গল্প হলেও সত্যি

গল্প হলেও সত্যি

গুড লাক নার্সিং হোমের চতুর্থ তলায় ICU -র ৪১২ নম্বর বেডের ভেন্টিলেশনে থাকা রুগী ৬৫ বছরের আবিরকে দেখে নিজের ঘরে ফিরলেন ডঃ মিত্র । ঘরে একজন ভদ্রমহিলা বসে। ডঃ মিত্র কে দেখে হাত জোড় করে নমস্কার করে উঠে দাঁড়ালেন।

নিজের চেম্বারে একজন অপরিচিত মহিলাকে দেখে একটু বিব্রত ও বিরক্ত বোধ করলেন ডঃ মিত্র । নিয়মরক্ষার প্রতিনমস্কার অত্যন্ত দায়সারা ভাবে সেরে জিগেস করলেন , “কি ব্যাপার ? ঠিক চিনতে পারলাম না ”
ভদ্রমহিলা বললেন , ” আমার নাম রুমা । আমার স্বামী অাবির আজ এক সপ্তাহ হলো ভেন্টিলেশনে। তার ব্যাপারেই জানতে এসেছি। ”

ডঃ মিত্র বেশ একটু ঝাঁঝিয়ে উঠলেন ,” তা এখানে কেন ? আমার তো পেশেন্ট পার্টিকে মিট করার ডিফাইনড টাইম রয়েছে। ওই সময় আসুন। এটা আউটডোরের সময়। বাইরে রুগীর লম্বা লাইন ”

রুমা গলা নামিয়ে বললেন , ” আমি দুঃখিত। কিন্তু আমার আর সময় হবে না। তাই এখনই জানতে চাই। ”
ডঃ মিত্র দেখলেন কথায় কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তাই স্পষ্ট বলে দিলেন , ” খুব একটা আশা দেখছিনা। ব্রেনটা পার্শিয়ালি ডেড। সার্ভাইভ করার চান্স খুবই কম। তাও চেষ্টা চালাচ্ছি ”

– ” কিন্তু আর কতদিন ?” জানতে চাইলেন রুমা
– ” সেকি আর বলা যায় ? যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষন আশ ”

রুমা এবার একটা অদ্ভুত কথা বলে বসলেন। কিছুক্ষন ডঃ মিত্রের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিগেস করলেন,”শ্বাস কি আর আছে ?”

এ প্রশ্নের জন্যে ডঃ মিত্র প্রস্তুত ছিলেন না। একটু রেগেই বললেন ,” কি বলতে চাইছেন আপনি ?”
রুমা সেই একই রকম নির্বিকার ভাবে বললেন , “ওকে মুক্তি দিন। আজ পাঁচদিন হলো ও চলে গেছে ”
ডঃ মিত্র চোখের চশমাটা খুলে টেবিলে ছুঁড়ে ফেলে বললেন , ” এতই যদি জানেন তো নিয়ে গিয়ে নিজে চিকিৎসা করলে পারতেন ”

রুমা আবার বললেন “পারলে তাই করতাম। উপায় ছিলোনা। এখন বলুনতো কিভাবে ওকে নিয়ে যাওয়া যাবে ?”
ডঃ মিত্র মেজাজ সপ্তমে চড়িয়ে বললেন “বন্ড সই করে দিন আর সব মিলিয়ে আজ অবধি ১২ লক্ষ বিল হয়েছে মিটিয়ে দিন ”

রুমা গণৎকারের মতো বললেন ,” নার্সিং হোমে ভর্তির দুদিনের মধ্যে ও মারা যায়। তারপর থেকে আপনারা আরো পাঁচ দিন ভেন্টিলেটর লাগিয়ে রেখে টাকা লুটছেন। ওই দুদিনে সব শুদ্ধু ১ লক্ষ ২৫ হাজার বিল হয়েছে। সেটা আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি ”

ডঃ মিত্র বেশ রাগের সাথে বললেন ,”আপনাকে আমি কোনোদিন দেখিনি। ওঁর ছেলে এসে ভর্তি করেছিল। আমি আপনার এই প্রলাপ শুনতে বাধ্য নই। সেরকম হলে”

কথা শেষ করতে পারলেন না ডঃ মিত্র । মোবাইল বাজছে।

-” হ্যালো। ডঃ মিত্র স্পিকিং ”
– “নমস্কার আমি ICU ৪১২ নম্বর বেডের পেশেন্ট আবির বাবুর ছেলে বলছি ”
– ” অরে মশাই আপনার মা এখানে কি উপদ্রব শুরু করেছেন। এভাবে কি চিকিৎসা করা যায় ? উনি এমন ভাব দেখাচ্ছেন যে রুগীর সব তথ্য ওনার জানা। আমি পরিষ্কার বলে দিচ্ছি এভাবে নার্সিং হোমে ঝামেলা করলে আমি পুলিশ ডাকতে বাধ্য হব ”
-“কি বলছেন ডাক্তারবাবু। মাকে পেলেন কোথায় ? তিনি তো পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন !”
– ” কি যাতা বলছেন। আমার সামনে এখনো দাঁড়িয়ে”
-“কোনো ফ্রড হবে। একদম ওঁর কোনো কথা শুনবেননা। আমি আসছি ”
ফোন রেখে ভদ্রমহিলার দিকে এবার ব্যঙ্গ ভরা একটা হাসি দিলেন ডঃ মিত্র ।
বললেন ,” একটু বসুন। আপনার ছেলে আসছে। তারপরেই নয় ফয়সালা হোক !”

রুমা বললেন ,” ডঃ মিত্র , আমার ছেলে আসার আগে আমি চলে যাবো। আমার জন্য আমার স্বামী বাইরে অপেক্ষা করছেন। ওঁর দেহটা আপনার দেয়া ভেন্টিলেটরে থাকলেও আজ গত পাঁচ দিন ধরে ও আবার আমার সাথেই থাকছে। দেখা করতে চান ? ওই দেখুন ”

এক ঝটকায় ঘুরে তাকালেন ডঃ মিত্র । দেখলেন রুগী দেখার ছোট্ট বিছানাটায় বসে আছেন আবির। যার মৃত শরীরকে একটু আগেই ভেন্টিলেটরে দেখে এসেছেন তিনি।

তার কপালে ততক্ষনে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে বললেন ,” এ সবের মানে কি ?”
এবার আবির মুখ খুললেন। ” কি লাভ হলো আপনার আমার ছেলেকে এভাবে সর্বসান্ত করে ? সামান্য মাইনের চাকরি করে। কোথায় পাবে এতো টাকা ? আপনি ডাক্তার না ডাকাত ?”

রুমা বললেন , ” তবে একেবারে নিরাশ করবোনা। হাতের এক গাছা চুড়ি দিয়ে যাচ্ছি। ওর পার্থিব শরীরটাকে এবার মুক্তি দিন। ”

দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ডঃ মিত্র । মুখ বেঁকে গেছে। তারপর যে দৃশ্য দেখলেন তাতে তার হৃদস্পন্দন চতুর্গুণ হয়ে গেলো। শাড়ির নিচ থেকে বেরিয়ে এলো দুটি শীর্ণকায় হাত। সে হাতে চামড়া নেই। আছে কিছু হাড় আর তাতে পরা কয়েকগাছা সোনার চুড়ি। ”

-“নানা চাইনা। চাইনা আমি ! ” চিৎকার করে উঠলেন ডঃ মিত্র।
আবির আর রুমা ততক্ষনে এগিয়ে এসেছেন। দুজনেই প্রায় একসাথে জিগেস করলেন ,”কেন ডাক্তারবাবু, টাকা রোজগার করবেন না ? এই তো সুযোগ। কই নিন। হাত থেকে চুড়ি খুলে নিন ”

-” না আআআআআ। ” বলে একটা তীব্র আর্তনাদ করে উঠলেন ডঃ মিত্র।

এর পরের দৃশ্যটা আরও সাংঘাতিক। ঘরের আনাচে কানাচে দাঁড়িয়ে রয়েছে আরও কয়েকজন। এদের ডঃ মিত্র চেনেন। এরা ওঁরই পেশেন্ট, যারা এখন মৃত। সবার সাথেই এভাবে ব্যবসা করেছেন ডঃ মিত্র । মৃত্যুর পরেও সে খবর বাড়ির কাউকে না জানিয়ে, ভেন্টিলেশনে রেখে প্রেস্ক্রাইব করে গেছেন দামি ওষুধ ও ইঞ্জেকশন। আজ তারা সবাই এসেছে কৈফিয়ত নিতে।

অনুভব করলেন দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসছে। পায়ের জোর হারাচ্ছেন। মাথা ঝিমঝিম করছে। জ্ঞান হারালেন ডঃ মিত্র|

ডঃ ঘোষ এসে নাড়ি দেখে বুঝলেন ডঃ মিত্র আর নেই। কিন্তু এই তো মওকা। মিত্র অনেক টাকার মালিক।নার্সকে বললেন “বাড়ির লোককে খবর দাও। কন্ডিশান খুব সিরিয়াস| ভেন্টিলেশনে দিচ্ছি। ”

ডঃ মিত্রের মৃত শরীরটা ভেন্টিলেশনে ঢুকিয়ে ডঃ ঘোষ নিজের ঘরে ফিরলেন। দরজাটা খুলেই চমকে উঠলেন। টেবিলের উল্টোদিকে বসে এক দৃষ্টে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন সদ্য প্রয়াত ডঃ মিত্র।

ডঃ ঘোষ অনুভব করলেন তাঁর দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসছে। পায়ের জোর হারাচ্ছেন। মাথা ঝিমঝিম করছে | এবার জ্ঞান হারালেন ….

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত