বাবার ভালোবাসা

বাবার ভালোবাসা

-ট্রেনে উঠার পর থেকেই
লোকটাকে বেশ
বিচলিত মনে হচ্ছিলো”
-সাত আট বছরের বাচ্চাকে কেউ এভাবে বকা দেয়
– ব্যাটাকে কষে দু ঘা দিতে পারলে ভাল্লাগত”
-একটা টিকেট নিয়েছে
-সেখানে ছেলেকে বসিয়ে দিয়ে ছেলের পাশে বাবা দাঁড়িয়ে ঝিমুচ্ছে
ট্রেনের আওয়াজে মাঝে মাঝে ঘুন চলে গেলেই বাচ্চার দিকে তাকাচ্ছে
-আর ধাক্কা দিয়ে বাচ্চাটার ঘুম ভাঙিয়ে দিচ্ছে
-আঞ্চলিক ভাষায়ই বলতে লাগলো,”ওই ঘুমাস ক্যা”তরে না ঘুমাইতে না করসি?
খানিকটা অবাক হলাম
-রাতের জার্নি,এই বাচ্চা ঘুমাবে না তো কি নাচবে?
ইচ্ছে হচ্ছে লোকটাকে জিগেস করতে মনে মনে ভাবনা আসলো,কে জানে হয়তো নামে মাত্র বাবা
-ট্রেনের কামরায় যতবার চা ওয়ালা আসছে ততবারই লোকটা ছেলেটাকে চা খাওয়াচ্ছেন
যেন ছেলেটা জেগে থাকে।

ছেলেটার দিকে একবার ভালোভাবে তাকালাম। চোখ থেকে যেন রক্ত ঝরছে। কে জানে,কয় রাত না ঘুমিয়ে রেখেছে এই বাপটা? মনে মনে গালি দিচ্ছিলাম,”শালা একটা হারামি” আবার কৌতুহল জেগে উঠে,কেন লোকটা এমন করছে।

ভাগ্যিস ছেলেটা আব্বা বলে ডাকছিলো,নইলে তো পাচারকারী বলে গণপিটুনি দিতাম। এদিকে ছেলেটাকে ঘুমাতে দিচ্ছিলো না,অন্যদিকে ছেলেটাকে খুব আদর করছে,খুব যত্ন করছে। ট্রেনে যাই নিয়ে আসে হকাররা লোকটা তাই কিনে দিচ্ছিলেন। কিন্তু ঘুমাতে দিচ্ছিলেন না।

প্রায় চার ঘন্টা লোকটার এমন অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করছিলাম। মনে হতে লাগলো,হয়তো ট্রেনে নানান অঘটনের ভয়েই লোকটা ঘুমোতে দিচ্ছিলেন না। জার্নি শেষে লোকটাকে আর জিগেস না করে পারলাম না।

-আপনি কি বাচ্চাটার বাবা?
-হ
-কি রকম বাবা ? মানে আপনাদের কি আসলেই বাবা ছেলের সম্পর্ক?
-আফনে কি আমার লগে মশোকরা কইত্তেসেন?
-না মানে,আপন বাবা হলে তো নিজের কোলে ছেলেটাকে ঘুম পাড়িয়ে দিতো। দেখতেই বোঝা যাচ্ছে ছেলেটা অনেক ক্লান্ত।
লোকটা এবার আমার দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকালো। “না,অরে আমি আমার কোলে ঘুমাইতে দিমু না”
-কেন? ও কি কন অপরাধ করেছে?
– হ
– অপরাধী?
লোকটা আমার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকালো। তার কলিজার টুকরাকে আমি অপরাধী বলেছি।
-আপনার ছেলেকে মাফ করে দিন?
– না,ওরে আমি মাফ করুম না
-অন্তত ঘুমাতে দিন?

লোকটা এবার কেঁদে দিলো। “ও তো কয়দিন পর এম্বেই ঘুমায়া যাইবো,এই কয়টা রাইত জাইগ্যা থাউক? আমার লগে কথা কউক?’ – বলেই লোকটা হাতের কিছু কাগজ পত্র আমার হাতে ধরিয়ে দিলো। আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছি।
দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। আর ওর পাগল বাবাটা তাকে ঘুমাতে দিচ্ছেনা।

কাদতে কাদতে চলে গেলো। “না,অরে আমি ঘুমাইতে দিমু না,অয় তো কয়দিন পর এম্বেই ঘুমায়া যাইবো,এহন ও আমার লগে কথা কইবো,অরে আমি একটা সেকেন্ড ও ঘুমাইতে দিমু না,যদি ওই এক সেকেন্ডেই ও উপরে উইঠ্যা যায়? আমি ওরে আমার কোলে শোয়ামু না,শোয়াইলে যদি ও আমার কোলেই ঘুমায়া যায়? অয় শুধু চা খাইবো,জাইগ্যা থাকবো,ঘুমাইবো না,আমার পোলারে কেউ কাইড়া নিবো না” লোকটা ডুকরে কেঁদে কেঁদে বলে যাচ্ছে।

—-সমাপ্ত—-

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত