠে গেলো… পরে আমার দিকে দুই একবার তাকিয়ে আবার সেই আগেরমতো করে বাসের সিটে মাথা রেখে ঘুমাতে লাগলো… সেই আবারো মাথা এপাশ ওপাশ ঘুমিয়ে পড়তেছে… ঠিক আগেরমতো করেই মাথাটা আমার কাঁধে এসে পড়লো… আমি ভাবলাম এবারো হয়তো উঠে যাবে… কিন্তু না, এবার সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে !

আমি কাঁধ নাড়ালাম না, আরো স্থির হয়ে বসে আছি… আমি চাইনা আমার জন্য মেয়েটার ঘুমটা ভেঙ্গে যাক… সেই সাথে আমার কাঁধে মাথা রাখার কারণে তার মাথার চুল থেকে অদ্ভুদ পাগল করার মতো সুগন্ধ নাকে ভেসে আসছে… আমার পুরো শরীর শিউরে উঠলো, আমি কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না… ঠিক এভাবে দুই ঘন্টার মতো আমার কাঁধে মাথা রেখে মেয়েটা ঘুমিয়েছে… আমার কাঁধ ব্যাথা হয়ে গেছে !!

ঘুম ভেঙ্গে মেয়েটা টের পেল তার মাথাটা আমার কাঁধের উপর… আমিও এক কাত হয়ে আছি… অমনি মেয়েটা কাঁধ থেকে মাথাটা সরিয়ে ফেললো… আমি কিছুই বললাম না বরং সোজা হয়ে বসলাম… তারপর মেয়েটা বললো –

– সরি, আপনার বুঝি কষ্ট হয়েছে…
— না ঠিক আছে…
– আসলে আমি কখন ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি…
— বুঝতে পারছি…
– আচ্ছা আমরা কতদূর আসছি ?
— প্রায় কাছাকাছি, ঢাকা আসতে আর এক ঘন্টার মতো লাগতে পারে…
– ওহ, নিশ্চই আপনার খুব খুদা পেয়েছে…
— হুম, তা একটু পেয়েছি… মেয়েদের দেখেশুনে রাখলে যে কারোর অল্পতেই খুদা পেয়ে যায়…
– হা হা হা… আপনি তো দেখছি বেশ মজার মানুষ…
— কি জানি, আমার মনে হয় না…

তারপর মেয়েটা তার ব্যাগ থেকে খাবার বের করলো… আমি দেখতে পেলাম সেখানে এক প্যাকেট বিস্কুট ও এক প্যাকেট পাউরুটি ও একটিমাত্র কলা রয়েছে… আমরা বিস্কুট ও পাউরুটি দু’জনই একসাথে খেলাম… পরে মেয়েটা কলাটা খাওয়ার জন্য বের করলো, আমি ভাবতেছি কলা একাই খাবে নাকি আমাকে দিয়ে দিবে… পরে দেখলাম মেয়েটা কলাটা দু’ভাগ করে বড় অংশটা আমাকে দিলো আর ছোট ভাগটা সে নিলো… বিশ্বাস করুন এই ব্যাপারটা আমার বড্ড ভালো লেগেছে… পুরো জার্নিতে আমার শুধুমাত্র এই ব্যাপারটাই স্মৃতি হয়ে থাকবে !!

আমি মেয়েটার উপর আরো একবার প্রেমে পড়ে গেলাম… কাউকে প্রেমে ফেলতে খুব বেশি কষ্ট করতে হয় না, শুধুমাত্র ছোট কিছু সুন্দর মুহূর্ত উপহার দিতে পারলেই কাউকে গভীরভাবে প্রেমে ফেলা সম্ভব… তারপর আমরা একসাথে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম… বাস যতই ঢাকার দিকে আগাচ্ছে আমার মন ততই খারাপ হয়ে যাচ্ছে… কারণ, বাস থেকে নেমে পড়লেই আমরা যে যার মতো হয়ে যাবো… তবুও আমি সাহস করে মেয়েটাকে বললাম –
— আমরা বন্ধু হতে পারি ??
– হা হা হা… তাহলে আমরা কি ?? বন্ধুই তো…
— না মানে ভালো বন্ধু…
– যেমন ??
— যেমন একে অপরকে তুমি করে বলা… ঢাকায় গিয়ে সময় হলে একবার দেখা করা… ফোনে মাঝে মাঝে কথা বলা… ইত্যাদি…
– হা হা হা… আচ্ছা ঠিক আছে…
— একটা কথা বলি, যদি মাইন্ড না করেন ??
– আরেহ না… মাইন্ড করার কিছু নাই, বলুন…
— আপনার হাসিটা খুব সুন্দর…

মেয়েটা কিছু না বলেই মুচকি হাসি দিলো, যে হাসিতে নিশ্চই কোন রহস্য আছে কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না… সাধারণত মেয়েরা স্বাভাবিক হাসির চেয়ে মুচকি হাসিতে অধিক রহস্য লুকিয়ে রাখতে পারে !!

আমি লক্ষ করলাম মেয়েটা কি যেন ভেবে ভেবে মুচকি মুচকি হাসতেছে… পরে চিন্তা করলাম আমি কিছু ভুল করিনি তো বা ভুল বলিনি তো… আমার কেমন যেন সন্দেহ লাগতেছে… কৌতুহল বসতো মেয়েটাকে জিজ্ঞাসা করলাম –

— কি ব্যাপার হাসতেছেন যে ?? কিছু ভুল বলেছি ??
– না ভুল বলেননি…
— তাহলে শুধু শুধু কেউ হাসে নাকি ??
– আসলে কেউ আমার হাসির প্রশংসা করলে আমার কেন যেন আরো বেশি বেশি হাসি পায়…
— হা হা হা… বেশ মজা পেলাম
– আসলেই…
— আচ্ছা একটুপরই তো নেমে যাবো, আমাকে আবার ভুলে যাবেন না তো ?
– ভুলার তো প্রশ্নই আসে না, বরং আরো ভালো মতো মনে থাকবে
— ভালো লাগলো শুনে
– কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আপনিই ভুলে যাবেন

আমি আর কিছুই বললাম না ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে বুঝালাম আমি ভুলে যাবো কি যাবো না সেটা পরেই বুঝতে পারবেন সব তো আর এখনই বলা যাবে না, ধীরে ধীরে হোক না সবকিছু !

হঠাৎ খেয়াল করলাম আমরা ঠিক ঢাকার কাছাকাছি এসে পড়েছি একটুপরই নেমে যাবো মেয়েটা তার ব্যাগ গুছাচ্ছে আর আমিও নামার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি ৬/৭ ঘন্টার জার্নিটা কিভাবে যে কেটে গেলো বুঝতেই পারলাম না মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগেই তো বাসে উঠেছি এরইমধ্যে বাসের কন্টাক্টারের ডাক, এখনই আমাদের নামতে হবে !

তারপর আমরা দু’জনই বাস থেকে নামলাম তারপর একে অপরের ফোন নাম্বার নিলাম বিদায়ের বেলায় মেয়েটার দিকে তাকালাম, লক্ষ করলাম মেয়েটার মুখে হাসি কিন্তু চোখে পানি টলমল আমারো প্রচণ্ড খারাপ লাগছে মনে হচ্ছে মেয়েটা কিছু বলতে চায় কিন্তু বলতে পারছে না এরইমধ্যে মেয়েটা বলে উঠলো –

– আপনি খুব ভালো একজন মানুষ, মনে থাকবে আজকের জার্নিটা
— আপনিও খুব ভালো, আপনার কথাও মনে থাকবে
– ঐতো একটা খালি রিকশা দেখা যায় আমার যেতে হবে, দেরি হয়ে যাচ্ছে
— আচ্ছা আপনি যান, আমিও এখন সি এন জি ধরে চলে যাবো
– আমার নাম্বার তো আছে, কথা বলতে চাইলে ফোন দিবেন আমি অপেক্ষায় থাকবো
— আমিও আপনার ফোনের জন্য অপেক্ষায় রইলাম

মেয়েটা রিকশায় করে চলে গেলে আমি এখন একা, মনে হচ্ছে একদম একা হয়ে গেছি বাসায় এসে প্রতি মুহূর্ত অপেক্ষায় আছি মেয়েটার ফোনের জন্য আর আমিও ফোন দেইনি, আমি চাই মেয়েটি আগে ফোন দিক হয়তো মেয়েটিও আমার মতো করে অপেক্ষায় আছে ফোনের জন্য জানি না কবে এই অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটবে কবে অদৃশ্য এক ইগোর হাত থেকে সম্পর্কটা বেড়িয়ে আসবে সেই অপেক্ষায় !

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত