আজ নীল শাড়ি পড়েছিলাম

আজ নীল শাড়ি পড়েছিলাম

আজ নীল শাড়ি পড়েছিলাম। চোখে ছিল টানা কাজল। হোস্টেলের এক বড় আপু বলেছিলেন, সাজলে নাকি মন ভাল হয়ে যায়! তাই মাঝরাতে সখকরে একটু সাজতে বসেছিলাম।
আফসোস, একটি সেল্ফিও তুলতে পারিনি.. তার আগেই চোখের পানিতে নষ্ট হয়ে যায় অবয়বের কারুকাজ। দেহটাকে রঙিন আবরণে সাজাতে পারলেও মনটাকে পারিনি। হয়তো পারবোওনা কোনদিন।

একটা ছেলেকে অনেক ভালবেসেছিলাম। শূন্য হৃদয়ে মনেরমত কাউকে খুঁজে পেয়ে সহজেই তাকে আপন করে নেই। সম্পর্ক গড়ে উঠতে খুব বেশি একটা সময় লাগেনি।

স্বপ্নবিহীন আনরোমান্টিক মেয়েটাকে সে অল্প ক’দিনেই স্বপ্নবিলাসী রোমান্টিক বানিয়ে দেয়! দিন দিন গভীর হতে থাকে আমাদের সম্পর্ক।

হঠাৎ তার কথার টপিকগুলো বদলে যেতে থাকে। প্রথম প্রথম উদ্ভট সব প্রশ্নগুলি শুনে লজ্জায় কলকেটে দিতাম। এই নিয়ে অনেক ঝগড়াও হত আমাদের মাঝে। ঝগড়ার টপিক শুনে ফ্রেন্ডরা হাসাহাসি করতো আর আমাকে বলতো.. “আরে.. তুই ছাড়া ওর আর কে আছে বল! তোকে বলবেনাতো কাকে বলবে?!”
ভুলের পথ চলা যেন সেদিন থেকেই শুরু হয়ে যায়। এভাবেই অস্বাভাবিক লাগা বিষয়গুলো প্রতিটাবার ফ্রেন্ডরা মিলে স্বাভাবিক বানিয়ে দিত!

আমি অত্যাধুনিক মেয়ে গুলোর মত এতটা স্মার্ট ছিলাম না। আমি গায়ের তিন টুকরো কাপড়ের সঠিক ব্যবহার করতে জানতাম! এতে হয়তো ফ্রেন্ডদের চোখে আমি খ্যাত, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমার বয়ফ্রেন্ডেরও বোধহয় এই ছিমছাম হিজাবী পোশাক নিয়ে কিছুটা আপত্তি ছিল। হয়তো মুখ ফোটে বলার সাহসটা পায়নি। নিজস্বার্থে সবসময় আমার সাপোর্টেই কথা বলে যেত।

সেদিন ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি, সন্ধ্যে সাতটা বাজে।
নিভু নিভু লাইটে সাজানো রেস্টুরেন্ট থেকে তড়িঘড়ি করে বের হয়ে আসলাম। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি সি,এন,জির অপেক্ষায়। হাত পা কাঁপছিল আমার। পাশেই বয়ফ্রেন্ড দাঁড়িয়ে আছে আমাকে সি,এন,জিতে উঠিয়ে দিতে। তার দিকে তাকানোর মত রুচিটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। সেদিন রেস্টুরেন্টে হুট করে সে আমার গায়ে হাত দিয়ে বসে! তার উদ্ভট আচরণে ক্ষনিকের জন্য আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। বেশিক্ষণ তার পাশে আর বসে থাকতে পারিনি। দ্রুত উঠে চলে আসি।

হোস্টেলে আসতেই গরগর করে চোখ বেয়ে পানি পড়তে থাকে। বাবা মা আমাকে যে নিরাপত্তার চাদরে আগলে রেখে বড় করে তুলেছে, সেই মূল্যবান চাদরের মর্যাদা আমি আজ রাখতে পারিনি। পরপুরুষের হাতের স্পর্শ আজ আমার গায়ে! হয়তো এই অত্যাধুনিক নোংরা সমাজে পার্ক অথবা রেস্টুরেন্টে ছেলেমেয়েদের কাছাকাছি চলে আসাটা কোনো গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখা হয়না। কিন্তু আমার মত মুসলিম পরিবারের মেয়েদের জন্য সেটা ছিল অনেক বড় রকমের এক ধাক্কা।

হোস্টেলের বড় আপু আমার চোখমুখ দেখেই বুঝে ফেলে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। তার কাছে শুরু থেকে শেষপর্যন্ত সবকিছু শেয়ার করি। আমি ছেলেটিকে অনেক ভালবাসি… তাই আপু ছেলেটিকে নিয়ে সরাসরি কোনো সমালোচনা করেনি, শুধু বলে দেয়…

“ছেলেটা ভাল নাকি খারাপ সেটা তুমি নিজেই বিচার করে নিয়ো। শুধু এইটুক মাথায় রেখে দাও.. ছেলেটার উদ্দেশ্য যদি খারাপ হয়, সে দিন দিন অনৈতিক আবদারগুলো ধাপেধাপে বাড়িয়ে দেবে। আজ তোমাকে একটু কাছে পেয়েছে কাল তা আরেকটু বাড়িয়ে দেবে। তার সব শারীরিক চাওয়াগুলো থাকবে ভালবাসাপূর্ণ মিষ্টি আশ্বাসে ঘেরা। বোন, নিজেকে একটু নিরাপদে রেখ”

হুম আপুর কথাটাই ঠিক হয়ে যায়। দু’দিন পরেই সে আমার নানা শারীরিক প্রশংসা শুরু করে দেয়। আমি নাকি সেদিন সন্ধ্যায় তার ভালবাসা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছি! আমি অবাক হয়ে তার কথা গুলো চুপচাপ শুনে যাচ্ছিলাম। এরপর সে ইনিয়েবিনিয়ে আমাকে ভিডিও কলে আসতে বলে। আমি জিজ্ঞেস করি “এই মাঝরাতে ভিডিও কলের কি প্রয়োজন?” এর প্রতিউত্তরে সে যা বলে তা ভাষায় প্রকাশের অযোগ্য!! মোবাইলটা ঘৃণায় ছুড়ে ফেলেদেই। দেয়ালে বাড়িখেয়ে মোবাইল থেকে ব্যাটারিটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেই সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আমাদের ভালবাসা নামক মিথ্যে সম্পর্ক!

(সমাপ্তি)

 

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত