দৌড় শুধু দৌড়

দৌড় শুধু দৌড়

এবারের ভৌতিক অভিজ্ঞতাটি হয়েছে সিংগাপুরের এক তরুণীর। এটা বরং তার মুখ থেকেই শুনি।

গত বছর জীবনের সবচেয়ে ভীতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাকে। আরেকটু হলেই মরতে বসেছিলাম।
আমার ষান্মাসিক পরীক্ষার দু-মাস আগের ঘটনা। ক্লাসের শিক্ষক ক্রস-কান্ট্রি দৌড় প্রতিযোগিতার জন্য বাছাই করলেন আমাকে। অনেক গাঁইগুই করেও পার পেলাম না। কারণ গত বছরও এতে অংশ নিয়েছিলাম আমি।

অনেক দিন ধরে দৌড়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। প্রস্তুতিটা ঠিকমত হওয়ার জন্য নিয়মিত দৌড় অনুশীলনের সিদ্ধান্ত নিলাম, কয়েকজন বান্ধবীর সঙ্গে। ঠিক হলো ম্যাকরিটচি রিজার্ভে অনুশীলন করব আমরা।

পরের শনিবার একদম সকালে সেখানে হাজির হয়ে গেলাম। তখনও খুব একটা আলো হয়নি। তবে দুটো মেয়ে ইতিমধ্যে উপস্থিত হয়ে গেছে। এখনও এসে না পৌঁছননা তিনটা মেয়ের জন্য অপেক্ষা না করে দৌড়নো শুরু করে দিলাম আমরা।

কয়েকশো গজ এগুবার পরই বুঝে গেলাম অনেক দিন না দৌড়নোতে আর আগের মত সাবলীল নেই আমি। বান্ধবীরা আমার থেকে অনেক ফিট এখন। তারা যেন বুনো খরগোশের মতই দৌড়চ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে বেশ পিছনে পড়ে গেলাম। মনে মনে আমার শিক্ষককে, দু-পাশের এই জঙ্গলকে আর নির্বাচিত হওয়ার জন্য নিজের কপালকে অভিশাপ দিতে দিতে একা একা ধীর গতিতে ছুটতে লাগলাম।

দৌড়বার সময় বানরদের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পেলাম। বনের যেখানটায় এখন আছি এদিকে গাছপালা বেশ গভীর। সকালের সূর্যের আলো ভালমত ভিতরে ঢুকতে পারছে না। এ কারণেই ম্যাকরিটচি রিজার্ভকেই, যেটাকে লোকে পোষ মানানো একটা বাগান বলে, গভীর জঙ্গল বলে মনে হতে লাগল।

চারপাশের গাছপালার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দৌড়চ্ছি, যদি একটা বানরের দেখা পেয়ে যাই এই আশায়। এসময়ই হঠাৎ বাম গালে জ্বালা ধরানো একটা ব্যথা অনুভব করলাম। মনে হলো যেন নিচু হয়ে ঝোলা কোনো ডালের বাড়ি খেয়েছি। কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে এমন কোনো ডাল-পালা নজরে এল না। মনে মনে বললাম, তবে নিশ্চয় কোনো পোকামাকড় কামড়েছে।

আর কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই এরপর দৌড় চালিয়ে যেতে পারলাম। শেষমেশ পাহাড়ের ওপরের ক্যান্টিনে বান্ধবীদের সঙ্গে মিলিত হলাম আবার। এখানে কফি পান করতে করতে ওপর
থেকে পুরো সংরক্ষিত বনটা দেখতে লাগলাম।

এসময়ই একজন বান্ধবী আমার মুখের দিকে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই, কী হয়েছে? তোমার বাম গাল কি কেটে ফেলেছ নাকি?

কী খুব বেশি কেটেছে? সচকিত হয়ে উঠলাম। খুব নয়। তবে একেবারে হেলাফেলা করার মতও না। বলল সে।
সম্ভবত কোনো পোকা কামড়েছে। বললাম আমি। অন্যরাও একমত হলো।

বাসায় ফিরে পরে একটা মলম লাগালাম গালের ক্ষতে। তারপর পড়তে বসলাম। আমার মা-ও ক্ষতটা দেখে জানতে চাইলেন কীভাবে ওটা হয়েছে। সামান্য একটা পোকার কামড় বলে আশ্বস্ত করতে চাইলাম। কিন্তু তাঁর দুশ্চিন্তা গেল না।

কিন্তু কাটাটা বেশ খারাপ মনে হচ্ছে, মা। বললেন তিনি।
আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখলাম এটা আগের চেয়ে আরো বেশি নজরে পড়ছে। ঠিক চোখের নীচেই ক্ষতটা। তবে কোনো ধরনের যন্ত্রণা বা চুলকানি হচ্ছে না। তাই মলমটা কাজ করে কিনা তা দেখার জন্য অপেক্ষা করা স্থির করলাম।

মোটামুটি বেশ রাত পর্যন্ত পড়ালেখা করার অভ্যাস আমার। সাধারণত সাড়ে বারটার আগে পড়ার টেবিল ছেড়ে উঠি না, বিশেষ করে শনিবারে। আসলে গত বছর পরীক্ষায় ভাল না করায়
এবার শুরু থেকেই পড়ালেখায় খুব মনোযোগ দিয়েছি।

এগারোটার দিকে গালের যে জায়গাটায় কিছু একটার কামড় খেয়েছি মনে হয়েছে সেখানটায় ব্যথা শুরু হলো। বারোটার দিকে এসে ব্যথাটা রীতিমত অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেল। ব্যথার চোটে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করল আমার। কিন্তু এত রাতে কিছুই করার নেই। মনে হলো কোনো মতে ব্যথা চেপে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কাল সকালে কোনো চিকিৎসকের কাছে যাওয়া যাবে।

শুরুতে এই যন্ত্রণার কারণে মোটেই ঘুম আসতে চাইল না। তারপর যেমন আরম্ভ হয়েছে তেমনি হঠাৎই ব্যথাটা চলে গেল। এতটাই ভারমুক্ত মনে হলো নিজেকে, সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই একটা ধাক্কা খেলাম। বাসার বাকি সবাই দেখেও ভয় পেয়ে গেল। ক্ষতটার চেহারা বেশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে, গালটা ফুলে গেছে। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় একটুও যন্ত্রণা নেই।
দ্রুত নাস্তা সারলাম। তারপরই আমাকে একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন মা দেখে চিকিৎসক ভদ্রলোকও বললেন কোনো পোকামাকড়ের কামড়ে এই অবস্থা হয়েছে, চিন্তার কিছু নেই। তারপর একটা অয়েন্টমেন্ট দিয়ে বললেন দিন দুয়েকের মধ্যে ফোলা কমে যাবে।

সারাটা দিন এমনকী রাতের শুরুটা ভালই কাটল। গতকালের মতই এগারোটা বাজতেই আবার ব্যথা শুরু হলো, ঠিক একই জায়গায়। এবার যন্ত্রণার পাশাপাশি একটা চিন্তাও উদয় হলো মনে। শুধু রাতে কেন জায়গাটায় ব্যথা করে? মলমটাও কোনো কাজই করছে না। রাত গভীর হলে এক সময় আগের মতই হঠাৎ ব্যথাটা অদৃশ্য হলো।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করলাম গাল আরো ফুলে গেছে। এতটাই যে বাম চোখে ভালমত দেখতে পর্যন্ত পাচ্ছি না। তবে অদ্ভুত ব্যাপার কোনো ব্যথা নেই। এবার সত্যি চিন্তায় পড়ে গেল আমার বাসার লোকেরা। মা স্কুলে যেতে মানা করলেন। বললেন আবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন।

ডাক্তারের কথা শুনে ভয় আরো বাড়ল। তিনি বললেন, কী কারণে এটা হচ্ছে বুঝতে পারছেন না। মলমটা আরো কয়েকবার লাগিয়ে আগামীকাল আবার আসতে বললেন।

তবে ভাগ্যই বলতে হবে মা ডাক্তারের এই পরামর্শ মেনে না নেওয়া স্থির করলেন। আমার এক আন্টিকে ফোনে ঘটনাটি খুলে বললেন তিনি। নানান বিষয়ে বেশ ভাল অভিজ্ঞতা আছে তাঁর।

বাসায় এসে আমাকে দেখেই চমকে উঠলেন তিনি। দেরি না করে আমাকে আর মাকে তার পরিচিত একজন ওঝা বা মেডিসিন ম্যানের কাছে নিয়ে এলেন। কিছুক্ষণ আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ওঝা। তারপর কীসব আওড়ালেন। একসময় মাকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করলেন, তোমার মেয়ের ভাগ্য খুব ভাল। কোনো দুষ্ট আত্মা তাকে একটা চিমটি কেটেছে কেবল। কিন্তু যদি ওটা ওকে ভালমত একটা চড় দিত তাহলে সম্ভবত সে মারা যেত। তবে এখন আর দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আমি এটা ঠিক করে দিচ্ছি।

আমাকে কিছু তন্ত্র-মন্ত্র পড়ে ফু দিলেন। তারপর জায়গাটায় লাগানোর জন্য একটা মলম দিয়ে কিছু খাবার আপাতত বেছে চলতে বললেন।

ভাগ্য ভাল তার চিকিৎসায় কাজ হলো। কয়েকদিনের মধ্যে ফোলা কমে গেল। সবচেয়ে বড় কথা, যেদিন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে সে রাত থেকেই ব্যথা একদম চলে গেল।

এখনও ম্যাকরিটচি রিজার্ভে ক্রস কান্ট্রি দৌড়ের প্রশিক্ষণ নিই আমি। যদিও মা বিষয়টা খুব একটা পছন্দ করেন না। তবে এখন সবসময়ই বান্ধবীদের সঙ্গেই থাকি দৌড়নোর সময়।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত