অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিবিলাস

অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিবিলাস

অাজকের অাবহাওয়াটা একটু অন্যরকম। একটু সময়ের জন্য ফ্ল্যাশব্যাকে চলে গিয়েছিলাম। সেই ২০০৫ এর ডিসেম্বরের প্রথম দিকের কথা। অামি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। বাসা সিলেটের জালালাবাদ মেয়র লোকমান মামার বাসার সামনে। এই সেই লোকমান মামা যিনি মেয়র পদে হেলিকপ্টার মার্কা পাওয়ার সুবাদে তিনি পাড়ায় হেলিকপ্টার ভাড়া করে এনেছিলেন অার অামারও প্রথম সেটায় চড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। যাইহোক সেটা অন্য কাহিনী।

অামার বাসা থেকে স্কুল অনেকটা দূরে। একদম অাম্বরখানা পয়েন্টে। প্রথম প্রথম নানা বাইকে করে দিয়ে অাসলেও পরে নানার স্থান দখল করে নিয়েছিল অামার তথাকথিত জনম জনমের প্রেমিকা। যাওয়া অাসা হতো একসাথে তাও হাতধরে। কারণ অামাদের যুগের মানুষের চিন্তাধারা অতটাও কুৎসিৎ ছিলনা যে ক্লাস ফাইভের দুটা বাচ্চা সমাজের ভয় পাবে।

ফাইনাল পরীক্ষা প্রায় শেষের দিকে। ডিসেম্বর মাস একেবারে হাড়কাঁপানো শীত। কুয়াশার কারণে দুপুরেও কিছু চোখে দেখা যায়না। অামাদের পরীক্ষা ছিল দুপুর ১টা থেকে ৪টা। যথারীতি অামি স্কুল ইউনিফর্মের উপর ব্ল্যাজার চড়িয়ে বারান্দায় দাড়িয়ে অাছি প্রেমার অপেক্ষায়। যথাসময়ে সে এসে অামাকে ডেকে নিয়ে গেল। পরীক্ষা শুরুর প্রায় অাধা ঘন্টা পর সবাইকে অবাক করে ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। ডিসেম্বরের এমন শীতে বৃষ্টির মানে কি। কারেন্ট নিয়ে গেছে। মোমবাতি জ্বালিয়ে পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা না ছাতা কেউই লিখছে না কিছু। পরীক্ষা শেষ হবার এক ঘন্টা অাগেই ভূড়িওয়ালা প্রিন্সিপাল সাহেব এসে জানালেন পরীক্ষা বাতিল, তবে বৃষ্টি বন্ধ না হলে কেউ বের হবেনা বাইরে। অামার মেজাজ খুব বিগড়ে গেল ৪:৩০ এ “Pokemon” দেখা হবেনা অাজকে। মনভরে গালি দিতে লাগলাম বৃষ্টিকে। প্রেমা হাই বেঞ্চে উঠে বসলো। হঠাৎ তার ঠান্ডা হাত দুখানা অামার ব্ল্যাজারের ঘাড়ের দিক দিয়ে ডুকিয়ে পিঠে রেখে বলল,

তোর পিঠ অামার টেডি বিয়ারের মত নরম তুলতুলে অার সবসময় গরম থাকে।
অামি ঘাড় ঘুরিয়ে বললাম, তুই হাত সেকার জন্য অামার পিঠ ছাড়া কিছু পাসনা? অামার ঠান্ডা লাগছে হাত সরা।
সে এ বিষয়ে কোন উত্তর না দিয়ে বলল অামার ব্যাগে মেরিডিয়ান চিপস অাছে বের কর। ছিড়ে অামারে দে অার তুইও খা।

অামি ওর সাথে তর্কে যাইনা কখনো। কারণ সবাই বলে ওর বুদ্ধি নাকি অামার থেকে বেশি। অামি অবশ্য সেটা মানিনা অামি জানি অামার অনেক বুদ্ধি। তবুও সে যেটা বলল সেটাই করলাম।

অামি দুটা করে খাইতেছি অার একটা করে ওর মুখে দিতেছি। ‌সে চোখ রাঙিয়ে সেটা দেখতেছে তাও অামি তাতে ভীত হলাম না।

ধর্ম স্যার ঈশারা দিয়ে তানিশা ম্যাডামকে দেখিয়ে বললেন,
অামাদের স্কুলের লাভ বার্ড।
বলে দুজনেই হাসতে লাগলেন।

তখনো লাভ বার্ড শব্দ বা পাখি সম্পর্কে অামার কোন ধারণাও নেই। অামি লজ্জায় চিপসের প্যাকেট প্রেমার উরুর উপর রেখে বারান্দায় চলে গেলাম।

বৃষ্টিতে মাঠটা পুরো নস্ট হয়ে গেছে অাগামী তিনদিন ফুটবল খেলা যাবেনা।
হঠাৎ কোমরে চিমটি কে যেন চিমটি দিল,

“কিরে চলে এলি কেন?”

: দেখলি না স্যার কি বলল।
– হ্যা বলছে তুই অামি জামাই বউ।
: হাহা পানি এনেছিস?
– দাড়া অানছি।

বলেই চলে গেল। অামি ভাবতেছি অাজকের পর্বে ডার্করাই কে মেরে ফেলবে প্লাজেল দেখতে পারব না ধ্যাত। মনটাই খারাপ হয়ে গেল।

অনেকক্ষণ পর কাকভেজা হয়ে গ্লাসে করে পানি নিয়ে ফিরলো প্রেমা।

: নে পানি খা।
– গ্লাস কই পেলি?
: ওয়াটার বটল অানিনি অাজকে, গ্লাস অফিসরুম থেকে এনেছি।
– তুই ভিজলি কিভাবে?
: কল থেকে পানি এনেছি অফিসে নাই।
– এই জন্য তুই ভিজে পানি অানবি।

সে কোন উত্তর না দিয়ে অামার ব্ল্যাজারে মাথা ঠেকিয়ে পানি নিষ্কাশন প্রক্রিয়া শুরু করলো।
সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। রাতের মতই অন্ধকার। অর্ধেকের বেশি বাসায় চলে গেছে। তাদের পরিবারের লোকেরা এসে নিয়ে গেছে। কিন্তু অামারে কে নিয়ে যাবে? অামার তো বাসায় অাম্মু একা। নানা গেছে বাড়িতে। অার ভাইয়া তো ইংল্যান্ডে। অামি নিশ্চিত অাম্মু বাসায় কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। প্রেমার দিকে তাকালাম। সে দিব্যি বারান্দায় বসে মহারানীর মত পা দুলাচ্ছে। তার যেন কোন চিন্তাই নেই এভাবেই কাটিয়ে দিতে পারবে সারাজীবন।
অামাকে চিন্তায় দেখে প্রেমা সামনে এসে দাড়ালো,

: কিরে বাসায় যাওয়ার চিন্তা?
– হুমম অাম্মু মারবে।
: মারবেনা, অাজকে তো বৃষ্টি।
– বাসায় কেমনে যাবো!
: চল অামরা ভিজেই বের হই

অামিও সাতপাঁচ না ভেবে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে পড়লাম।

অামি কোনমতে একহাতে ব্যাগ মাথায় দিয়ে রাস্তায় হাটছি অার অন্যহাত প্রেমার হাতের মুঠোয়। সে মনে করে অামার হাত না ধরলে অামি গাড়ির নিচে পড়ে যাব। এত বৃষ্টি যে এক হাত দূর ও কিছু দেখা যাচ্ছিল নাহ। অামি থরথর করে কাপছিলাম। প্রেমা সেটা বুঝতে ‌পেরে শুরু করলো খোচাঁনো।

: কি হৃদয় বাবু ভয় করছে?
– ঠান্ডা লাগছে
: চিন্তা করিস না অামি তোকে বাসায় পৌছে দিব।
– মুখটা বন্ধ রাখ।

মাগরিবের অাজান দিচ্ছে। সন্ধ্যার পর কখনোই অাম্মু ছাড়া বাইরে থাকিনি। বাসার সামনে মাঠ থাকা সত্বেও সবসময় অাজানের ১০ মিনিট অাগে বাসায় ফিরেছি। না জানি অাম্মু কত চিন্তা করছে।

প্রেমার চেহারায় কোন চিন্তার রেখাও নেই। মনে হচ্ছে সে খুশিই হয়েছে বৃষ্টি অাগমনে। ব্যাগ থেকে অাধখাওয়া চিপসের প্যাকেট বের করলো। চায়ের বদলে বৃষ্টির পানিয়ে ভিজিয়ে ভিজিয়ে খাচ্ছে। অামার বাসার খুব কাছাকাছি অাসতেই বৃষ্টি কমে গেল। প্রেমার বাসা হেটে অারও ১০ মিনিটের পথ। অাম্মু গেইটের কাছেই দাড়িয়ে ছিল দৌড়ে এসে অামাকে জড়িয়ে ধরলো। অাচঁল দিয়ে মাথা মুছে দিলো।

এবার প্রেমার দিকে তাকালেন,
: বউমা অামার ছেলেকে নিয়ে কোথায় গিয়েছিলে এত দেরী হল যে?
– অান্টি অাজকে কক্সবাজার গিয়েছিলাম। সাগরে সাতার কেটেঁ অাপনার ছেলের ঠান্ডা লেগেছে।
: দাড়াও তোমার জন্য ছাতা নিয়ে অাসি।
অাম্মু চলে গেলে প্রেমা তার ব্যাগ থেকে ছাতা বের করে ভিলেনি স্টাইলে একটা হাসি দিল,
: তোর কাছে ছাতা ছিল অাগে বের করলিনা কেন?
– সারাদিন কার্টুন দেখিস তুই বুঝবি কেমনে? হিন্দি ছবিও দেখ।
: হরিয়া মর মরকির ফুরি!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত