সন্দেহ

সন্দেহ

কাঁপাকাঁপা কণ্ঠ থেকে ভয় সরিয়ে অবশেষে বাবাকে প্রশ্ন করেই ফেললাম,”বাবা রুহি আন্টির সঙ্গে তোমার এত মেলামেশা কিসের জন্য?” বাবা হাজার পাওয়ারের চারকোণা চশমার পাঁক দিয়ে চোখ বড়বড় করে তাকালেন। আমি দৃষ্টি নিচু করে নিয়ে আবারও বললাম,”না মানে বাবা! উনার প্রতি তোমার এতো উধারতা আমার ভালো লাগে না”।

বাবা কিছু বললেন না। লালচে চোখ দু’টো নিচু করে খবরের কাগজ পড়তে ব্যস্ত ছিলেন। আমি বাবার কাছে কোন জবাব না পেয়ে নিজের রুমে চলে আসলাম। আমার পেছন রুহি আন্টি রুমে প্রবেশ করে বললেন, “মা তোমার চা”। আমি বিরক্তবোধ করলাম। চোখ কুচকে দোয়াজ কণ্ঠে প্রশ্ন করলাম,”আন্টি আপনি আমাদের বাসায় কাজ করতে এসেছেন, সেটা ভুলে যান কেন?””না মা! আমি ভুলিনি সেকথা” “বাবার আশেপাশে এত ঘুরঘুর করেন কেন? এটা আমার একদম পছন্দ নয়”। আমার কথা শুনে রুহি আন্টি মাথা নিচু করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি গম্ভীর হয়ে চুপচাপ বসে আছি।

বাবা শিক্ষকতা করতেন। অবসর পেয়ে এখন বেশিরভাগ সময় বাড়িতে থাকেন। মা গত হয়েছেন তিন বছর হলো। মা মারা যাওয়ার পর বাবা খানিকটা হৈচৈশূণ্য হয়ে পড়েছেন। বাবা কখনো বই বা কখনো খবরের কাগজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। রূষ্ট চাহনির পেছনে বাবা সুদৃশ্য মনের একজন মানুষ। বাবার রূষ্ট চাহনির আড়ালে যে পৌঁছাতে পেরেছে কেবলমাত্র সে জানে বাবা কতটা আবেগতাড়িত। আমি বিছানার এক পাশে চুপ হয়ে বসে আছি। রুহি আন্টি রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট দশেক পর বাবা আমার রুমে প্রবেশ করলেন। আমি চৈতন্য হারিয়ে আছি।

বাবা বিছানার ওপর পাশে বসে টেবিল ল্যাম্পের নিচে থাকা মায়ের ছবির দিকে অবিরল তাকিয়ে রইলেন। আমি ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলাম,”কিছু বলবে বাবা?” “তোমার মায়ের কোন গুণটা তুমি বেশি পেয়েছো জানো?” “না” আমি বিরক্তবোধ নিয়ে উত্তর দিলাম। “তুমি ঠিক তোমার মায়ের মত সন্দেহ করার গুণ পেয়েছো” আমি কুচকানো ভ্রু সরল করে হঠাৎ বাবার মুখের দিকে তাকালাম, বাবার চোখে পানি টলমল করছে, মনে হচ্ছে এই বুঝি অশ্রুকণা গুলো ঝরে পড়বে। আমি কিছু বলার আগে বাবা উঠে দাড়ালেন। পাঞ্জাবী টেনে ঠিক করে বাবা নিজের রুমে চলে গেলেন। আমি স্তম্ভিত হয়ে দাড়িয়ে রইলাম।

বাবার চোখের অশ্রুর কারণ আমি! অজান্তে আমার কাঁদন আসছে। আমি বাবাকে কখনো আঘাত করতে চাইনি। মা মারা যাওয়ার পর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। আমাকে পুতুলের মত আগলে আগলে রেখেছেন,ছোট বড় সকল শখ-আল্লাদের আবদার পূরণ করেছেন। আমার প্রতি বাবার ভালোবাসার কোন ত্রুটি নেই তবে আমি  কেন বাবাতে আঘাত দিলাম!! সন্দেহ শব্দটার সঙ্গে আমি একেবারে পরিচিত।  নূরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভাঙ্গনের একমাত্র কারণ সন্দেহ,কিন্তু আমি কখনো বুঝতে পারিনি সন্দেহমূলক এমন কী কথা বলি! নূর আমাকে ছেড়ে যাওয়ার সময় বলেছিলো,”যদি পারো তবে সন্দেহ করাটা কমিয়ে দিও,এভাবে সন্দেহ করলে কেউ তোমায় ভালোবাসবে না”। আচমকা নূরের কথাটা মনে পড়লো।

চটুলতা ধরে রাখতে না পেরে বাবার রুমের সামনে গিয়ে দাড়ালাম। বাবা বিছানায় হেলান দিয়ে বই পড়ছে। আমি সিত কণ্ঠে বাবাকে বললাম,”ভেতরে আসবো বাবা?” বাবা বইয়ের ওপর দিয়ে মুখ তুলে তাকালেন। নিবন্ত কণ্ঠে বাবা বললো,”আসো”। আমি বাবার পাশে গিয়ে বসলাম।বাবা বই রেখে বললো,”কিছু বলবে মা?”  “আমি তোমার অশ্রুর কারণ হতে চাইনি বাবা!” “রুহির জন্য আমার এত উধারতা কিসের তুমি বলো?” বাবার প্রশ্নে আমি চুপ হয়ে রইলাম।

মনে মনে ভাবলাম,আমার বাবা এমন নয়! বাবার সঙ্গে রুহি আন্টির খারাপ সম্পর্ক থাকতে পারে না, মা বেঁচে নেই। মায়ের শূণ্যতা পূরণে রুহি আন্টির সঙ্গে বাবার অন্য সম্পর্ক হতে কতক্ষণ!।  বাবা আবার বলে উঠলো,”তুমি এটায় ভাবছো যে রুহির সঙ্গে আমার অন্যরকম সম্পর্ক আছে যা সবার আড়ালে”। আমি মাথা নিচু করে গম্ভীর মুখ নিয়ে বসে রইলাম। বাবা রুহি আন্টিকে ডাকলেন। রুহি আন্টি আসলেন। বাবা রুহি আন্টিকে বললো,”তোমার পরিচয় দাও”।

কাঁপা কণ্ঠে রুহি আন্টি বললেন,”স্যার আমার পরিচয়!” “হ্যা মা, তোমার পরিচয় আমার এক মাত্র সন্তানকে দাও” রুহি আন্টি এবং বাবার কথা শুনে আমি দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। রুহি আন্টি চুপ করে রইলেন। বাবা আমাকে বললো,”রুহি আমার প্রিয় ছাত্রী,ক্লাসে ভালো ছাত্রীদের মধ্যে ও একজন। অল্প বয়সে প্রেম নামক জালে পা রেখে বাড়ি ছেড়েছিলো। স্বামীর অবহেলা এবং সন্দেহের কারণে আজ ও এখানে দাড়িয়ে!। বাবার কথা শেষ হতেই রুহি আন্টি হুহু করে কেঁদে উঠলেন, ওনার কান্নার শব্দ আমার  হৃদয় স্পর্শ করলো। আমি বিস্ময় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,”বাবা উনি তোমার ছাত্রী?” “হ্যা রুহি আমার ছাত্রী, সংসার জীবনের সন্দেহের ছায়া এবং স্বামীর অবহেলা ওর মুখে বয়স্কের চাপ ফেলেছে তাই তুমি তাকে খুব সহজে আন্টি বলে মান্য করেছো”।

আমার মুখে কোন শব্দ নেই। বাবার পাশ থেকে উঠে রুহি আন্টির পাশে গিয়ে দাড়ালাম, উনি আমার উপস্থিতে খচরমচর করছেন,হয়তো আমার চোখে চোখ রাখতে লজ্জা পাচ্ছেন। আমি উনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। বাবা দ্রুত পায়ে বিছানা থেকে নেমে আমাদের পাশে এসে দাড়ালেন। চোখের আভাসে লজ্জা রেখে বললাম,”তোমরা দুজন আমায় ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখো” বাবার দিকে ফিরে বললাম,”এখন বুঝতে পেরেছি বাবা সন্দেহ জিনিসটা আসলে কী!”। আমি সেখানে দাড়িয়ে থাকতে পারলাম না। দ্রুত নিজের রুমে এসে দীর্ঘ শ্বাস ফেললাম। মনে হলো যেনো বুকের ভেতরের এক অজানা পাথর নেমে গেলো। সন্দেহ জিনিসটা সত্যিই মানুষকে এতটা নিচু চিন্তার দুয়ারে পৌঁছে দেয়!!

গল্পের বিষয়:
অনুপ্রেরণা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত