অতীতয়ী

অতীতয়ী

মনে করেছিলাম বিয়ের পরে জীবনটা সুন্দর হবে। কিন্তু সুন্দর তো হলোই না বরঞ্চ অমলা অমলা হয়ে গিয়েছে। একটা আনরুমান্টিক মেয়েকে বিয়ে করেছি পারিবারিকভাবে।

নাম আরবী।

দেখতে মনের মতোই কিন্তু তাঁর চলাফেরা মনের মতো না। মনে হয় ঝিমে ধরা রোগী। বাইরে এতো সুন্দর চাঁদ উঠেছে। কোথায় বায়না ধরবে একসাথে চাঁদ দেখার।

তা না আমি বলার পরে বললো, না। বাইরে গেলে ঠাণ্ডা লাগবে। মেয়েরা না কী স্বামীর কাছে শুধু সময় চায়। কিন্তু আমার উনি কী চায় আল্লাহ্‌ জানে। একদিন বললামঃ-

– আরবী।
– হুম।
– কালকে চলো কোথাও গিয়ে ঘুরে আসি। বিয়ের পরে তো আর আমাদের একসাথে কোথাও যাওয়া হয় নি।
– আমার ঘুরতে ভালো লাগে না। আপনার মন চাইলে একা একা গিয়ে ঘুরে আসেন।

এমন কথা শুনার পর আর ঘুরার আগ্রহ থাকে না। মাঝে মাঝে আমি দুষ্টামি, মজা করার চেষ্টা করি কিন্তু আরবী নিজেকে গুটিয়ে রাখে। যেনো আমি পরপুরুষ! সারাদিন অফিস করে আসার সময় যখন হাতে ফুল নিয়ে আসলে ও আরবীর মুখে হাসি দেখতে পাই না। তখন মনে হয় আমার সারাদিনটাই মাঠি।

অনেক চেষ্টার পরে ও যখন আরবী স্বাভাবিক হলো না তখন আমি আরবীর স্বাভাবিক হবার চিন্তা ছেড়ে দিয়েছি। ভুলে গিয়েছি আমার ঘরে বৌ নামক কোনো প্রাণী আছে।
হানিমুনের কথা শুনার পরে আরবীর মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পরলো এমন। আমি সব কিছু বাতিল করে দিয়েছি। এতে আরবী খুশি হলো কমপক্ষে। এর মাঝে অফিসে একটা মেয়ে জয়েন করলো। নাম নূপুর। আমার পাশেই তাঁর কাজের সিট। যে কারণে টুকটাক কথাবার্তা হয়। আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব। কিছুদিন যাওয়ার পর নূপুর আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পরে। তা আমি নূপুরের চোখ দেখলেই বুঝতে পারি। নূপুর এটাও জানে যে আমি বিবাহিত।

তবুও কেনো জানি না নূপুর আমার সঙ্গ চায়। অফিসে একটু দেরি করে গেলে রাগ করে। অফিস শেষে প্রতিদিন একসাথে বসে চা খাওয়া হয়। নাহয় কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়। শপিং তো আছেই। আমি যে বিবাহিত এটা মনে করিয়ে দেয়ার জন্য বারবার নূপুরকে আরবীর কথা বলি। নূপুর কিছু মনে করে না। বলে, ‘তো কী হয়েছে? এমন কোনো কথা আছে নাকি যে বিয়ের পরে কোনো মেয়ের সাথে ঘুরা যাবে না?’ আমি জবাব কী দিবো? তা খুঁজে পাই না। একরকম ঝামেলায় পরে গেলাম। এদিকে নূপুর আমাকে ছাড়া কিছু বুঝেই না। সপ্তাহে সাত দিন নূপুরের সাথে দেখা করতে হয়।

প্রায় সারাটাদিন নূপুরের সাথেই কাটানো হয়। অফিসে আর ফোনের কথায়। কিছুক্ষণ পরপর ফোন করে। এখন এরকম হয়েছে যে রাতে ঘুমানোর সময় যখন আরবী বিছানায় ঘুমাতে আসে।

তখন বুঝতে পারি যে আরবী নামে কেউ একজন এই বাড়িতে থাকে। প্রায় ছয়মাস এভাবে যাওয়ার পর নূপুর বলছে যে তাঁকে ও বিয়ে করতে হবে! আমি বুঝানোর অনেক চেষ্টা করছি কিন্তু নূপুর বলছে আমার স্ত্রী হিসেবে শুধু একটা দিন আমার সাথে কাটাতে চায়। আর কিছুই আমার থেকে চায় না। আমি এটা করতে পারবো না। ঝামেলা হলো নূপুর ও মানতে চায় না। মাঝেমধ্যে এখন এরকম বলে যে আমাকে না পেলে না কী আত্মহত্যা করবে! প্রায় এক বছরে ও যার সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কে আসা গেলো না। তাঁর সাথে মনে হয় না আর স্বাভাবিক হওয়া যাবে। আমারো মনে হয় আরবী কোনো কারণে হয়তো আমাকে পছন্দ করে না। বা অকারণেই। আজকে বললামঃ-

– আরবী।
– হুম।
– তুমি মনে হয় আমাকে পছন্দ করো না। সেটা যে কারণেই হোক। যতটুকু বুঝেছি তোমার বাবার মান সম্মানের দিকে তাকিয়ে তুমি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্পর্কের অভিনয় করে যাচ্ছো। কিন্তু মনের বিরুদ্ধে সারাজীবন থাকা যাবে না। আমাদের আলাদা হওয়া উচিৎ।
– হঠাৎ আলাদা হওয়ার কথা বলছেন কেনো?
– বোকার মতো একটা প্রশ্ন করলে! যেখানে বিয়ের প্রায় এক বছরে তোমার হাতটা পর্যন্ত ধরার সাহস পেলাম না সেখানে সারাজীবন একসাথে কীভাবে থাকার সাহস করবো? আর তুমি একটা কথা এড়িয়ে যাচ্ছো কেনো? এমন কোনো কথা নেই যে কারো সাথে বিয়ে হলে তাঁকে মেনে নিতে বা পছন্দ করতেই হবে। তোমার অপছন্দ হতেই পারে। কিন্তু সেটা তো বলতে হবে নাকি?
– হাত! শরীর! আপনাদের পুরুষের কাছে শুধু ইত্যাদিরই দাম আছে। একটা মেয়ের মনটা কিছুই না।
– আমি জানি না। এই কথাটা তুমি কীভাবে বলতে পারলে! এই এক বছরে আমি কম চেষ্টা করি নি তোমার মন জয় করতে। বারবার তুমিই নিজেকে সরিয়ে রেখেছো। নূপুরকে পর্যন্ত আমি আমার কাছে আসতে দেই না। শুধু তোমার জন্য।
– নূপুর? নূপুর কে?
– আমার সহকর্মী।
– তাহলে নূপুরই হচ্ছে আলাদা হওয়ার মূল কারণ! ঠিকাছে আমরা আলাদা হচ্ছি।

কথাটা বলেই আরবী বাইরে চলে যায়। বাইরে বলতে একেবারে বাপের বাড়ি। আর আসে নি! কীভাবে যেনো আমাদের ডিভোর্সটা হয়েই গেলো। নূপুর এতে হয়তো খুশি হবে। নূপুর অনেক দিন আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে মানুষের জীবনে এমন হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ে করলে সব ঠিক হয়ে যায়। নূপুরের ধৈর্য আর সহায় হয় নি। অফিস বদলি করে বান্দরবন চলে যায়। শুনেছি সেখানে না কী বিয়ে ও করেছে। খুশির খবর। সুখে থাকুক এটাই কামনা।

বাড়ি থেকে ও অনেক চাপ দিচ্ছে আরেকটা বিয়ের জন্য। কিন্তু আমি পারবো না আরেকটা বিয়ে করতে। আরবীকে এক সেকেন্ড এর জন্য ও মাথা থেকে দূরে ফেলতে পারি না। আমি আরবীকেই চাই।

পাঁচ বছর কেটে গিয়েছে। কালকে আমার জার্মানে যাওয়ার দিন। প্রমোশন হয়েছে। চিন্তা করছি বাঁকি জীবনটা সেখানেই কাটিয়ে দিবো। আরবীর স্মৃতি বুকে নিয়ে। ট্রেনে উঠেছি। একদিন আগে আমার এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে হবে। অনেক কাজ বাঁকি। এখন চোখে একটা চশমা ও লাগে আমার। চোখে কম দেখি। চুল দাঁড়ি পাঁকা শুরু করেছে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ ছোট্ট একটা বাচ্চা ছেলে এসে আমার প্যান্ট ধরে বললোঃ-

– আংকেল আংকেল, আপনার কাছে পানি হবে?
আমার ব্যাগে পানি ছিলো আমি তা বের করে দিয়ে বললামঃ-
– তুমি কীভাবে বুঝলে যে আমার কাছে পানি আছে?
– আপনার কাছে তো ব্যাগ আছে।
– ব্যাগ তো আরো অনেকের কাছেই আছে।
– কিন্তু অনেকের চোখেই চশমা নেই। যারা চোখে চশমা পরে মা বলে তাঁরা বেশি পানি পিপাসু হয়।
– তোমার মা খুব বুদ্ধিমতী তাহলে।

বলে আমি হাসলাম। ছেলেটা পানির বোতলের অর্ধেক পানি পান করতেই তাঁর মা তাড়াহুড়ো করে, পাজি ছেলে। বলতে বলতে ছুটে আসলো। আমার কাছে আসতেই ছেলেটাকে কোলে নিলো।

কোলে নিয়ে কিছু বলতে যাবে তখনি সে স্তব্ধ হয়ে গেলো! সঙ্গে আমি ও! চোখের চশমাটা খুলতে খুলতে মুগ্ধ হয়ে দেখছি! চিরচেনা সেই মুখ। সেই আরবী! আজ ও গায়ের রঙ চুল পরিমাণ মলিন হয় নি। আগের থেকে আরো সুন্দরী হয়েছে বটে। বুকের ভিতরটা কিরকম শব্দ করছে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত