টমে ‘র বাসর রাত

টমে ‘র বাসর রাত

জোড়ে শব্দ করে রুমের দরজা বন্ধ করলাম! এতো জোড়ে শব্দ হয়েছে যে আমার রুমে বসে থাকা আমার বউ সহ বাড়ির সবাই শুনতে পেয়েছে! আমার বউ এই শব্দে এতটাই ভয় পেয়েছে, তার শরীর কাঁপতে শুরু করেছে! আর তার প্রধান কারন আমার হাতে থাকা তিন ইঞ্চি মোটা আর দু’হাত লম্বা গোল লাঠিটা!

সে বোধহয় এটা আশা করেনি, না করার ই কথা কারণ আজ যা হবে তা বাড়ির সবাই স্বপ্নে দেখতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে আমার! আমার মাথায় থাকা পাগড়ি টা ছুড়ে মারলাম বউয়ের উপর, মেয়েটা ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। লাঠি হাতে নিয়ে আমি বিছানার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম!

চোখ বড় বড় করে মেয়েটা আমার দিকে তাকাচ্ছে, আমি বিছানার চারপাশে চক্কর দিতে লাগলাম! গম্ভীরমুখে তিন চক্কর দেওয়ার পর দেখলাম মেয়েটা এতটাই ভয় পেয়েছে যে তার গলাটা শুকিয়ে গেছে। বিছানার পাশে থাকা ছোট্ট টেবিলের উপরে রাখা গ্লাস টা ধরতে যাবে তখনি বাঘের মতো গর্জে উঠলাম আমি ;
– এই মেয়ে!
মেয়েটা গ্লাস না ধরে বিদ্যুৎ বেগে আমার দিকে ঘুরে বসলো, চোখে রাজ্যের ভয় জমে আছে! আমি আবার আগের মতোই চিৎকার করে বললাম ;
– জানো এইটা কার গ্লাস?
মেয়েটা এতে কেঁদে দিল! আমি তো পারলে হেসে মরে যাই! আমার এতো হাসি পাচ্ছিলো আমি তো একসময় ভাবলাম এই সব ভন্ডুল করে ফেললাম বুঝি! কিন্তু না নিজেকে সামলে নিলাম। এবার বিরক্ত হবার ভান ধরে বললাম;

– চুপ করো তো! নাম কি তোমার?
মেয়েটি কেঁদে ই চলেছে,আমি জানি আমার কি করতে হবে এখন! খুব জোড়ে একটা ঝাড়ি দিলাম আবার ;
– এই মেয়ে! থাপ্পড়িয়ে দাঁত ফেলে দিব, না না থুক্কু লাঠি দিয়ে আজ মাথা ফাটাবো তোমার!
মেয়েটা এবার মা গো, বাবা গো বলে কাদঁতে লাগলো! এত জোড়ে যে বাড়ির সবাই দরজার কাছে জড়ো হয়ে গেছে তার কান্না শুনে! মা ডাকছেন আমাকে ;
– খোকা, এই খোকা কি হলো?
মেয়েটা এবার আরো জোড়ে কান্না করতে লাগলো, আর বলে উঠলো ;
– আমাকে বাঁচান! আজকে আমার মাথা ফাটিয়ে ফেলবে!
আমি আবার গর্জে উঠলাম আর চোখ মুখ কঠিন করে বললাম ;
– এই চুপ! একদম চুপ কোনো কথা না!
মা তো দরজা ভাঙার নির্দেশ দিয়ে দিলেন! আমি তাই তাদের উদ্দেশ্য বললাম ;

– কেউ যদি দরজায় হাত দাও, খোদার কসম আজকে এই মেয়ের মাথা আমি দু টুকরো, না না দুই দু গুনে চার টুকরো করবো! তাই তোমরা সবাই এখান থেকে চলে যাও!

– বাবা, তুই পাগলামি করিস না! কি হয়েছে বল আমাকে? কোনো সমস্যা হলে আমরা আছি তো! বল বাবা কি হয়েছে?
– কিছুনা মা! তোমরা যাও আমি আজকে এই মেয়ের মাথা চার টুকরো করে আসছি!
– কি বলিস এইসব?
একটু জোড়ে চিৎকার করে বললাম ;
– যাবে তোমরা? না কি এখনি মাথা ভাঙবো?

এতে দেখি বাড়ির সবাই একটু ঠান্ডা হয়েছে! আমি আর সেদিকে কান দিলাম নাহ! সোজা বিছানার পাশে গেলাম! মেয়েটা মানে আমার বিয়ে করা বউ, কান্না করছে এখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে! তার মুখে থাকা হালকা মেকাপ গুলো চুখের জলে মুছে গেছে! আমি এবার একটুখানি আস্তে বললাম ;

– কি নাম তোমার?
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ই বললো;
– জেরিন!
– চুপ বেয়াদব! বড়রা নাম জানতে চাইলে পুরো নাম বলতে হয় জানো না?
মেয়েটা আবার ফোঁপাতে শুরু করেছে! এবার ফোঁপানি টা বেড়ে গেছে অনেকটা! আমি বললাম ;
– পুরো নাম বলো?
– নাবিলা সাহারিয়ান জেরিন!

– হুম,বুঝলাম! তবে আমি জেরিন টেরিন ডাকতে পারবো নাহ! আমি জেরি ডাকবো, যেহেতু আমি টম ক্রুজের একজন বিশাল মাপের ভক্ত তাই আমি নিজের নাম টম রেখেছি! আমার নামের সাথে মিলিয়ে তোমার নামটা রাখলাম! আমি টম আর তুমি কি?

– জেরিন!
আমি এবার চোখ মুখ কঠিন করে ফেললাম, তারপর দিলাম আরেকটা ঝাড়ি!
– কি? আমি না বললাম আমি জেরিন টেরিন ডাকতে পারবো না?
– সরি, সরি! আমি জেরি!
– চুপ! একদম চুপ! আর তোমাকে কে বলেছে ছন্দ মিলাতে?
– আমি কখন ছন্দ মিলিয়েছি?
– সরি,সরি আমি জেরি!
এইটা কি? ফাইজলামি করো আমার সাথে? দিব মাথা ফাটিয়ে?
মেয়েটা এবার আবার ফোঁপাচ্ছে, আমার দিকে এখন আর তাকাচ্ছে না! নিচের দিকে তাকিয়ে বললো ;
– জ্বী, না! আমি সরি বলেছি!
– হুম, হইছে! চুপ থাকো এখন!

আমি মেয়েটার কথা ভাবছি! মেয়েটা হয়তো ভাবছে, কোন কুক্ষনে আমার বউ হয়ে এই বাড়িতে এসেছে! ভাবুক যা মন চায়, আমি এখন আরো সামনে যাবো! গলার সুরে কৃত্রিম বিরক্তি ফুটিয়ে বললাম ;
– তোমার কোনো ইয়ে ছিলো? মানে ওই যে কি থাকে না? কি যে বলে, বয়ফ্রেন্ড নাকি?

মেয়েটা চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে!

– থুক্কু! বাদ দাও জানি তোমার ওইসব থাকবে না! তুমি তো আর দেখতে বিশ্ব সুন্দরী নাহ!
– কি বলতে চান আপনি? আমি দেখতে খারাপ? জানেন আমি জীবনে কতটা প্রেম পত্র পেয়েছি? ৩৪৮ টা! জীবনে একটা প্রেম ও করিনি আমার ভবিষ্যৎ জামাইয়ের কথা ভেবে! আর এমন একটা জামাই হলো আমার!

মেয়েটা এক নিশ্বাসে কথা গুলো বললো, বলেই কান্না শুরু করে দিল! কান্না করছে তো করছে থামার কোনো নাম নেই! আমি বিরক্ত হবার ভান ধরে বললাম ;

– তোমার মাথায় আমি সত্যি সত্যি এই লাঠি ভাঙবো! তুমি কি চাও আমি এটা করি?
মেয়েটা এবার জোড়ে, অনেক জোড়ে কান্না করতে লাগলো! আমি এবার হাতের লাঠিটা নিয়ে এগিয়ে গেলাম! মেয়েটা হাউমাউ করে কান্না করতে লাগলো, চোখে ভয়ংকর ভয়! আমি তার সামনে গেলাম, যাওয়া মাত্র ই চোখ বন্ধ করে ফেললো! আমি আর হাসি থামাতে পারলাম না, হো হো করে দানবের মতো হেসে উঠলাম! আমার জীবনে আমি এভাবে হাসিনি! সোজা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললাম! তারপর কোনো দিকে না তাকিয়ে ছাঁদের উদ্দেশ্য পা বাড়ালাম!

দরজা খুলতেই সবাই হুড়োহুড়ি করে আমার রুমে ডুকে পরলো! আমি তো হাসতে হাসতে মরে যাবো এই অবস্থা! ছাঁদে এসে এত হাসছি, যে কেউ দেখলে ভাববে আমি বোধহয় পাগল হয়ে গেছি! বাসায় কি হচ্ছে বা এরপর কি হবে তা ভাবতে ই আমার হাসিতে দম বন্ধ হবার উপক্রম হচ্ছে! যা কান্ড একখানা ঘটিয়েছি, এরপর আম্মা আমাকে ঘরে ঢুকতে দিলে হয়! আমি নিশ্চিত আজকে আমার কপালে অনেক দুঃখ আছে, তাতে কি? এই মজা তো আর প্রতি দিন করা যাবে না! আর এইরকম বাসর রাত ই বা কয়জন পায়?

রাত ২ টা বাজে! আমি ছাঁদে এসেছি ১ ঘন্টা ৩৮ মিনিট হয়েছে! এই পর্যন্ত আমার খুঁজে কেউ আসেনি! সত্যি বলতে কি আমি এই ১ ঘন্টা ৩৮ মিনিটের মধ্যে বোধহয় পুরো টা সময় হেসেছি! আমার এখনো হাসি পাচ্ছে! নিচে নেমে আসলাম, দরজায় টোকা দিতেই দেখি রাকিব দরজা খুলে দিয়েছে আর আম্মা গম্ভীরমুখে ড্রয়িং রুমে বসে আছেন! কিন্তু একটা জিনিস যেটা উনার হাতে খুবি বেমানান সেটা হচ্ছে আমার তিন ইঞ্চি মোটা আর দু’হাত লম্বা লাঠিটা!

আমাকে দেখেই আম্মা লাফ দিয়ে উঠলেন, উনার এই অগ্নি রুপ দেখে আমি বুঝে নিলাম আমার আজকে নিস্তার নেই! আম্মা রেগে গেলে আমি একটা জিনিস করি আর এতে আম্মার রাগ পানি হয়ে যায়! আমি আমার সেই পুরোনো কিন্তু কাজের ফরমুলা টা ব্যাবহার করলাম! আমি বাচ্চাদের মতো করে হেসে ফেললাম, ব্যস এতেই কেল্লা ফতে! আম্মা নিজেই হেসে দিলেন আমার সাথে তারপর বললেন ;
– তুই এটা কোথায় পেলি?
– রাকিব এনে দিয়েছে!

আম্মা রাকিবের দিকে লাঠি নিয়ে এগিয়ে গেলেন! আর আমি চললাম আমার বউয়ের কাছে! রুমে গিয়ে আবার দরজা লাগিয়ে দিলাম বিকট শব্দ করে, আমি যে রুমে এসেছি সেটা জানিয়ে দিলাম মেয়েটা কে! বিছানার উপরে গিয়ে বসলাম! মেয়েটা চোখ মুখ শক্ত করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে! আমি আম্মার ক্ষেত্রে যে ফরমুলা ব্যবহার করেছি সেটা এখানে ও করলাম! মেয়েটা আমার হাসি দেখে হো হো করে হেসে উঠলো! আমি ভাবতে লাগলাম, আমার এই হাসির জন্য বোধহয় খুন করেও মাফ পেয়ে যাবো!

– কি রকম এক্টিং করলাম ?
– আপনি তো অস্কার পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন! কিন্তু আপনার উপর কেউ অস্কার ছুড়ে মারছে না কেন বুঝতে পারছি না!

– তোমরা মেয়েরা আসলে বোকা!
– আমি জীবনে ভাবিনি আপনি আমাকে এভাবে ভরকে দিবেন! আমি তো উল্টো আপনাকে ভরকে দেওয়ার ফন্দি করছিলাম!

– তাই নাকি?
– হুম! আমি আজকে অবরোধ ঘোষণা করতাম আপনার জন্য!
– তাই নাকি? তা অবরোধ কি এখনো আছে?
– কোনো এক অদ্ভুত কারনে অবরোধ টা তুলে নিলাম!
– আমি তাহলে…
– মোটেও না!
– তাই?
– হুম!
– হুম!
– আরে বাবা, হুম!
– আমি ও তো বলছি, হুম!
– যান তো!
– আচ্ছা আসছি!

আমি এখন জেরির খুব কাছে, তার নিশ্বাসে হয়তো তার বিশ্বাসে জায়গা করে নিয়েছি! তার ঠোঁটের রঙে, কালো চোখে – আমি তার সমস্ত অস্তিত্বে আছি! ছুয়ে দিব হয়তো, তার মনটা কে আমার রঙে!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত