যাদের দেখা যায় না

যাদের দেখা যায় না

ডুয়ার্সে চাকরি নিয়ে গিয়েছি। আপাতত একাকী। নতুন জায়গা এর হালচাল সম্পূর্ণ না জেনে সপরিবারে যাওয়ার বিপ্ন আছে—তাই একা এসেছি।

চাকরিটা কি করে পেলাম? বন্ধু গৌতমের যত্ন ও চেষ্টায়। সে-ই এটা আমাকে জুটিয়ে দিয়েছে। তাই তার ওপর আমার কৃতজ্ঞতার আর শেষ নেই। কিন্তু চাকরিটা জুটিয়ে দিয়ে সে গেল কোথায়? আজ দু’মাসেরও বেশি কাজে জয়েন করেছি, বহু খুজেছি কিন্তু গৌতমের কোনো খোজ পাইনি। কেউ কোনো খোজ দিতেও পারেনি। আশ্চর্য! ও কি তবে অন্য কোথাও ভালো কাজ পেয়ে চলে গেল? নিঃসঙ্গ আমি। বই-ই আমার সঙ্গী। বই না পড়লে আমার রাতে ঘুম আসে না।

সেদিন একটা বই পড়ছিলাম ইজিচেয়ারে শুয়ে শুয়ে। ঠান্ডা কনকনে রাত। দূরে দুয়ার্সের ঘন অরণ্য জমাট বেধে যেন কালো ক্রেয়নে আঁকা ছবির মতো দেখাচ্ছে। স্টেশনের ক্ষীণ আলো কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে কেমন দপদপ করতে লাগল। উড়ে গেল একা নিশাচর পাখি বিশ্রী আওয়াজ করে। টেবিলের জুলত লণ্ঠনটা দপদপ করে খানিক কালি তুলে হঠাৎই নিভে গেল। ঘরটা ভরে গেল পোড়া কেরোসিনের গন্ধে আর ঘনীভূত অন্ধকারে। সঙ্গে সঙ্গে উত্তরের এক ঝলক হিমেল হাওয়া পাগলের মতো আছড়ে পড়ে ঘরের দরজা-জানালাগুলো সব ক্ষিপ্ত হাতে খুলে দিল। চমকে উঠে আমি মাথার তলায় রাখা দেশলাইটা খুজতে লাগলাম আতিপাতি করে।

পেছন থেকে কে বললে । এই নে দেশলাই-–হয়তো ড্যাম্প লেগেছে, জ্বলবে না। তবে চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী?
গৌতম? তুই ?—আমি অবাক হয়ে গেলাম।

হ্যাঁরে বিমল। দেখতে এলাম তোকে ।
এই রাতদুপুরে? তোমার আর আসবার সময় হল না!

না! আমার সময় বড় কম। তোর কাছে আমি কিছু বলব। কথাগুলো খুবই জরুরি। আমার সঙ্গে একটু আসতে হবে বাইরে।

আমি খুশি হয়ে বললাম ঃ এটা আর বেশি কথা কি! চল কোথায় যেতে হবে। এ চাকরিটাও তো তোর জন্যই পেয়েছি। তুই আমার কত উপকারী বন্ধু। তার ওপর ছোটবেলার খেলার সাথী, যাব নিশ্চয়ই, দাঁড়া। গায়ে একটা চাদর দিয়ে নিই। বাইরে ঠাণ্ডা।

বাইরে বেরিয়ে আমরা পাশাপাশি হাঁটতে লাগলাম। কিন্তু গৌতম কেন যেন একটু দূরে দূরে আমাদের মধ্যে একটা তফাৎ বাচিয়ে চলতে লাগল।

হঠাৎ লক্ষ পড়ল গৌতমের গা খালি! ঠান্ডার মধ্যে খালি গায়ে গৌতম হাঁটছে কি করে! আমি ব্যস্ত হয়ে উঠলাম, একি তোর গায়ে যে কিছু নেই? তোর শীত লাগছে না? নে আমার এই গৌতম কিছু না বলে আমার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর বলল ঃ আমার শীত লাগে না। ওটা তুই রাখ।

তার দৃষ্টিতে কী ছিল জানি না। আমি যেন কেমন হতবাক হয়ে গেলাম। কিছু যে বলব তাও পারলাম না। চুপ করেই চলতে লাগলাম। রাতের ঘন অন্ধকারে গৌতমকে ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না। অনুমানে বুঝছিলাম সে আমার সঙ্গেই আছে।

খানিকটা দূরে দুটো পাশাপাশি পাথর রাস্তার ওপরই পড়ে ছিল। গৌতম নিজে একটার ওপর বসে অন্যটা আঙুল দিয়ে আমাকে দেখিয়ে দিয়ে বললে। বস, দরকারি কথাটা আজ সেরেই নি। তুই কিন্তু কোনো প্রশ্ন না করে সব কথা শুনে যাবি আগে। হ্যা-ই করবারও দরকার নেই, তারপর বন্ধুর জন্যে যা পারিস করবি। আমি বললাম, বেশ, বল কি বলবি?

গৌতম শুরু করল। আমি একটা ব্যবসায়ী ফার্মে চাকরি করতাম। ওরা আমাকে অনেক টাকা মাইনে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিছুদিন কাজ করবার পর আমি বুঝতে পারি ওরা সৎভাবে টাকা রোজগার করে না। বরং খুবই অসৎ পথ বেছে নিয়েছে টাকা করবার জন্যে। আমার এ ব্যাপারটা একেবারে পছন্দ নয়। এটা ওরা বুঝতে পেরে আমাকে তাদের টাকার একটা মোটা অংশ দিয়ে আমার মুখ বন্ধ করে দিতে চায়। কিন্তু আমি ওদের ওই পাপের টাকা একেবারেই নিতে চাইনি। বরং আমাকে এ সব টাকার অংশ দিতে চাইলে আমি চাকরি ছেড়ে দেব বলি, তখন ব্যাপারটা আরো ঘোরালো হয়ে ওঠে। ওরা আমাকে নজরবন্দী করে ঘরে আটকে রাখে।

একদিন আমি গভীর রাতে পালাবার চেষ্টা করে ধরা পড়ে যাই। খুবই ভয় পেয়েছিলাম ওরা বুঝি আমাকে মারধোর করবে। কিন্তু কিছুই করল না দেখে অবাক হয়েছিলাম। তবে ওদের চালচলন, চোখ-মুখের চাহনি দেখেও বুঝতে পারছিলাম আমার জন্যে আরো ভয়ঙ্কর কিছু অপেক্ষা করে আছে। আমি রুদ্ধশ্বাসে গৌতমের কথা শুনছিলাম। আর শুনছিল নিথর আকাশ-“নিশুতি রাত-আর ঘুমন্ত বন। মাঝে মাঝে রাতচরা পাখির আওয়াজ আর বাতাসে ঝাউ বনের শনশন শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। পাশে তাকিয়ে দেখলাম গৌতম বেশ দূরেই বসেছে। কেন? আমার কাছে এসে বসলে কী দোষ হত ! আমি কথা বলতে যাব, ঠিক তখনই গৌতম বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে ক্লান্ত ধরা গলায় আবার বলতে শুরু করল ঃ ওরা আজ হঠাৎ আমাকে বলল, অনেকদিন ঘরে বন্দী আছ, চল, আজকে একটু বেড়িয়ে আসবে।

ঘুমন্ত আমাকে শীতের রাতে ঘুম ভাঙিয়ে তুলে বেড়াতে নিয়ে যেতে চাওয়ায় আমি ভয়ে চমকে উঠেছিলাম। কিন্তু সে ভাব প্রকাশ না করে খুব ঠান্ডা গলায় বলেছিলাম এত রাতে বেড়াতে যাওয়া, থাক না আজ। অন্য আর একদিন যাওয়া যাবে।

কিন্তু ওরা আমাকে ছাড়েনি। জোর করে গাড়িতে তুলেছিল। তারপর গাড়ি ছুটিয়েছিল জঙ্গলের পথে। গভীর ঘন পাহাড়-জঙ্গল পেরিয়ে ওরা একটা ছোট জলার ধারে এসে থেমেছিল। সেখানে আমাকে ওরা শাসাতে লাগল, চুরির টাকার ভাগ নিতে হবে, তা না হলে ওখানেই আমাকে ওরা শেষ করে দেবে।

তুমি তো জান বিমল, আমি মার একমাত্র ছেলে। মার কাছে কখনও কোনো অন্যায় করবার শিক্ষা পাইনি। চুরি করা টাকা আমি কেমন করে মার হাতে তুলে দেব! তার চেয়ে তো আমার… আমার দ্বিধা দেখে ওরা বুঝে নিল আমি আর যাই হই চোর নই। তারপর আমাকে ওরা খুন করে ওই জঙ্গলে ফেলে দিয়ে গেল।

এতক্ষণ আমি স্তম্ভিত হয়ে গল্প শুনছিলাম। এবার চমকে উঠলাম। তবে যার সঙ্গে আমি এতদূর এলাম । সে কি আমার বাল্যবন্ধু গৌতম নয়! তার প্রেতাত্মা। সমস্ত শরীর আমার হিম হয়ে গেল। এত শীতেও ঘেমে উঠলাম।

গৌতম আমার অবস্থা বুঝতে পেরে বলল, ভয় পাস না। তোর তো আমি কোনো ক্ষতি করব  না। আমি তোর সাহায্য চাই। করবি? বল ?–আমি সাহসে ভর করে বললাম।

আমি আমার মার কাছে যেতে পারব না। কারণ মা যদি বুঝতে পারেন আমি নেই, তাহলে আর বাঁচবেন না। তিনি আজ ক’দিন থেকেই মনে মনে কী যেন বুঝে ঘরে শুয়ে শুয়ে কাদছেন। তুই গিয়ে আমার নাম করে এই টাকা ক’টা ওঁর হাতে দিবি। বলবি ঃ গৌতম দিয়েছে। আর কিছু বলবি না। আর ওই পাথরের পাশে আমার শবটা পড়ে আছে, ওটার সন্ধান আর ওই বদমাশগুলোর সব কথা পুলিশের কাছে গিয়ে বলে দিবি। ওদের সাবধান করে দিবি ওরা যেন কোনোমতে তোর নামটা প্রকাশ না করে। আমার শবের পাশে আমার মানিব্যাগটা পড়ে আছে, ওটা ভাই তুলে নে। ওতেই সবকিছু পাবি। হিম ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে ভোরের আলোর জোয়ারে মিশে গেল গৌতম। আর ওকে দেখা গেল না।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত