আজও পারি নি বলতে তোকে

আজও পারি নি বলতে তোকে

শীতের শিশির ভেজা ঘাসের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অজানা এক অনুভূতি পাওয়া যেন আমার এ’কদিনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজও তার ব্যতিক্রম হবে কেন? তাই তো সকাল সকাল শিশির ভেজা ঘাসে উপর হাঁটছি আমি। চারপাশে কুয়াশার চাদর-এ ঢাকা রয়েছে। এই কুয়াশাকে আমার প্রচণ্ড রহস্যময় মনে হয়। কেমন করে আগলে রাখছে আমার দৃষ্টি শক্তি। যা সত্যিই রহস্যময় করে তুলছে। যেন এটাই রহস্যময় আমার সেই অতীত।

আজ রাতে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। তাই যেন বেশিক্ষণ ধরেই হাঁটছি। আম্মু তো কবে একদিন বলেই ফেলেছিল, “তোকে তো দেখছি মেয়েদের অভ্যাসে ধরে ফেলেছে!” আমি কিছু বলি না, শুধু হাসি। কারণ কাউকে সাথে নিয়ে এভাবে হেটেছি বহুকাল আগে। দিন কতক আগে আমেরিকা হতে দেশে এসেছি প্রায় পাঁচ বছর পর। ভেবেছিলাম ওখানেই স্থায়ী হয়ে যাব। কিন্তু বাবা মায়ের জন্যে আবার ফিরে আসলাম। দেশে যে আমার প্রাণ প্রিয় মানুষরা আছেন। আমার জন্য জন্য বাবা মা কষ্ট পাবে, বন্ধু বান্ধবরা কষ্ট পাবে, আরও বিশেষ একজন কষ্ট পাবে তাই কী হয়। সে তো আমার জন্যই অপেক্ষা করছে। তাই চলে আসলাম। ঢাকা যাচ্ছি চাকরির জন্যে। অবশ্য চাকরি হয়েই আছে। খালি যোগ দিতে হবে চাকরিতে। আমেরিকা থেকে সরাসরি ঢাকায় চাকরি ঠিক করিয়ে নিয়েছি। এভাবেই কেটেছে কিছু দিন গ্রামে।

ধীরে ধীরে রোদ উঠতে শুরু করলে আমি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

আমি ফয়সাল। রাজশাহী বিভাগের কোনো একটা জেলার গ্রামে আমার বাবা মা থাকেন। গ্রাম হলেও বেশ প্রতিপত্তি আছে আমাদের শহরে এবং গ্রামে। স্কুল পর্যায় গ্রামেই শেষ করেছিলাম। বাকি পড়াশোনা রাজশাহীতে আর ঢাকাতে এবং তারপর আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা নিয়ে একটা জব করছিলাম। বেশি দিন হয় নি। তারপরই দেশে ফিরে এলাম। প্রতিপত্তির জোরেই হোক, ঢাকাতে একটা চাকরীর ব্যবস্থা করে রাখতে দেড়ি হলো না। আর আজ রাতেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিব।

বাসায় ফিরার পরেই আম্মু বলল,

— নবাবের কী মেয়েলীপনা শেষ হলো?

আমি কিছু না বলে একটা হাসি দিলাম। কিন্তু এই হাসিতে কতটা যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে সেটা মা ভালো করেই জানেন। কিন্তু কিছু বলেন না। কারণ তিনি সবটুকু জানেন। কিছু না বলে আম্মুকে একটু ভাত দিতে বললাম।। আম্মু টেবিলে বসতে বলল এবং সেখানে সব তৈরি আছে তা জানালো। আমার আম্মুর একটা ভালো দিক হলো অনান্য মায়েদের মত বিয়ে নিয়ে কখনও উঠে পরে লাগা তো দূরের কথা, বিয়ের কথায় বলেন না। কারণ এই ‘বিয়ে’ কথাটাই আমার ক্ষতকে দ্বিগুণ করে তুলে।

খেয়ে দেয়ে ফ্রেশ হয়ে, বাহিরে বের হলাম। গ্রামের বন্ধুদের থেকে বিদায় নিলাম। আবার না জানি কবে দেখা হয় কে জানে। বিকেলে বাড়ি ফিরে হাল্কা নাস্তা করে বাবা মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে শহরে চলে আসলাম। সূর্য ডুবে গেছে ততক্ষণে, সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। টিকিট কাউন্টার থেকে বাসের একটা টিকিট কাটলাম। বাস ১২ টায় ছাড়বে। এখনো অনেক দেড়ি। সময়টা টিকিট কাউন্টারেই কাটাবো ঠিক করলাম। এমন সময় এক কাছের বন্ধুর ফোন। অনেক খোজ খবর রাখে বন্ধুটা। এইতো পাশের শহরেই ওদের বাড়ি। এই শহরের ওপাশেই বাড়ি। ঢাকা যাচ্ছি জানানো হয় নি। ও যখন জানলো আমি এখানে টিকিট কাউন্টারে একা একা বসে আছি তখন থেকেই জোর জবরদস্তি শুরু করলো ওদের বাসায় যেতে।

আমিও ভেবে দেখলাম মন্দ হয় না। তাছাড়া ওর ২ দুইবছরের একটা ছেলেও আছে। বিশেষত আমার আবার বাচ্চার প্রতি প্রচুর টান। এই স্বভাবটা আমার প্রিয়জনের থেকে পেয়েছি। তাছাড়া অনেক বছর বন্ধুকে দেখাও হবে আড্ডাও হবে। হাতে অনেক সময় আছে এখনোও। শুধু শুধু এখানে বসে হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় মশা তাড়ানোর মানে হয় না। তাই রাজি হয়ে গেলাম। কাউন্টার থেকে বাহির হয়ে একটা একটা অটো নিয়ে লোকাল বাস স্টেশনের দিকে রওনা হলাম। সেখানে পৌঁছে ভাড়া মিটিয়ে একটা লোক ভর্তি বাসে উঠে পড়লাম। তার আগে হেল্পার টাইপ লোকটাকে আসিফের এলাকার ঠিকানা জানালে যাওয়া ইঙ্গিত দিয়েছিল। ও হ্যা ঐ বন্ধুর নাম আসিফ।

৩০ মিনিট পরে পৌছে গেলাম আসিফের এলাকায়। এখান থেকে ৫ মিনিটের পথ। আরেকটা অটো ডেকে উঠে পড়লাম। যখন আসিফের বাড়ির সামনে পৌঁছালাম দেখি আসিফ দাঁড়িয়ে। নামতেই অনেক বছর পর প্রিয় বন্ধুকে কাছে পেয়ে আসিফ আমাকে জড়িয়ে ধরলো। এই বন্ধুটিই আমার পাগলা ভক্ত ছিল। যেখানে অন্যরা স্বার্থ সন্ধানী হলেও একে নিশ্চিন্তে তাদের বিপরীতে ফেলা যাবে। অবশেষে আমাকে ছেড়ে করমর্দন করলো। তারপর বাসার ভিতরে আসতে বলল। আমি অটোর ভাড়া মিটিয়ে আসিফের পিছ পিছ তার বাড়িতে ঢুকলাম। ছিমছাম গোছানো বাসায়। বেশ ভালো লাগলো। বললাম,

— ভাবী মনে হয় বেশ পরিপাটি মেয়ে। গোছগাছ পছন্দ করেন!

আসিফ বলল,

— হ্যাঁ শুধু পরিপাটি নয় খুব ভালো মেয়েও বটে।

আমি খুশিই হলাম। সে আমাকে ড্রইংরুম এ বসালো। এবং বাহির হয়ে তার দুবছরের ছেলেকে এনে আমার কোলে দিল। খুব মায়াবী হয়েছে ছেলেটা। আসিফ জানে আমার বাচ্চার প্রতি দুর্বলতা আছে। আর আমার এখানে আসার পেছনে বাচ্চার অবদান আছে সেটাও তার অজানা। আমার মায়ের পর দ্বিতীয় কেউ যদি আমার ব্যপারে সব জানে সে হচ্ছে আসিফ। আসিফ কে জিজ্ঞাসা করলাম বাবুর নাম কী। সে বলল দীপ। খুব সুন্দর নাম তো বটেই। মানিয়েছেও বেশ। দীপ মানে প্রদীপ। প্রদীপ আলো জ্বেলে উজ্জ্বল হয়। ছেলেও হয়েছে প্রদীপের আলোর মত। সুন্দর এবং মায়াবী।

আমি আসিফের সাথে কথা বলছি আর দীপ-এর সাথে খেলছি। ভাবীও খাবার তৈরি করে এস আড্ডা দিতে বসেছে। ভাবীর নাম আফসানা। আসিফ আর আফসানা দুজনকে মানিয়েছেও বেশ। কিন্তু বুকের কথায় যেন চিন চিন করে ব্যথা করে উঠলো। হয়তো আজ আমারও এমন একটা সুখী গোছানো সংসার থাকতো। যাক যা হবার নয় তা হয় নি। আফসোস একটা থেকেই যায়। ভাবী বলল,

— আসিফের থেকে আপনার ব্যাপারে প্রচুর শুনেছি। তাই এতদিন দেখার ইচ্ছা ছিল। সেই ইচ্ছা আজ পূরণ হলো অবশেষে।

আমি আসিফের দিকে তাকালাম। সে এমন ভাব করলো যেন কিছুই জানে না। একদম সাধু। আমার হাসি চলে এলো। তিনজই হেসে উঠলাম। এই ভাবে কথা বার্তা চলতে লাগলো। হঠাৎ ভাবী আমার বাচ্চার উপর আগ্রহ দেখে বলে উঠলো,

— ভাইয়ার তো বাবুর উপর অনেক আগ্রহ বা দুর্বল। তাইলে একটা বিয়েও তো করে নিতে পারেন। নিজেদের একটা বাবুও পাবেন।

বলেই কী হাসি। আমি আসিফের দিকে তাকালাম। বেচারার মুখ থেকে রক্ত সরে ফ্যাকাশে এবং ভয়ে চুপসে গেছে। আমি হাসি মুখেই ভাবীকে বললাম,

— কী দরকার বলুন তো? এমনি একাকী জীবনে ভালো আছি। নিজের স্বাধীনতা নিয়ে বেশ আছি। নিজের স্বাধীনতা কেই বা হরণ করতে চায় বলুন?

তাও ঠিক বলেই ভাবী হেসে উঠলেন। আমিও হেসে উঠলাম। আসিফ বেচারাও ভয় কাটিয়ে হেসে উঠলো। কিন্তু আমার মন তখন বলছিলো অন্য কথা। যাকে চেয়েছিলাম লাইফে তাকে তো নিজের দোষেই হারিয়ে ফেললাম। অন্য কাউকে তো কল্পণাই করতে পারি না।

খাওয়া দাওয়া করে, বাসের সময় হয়ে এলে আমি তাদের থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে আসি বাসের টিকিট কাউণ্টারে। দেখি বাস এসে পড়েছে। নিজের সিট খুঁজে বসে পড়লাম। জানালার পাশে সিট। বাহ রাত টা তাহলে চমৎকার কেটে যাবে। আচ্ছা একটা ঘুম দেয়া যাবে। মনটা শান্ত করার জন্য ঘুম টা খুব দরকারি।

ঢাকা যখন পৌঁছালাম তখন ভোর। ইশ গ্রামে থাকলে শিশির ভেজা ঘাসের উপর হাটা যেত। মিস করে ফেললাম। যাই হোক, তল্পিতল্পা নিয়ে আমার বাসার উদ্দেশ্যে। ও হো বলা হয় নি যে ঢাকা শহরে একটা ফ্লাট আছে আমার। আগে ঢাকাতে পড়াশোনা করার সময় নিয়েছিলাম ফ্লাট টা। এখানে থেকেই এখন চাকরী করবো। ভাগ্যক্রমে অফিসও পাশের এলাকায়।

ফ্লাট টা সাজানো গোছানোই আছে ৫ টা বছর আগে যেমন রেখে গেছিলাম। খালি ধুলাবালি জমেছে আর কী। আজ সারাদিন যাবে এই পরিষ্কার করতেই। কাল থেকে অফিসে জয়েন করবো ভাবলাম। একটু বিশ্রাম নিয়ে লেগে গেলাম পরিষ্কার করার কাজে।

প্রায় দুপুর হয়ে এল। পরিষ্কার করা শেষ। নিজে পরিষ্কার হয়ে তৈরি হয়ে বাহির বের হলাম এলাকাটা ঘুরে দেখতে। একটা হোটেল থেকে নাস্তা করে নিলাম। পরিচিত এলাকা অপরিচিত হয়ে গেছে। পাঁচ বছরে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে এলাকাটা।

বিকেল বেলা পাশের এলাকায় পৌঁছালাম। এখানেই আমার খুব প্রিয় কেউ একজন আছে। যার উপর অনেক বছরের অভিমান। যাকে সত্য না বলতে পারার কঠিন অনুশোচনা। যার জন্য ৫ বছরেও একবারও দেশে আসি নি কারণ শুধু মাত্র নিজের দোষে সে হারিয়ে গিয়েছিল। ভাবছি আজকে তাদের বাসায় যাব। অনেক দিন হল কথা বলা হয় না, দেখাও হয় নি। যদিও তার অনেক ছবি আছে আমার কাছে। আজ মন খুলে কথা বলব।

ওদের বাসার বেল বাজালে ওর আব্বু অর্থাৎ আঙ্কেল দরজাটা খুলে দেন। আমাকে দেখে চমকে গেলেন। আজ কত বছর পরে দেখছেন আমাকে। অবাক হবেই তো। কোনো কিছু না জানিয়েই চলে এসেছি। কিন্তু সেটা বেশি ক্ষণ স্থায়ী হলো না। পরপরই খুশিতে ভড়ে গেল তার মুখটা। এদিকে আন্টি আমাকে দেখেই কাছে এসে খুশিতে জড়িয়ে ধরলেন।

আঙ্কেল আন্টি আমাকে ভেতরে নিয়ে এল। আমার ভালো মন্দ জিজ্ঞাসা করলো। যখন শুনলো উচ্চশিক্ষা শেষ করেছি তখন আন্টি খুশি হলেন। হবেই না কেন? তিনি আমাকে তার ছেলের মতই ভালোবাসেন। অনেকক্ষণ ধরে অনেক কথা বললেন আঙ্কেল আন্টি। কিন্তু আমার প্রিয় মানুষটার কথা একবারও জিজ্ঞাসা করলেন না। তাই ইঙ্গিত টা আমিই দিলাম। আন্টি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলেন।

আমি বাড়ির পিছনে চলে এলাম। সেখানেই আছে আমার প্রিয় মানুষটা। অনেক খোলা আর পরিষ্কার বাগান এখানে। আমার প্রিয়জনের পছন্দের জায়গা। রোজ পরিষ্কার করা হয় বুঝা যাচ্ছে। আমার সামনেই আছে ও। আমি ওর পাশেই বসে পড়লাম। হঠাৎ বুক ফেঁটে প্রচণ্ড কান্না আসতে লাগলো। আসবেই না বা কেন? কারণ আমার প্রিয়তমা তো বেঁচেই নেই। হ্যা মারা গেছে আজ থেকে ৫ বছর আগে।

আমার সামনেই শুয়ে আছে সে। চির নিদ্রায়মাণ সে এখন। যে নিদ্রা ভাঙা কখনোও সম্ভবপর নয়। এইতো শুয়ে আছে আজ মাটির নিচে আজ ৫ বছর ধরে। হ্যা আমার সামনে আমার প্রিয়জনের কবর। এইতো সামনেই ফলকে লিখা তার নাম জিনিয়া সিদ্দিকা।

পুরোনো স্মৃতি গুলো উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করলো। কতই কতোই না মিষ্টি ছিল সে দিনগুলি। যা আজ মাত্রই স্মৃতি। প্রচণ্ড অভিমানী ছিল মেয়েটা। আর প্রচণ্ড রাগীও ছিল।

“জিনিয়ার সাথে আমার পরিচয় হয় আজ থেকে ১০ বছর আগে। তখন আমি কলেজে ১ম বর্ষে পড়তাম। জিনিয়াও সেম ক্লাস ছিল। জিনিয়ার সাথে পরিচয় ভার্চুয়ালেই। একটা পোষ্টের কমেন্ট থেকেই পরিচয়। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে কথা বার্তা শুরু হয় আমাদের। এক পর্যায়ে বন্ধুত্বও হয় আমাদের। সে তখন আমাদের পাশের জেলায় থাকতো। যার ফলে দেখা হওয়াতে খুব একটা অসুবিধা হয় নি। খুবই খুনশুটির বন্ধুত্ব ছিল আমাদের। সারাদিন খুনশুটি করতাম। আর শেষ বেলায় ওকে রাগিয়ে দিয়ে বিদায় নিতাম। এটাই ছিল আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস।

এক পর্যায়ে আমাদের ১ম বর্ষ শেষ হলে জিনিয়ারা স্বপরিবারে ঢাকা চলে যায়। এর ফলে দেখা করাও কম হতো। ৬ মাসে ১ বার কী ২ বার দেখা হতো। তাছাড়া রোজ কথা বার্তা হতো। এভাবেই চলছিল দিনগুলো।

একদিন দেখা হয়। সেদিন সে আজব কাণ্ড করে বসেছিল। আমাকে সে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। আমি তখন বড় আপুদের উপর ক্রাশ খেতে ব্যস্ত ছিলাম। আমার মনে আছে, আমি তখন তার প্রস্তাব শুনে তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। কারণ আমি এসব ব্যাপারে ভাবিই নি তখন। আমি বলেছিলাম, ‘ফান করছিস’। ও উত্তর দিয়েছিল, ‘নাহ।’ আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। নাহ সেখানে মজার কোনো আভাস ছিল না। একটা সিরিয়াস টাইপ লক্ষণ ছিল মুখে। আমার দিকে চেয়ে মুখ টা নামিয়ে দিয়েছিল। আমি কিছুই বলি নি সে বেলায়।

পরে জিনিয়া নানা ভাবে তার ভালোবাসার কথা বুঝাতে চেয়েছিল। আমি না বুঝেও বুঝতাম। সে আমার খেয়াল রাখা বাড়িয়ে দিয়েছিল। সারাক্ষণ এটা করবা না ওটা করবা বলে বকা দিত। আমিও করেও করতাম না বলে রাগিয়ে দিতাম। আর সেই রাগ দেখার মত নাহ। কাছে পেলে আস্ত চিবিয়ে খেয়ে নিবে যেন। কথা বলা অফ করে দিত। তবুও বেশিক্ষণ না বলে থাকতে পারতো না।

একপর্যায়ে জিনিয়াকে বলেছিলাম, ‘আমাকে এতোই ভালোবাসিস তো আমার মাকে রাজি করাতে পারবি। যদি আমার মা রাজি হয়, তাহলে আমার পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই।’ সেদিন সে শুধু আচ্ছা বলে কেটে দিয়েছিল। এরপর একসপ্তাহ কোনো কথা বার্তা হয় নি তার সাথে। ভেবেছিলাম হয়তো ভয় পেয়েছে বা ভালোবাসার নমুনা। কিন্তু সে আমার অনুমানকে ভুল প্রমাণ করেছিল।

এক সপ্তাহ পর আম্মু আমাকে ফোন দেয়। আম্মু জানায় বৌমা নাকি খুব সুন্দর আর সুন্দর ভালো মন।

আমি অবাক হয়েছিলাম, কে তার বৌমা? আম্মুকে বলতেই জিনিয়ার নাম বলেছিল। একটা মেয়ে এক সপ্তাহের মাঝে আম্মুকে রাজি তো করিয়েছে সাথে মায়ায় ফেলেছে। এই মেয়ে তো ভাঁড়ি সাঙ্ঘাতিক। আমার সাথে যতক্ষণ কথা বলেছিলাম ততক্ষনই জিনিয়াকে নিয়েই কথা বলেছিল। শেষে খালি বলেছিল,”মেয়েটাকে কষ্ট দিস না। প্রচণ্ড অভিমানী আর রাগি। কখন কী করে বসবে। তোকে প্রচণ্ড ভালোবাসে আমি বলছি।” বলেই কেটে দিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর্যন্ত আমি কানে ফোন ধরে বসেছিলাম।

সেই প্রথম জিনিয়াকে নিয়ে ভালো করে ভাবতে শুরু শুরু করেছিলাম। যতই ভাবছিলাম ততই যেন ভালো লাগছিল। “সর্বনাশ এই মেয়েকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছি” এটাই মাথায় এসেছিল সেই সময় প্রথম। আবার আরেকটা সর্বনাশের কথা মাথায় আসছিল
যেটা “আমার ইমোশনকে এতটা চেপে রেখেছিলাম যে মেয়েটাকে কবেই ভালোবেসেছি নিজেও জানতাম না। এমনটাও কী কখনো হয় না কী?

স্বাভাবিকই এতো যত্ন রাখলে সে মেয়ের উপর মন বসে যায় অনেকেরই। আমার বেলাও তাই হয়েছিল। তাই আমি এতদিন তার প্রতি আমার দুর্বলতা চেপে রেখেছিলাম যে সেটা চেপে থেকেই ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে। ছোট থেকে প্রচণ্ড চাপা স্বভাবের ছিলাম। যার ফলে নিজের ইমোশন লুকানো খুব ভালো করে শিখে গিয়েছিলাম। যার ফলে অনেকেই অনেক ভাবতো। অনেকে পাথরও বলেছিল আমায়।

পরেরদিন জিনিয়া ফোন দিয়েছিল। সে বলেছিল, “আম্মু তো সব বলেছে। এখন তোমার ইচ্ছা!”
কিসের ইচ্ছা সেটা জানি। আমি আর ভাবি নি। আম্মু তো বলেও দিয়েছে। তাছাড়া মায়েরা সন্তানের ভালো চাইবে। আম্মু যেখানে রাজি সেখানে আমার না রাজি হয়ে উপায় কী? তাছাড়া আমার দুর্বলতা তো আছেই।

আমাদের প্রেমের শুরুটা আর ৮-১০ টা প্রেমের মত ছিল না। ফুচকা খাওয়া এগুলো মাঝে চলত। কিন্তু প্রধান কাজ ছিল সকালের মিস্টি আলোয় ঘাসের শিশিরের উপর হাটা। আমি বুঝছিলাম মেয়েটা আমায় প্রচণ্ড ভালোবাসে। কিন্তু আমার ইমোশন কিছুতেই খুব একটা প্রকাশ করতাম না। যার ফলে মেয়েটা সারাক্ষণই ভাবতো আমি তাকে ভালোবাসি না।

ইন্টারে ভালো রেজাল্ট করেই বাড়ি ফিরার পর মায়ের আদেশ ছিল ঢাকায় পড়াশোনা করতে হবে। কী আর করার মায়ের আদেশে ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স নিয়েছিলাম এবং পেয়েও গিয়েছিলাম। জিনিয়াদের পাশের এলাকায় অই ফ্লাট টা কিনেছিলাম।

ধীরে ধীরে জিনিয়াকে প্রচণ্ড ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম। ইমোশন হাল্কা হাল্কা প্রকাশ করতে শুরু করেছিলাম। অনেকে বলে যে দুর্বলতা প্রকাশ করলে নাকি প্রিয়জনরা সে মুহুর্তে ভালোবাসার বদলে অবহেলা করতে শুরু করে। কিন্তু সে মুহুর্তে জিনিয়া আমাকে অবহেলা তো দূরে থাকুক আরও আঁকড়ে ধরেছিল তার ভালোবাসা দিয়ে। এটাই ছিল আমার বড় প্রাপ্তি।

এভাবেই কেটে যাচ্ছিল সময় কাল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিকের সময় ছিল সেটা। ততদিনে আমাদের ভালোবাসার বয়স হয়ে এসেছিল। কিন্তু এর পরেই ঘটেছিল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।

সেবার আমার হাল্কা ওষুখ হয়েছিল। তার উপর সেদিন মন আর মুড কোনো টাই ভালো ছিল না। তাই কারও সাথে কথা বলি নি। কিন্তু জিনিয়া বারবার ফোন দিচ্ছিলো। রাগে কল অটো রিজেক্ট করেছিলাম ফোন অফ করা বাদ দিয়ে। ১ ঘণ্টা পরেই অটো রিজেক্ট বন্ধ করে দিয়েছিলাম। তবে সেই অটো রিজেক্ট চালু করাই আমাদের ভালোবাসার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

পরের ৩ দিন ফোন দেয় নি। বাহ কোনো রকম খোজ খবর নেয় নি। আমিও চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু লাভ হয় নি। হঠাৎ ৩ দিন পর আমাকে দেখা করতে বলেছি। এমনিতেও ওর উপর রাগ আছে ওর উপর, তাও রাজি হয়েছিলাম।

পরের দিনে দেখা করেছিলাম। তবে দিনটা শুভ ছিল না বুঝেছিলাম পরে। তার কাছে পৌছানোর পর তার প্রথম কথা ছিল ‘আমি পুরাতন হয়ে গেছি তাই না। নতুন কাউকে পাইছো।’ আমার তখন রাগের উপির রাগ উঠেছিল। সে প্রায় এমন করতো। সেদিন আর সহ্য করতে পারি নি। যার ফলে আমি রাগের মাথায় হ্যা বোধক উত্তর দিয়েছিলাম। দিয়ে উলটো হয়ে বাড়ির পথে হাটা দিয়েছিলাম। জিনিয়া সেখানে ধাক্কা খেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে হয়তো এমন উত্তর আশা করে নি। ঘুরে দেখেছিলাম ও চলে যাচ্ছে আর বার বার চোখ মুছছে। রাগী মনে একটু খারাপ লাগলেও পাত্তা দেয় নি। রোজ রোজ এসব ভালো লাগে না। ধরলাম ভালোবাসে খুব। তাই বলে এতো সন্দেহ করতে হবে।

হঠাৎই পিছে জোরে চিৎকার শুনতে পেয়েছিলাম। পিছে ঘুড়ে দেখেছিলাম একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। বুকের মধ্যে ধ্বক করে উঠে ছিল। যা সন্দেহ করেছিলাম সেটাই সত্যি হয়েছিল। হ্যা জিনিয়াই পড়ে আছে। প্রাইভেট কারের সাথে ধাক্কা খেয়েছে জিনিয়া। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছিল। মাথা ফেটে গেছে রাস্তার সাথে ঠুকে গিয়ে। রক্ত বাহির হয়েছিল প্রচণ্ড। আমি জিনিয়ার পাশে বসে পড়েছিলাম। বলা চলে শক্তি পাচ্ছিলাম না শরীরে হাটু ভেঙে পড়ে গিয়েছিলাম। প্রাইভেট কার থেকে চালক নেমে এগিয়ে এসেছিল। আমাকে বলেছিল জিনিয়াকে ধরে তার গাড়িতে তুলতে। দুজনে ধরে জিনিয়াকে নিয়ে পেছনের সিটে তুলেছিলাম। আমি লোকটাকে রুমাল দিয়ে মাথায় চেপে ধরতে বলে ড্রাইভিং সীটে উঠে পড়ে জোরে গাড়ি ছুটিয়েছিলাম স্থানীয় হাসপাতালে।

হাসপাতালের জরুরী ডাক্তার দেখে অপারেশন করতে হবে বলে জানিয়েছিল। আমি তাৎক্ষণিক সব ব্যবস্থা করতে বলেছিলাম। টাকাও জমা দিয়েছিলাম। এই ব্যাঙ্ক থেকেই আমি টাকা তুলতাম। হাসপাতালের বিল শোধ করে দিয়েছিলাম। জিনিয়ার অপারেশন শুরু হয়েছিল। পুলিশের বড় কর্তা আমার পরিচিত বলে পুলিশি ঝামেলা হয় নি। তাকে বুঝিয়ে দিতেই বুঝে গিয়েছিল।

আমি ড্রাইভার কে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় দিয়েছিলাম। আর জিনিয়ার বাবা মাকে খবর দিয়েছিলাম। খানিক বাদেই ওরা চলে এসেছিল। জিনিয়ার অপারেশন প্রায় ১ ঘণ্টা চলেছিল। পর মুহুর্তে চিকিৎসক বাহির হয়ে এসে বলেছিলেন, ‘রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। লাইফ সাপোর্টে রাখতে হবে। মাথায় গুরুতর চোট পেয়েছে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। আপাতত ফেটে যাওয়া স্থান সিলাই করে ব্যাণ্ডেজ করে দিয়েছি।’

জিনিয়াকে লাইফ সাপোর্টে রাখার ১ দিন পরেও অবস্থার উন্নতি হয়েছিল না। আমি না খেয়ে সারাক্ষণ তার একটা ডাক ‘বাবুই’ শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। মাঝে মাঝে জিনিয়ার বাবা মায়ের জন্য খাবার এনে দিয়েছিলাম। তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম রেস্ট নিতে। আমিই ছিলাম হাসপাতালে সারাটা সময়। আর অধীর অপেক্ষায় ছিলাম কখন জিনিয়ার ‘বাবুই’ বলাটা শুনবোন। পরের দিন এক নার্স জানিয়েছিল জিনিয়া নাকি আমার সাথে কথা বলতে চায়। আমি এত খুশি হয়েছিলাম বলার মত ছিল না। আমি গিয়ে তার পাশে বসেছিলাম। তার মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো ছিল। ধীরেধীরে কথা বলার চেষ্টা করলো আধো আধো গলায়। স্পষ্ট না শুনলেও বুঝলাম, আমি যে ডাকটা শোনার আশায় বসে ছিলাম সেটাই বলছে ‘বাবুই’। ‘বাবুই কেমন আছো? অনেক শুকিয়ে গেছো দেখছি। ঠিক মত খাও নি, তাই না?’

আমি হেসে উঠেছিললাম। কষ্টও হচ্ছিল সে সময় জিনিয়ার কষ্ট দেখে। মনে মনে নিজেকে দোষী মনে হয়েছিল যে আমার জন্যে জিনিয়ার এই অবস্থা। রাগ না করলে হয়তো আজ ওর এই পরিস্থিতির শিকার হতো না। এত কিছুর পরও কেমন ঠিকই আমাকে দেখে বুঝে গেল। মেয়েটার সত্য ভালোবাসার কাছে আবারও পরাজিত হয়েছিলাম আমি। আমি কী না একেই কষ্ট দিয়েছিলাম।

খানিক পরেই জিনিয়া কেমন যেন করে উঠে ছিল। আমার বুক ধড়াস করে করে উঠে ছিল। তাড়াতাড়ি ডাক্তার কে ডাকতে বলেছিলাম নার্সকে। কিন্তু জিনিয়া কষ্ট নিয়েও বলে উঠেছিল, ‘আমার কপালে একটা চুমু দিবে। আর তোমার তো উচ্চশিক্ষা নেয়ার ইচ্ছা। আমার অনুরোধ রইলো উচ্চশিক্ষা নিবে অবশ্যই। আর হ্যা তোমার ঐ ভালোবাসার মানুষটাকে বিয়ে করে নিয়। তোমাদের মাঝে বাধা হয়ে আর দাঁড়াবো না। চলে যাচ্ছি। ওপারে দেখা হবে আমাদের।’

আমার মনে আছে সে সময় আমি আমার কান্না করেছিলাম। আমি বলেছিলাম, ‘কী আবল তাবল বলছো কিছু হবে না তোমার।’ বলেই চুমু একে দিয়েছিলাম তার কপালে। বলেছিলাম, ‘শুধু তুমিই আমার ভালোবাসা। আমি রাগে ওটা বলেছিলাম। আমি আর কাউকে ভালোবাসি না।’ কিন্তু অনুভব করে ছিলাম হাত ছুটে গেছে। আরও খেয়াল করেছিলাম তার শ্বাস প্রশ্বাস থেমে গেছে।

মানে অনেক দেড়ি হয়ে গেছে। জিনিয়া আমার শেষের কথা শুনতে পায় নি। আমাকে একা ফেলে অভিমান করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে সে।জিনিয়ার বাবা-মাকে সেদিন কাঁদতে দেখেছিলাম। জিনিয়াকে তার বাড়ির পাশের বাগান অর্থাৎ তার প্রিয় জায়গায় কবর দেয়া হয়েছিল। আর হ্যা নিজেকে সেদিন আবিষ্কার করেছিলাম অন্য আমি হিসেবে। সম্পূর্ণ অন্য আমি। কেঁদেছিলাম আমি সেদিন প্রচণ্ড। নিজেকে প্রচণ্ড অপরাধী মনে করেছিলাম। আমার জন্যই তো একজন বাবা মা আজ সন্তান হারা। সব আমার জন্যই হয়েছে।

পরে দু দু বার সব ছেড়ে দিব চিন্তা করেছিলাম। কিন্তু কল্পনায় জিনিয়ার সেই মুখের দিকে চেয়েই সব বাতিল করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সবাইকে আকড়ে ধরে বেঁচে থাকার। ভাবেছিলাম বিদেশ গিয়ে উচ্চশিক্ষা নিব। জিনিয়ার অনুরোধ রাখবো আমি। জিমিয়ার আম্মুরও তাই করতে বলেছিলেন। বিদেশ গিয়েছিলাম গিয়েছিলাম অবশেষে। নিজেকে এতই অপরাধী লাগতো যে আমি বিদেশেই গেড়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। দেশের মানুষদের সাথে খুব কম কথা হত। কিন্তু মায়া আর নাড়ির টান কী সহজের দূর করা যায়। তাই ফিরে এসেছি।””

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। স্মৃতির কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে সন্ধ্যা হয়ে বেলা ডুবে যাচ্ছে খেয়াল করি নি। আন্টি এসে ডেকলো। আমি পরে আসছি জানিয়ে দিতেই আন্টি ফিরে গেল। জোর করলো না। চোখ বন্ধ করে ভাবছিলাম, ‘কেন চলে গেলে জিনিয়া? আমাকে একা রেখে। এই দেখ আজ তোমার অনুরোধ পূর্ণ করেছি।’ খানিক পরেই উঠে দাঁড়াতে যাকে চোখে পড়লো দেখে অবাক হয়ে গেলাম। সন্ধ্যার আধো আলো আধো অন্ধকারে দেখলাম, ‘জিনিয়া, জিনিয়া আমার সামনে দাঁড়িয়ে এ কীভাবে সম্ভব। নিশ্চয় হ্যালুসিনেশন হচ্ছে আমার।’

জিনিয়া বলে উঠলো,

— আমি হারিয়ে যাই নি বাবুই। আমি সব সময় সাথে আছি তোমার। সব সময় তোমার মাঝে আছি।

বলেই জিনিয়া আমার মাঝে মিলিয়ে গেল। সন্ধ্যা হয়ে গেল, সাথে শেষ আলো টকুও মিলিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে। তখনও ঠাই দাঁড়িয়ে আমি জিনিয়ার কবরের সামনে!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত