অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা

অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা

আমি সবসময় আমার স্বামীর মাঝে জাভেদের ভালবাসা খুঁজে ফিরি। কিন্তু কখনো খুঁজে পাইনা জাভেদের ভালবাসা। কারন আমার স্বামী আমার স্বামীর মতই। প্রতিনিয়ত মনে হয় জাভেদ হয়তো আমাকে অনেক সুখে রাখত, অনেক ভালবাসত।

পাগলের মত ভালবাসা কাকে বলে আমি জানিনা। কিন্তু আমার জন্য জাভেদের চোখে বহুবার পানি দেখেছি। সে চোখের পানিতে ছলনা ছিলনা। ভালবাসা ছিল, সত্যিকারের ভালবাসা।

খুব অল্পতে কেঁদে ফেলা ছেলেটি আমার বান্ধবীদের সামনেও কেঁদে ফেলত। তার কাঁদার কারণ ছিল আমি কেন তার সাথে কথা বলিনা, কেন তাকে ভালবাসিনা।

তখন সবেমাত্র নবম শ্রেণীর ছাত্রী আমি। স্কুলের যাওয়ার সময় দেখতাম প্রতিদিন একটি ছেলে রাস্তার পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে কারো প্রতীক্ষার প্রহর গুণছে। পিছন পিছন হেটে আসত অনেক দূর। এক বান্ধবী জানতে চাওয়ায় বলেই দিল একদিন, “রূপাকে আমার অনেক ভাল লাগে, তাকে অনেক ভালবাসি আমি।”

কিছুটা হাসি পেল, এই ছেলে ভালবাসে আমাকে। কিছুটা ভয় কাজ করল, কেউ জানতে পারলে লোকে মন্দ বলবে। কিছুটা রাগ হল, তার প্রতিদিনকার অপেক্ষা আমার বিরক্তির কারন হয়ে দাড়াল।

ইচ্ছে করে কত অপমান করেছি, তবুও পিছু ছাড়েনা ছেলেটি। যত অপমানিত হয় ততই বেশী তার ভালবাসা প্রকাশ করতে চায় আমার কাছে।

কত বলত, “রূপা তোমাকে ভালবাসার জন্য যে পরীক্ষা বলবে আমি দিতে রাজী আছি।”
বলেছিলাম, আমাকে ভুলে যাও। আমার পিছু ছেড়ে দাও।
ছেলেটি তবুও তার ভালবাসায় অটল।

আমার বান্ধবীর কাছ থেকে নাকি কার কাছ থেকে যেন জাভেদ আমার ফোন নাম্বার জোগাড় করে ফেলে। প্রতিটা দিন ফোন দিত। আমি তার কন্ঠ শুনলেই লাইন কেটে দিতাম। একদিন, দুইদিন, এক সপ্তাহ, আর কত?
জাভেদ বলত, “একটু কথা বললেতো তুমি আমার প্রেমে পড়ে যাবেনা, একটু কথাই বলো।”

ভাবলাম যে ছেলেটা এত পাগলামি করে আমার জন্য। একটু কথা বলতে চায় শুধু। তাহলে একটু কথা বলি।
প্রতিদিন ফোন দিত, রিসিভ করে কথা বলতাম।

খেয়েছি কিনা? কি দিয়ে খাইলাম? মন ভাল কিনা? পছন্দ কি? এসবই বেশী বলত। কিন্তু প্রতিদিন এসব কথার পর আবার সেই একটাই কথা, “রূপা আমাকে একটিবার ভালবাসা যায়না?”
না, যায়না। আমি ভালবাসতে পারবনা তোমাকে। বলে ফোন রেখে দিতাম।

একদিন জানতে চেয়েছি, কিসের জন্য আমার প্রেমে পড়লে? দুনিয়াতে কি মেয়ের অভাব?
উত্তরে বলেছিল, “প্রথমদিন তোমার হাটা দেখে আমি প্রেমে পড়েছি। মানুষতো কত কিছু দেখেই প্রেমে পড়তে পারে। কিন্তু আমি প্রেমে পড়েছি তোমার হেলে দুলে হাটা দেখে। চিকনা শরীর, বাতাসে মনে হয় ফেলে দেবে। সে মেয়ের আঁকা বাঁকা চলন আমার মন কেড়েছে।

তার উপর এত ফর্সা আর লম্বা তুমি, যে কোন ছেলেই তোমার প্রেমে পড়তে বাধ্য। তোমার রাগী ভাবটা আমার আরো বেশী ভাল লাগে। ”

আবার রেগে গেলাম, কি আমি রাগী মেয়ে? ওকে আবারো রাগ দেখাচ্ছি আমার পিছনে আর ঘুর ঘুর করবেনা।

কলেজে যাবার পরও ওর ভালবাসা বিন্দুমাত্র কমেনি। দুই বান্ধবীকে লাগিয়ে দিলাম জাভেদের সাথে প্রেম করার জন্য। কিন্তু জাভেদের একটাই কথা, “জীবনে একজনকেই ভালবেসেছি, সে হল রূপা। আমার জীবনে রূপা ছাড়া অন্য মেয়ের ভালবাসার প্রয়োজন নেই।”

একদিন কথা না বললে কেঁদে দিত। কতটা আবেগ প্রবণ যে ছিল ছেলেটা। চোখের কোণে মনে হয় সারাক্ষন পানি এসেই থাকত। আর সেটা আমারি জন্য। কত বলত দেখা করার জন্য। ওর নাকি খুব ইচ্ছে নীরবে বসে আমার সাথে কথা বলবে। আমিও কোথাও যেতামনা। যাকে ভালই বাসিনা তার সাথে দেখা করব কেন? সত্যিই অনেক জিদ চেপেছে মনে যে আমি এই ছেলেকে ভালবাসবনা।

একদিন তার অনুরোধের কাছে হার মানলাম। তার অনুরোধ তার সাথে নীরবে বসে একদিন কথা বলতে হবে। রাজী হলাম। বিকাল চারটা, পার্কের বেঞ্চ হল ঠিকানা।

১০ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৭। ভালবাসা দিবসের চারদিন আগে দেখা করতে গেলাম জাভেদের সাথে। প্রথম ত্রিশ মিনিট সে তেমন একটা কথা বলতে চায়নি। শুধু তাকিয়ে থাকত। আমিই বলতেছি, “দেখো আমি তোমাকে ভালবাসিনা, আর ভালবাসতে পারবওনা। আমার জন্য এত ভালবাসা দেখাতে হবেনা, পাগলামিও করতে হবেনা।”
শুরু হল তার অনর্গল কথা বলা। সে আমাকে খুব ভালবাসে। আমার জন্য যা খুশি করতে পারবে। যেভাবে বলি সেভাবে চলবে।

অথচ আমার জিদ আমি প্রেম করবনা। কিন্তু ভিতরে কেমন একটা শিহরণ হচ্ছে জাভেদের কথাগুলোতে। আমি উঠতে চাইলাম। জাভেদ আমাকে আসতে দেয়না। হাত ধরে কান্না করতেছে। “রূপা আমাকে একটি বার ভালবাসো। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবনা।”

অবশেষে বলেছি, “তোমাকে ভালবাসা আমার পক্ষে সম্ভবনা। তবে তুমি আমার পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারো। যদি আমার বাবা মা তোমার কাছে আমাকে বিয়ে দেয় তাহলে আমার আপত্তি নেই।”

বুঝিয়ে শুনিয়ে বাড়ি চলে আসলাম। তবে কে জানত সেই দেখাই জাভেদ আর আমার শেষ দেখা।

জাভেদকে বলার পর সে পরেরদিনই তার বাবা মা নিয়ে আমাদের বাড়ি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে হাজির। কিন্তু আমার বাবা মা রাজী হলেন না। আমার পরিবার লোক মুখে কিছু শুনলেও বিশ্বাস করতনা। কারন আমার বাবা মা জানত তাদের সম্মান নষ্ট করে প্রেম ভালবাসা নিয়ে আমি কখনোই সময় নষ্ট করবনা। কিন্তু যখন জাভেদ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসল আমার বাবা মায়ের ধারনা আমি প্রেম করি জাভেদের সাথে।

জাভেদ ও তার পরিবার চলে যাবার পর বাবা আমার মোবাইল কেড়ে নিলেন। কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। সাত মাস পর আমার ফাইনাল পরীক্ষা অথচ আমার বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ।

এই প্রথমবার বুঝতে পারলাম আমি জাভেদকে ভালবাসি। যখন মোবাইল নেই হাতে। জাভেদের সাথে কথাও হচ্ছেনা। কলেজ যাবার পথে দেখাও হচ্ছেনা। আমি কেমন যেন ছটফট করতে লাগলাম জাভেদের জন্য। তাহলে এতদিন এত রাগ এত জিদ এল কোথা থেকে? আজ কেন তাকে একটিবার দেখার জন্য একটু কন্ঠ শুনার জন্য এমন ছটফট করতেছি? ভালবাসাটা এতদিন বুঝতে পারিনি কেন?

এতটাই ছটফট করছিলাম যে বারবার মনে হচ্ছিল বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে জাভেদকে একনজর দেখে আসি। দরকার হয় তাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাই।

কিন্তু না, বাবা মায়ের কথা চিন্তা হলে আর পাগলামি করতে ইচ্ছে হয়না। এলাকার মানুষ কি বলবে আমার বাবা মা’কে আমি যদি অন্যের জন্য বাড়ি ছেড়ে পালাই।

দুইমাস তেইশ দিন কেটে যায়। ২০১৭ সালের মে মাসের ১৩ তারিখ রাতের বেলা হুট করে আমাকে বিয়ে দিয়ে দেয়। তখন না পারছিলাম পালাতে, না পারছিলাম জাভেদকে ছাড়া অন্য কাউকে স্বামী বলে কবুল করতে।
কিন্তু শেষ অবধি বিয়েটা হয়েই গেল।

বিয়ে হল নয় মাসের উপরে। কিন্তু সুখ কি? ভালবাসা কি বুঝিনি কখনো। সংসার কি শুধু রান্না করো, খাও, ঘুমাও?
একটা দিন আমার স্বামী জানতে চাইলনা তোমার কি পছন্দ? কি খেতে ভাল লাগে? কি পরতে ভাল লাগে? বা চলো আজ কোথাও ঘুরে আসি। চলো আজ দুজনে বসে গল্প করি।

বাবা মায়ের পছন্দ অনুযায়ীতো বিয়ে করেই নিয়েছি। তবে কেন সুখ নামের পাখিটাকে ধরতে পারছিনা? কেন জাভেদকে মন থেকে সরাতে পারছিনা?

যদি আজ আমার স্বামী আমাকে ভালবাসত তবে হয়তো জাভেদকে ভুলে থাকতে পারতাম। বাবা মা’কে দেখা হয়না সেই কবে থেকে।

যখন একা বালিশে মুখ গুঁজে থাকি তখন জাভেদকেই মনে পড়ে।

ফেসবুক থেকে জাভেদকে ব্লক করা উচিত। তার কান্না জড়িত আবেগী মেসেজ আমাকে আরো অসুখী করবে। তার প্রতিটি মেসেজ পুরোনো স্মৃতিকে জাগ্রত করে দেয়। এভাবে চলতে থাকলে জাভেদকে ভোলা কিছুতেই সম্ভব হবেনা। তবে আমাকে যে সংসার করতে হবে। জাভেদকে মন থেকে মুছে সুখে থাকার অভিনয় করতে হবে।
তবুও কেন যেন অবুঝ মনটা বারবার বলে, “জাভেদকে হয়তো বড্ড বেশী ভালবেসে ছিলাম।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত