একমুঠো সুখের আশায়

একমুঠো সুখের আশায়
“আকাশটা রৌদ্রজ্জ্বল, মনে হচ্ছে মাঝ দুপুর। কাশবনের মাঝ দিয়ে চলে গেছে গ্রামীণ মেঠো পথ। সেই পথে হাত ধরে হাটছে দুজন মানব মানবি। ঠিক পুরোনো দৃশ্যের মত, যেখানে দুজনে দুজনের হাত ধরে কাশবনের মাঝের রাস্তায় হাটতে দেখা যায়। তাদের চেহারাটা বোঝা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে শুধু মুখের অবয়বটা। দুজন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। মেয়েটা কাশফুল নিয়ে খেলা করছে। ছেলেটা তার দিকে তাকিয়ে দেখছে। ধীরেধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠছে দৃশ্যপট। অস্পষ্ট মুখ দুটো পরিষ্কার হয়ে উঠছে। হঠাৎ মেয়েটি ছেলেটির হাত ছেড়ে দিল। ছেলেটাও দাঁড়িয়ে গেছে। মনে হচ্ছে মেয়েটি মেয়েটা ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছে। ছেলেটি অনবরত মেয়েটির বাড়ানো হাত ধরার চেষ্টা চালচ্ছে। কিন্তু শত চেষ্টা করেও ধরতে পারছে না। হঠাৎ মেয়েটি মিলিয়ে গেল যেন বাতাসে। ছেলেটি বসে পড়লো মাথা নিচু করে। মনে হচ্ছে কান্না করছে। খানিক পরে একটা ছোট বাচ্চা মেয়ে প্রায় ঐ মেয়েটার মত দেখতে বলে মনে হচ্ছে, সে এসে ছেলেটিকে টেনে তুলল। হঠাৎ চেহেরা গুলো পরিষ্কার হয়ে গেল আর তখনই….”
লাফ দিয়ে ঘুম উঠে গেলাম আমি। বুক ধড়ফড় করছে। মানে স্বপ্ন দেখছিলাম। এই খাপছাড়া স্বপ্নটি বহুবার দেখেছি। বহু রাতে ঘুম ভেঙেছে এমন স্বপ্নে। কিন্তু প্রতিবারের মতোই স্বপ্নটা খাপছাড়া হয়। ঘুম যেন বিলীন হয়ে যায়। আর চেষ্টা করেও ঘুম আসে না।
থাক আজও আর ঘুম আসবে না। অযথা চেষ্টা করে লাভ নেই, কারণ চেষ্টা বিফল হবে। তাই উঠে গিয়ে বারান্দায় রাখা চেয়ারে বসলাম। এই রাতটাও হয়তো নির্ঘুম চলে যাবে। মনে পড়তে থাকবে তখন অতীতের সেই কষ্ট ঘেরা ঘটনা গুলো। মনে পড়তেও শুরু করেছে ইতো মধ্যে…
হ্যা স্বপ্নে দেখা সে মুখ গুলো আমার খুবই পরিচিত। এককালে যাঁদের মাঝে ছিল আমার বিচরণ। এখনও আছে তবে হারিয়ে ফেলেছি কাছের একজনকে। মেয়েটির নাম ‘জিনিয়া সিদ্দিকা’। স্বপ্নে যে মেয়েটা ছেলেটার হাত ছেড়ে বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল সেই জিনিয়া। আর ছোট বাচ্চা মেয়েটা, যে জিনিয়ার মত দেখতে সে জিনিয়ার সন্তান, নাম ‘অদ্রিতা’। বর্তমানে বলতে গেলে সে আমার সন্তান। যদিও জিনিয়া এখন অতীত, সে স্থলে এখন মাত্রই এক রাশ কষ্ট ছাড়া আর কিছু নেই। তবুও সে কষ্টের মাঝে সুখ খুঁজে ফিরি। তবে আজও সফল হই নি। কষ্ট যে কখনও সুখ দিতে পারে না। তবুও জিনিয়ার স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকার ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। আর স্বপ্নে যে ছেলে সেটা…. সেটা আর কেউ না, আমি নিজেই!
“অতীতটাতে যে সুখ ছিল না তা না। সুখকে আলোকিত করেই আমার জন্ম হয়েছিল আমার বাবা মায়ের কোলেই। বাবা মা আদর করে আমার ডাকনাম রেখেছিল ‘ফয়সাল’। ছোট বেলায় হেসে খেলে বড় হচ্ছিলাম। কিন্তু সে সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। জন্মের কয়েক বছরের মাঝে আমার মা মারা যায়। কষ্ট আসলে কপালেরই লিখন। সত্য বলতে কপালে যদি কষ্ট লিখা থাকে, তখন যদি সে সুখও দেখে কিন্তু জানে না সুখের আড়ালে কষ্ট থাকে। যা সুখের চাইতে আরও কষ্ট দেয়।
“ছোট থেকে ভালোবাসাহীন ভাবে বড় হয়েছিলাম। কারণ মা নেই। বাবাও আর বিয়ে করেন নি আমার কথা ভেবেই হয়তো। কিন্তু বাবা ব্যস্ত থাকতেন কাজ নিয়ে। তিনি ছিলেন একজন নামকরা শিল্পপতি। তাই আমাকে তেমন সময় দিতে পারতেন না। তবুও দিতে চেষ্টা করতেন। বড় হয়েছিলাম ছোট থেকে এমন করেই মানিয়ে নিয়ে।
এসএসসি তে আশাজনক ফল করেছিলাম। মূল কাহিনীর শুরু এরপর থেকেই। আব্বুকে বলে ভালো একটা পাবলিক কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এতে বন্ধুও জুটবে আড্ডা দিয়ে ভালোই
সময় কাটবে। একা থাকতে থাকতে অরুচি ধরে গিয়েছিল। আব্বুও রাত ছাড়া তেমন সময় দিতে পারতেন না। এই সময় খুশির একটা মুহূর্ত ছিল এসএসসির পরে ছুটির সময় আব্বু আমাকে অনেক সময় দিয়েছিলেন।
স্কুল লাইফে বন্ধু ছিল না তেমন। কয়েকজন পরিচিত ছিল। তাদের মাঝে একজন ছিল লিমন। কয়েকজন এ কলেজেই ভর্তি হয়েছিল। প্রথম দিন ছিল সেদিন। আব্বু আমাকে বাইক কিনে দিলেও আমার সাইকেলই ভালো লাগতো। তাই সব সময় সাইকেল নিয়েই ঘুরতাম। কলেজের প্রথম দিন সাইকেল নিয়েই কলেজে পৌঁছেছিলাম। নবীনবরনের অনুষ্ঠান চলছিলো সেদিন। সেখানে পৌঁছে কলেজে ঢোকার সময় লিমনকে দেখেছিলাম। দেখেই আমরা কথা বলতে শুরু করেছিলাম। বন্ধুও হয়ে গিয়েছিলাম।
কথা বলার একফাঁকে আমার পাশ কাটিয়ে যাওয়া একটা মেয়েকে লক্ষ্য করেছিলাম। আমি ছোট থেকেই একটু লাজুক ছিলাম। মেয়েদের দিকে তাকাতাম কম আর কথা বলা দূরেই থাক। কিন্তু ঐ মেয়েকে দেখেই একটা হার্ট বিট মিস হয়ে গিয়েছিল। যেমনি সুন্দর তেমনই মায়াবী। হ্যা তার চোখটায় প্রচুর মায়া ছিল। সেই সাথে চোখে কাজল দেয়া ছিল। হলুদ ড্রেসে সাথে হাল্কা সাধারণ সাজগোছ। এতে তাকে অপরূপ লাগছিল। চোখ সরাতে পারি নি তার মায়াবী মুখ থেকে। হয়তো নবীন বরণের অনুষ্ঠানের জন্য এই তার এই সাজগোছ ছিল।
আমি যেন আমার এতবছরের পালন করা নিয়ম ভঙ করে ফেলছিলাম। জীবনে এর আগে কখনোও বাহিরের কোনো মেয়ের দিকে এমন ভাবে এত সময় তাকিয়ে থাকি না। লিমনও আমাকে স্কুল থেকে ভালো চিনতো। সে হয়তো আমার কার্যকলাপ লক্ষ্য করেছিল। আমি তার দিকে চাইতে তার মুখে রাজ্যের বিস্ময় লক্ষ্য করেছিলাম। আমি কিছু না বলে শুধু একটা মুচকি হাসি উপহার দিয়েছিলাম।
উল্লেখ্য যে আমি খুব সাদামটা থাকতাম এবং পছন্দ করতাম। আমাকে দেখলে কেউ ভাবতেই পারতো না যে আমার বাবা একজন নামীদামী শিল্পপতি। তাই কলেজে অনেক ভালো কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষী জুটে গিয়েছিল। সারাটাদিন তাদের সাথেই আড্ডা দিয়ে কাটাতাম। তাদের বন্ধুত্বের স্পর্শে আমার নিঃসঙ্গতাও ঘুচেছিল। তাদেরই কাছ থেকে কথায় কথায় জেনেছিলাম, সেই মেয়েটার নাম ”’জিনিয়া সিদ্দিকা”’।
এরপরেও আমি আমার নিয়ম থেকে খুব একটা সরে দাঁড়াই নি। কিন্তু এই মেয়েটার সামনে গেলে আমার নিজের নিয়মে বাধা অবস্থায় থাকতে ইচ্ছা হতো না। বুঝেছিলাম ভালোবেসে ফেলছি মেয়েটিকে। তবুও সাবধান থাকতাম। কাউকে বুঝতে দিতাম না। অনেকেই ভাবতো বড় লোকদের ভালোবাসা ঠুনকো ছেলেখেলা। যদিও বেশির ভাগ কেউ জানতো না। আমি চাইছিলাম না আমার ভালোবাসা ঠুনকো পরিচয় লাভ করুক। তাই আমার ভালোবাসা নিজের হৃদয়েই আড়াল করে রেখেছিলাম।
অনেকবার চেয়েছিলাম তাকে জানাতে। কিন্তু সে সাহস আমার হয় নি। আচ্ছা ওকে ‘ভালোবাসি’ তাই বলে এই মানেই এই না যে প্রেম করতে হবে। ভালোবাসা মানেই তো তা যার মাধ্যমে ভালোবাসার মানুষ টিকে কাছে পাওয়া যায়। ভালোবাসা এমন একটি অনুভূতি যার মাধম্যে সারাটা জীবন কাটিয়ে দেয়া যায়। তাছাড়া আমি বললেই সে আমাকে ভালোবাসবে কেন? হয়তো সে ভালোবাসে অন্য কাউকে। কিংবা তার পছন্দের কেউ আছে হয়তো। এই ভাবনা গুলোই আমার সাহসকে দমিয়ে দিত। তখনই ঠিক করেছিলাম ভালোবাসা আড়াল করে রেখে দিব। প্রকাশ করবো না। কিন্তু এটাই ছিল আমার ভুল। এবং গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সেবারই জানিয়ে দিলে হয়তো গল্পের মোড় টা ঘুরে যেত না।
এভাবে কলেজ লাইফটা শেষ করে দিয়েছিলাম শুধু ভালোবাসা চেপে রেখে আর জিনিয়াকে দেখেই। মাঝে অবশ্য কথা বার্তা হয়েছে। হয়েছে হাল্কা পরিচয়ও। যতবারই কথা হত কেঁপে উঠতো যেন হৃদপিণ্ডটা। প্রচণ্ড ভয় লাগতো। কারণ অন্য কোনো মেয়ের সাথে কথা বলে বেশি অভ্যাস নেই তো!
আমি এইচএসসিতেও ভালো ফল নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। জিনিয়াও ভালো ফল করেছিল। বেশ ভালো ছাত্রীও বটে ও। আমি পাশের একটা পাবলিক ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিলাম। অবশ্যই জিনিয়া সেই ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিল।
ভার্সিটিতে ভর্তি হবার বেশ কয়েক মাস পরের কথা। সেইবার একদিন একটা কাজের জন্যে বাবার প্রাইভেট কার নিয়ে বাহির হয়েছিলাম। সচারচর প্রাইভেট কার চালাতাম না তবুও শিখেছিলাম। সেদিনে কাজ শেষ করে ফিরছিলাম। বাজার পার হয়ে হয়ে আসতে হঠাৎ দূরে সামনে দেখতে পেয়েছিলাম একটা অটোরিক্সা এসে এক মাঝবয়সী লোককে ধাক্কা দিয়ে গেল। থামায়ও নি, জায়গাটা জনশূন্য ছিল বলেই অটো থামানোর কেউ ছিল না। লোকটি পড়ে গিয়েছিল। তার বাজারের ব্যাগ গুলো পড়ে ছিল তার আশেপাশে। বাজার গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিল। এর পর সেদিনের ঘটনাই বর্ণনা করছি। কারণ মেন কাহিনীর মূল অংশ ছিল এটি-
আমি তাড়াতাড়ি লোকটির সামনে গাড়িটা সাইড করে থামিয়ে দিলাম। তারপর নেমে দৌড়ে লোকটির কাছে চলে আসলাম। হাতের কয়েক জায়গায় চামড়া ছড়ে গেছে। আর একজায়গায় গাড় ভাবে ছড়ে গেছে আর রক্ত পড়ছে অনেক। দেখে বুঝলাম ফ্যাকচার হয়েছে ব্যান্ডেজ করাতে হবে। আমি লোকটি বললাম,
— চাচা গাড়িতে উঠে বসুন। ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
তিনি বললেন,
— ও কিছু নয় বাবা। তুমি বরং যাও। ওগুলো এমনিই ওষুধ দিলেই সেরে যাবে।
আমি বললাম,
— চাচা উঠুন তো জলদি। আমি তো দেখতেই পাচ্ছি কতটা রক্ত পড়ছে। ওগুলো পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করতে হবে।
বলে তাকে ধরে গাড়ির কাছে এনে ড্রাইভিং সীটের পাশে বসিয়ে দিলাম। আমিও ড্রাইভিং সীটে বসে গাড়ি চালিয়ে কাছের ফার্মেসীতে গিয়ে ফার্মেসী বয়কে পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে দিতে বললাম। আর কাউন্টারে টাকা পরিশোধ করে দিলাম। সময় লাগবে একটু। এই সময়ের একটা কাজ করতে হবে ভাবলাম। তাই চাচাকে বললাম, ‘চাচা, কাজ হয়ে গেলে বসবেন একটু। আমি খালি যাব আর আসবো।’ চাচা কৃতজ্ঞ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা যাও বাবা। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো।’
আমি বাহির হয়ে গাড়ি নিয়ে বাহিরের দিকে ছুটলাম। সেখানে গিয়ে ভালো মতো কিছু বাজার করে ফিরলাম। চাচাকে বাজার গুলো ধরিয়ে দিলাম। প্রথমে নিতে চাইলেন না। আমি জোর করে ধরিয়ে দিলাম। তার বাসার ঠিকানা জেনে বুঝলাম ১৫ মিনিটের পথ। তাই তাকে গাড়িতে বসতে বললাম। আমিও উঠে বসলাম। যাওয়ার পথে চাচার সাথে ১৫ মিনিটে অনেক গল্প করলাম। অনেক আপন হয়ে গেলাম। আমিও আমার না পাওয়া ভালোবাসার কিছুটা পেলাম এই চাচার থেকে।
চাচার বাড়িতে নামলে তিনি তার বাড়িতে আসার আমন্ত্রণ জানালেন এবং তারপর তার মেয়েকে ডাকতে থাকেন। কিন্তু এদিকে আমি জানালাম,
— চাচা আজ আসি। অন্য একদিন না হয় বেড়িয়ে যাব।
চাচা মুখ কালো করে বললেন,
— জানি বাবা তুমি আসবা না। গরীবের ঘরে বড় লোক আসবেই বা কেন?
আমি হা-হা করে বলে উঠলাম,
— চাচা এমন বলবেন না। আচ্ছা ঠিক আছে আমি আসছি।
এমন সময় চাচার মেয়ে আসলেন। তার হাতের ব্যান্ডেজ দেখে কী হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করছে। কণ্ঠটা কেমন পরিচিত পরিচিত লাগছে। তাই গাড়িটা অফ করে বাহির হয়ে যাকে দেখলাম তাকে দেখে স্তম্ভিত এবং হতবাক হয়ে গেলাম। সে ছিল জিনিয়া এবং চাচার মেয়েই জিনিয়া। সে আমাকে দেখে চাচার কাছে জানতে চাইলো আমি এখানে কেন? এবং গাড়ি কার? চাচা সব খুলে বলল তাকে এবং আমি বললাম, ‘গাড়িটা আমার বাবার।’ জিনিয়ার জিজ্ঞাসা করাই স্বাভাবিক। ভার্সিটিতে কেউ আমাকে প্রাইভেট কার চালাতে দেখেনি। সাধারণ ভাবে ছিলাম। সাইকেল নিয়েই যেতাম, মাঝে মাঝে বাইক নিয়ে।
চাচার বাড়িতে এর পর আমি যেন তাদের আরেক সন্তান। আর আমার আর জিনিয়ার বন্ধুত্ব সেই থেকে শুরু। কৃতজ্ঞতা থেকেই কথা শুরু হয়েছিল অবশ্য যদিও আমি ভালোবাসতাম। এভাবেই দিন কাল যাচ্ছিল, খুনশুটি বন্ধুত্ব আর চাচা-চাচীদের সাথে। চাচা-চাচী জিনিয়া আমার ব্যাপারে সব জানতো। ইভেন আমিই জানিয়েছিলাম তাদের সব। ছোট থেকে কেমন ভালোবাসাহীন কষ্টের মাঝে বড় হয়েছি। তাই যেন ভালোবাসতেন তারা আমাকে একটু বেশিই।
এভাবে দিন যাচ্ছিল হাশিখুশির মাঝে। কিছু দিন পর আমি লক্ষ্য করেছিলাম, জান্নাত নামে কোনো এক মেয়ে আমাকে আমাকে পছন্দ করে। হয়তো ভালোবাসে। তবে আমি তাকে পাত্তা দিতাম না। আমি তো জিনিয়াকে ভালোবাসতাম। একদিন সে প্রপোজাল দিয়েছিল। কিন্তু আমি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। কিন্তু এর পর থেকে শুরু হয় আমার দুঃখের যাত্রা।
জিনিয়ার সাথে রনি নামের এক ছেলের সাথে সম্পর্ক হয়েছিল কিছুদিন পরেই। আমি তা জানতাম না। জিনিয়াকে জিজ্ঞাসা করাতে বলেছিল এটা তাদের পুরোনো সম্পর্ক। কিন্তু আমাকে জানায় নি কেন? জিজ্ঞাসা করলে জবাব দিয়েছিল, ‘বলার প্রয়োজন মনে করি নি তাই। তবে একটা কাজ করে দিবি? আমাদের বিয়েটা ঠিক করে দে না।’
সেদিন আমি সারারাত ছাদে মন খারাপ করে বসে ছিলাম। তাহলে সে অন্য কারও হয়ে যাচ্ছে। আরও একরাশ কষ্ট, কষ্টের লিষ্টে আশ্র‍য় পেয়েছিল। পরে অবশ্য মনস্থির করেছিলাম আমি না হয় কষ্ট পেলাম, কিন্তু জিনিয়ার সুখেই তো আমার সুখ। তাই আমি ওদের বিয়ে ঠিক করে দিয়েছিলাম চাচা-চাচীকে বলে। তারাও মেনে নিয়েছিলেন। আমি ভেবেছিলাম, ‘সুখী হোক। তার সুখেই তো আমার সুখ। আমি না হয় সারাটা জীবন এভাবেই পার করে দিব।’
অবশ্য বিয়ে একটু দেড়ি করেই ঠিক হয়েছিল। সেই সময়টুকুতে আগের মতোই ভার্সিটি যেতাম একসাথে। কিন্তু কারও সামনে তার ভালোবাসা অন্য কারও সাথে প্রেম করে, অন্য জনকে ভালোবাসছে, এটা সহ্য করা হয়তো কোনো ভালোবাসার মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন। তেমনি হয়েছিল আমার ক্ষেত্রেও। কিন্তু আমি সহ্য করে নিয়েছিলাম। বলা যায় সহ্য করতে শিখে গিয়েছিলাম। সে তো সুখেই আছে, আমারও তো সুখী হতে হবে। কারণ তার সুখেই তো আমার সুখ।
আমার চোখের সামনেই বদলে গিয়েছিল জিনিয়া। সেই আগের জিনিয়া ছিল না সে। ঠিক মত কথা বলতো না। বিরক্ত হতো। অবশ্য বদলে যাবে এই তো স্বাভাবিক। তার ভালোবাসার মানুষ আছে। সেই তো ওর খেয়াল রাখতে পারবে। আমার তো আর প্রয়োজন নেই। তবুও অবাধ্য মন বাধা মানে না। যেচে তার খোজ খবর নেয়। যেচেই তার খেয়াল রাখতে যায়। খেয়াল করেছি এতে জিনিয়া কেমন যেন বিরক্ত হয় যেটা আমার আর সহ্য হয় নি। ঠিক করেছিলাম বিদেশ চলে যাব। অন্তত আমার জন্য কেউ বিরক্ত হোক তা চাই না।
জান্নাত আমার লাইফে আশার বহু চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পারে নি। আমার হৃদয় দুয়ার তো বদ্ধ। জিনিয়ার বিয়ের কিছুদিন আগে বিদেশ যাওয়া সব ব্যবস্থা করে ফেলেছিলাম। কারণ অন্তত জিনিয়ার বিয়েটা ভালো মত হোক। জিনিয়ার বিয়ের আগে সবার থেকে বিদায় নিয়েছিলাম। চাচা চাচী অনেক জোর করেছিলো অবশ্য জিনিয়ার বিয়ে পর্যন্ত থাকতে। আমি বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে ছিলাম। জিনিয়ার সাথে সেদিন তেমন বেশি কথা হয় নি। একটু খারাপ লেগেছিল বৈকি।
তবে বিদেশ যাওয়ার কারণ আমার আরেকটা মোটিভ আছে। নিজের সামনে আমার ভালোবাসা অন্য কারও হয়ে যাবে এটা হয়তো আমি সহ্য করতে পারবো না। কী দরকার অযথা পরে ঝামেলা করে। তাইতো আগেই দূরে চলে যাচ্ছি। ভালো থাকুক প্রিয় মানুষেরা।
সেবার বিদেশে চলে এসেছিলাম। কিন্তু তার আসার আগে একটা চিরকুট জিনিয়ার টেবিলের উপরে রেখে এসেছিলাম। তাতে লেখা ছিল,
প্রিয় জিনিয়া,
জানি তোর কাছে আমি প্রিয় না। জানিস ভালোবাসতাম তোকে অনেক বেশি। এখনও ভালোবাসি। না, আমি তোকে ভালোবাসতে বলছি না। শুধু সত্য জানালাম।
ইতি,
ফয়সাল
চিরকুট টা দিতে চাইছিলাম না। তবুও মনকে থামিয়ে রাখতে পারছিলাম না।
ব্যবহারের সিমটা ভেঙে ফেলেছিলাম। যেন কেউ আমার হদিস না পায় বা আমার দ্বারা বিরক্ত না হয়। নতুন সিমে যোগাযোগ আব্বুর সাথেই রেখেছিলাম। তার থেকেই জেনেছিলাম জিনিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে। সেই দিন সারারাত শুধু আকাশ দেখেই কাটিয়েছিলাম। কীভাবে যেন ১.৬ বছর চলে গিয়েছিল। ১.৬ বছরে মাঝে মাঝে জিনিয়া কে নিয়ে স্বপ্ন দেখে ঘুম হতো না। কারণ স্বপ্ন কোনোটাই সুখকর হত না। তবে কষ্ট তো আমায় ছাড়ে নি। একরাশ কষ্ট গুলো ক্রমাগত কষ্টের খাতায় হিসেবে যোগ হচ্ছে।
ঠিক ১.৬ পর আব্বুর মাধম্যে জানতে পারি যে জিনিয়ার একটা মেয়ে হয়েছে নাকি। খুশিই লেগেছিল কিন্তু এরপর যা শুনেছিলাম কল্পনাও করি নি তা। জিনিয়া নাকি মারা গেছে সন্তান জন্ম দিয়েই। রনি সন্তানের দায়িত্ব নেয় নি। এবং নিবেও না ঘোষণা দিয়েছিল। আমি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। কথা বলতে পারি নি। আব্বু মনে হয় কিছুক্ষণ হ্যালো হ্যালো করে ফোন কেটে দিয়েছিল।
সেই রাতে হয়তো কান্না করেছিলাম একটু। পরের দিনেই দেশে ফেরার সব ব্যবস্থা করে পরের দিনই দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গিয়েছিলাম। দেশে পৌঁছে আগে চাচা-চাচীদের বাসায় পৌঁছেছিলাম। চাচা-চাচী আমাকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু পর মুহুর্তে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছিল। আমি তাদের কাঁদতে বাধা দিই নি। কারণ কাঁদলে বুকের ভাড় অনেকটা কমে আসে।
অনেক কথা বার্তা হলো। অনেক জিজ্ঞাসা বার্তা হলো। কথায় কথায় জেনেছিল জিনিয়ার জন্যেই আমি ছুটতে ছুটতে এসেছি। আমি জিনিয়ার মেয়েকে দেখতে চাইলাম। তারা আমাকে একটা বাচ্চার দোলনার কাছে নিয়ে এসেছিল। আমি দোলনায় একটা মেয়ে শিশুকে লক্ষ্য করেছুলাম। মেয়েটা দেখতে হুবুহু জিনিয়ার মতই হয়েছে। বড় বড় মায়াবী চোখ। অবিকল তার মায়ের মত হয়েছে। এমন মায়াবী শিশুকে যে পরিত্যাগ করতে পারে সে নিশ্চয় মানুষ না। শুনলাম জিনিয়া মৃত্যুর আগে মেয়ের নাম দিয়ে গেছে ‘অদ্রিতা।’ আমার প্রিয় নাম। কিন্তু ওর মেয়ের নাম অদ্রিতা দিল কেন? রহস্যের সুক্ষ একটা চিন্তা মাথা দিয়ে খেলে গেল।
আমি যখনই নামের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমি জিজ্ঞাসা আগেই উত্তর দিল, জিনিয়া মৃত্যুর আগে নাকি বলে গেছে একটা চিঠি আমাকে দিতে। আমি অদ্রিতাকে চাচীর কাছে দিয়ে চিঠি পড়লাম। সেখানে লিখা ছিল-
প্রিয় ফয়সাল,
আসলে তুই আমার প্রিয়দের মাঝে একজন। হ্যা ভালোওবাসতাম। কিন্তু একটা ব্যাপার কী জানিস? আমি তোকে ফ্রেন্ড হিসেবে ভালোবাসতাম। জান্নাত মেয়েটা রিয়েলি ভালোবাসে তোকে। আর তুই ওর সাথে সুখীও হবি। আমি জানতাম তুই আগে থেকে আমাকে পছন্দ করিস। তোকে জান্নাতের দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য আমি রনির সাথে সম্পর্ক করি। একটা সত্য হলো রনিকে আমি আগেই পছন্দ করতাম। আমার থেকে তোকে দূরে সরানোর জন্য যে কত এক্টিং করলাম। আমি তো চাইতাম তুই যেন সারাক্ষণ আমার পাশে থাকিস। কিন্তু কতটা খারাপ আমি। সেটা চেপে রেখে তোকে আমার থেকে দূরে রাখতে বাধ্য করলাম। হলামই আমি না হয় খারাপ, এতে তুই তো সুখী হবি। এর চেয়ে বেশি আর কী চাওয়া আছে? তার পরেও যখন তুই জান্নাতকে মেনে নিলি না আমি তোকে আমাদের বিয়ে ঠিক করে দিতে বলি। কিন্তু তুই বিদেশ চলে গেলি। হ্যা ফিরলে জান্নাতকে মেনে নিস। ভালো থাকিস সব সময়।
ইতি,
জিনিয়া
আমি হতবাক। আমি অদ্রিতাকে কোলে নিয়ে বাড়ির পাশে জিনিয়ার কবরের সামনে গেলাম। নিরবে কান্না করেছিলাম। হয়তো বিড়বিড় করে জিনিয়ার উদ্দেশ্যে অনেক কিছুই বলেছিলাম। আসলে ছেলেরা চিৎকার কান্না করতে চাইলেও স্বভাব বসত চিৎকার করে কান্না করতে পারে না। আমি সে সময় শুধু জিনিয়ার সাথে কাটানো সময় গুলো ভেবেছিলাম। ক্ষানিক পরেই উঠে গিয়েছিলাম। চাচার কাছে অদ্রিতাকে দিয়ে চলে এসেছিলাম। খুব ইচ্ছে করছিলো কাছে রাখতে। কিন্তু আমার মানসিক অবস্থা তখন এতটা বিপর্যস্ত ছিল। তাছাড়া চাইলেই বা তারা কী মনে করতো?
বাড়ি ফিরে সেদিন টানা ৩০ মিনিট ঝরণার পানি ছেড়ে দিয়ে কেঁদেছিলাম। কষ্ট, কষ্ট আর কষ্ট, তিনটা জিনিশই আমার কপালে লিখা আছে হয়তো। আসলে চিঠি পড়ার আগে যতটা কষ্ট পেয়েছিলাম চিঠি পড়ার পর তার দ্বিগুণ কষ্ট হচ্ছে এখন। মনে চলছিল অদ্রিতা আর জিনিয়াকে নিয়ে ঝড়। মনঃস্থির করেছিলাম অদ্রিতাকে আমার সাথে রাখবো। অন্তত জিনিয়ার স্মৃতিটা আমার কাছেই থাকুক।
সেদিনের পর চাচা-চাচীর কাছে অদ্রিতাকে ভিক্ষা হিসেবে হলেও পেতে চেয়েছিলাম। চাচী জানিয়েছিল, ‘জানতাম তুমি চাইবে। আমরাও আপত্তি করতাম না। কিন্তু বাবা তুমি এখনও বিয়ে করো নি। অদ্রিতার জন্য তোমার বিয়ে করতে সমস্যা হবে।’ আমি বলেছিলাম, ‘চাচী বিয়ের চিন্তা আমার নাই। আমি শুধু অদ্রিতাকে নিয়ে বাঁচতে চাই বাকি জীবন। জিনিয়াকে হারিয়েছি, অদ্রিতাকে হারাতে চাই না। আর কোনো কিন্তু নয়…’ তারা অবশ্য আমার জেদের কাছে হার মেনেই অদ্রিতাকে আমার আশ্রয়ে দিয়েছিলেন।
সেই থেকেই অদ্রি আমার সাথে আছে। বড় হয়েছে এখন। ৫ বছর বয়স এখন ওর। ভাবছিলাম সামনের বছরেই স্কুলে দিব। ছোট হলেও কিন্তু ফাজিল আর চঞ্চল ঠিক ওর মায়ের মত। ওর মাঝেই যেন আমি আমার জিনিয়াকে খুঁজে পাই।
এদিকে খোজ নিয়ে জেনেছিলাম রনি নতুন বিয়ে করেছে নিয়েছিল। নতুন সংসার, বউ-সন্তান নিয়ে সে সুখেই আছে। আমার এখনো মাঝে মাঝে আফসোস হয় যে ‘জিনিয়া! অন্যকে ভালোবেসেছিস ঠিক আছে কিন্তু ভালো মনের কাউকে ভালোবাসতি।’
আর জান্নাত, ওর কথা তো বলাই হয় নি। যা হয়েছে এর জন্যে পরোক্ষ ভাবে জান্নাতই দায়ি। কিন্তু দোষ দিব না তাকে। কারণ ভালোবাসতেই পারে। দোষ কারও ছিল না এখানে।
জান্নাত অনেক বার আমার কাছে এসেছিল। আমি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। বাবা ওর সাথে বিয়েও পর্যন্ত ঠিক করেছিল। কিন্তু আমি বাসা ছেড়ে আলাদা বাসা নিয়েছি বিয়ে করবো না বলে। অন্তত বিয়ের চাপ যেন আমার উপর চাপ দিতে না পারে।
নিজে একটা বেসরকারি চাকরিও জোগাড় করে নিয়েছিলাম। সবই করেছি শুধু ছোট্ট অদ্রির মুখের দিখে তাকিয়ে। কারণ ভয় একটাই, নতুন কেউ যদি ওকে মেনে না দেয়, কষ্ট দেয়। কী দরকার শুধু শুধু বিয়ে করার। এর চেয়ে বাবা মেয়েই একসাথে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিই।
কিন্তু জান্নাত পিছু ছাড়েনি কখনো। অদ্রিতাও ও কে পছন্দ করতো খুব এবং ও অদ্রিতাকে। কিন্তু একটাই ভয় ছিল বিয়ের পরে ঠিকই বদলে যাবে ভেবে। তাই বেশি দূর আগায় নি। তবুওএকদিন ওকে একটা রেস্টুরেন্টে ডেকেছিলাম। সেদিনই সব মিটিয়ে নিতে চেয়েছিলাম। ঘটনাট অবশ্য ৩ দিন আগের। ঘটনা অনেকটা এমন,
আমিই শুরু করেছিলাম প্রথমে কথা বলা,
— জানি তুমি আমায় ভালোবাসো। বিয়ে করতে চাও। কিন্তু আমি চাই না আমার সিদ্ধান্তের জন্য অদ্রিতা কষ্ট পাক।
সে বলেছিল,
— আমার দ্বারা অদ্রিতা কোনো কষ্ট পাবে না। এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।
আমি বললাম,
— হয়তো। তবে আমাকে যদি বিয়ে করতেই চাও কয়েকটা শর্ত তোমাকে মানতে হবে।
১) বিয়ের পর কোনো বাচ্চা নিতে পারবে না। কারণ বাচ্চা নিলে অদ্রিতার উপর থেকে মায়া উঠে যাবে। এবং দুর্ব্যবহার করতেও বাধবে না তোমার। কারণ মায়েরা চায় তার নিজের সন্তান ভালো থাকুক। অন্যের নয়।
২) ওর সাথে আপন মায়ের মত ব্যবহার করতে হবে। কখনও অবহেলা করতে পারবে না। এই দুটোই শর্ত রইলো।
তবে আমি মনে করি ১ নাম্বার শর্তই তোমাকে থমকে দিতেই যথেষ্ট কারণ প্রত্যেক মেয়ে মাতৃত্বের স্বাদ নিতে চায়। আমি এতটা কঠোর হচ্ছি শুধু মাত্র অদ্রিতার জন্য। আশা করি তোমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। উত্তর টা আমি জানি।
সেদিনের পর আজ ৩ দিন কেটে গেছে। অবশ্য অপেক্ষা করছি না। আমাদের দিন চলা থেমে থাকে নি। চলে যাচ্ছে তার মত। হাসি খুনশুটিতে আর চাকরী করে বাবা মেয়ের দিন কেটে যাচ্ছে।””
হঠাৎ বাস্তবে ফিরলাম বারান্দাতে বাহির থেকে ঠাণ্ডা বাতাসের স্পর্শে। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে। ভাবলাম একবার যাই চাদর টা নিয়ে আসি। আবার মনে হলো না থাকুক, কী দরকার তার চেয়ে বরং ঠাণ্ডাটাই উপভোগ করি। ঠাণ্ডা আর কষ্টের মাঝে কেমন একটা অদ্ভুত মিল। ঠাণ্ডা যেমন অনুভব করা যায় তেমন কষ্ট টাও অনুভব করা যায়। ঠাণ্ডাতেও কষ্ট হয়। আর কষ্টে তো কষ্টই হয়। দারুণ মিল। এরূপ ভাবনা এবং স্মৃতিচারণ করতে করতে রাতটা শেষ হয়ে গেল সে খেয়াল হয় নি।
সকাল হতে শুরু করলো। আমিও উঠে গেলাম। গলাটা খুসখুস করছে, ঠাণ্ডা লেগেছে। এক কাপ চা খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। তাছাড়া সকালে নাস্তা তৈরি করতে হবে। চা করে খেয়ে নাস্তা তৈরি করলাম। কেউ তো নেই তাই আমাকেই করতে হয়।
রান্না শেষ তাই অদ্রিতার ঘরে গেলাম। গিয়ে দেখেই বুঝলাম ঘুমের ভান করে শুয়ে আছে। কারণ ও ঘুমের ভান করলেই চোখ পিটপিট করে। আমি চুপি চুপি তার কাছে গেলাম। গিয়েই পেটে কাতুকুতু দিয়ে কোলে নিলাম। অদ্রি হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। আবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে আছি। এ যেন ছোট জিনিয়া। আমার একাকী জীবনে এই একমাত্র আবলম্বন। আমার কষ্টের জীবনে এক টুকরো সুখ।
ওকে ফ্রেশ করিয়ে দুজনে মিলে খেয়ে নিলাম। অবশ্য অদ্রিকে খাইয়ে দিতে হয়। খাইয়ে দিচ্ছিলাম আর ভেবে ঠিক করলাম আজ অফিসে যাব না। অদ্রির খাওয়া শেষে হাত ধুতে যাব এমন সময় কলিং বেল বাজলো। আমি তাড়াহুড়া করে হাত ধুয়ে ‘কে?’ বলেই দরজা খুলে দিলাম। তবে খুলেই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। যাকে আশা করি নি সেই এসেছে। হ্যা জান্নাতই এসেছে। তবে কেন আসলো? তবে কী… আমি কিছু বলার আগে সে বলে উঠলো,
— যাকে ভালোবাসি, যার জন্য এতটা কাল অপেক্ষা করেছিলাম তার জন্য আমি এতটুকু করতে পারবো না তা কী সম্ভব। আমি রাজি ফয়সাল! অন্তত তোমাকে আর অদ্রিতাকে তো কাছে পাব।
কী বিষয়ে রাজি তা বলে দিতে হলো না। আমি হতবাক। সময়টা যেন থমকে গেছে। অতঃপর একটু সুখের আশা। আহা এমন ভাবে যদি সময়টা থমকে যেত সুখের মুহুর্ত উপভোগের জন্য।
সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত