আয়নার কুহক

আয়নার কুহক

শীতের শেষ। পাতাঝরা গাছগুলোতে আবার নতুন করে কুড়ি দেখা দেবার উপক্রম হচ্ছে। সকাল বেলাকার রোদূরটা খুব মিঠে না হলেও একেবারে কড়া নয়। দোতলার বারান্দায় একটা ইজিচেয়ারে শুয়ে বিমান পত্রিকার উপর চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। আর একটু বাদেই উঠে নাওয়া খাওয়া শেষ করে অফিসমুখো হতে হবে। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়া শুনে সে উঠতে যাবে, এমন সময় তার ছোট বোন নমিতা দরজা খুলে পিয়নের হাত থেকে একটা খাম নিয়ে বারান্দায় এগিয়ে এল। বিমানের দিদি শমিতা চানে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিল, সেও ঘর থেকে বেরিয়ে এল বারান্দায়। বিমান খামটা হাতে নিয়ে উপরের ঠিকানার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল। —“এ কার চিঠি। ”
শমিতা বলে ঃ “ভাবনা ছেড়ে খামটা ছিড়ে দেখ না বিমান! আমাকে আবার এক্ষুনি চান সারতে হবে।

বিমান খাম ছিড়ে চিঠিটা বার করে । মোটামুটি একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে শমিতার হাতে দিয়ে দিলে। তারপর চোখ বুজে চেয়ারটায় শুয়ে পড়ল। কপালে তার চিন্তার রেখা সুস্পষ্ট হয়ে উঠল। শমিতা নমিতা দুজনেই এতক্ষণে চিঠিটা পড়ে ফেলেছে। কিন্তু তাদের মুখে যে প্রতিক্রিয়ার চিহ্ন দেখা দিল, তা বিমানের মতো নয়—ভিন্নতর। শমিতার মুখে আনন্দের আভাস ফুটে উঠল আর নমিতা আনন্দে একেবারেই হাততালি দিয়ে উঠল।

শমিতা বিমানকে বলে ঃ “তুই ভাবছিস কি বিমান ? এতদিনে ভগবান তবু মুখ তুলে চাইলেন!” বিমানের চোখে-মুখে ক্রমে আশার আলো দেখা দিলেও সে যেন একেবারে নিশ্চিন্ত হতে পারেনি। তবু বলে, “বটে!”

প্রসঙ্গটি আপাতত এখানেই চাপা পড়ে গেল। শমিতার ইস্কুলের বেলা, বিমানের অফিস-টাইম আর নমিতার কলেজে যাবার সময় হয়ে এসেছে। তাড়াহুড়া করে সবাই চান-খাওয়া সেরে যথাস্থানে রওনা হল। দোতলার সেই ফ্ল্যাটের দরজায় একটা তালা মাত্র ঝুলে রইল। এই ফাকে পেছনের ইতিহাসটা সেরে নিলে আমাদের এগুতে সুবিধে হবে।

কলকাতার কাছেই একটা মফঃস্বল শহর। ডাঃ সেনের খুব ফলাও ব্যবসা-খুব পশার জমিয়ে বসেছেন আর দু’ হাতে টাকা লুটছেন। তার ছোট ভাই এম. এ পাশ করে শহরেই ছেলেদের একটা হাইস্কুলে মাস্টারি জুটিয়ে নিয়েছিলেন। ডাঃ সেন নিঃসন্তান; আর তার ভাইয়ের ছিল দুটি মেয়ে আর একটি ছেলে-শমিতা, নমিতা আর বিমান। ভাগ্যের বিপাকে অল্পবয়সেই ওদের বাপ-মা দুজনেই অকালে মারা পড়লেন একটা আকস্মিক দুর্ঘটনায়। নিঃসন্তান ডাঃ সেন তাদের সেই শোক বুঝবার সুযোগ দিলেন না। নিজের সন্তানের মতো করেই ওদের মানুষ করতে লাগলেন। শমিতা বি. এ পাশ করেছে, বিমান কলেজে পড়ছে, আর নমিতা স্কুলেরই উপর দিকের একটা শ্রেণিতে প্রমোশন পেয়েছে–এমন সময় ডাঃ সেনেরও ডাক পড়ল পরলোকে। সদ্যবিধবা ওদের জ্যেঠাইমার তখন অবলম্বন বলতে শুধু এই দেবর-পুত্র-কন্যাগণই।

দীর্ঘকালের মধ্যে পরিবারে দুর্ঘটনা কয়েকটি ঘটলেও কারও চোখে-মুখে কোনো অশান্তি বা দুর্ভাবনার চিহ্ন ছিল না। কিন্তু ডাঃ সেনের মৃত্যুর পর দেখা দিল মহা অশাত্তি। বিমান আর কিছুতেই তার জ্যেঠাইমার সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারছে না। খুঁটিনাটি অনেক কিছুতেই তাদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধতে লাগল। আর তা শিগগিরই সংক্রামিত হল শমিতা নমিতার মধ্যে। প্রত্যক্ষ সংঘর্ষে যোগ না দিলেও একটা পরোক্ষ প্রভাব তাদের উপর এমন একটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল, যার জন্যে তারা এ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিকে আর কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারছে না। অবশ্যএ অবস্থাও আর বেশিদিন না—একটা সাংঘাতিক আঘাতে অকস্মাৎ তারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল।

অতি সাধারণ একটা ঘটনাকে সূত্রপাত করে তাদের জ্যেঠাইমা যখন বিমানকে টাকা-পয়সার খোঁটা দিয়ে আক্রমণ করলেন, তখন বিমানও চপলকণ্ঠে উত্তর করেছিল—“ডাইনিবুড়ি, তুমি মলে কী হবে? তখন তোমার টাকাপয়সা যক হয়ে আগলে রাখতে পারবে তো? পেত্মি হয়ে দেখো— আমি দু’হাতে তোমার পয়সা উড়াব।’

বলা বাহুল্য জ্যেঠাইমার মেজাজ তখন সপ্তমে চড়ে গেছে—তিনি তাদের শাপ-শাপাক্ত করতে লাগলেন। তারপর আর এখানে তিষ্ঠানো তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিন ভাই-বোন তল্পিতল্লা গুটিয়ে চলে এল কলকাতায়। দোতলার এই ফ্ল্যাটটা ভাড়া নিয়ে তাদের দিন কাটতে লাগল। শমিতা একটা স্কুলে মাস্টারি নিয়ে বিমানকে বি, এ পাশ করিয়েছে। এক্ষণে তারা দুজনে চাকরি করে, আর নমিতা কলেজে পড়ে ।

সেদিন সকালবেলা খামে-মোড়া যে চিঠিটা বিমানের নামে এসেছিল, সেটা ছিল উকিলের চিঠি। তাতে তাদের জ্যেঠাইমার মৃত্যু-সংবাদ জানিয়ে উকিল তাদের সম্পত্তির দখল নিতে বলেছেন। আইনত তারাই জ্যেঠাইমার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী।

বিকেল ৩টা। সবাই কর্মস্থল থেকে ফিরে এসে বিশ্রামরত। সারা দিন সবাই চিঠির কথা ভেবে ভেবে যার যার চিত্তাকে গুছিয়ে রেখেছিল। চা খেতে খেতে তারই জের টেনে আলোচনা চলল।

বিমান গোড়াতে দোমনা থাকলেও বোনদের আগ্ৰহাতিশয্যে শেষ পর্যন্ত তাদের জ্যেঠাইমার বাড়ি ফিরে গিয়ে থাকতে রাজি হল। ঠিক হল, আপাতত তারা একমাসের ছুটি নিয়ে বাড়ি যাবে-তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা হবে। আর যদি পাকাপাকিভাবে তাদের বাড়িতে থাকাই সাব্যস্ত হয়, তবে একদিন এখানকার সব বন্ধুবান্ধবদের নেমন্তন্ন করে যে একটা মহাভোজের আয়োজন করা হবে-তা-ও আপাতত ঠিক হয়ে রইল। দুঃখকষ্টের মধ্য দিয়ে যে দিনগুলো তাদের এখানে কেটেছে, সুদে-আসলে তার উসুল হবে ও-বাড়িতে গিয়ে। ঠাকুর-চাকর রেখে, চাই কি, পায়ের ওপর পা দিয়ে আরামেই তাদের বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দিতে পারবে।

বিমান ভাবছিল—জ্যেঠাইমার সঙ্গে সে যে অসদ্ব্যবহার করেছিল, এবং তার ফলে তিনি যখন তাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তখন তারই বাড়ি গিয়ে থাকা এবং হয়তো বা বাকি জীবনটা সেখানেই কাটানো খুব সঙ্গত হবে কি না! কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন খেয়াল হল যে, তার সংসারের বোঝা বইতে গিয়ে তার বেচারা দিদি আজও বিয়ের ফুরসুত পেল না, তখন তাকে অন্তত এ টানাহাচড়ার হাত থেকে মুক্তি দেবার জন্যে হলেও তাদের ও-বাড়ি যাওয়াই সঙ্গত।

পরদিনই তারা এখানকার পাট উঠিয়ে দিয়ে চলে গেল অদূরবর্তী সেই মফঃস্বল শহরে—তাদের জ্যেঠাইমার বাড়ি।

ছোট শহরে ওদের বাড়িটাই সবচেয়ে বড় এবং চোখে পড়বার মতো বাড়িই ওটা। দোতলা বাড়ি-চারিদিক খোলা। সামনে পিছনে—দুদিক থেকেই উপরে উঠবার সিড়ি। নীচের তলাটা রান্নাঘর, বসবার ঘর, গুদাম, চাকর বাকরদের থাকবার ঘর। আর শোবার ঘর সব কটাই উপরে।

মাঝখানে একটা মস্ত বড় হলঘর আর তার দু’পাশে দুটো দুটো চারটে শোবার ঘর। দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘরটাই বাড়ির সবচেয়ে ভালো ঘর—সবচেয়ে আরাম প্ৰদ। তাদের জ্যেঠাইমা ওই ঘরটাতেই বরাবর বাস করে গেছেন। শমিতা সবার বড়–কাজেই ওই ঘরটা তাকেই দেওয়া হল। এ-ঘরটার সঙ্গেই রয়েছে এরি একটা জুড়িঘর পশ্চিম দিকে। নমিতার ভাগে পড়ল ঐটে। হলঘর পার হয়ে যে দুটো ঘর—তার একটা নিল বিমান। সারাটা দিন ওরা সবাই মিলে ঝাড়পোছ করে কিছুটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে তুলল ঘরগুলো।

নীচে বসবার ঘরে বসে সন্ধেবেলায় ওরা পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করছিল। এ বাড়ির প্রতিটি ইটের সঙ্গে এদের পরিচয়—দীর্ঘদিন এখানে বসবাস করে তারা হঠাৎ এ-বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। আবার তাদের এই আকস্মিক আগমনটা যেন ওদের নিকটই কেমন বিস্ময়ের বিষয় বলে মনে হচ্ছিল। ওই নিয়েই তাদের আলোচনা চলছিল। বিমান বলছিল ঃ “এখানে, এঘরে বসেই আমি জ্যেঠাইমাকে ডাইনিবুড়ি বলে গাল দিয়েছিলাম।”

শমিতা কান দিয়ে বিমানের কথা শুনছিল বটে, কিন্তু তার দৃষ্টি বিমানকে ডিঙিয়ে গিয়ে পড়ছিল পাশের ঘরটায়। হঠাৎ সে বল্লে ঃ “দ্যাখ তো নমিতা পাশের ঘরে কে ? আমার যেন মনে হল— নমিতা চট্ট করে ঘুরে এসে বললে ঃ “কই, না তো! ওখানে আবার কে থাকবে? ঠাকুর-চাকরও তো এখন পর্যন্ত জোটেনি।”

মাথা নেড়ে শমিতা বনে ঃ “না না, যাই বলি;-আমি ঠিক দেখেছি কে একজন যেন পৰ্দাটার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমাদের কথা শুনছিল।

নমিতা বক্সে ঃ “হ্যা দিদি, তোমার যত— ও বাবা! কখন খেতে যাবে? রাত কত হয়েছে, খেয়াল করেছ? তুমি রান্নাঘরে যাও দিদি, আমি উপর থেকে চট করে ঘুরে আসছি।

শমিতা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল, আর নমিতা সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। হলঘরে ঢুকতেই তার মনে হল একটা সাদা শাড়ির আঁচল যেন শমিতার ঘরের ভিতর মিলিয়ে গেল! সে চমকে উঠে ভাবল, “দিদি তো নীচে রান্নাঘরে–তবে তার ঘরের ভিতর কে ঢুকল?”

এমন সময়
পেছনে সিড়িতে পায়ের শব্দ শুনে সে ফিরে তাকিয়ে দেখলে—শমিতা উপরে উঠে আসছে। নমিতা বলে : “দিদি, এইমাত্র কে যেন তোমার ঘরে গিয়ে ঢুকল বলে মনে হল!

তারা দুজনে এগিয়ে শমিতার ঘরে গিয়ে দেখলে কেউ কোথাও নেই। আর থাকবেই বা কোথায়? শাড়ি-পরা লোক তো এ-বাড়িতে ওরা দুটি বৈ তিনটি নেই।

নমিতা বলে “অথচ আমি যেন স্পষ্ট দেখলুম থান-কাপড়ের একটা আঁচল তোমার ঘরেই গিয়ে ঢুকল। ”

চমকে উঠে শমিতা ব ললে ঃ “থান-কাপড়ের আচল? সত্যি তাই, আমিও তখন থান-কাপড়-পরা একজন মহিলাকেই যেন পৰ্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমাদের কথা শুনতে দেখেছিলুম।”

নমিতার মুখ শুকিয়ে গেল। তবু হাসি টেনে বল্লে ঃ ‘তবে কি আমরা সব ভূত দেখতে আরম্ভ করেছি? কী জানি, এখানে এসে অবধি যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে! ঠাকুর-চাকর সব এলে বাঁচি!”

কদিন পরের কথা। যে উকিলের কাছ থেকে চিঠি পেয়ে তারা এখানে এসেছে, তিনিই এলেন তাদের সঙ্গে দেখা করতে। রামভদ্রবাবু প্রাচীন ব্যক্তি—দীর্ঘকাল এদের সঙ্গে সম্পর্কিত। শুধু উকিল হিসেবেই নয়, তিনি ছিলেন ডাঃ সেনের একজন সত্যিকার হিতৈষী, এবং তিনিই এতাবৎ ডাঃ সেনের সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। বিমান বাড়ি নেই। ওরা রামভদ্রবাবুকে সঙ্গে নিয়ে বসবার ঘরে গেল।

শমিতা কথাপ্রসঙ্গে জানতে চাইল ঃ “জ্যেঠাইমা কি মরবার আগে খুব বেশি কাহিল হয়ে
পড়েছিলেন?

সহসা রামভদ্রবাবুর মুখ দিয়ে কোনো উত্তর জোগাল না। তিনি আমতা আমতা করে বল্লেন ঃ “তা…. মানে—অর্থাৎ তার ঠিক মৃত্যুর সময়টাতে আমি এখানে উপস্থিত ছিলাম না।

তার এ উত্তরে শমিতা সন্তুষ্ট হতে পারলে না। তার যেন মনে হল—রামভদ্রবাবু প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতে চাইছেন। তাই শমিতা সরাসরি প্রশ্ন করলে ঃ “আচ্ছা তার শেষ চিকিৎসা কে করেছিলেন? এবার রামভদ্রবাবু একটু স্পষ্ট করেই বল্লেন । : “চিকিৎসা তার ডাঃ গুহই করেছিলেন । তবে যতদূর মনে হচ্ছে তোমাদের জ্যেঠাইমার মরবার অন্তত দশদিন আগে থেকেই তিনি আরচিকিৎসা করেননি।

নমিতা বল্লে ঃ “ওঃ, তাহলে চিকিৎসার অভাবেই তার মৃত্যু হয়েছে।

রামভদ্রবাবু জবাব দিলেন, “না মা! কথাটা ঠিক হল না। চিকিৎসার তার প্রয়োজন ছিল না— তিনি অনেকটা সুস্থই হয়ে উঠেছিলেন। তারপর সেদিন যখন ডাক্তারকে তিনি খবর পাঠালেন, তখন ডাক্তার বাড়ি ছিলেন না। তিনি যখন এসে পৌছলেন, তখন সব শেষ হয়ে গেছে।”

শমিতা-মমিতা দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল ঃ “তার মানে ?”

রামভদ্রবাবু একটু থতমত খেয়ে বল্লেন ঃ “মানে, তখন তিনি অর্থাৎ তার মৃত্যুটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। তার শোবার ঘরের কড়িতে একটা শাড়ি ঝুলিয়ে—না, হ্যা, শাড়িটা বেশ শক্তই ছিল; ছিড়ে যায়নি।

দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেলে শমিতা আর নমিতা। খানিকক্ষণ সব চুপচাপ, রামভদ্রবাবুও এই অবসরে তার উত্তেজনাটা একটু প্রশমিত করে নেবার সুযোগ পেলেন। খানিক বাদে একটু আত্মস্থ হয়ে শমিতা বল্লে : ‘তাহলে তিনি আত্মহত্যা করেছেন?’

রামভদ্রবাবু মাথা নেড়ে স্বীকৃতি জানালেন। শমিতা বলে ঃ “থাক, ভালোই হল—খবরটা জেনে রাখলুম। কিন্তু আমার একটা অনুরোধ। বিমানকে খবরটা জানাবেন না। ওর শরীরটা খুব সুস্থ নয়- হয়তো এ-আঘাত সইতে পারবে না।

রামভদ্রবাবু স্বীকৃত হলেন। আরও খানিকক্ষণ কথাবার্তা বলে তিনি বিদায় নিলেন।

দু’বোন খানিক চুপ করে থাকবার পর শমিতাই প্রথম কথা বললে ঃ “তাহলে এই ঘটনা! গোড়া থেকেই আমার যেন কেমন একটা সন্দেহ হয়েছিল! আর এই জন্যেই এ সমস্ত—’ নমিতা তার দিদিকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বক্সে ঃ “আমার ভয় করছে দিদি! আমারও মনে হচ্ছে, এ বাড়িতে কোথায় যেন কী লুকিয়ে রয়েছে! সাদা থান-পরা …”
শমিতা কথাটা শেষ করলে ঃ “সাদা থান-পরা একজন মহিলা যেন বাড়িময় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। হ্যা রে নমি-জ্যেঠাইমাই তো শেষ বয়সে সাদা থান পরতেন—নারে?”

অকস্মাত যেন সমস্ত প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে গেল। কিন্তু এতে তাদের ভয় মোটে কাটল না, বরং একটা অজানা আতঙ্কে যেন ওদের বাকরুদ্ধ হয়ে এল! অনেকক্ষণ পর বিমান এসে ঘরে ঢুকতে তাদের ভয় কমল, মুখ দিয়ে কথা বেরুল। তারা বিমানকে জানাল যে, উকিল রামভদ্রবাবু এসে খানিক অপেক্ষা করে চলে গেছেন। তিনি কিছু বলে গেছেন কি না জানতে চাইলে নমিতা

বলে ঃ “তেমন কিছু নয় । তাদের আলাপ-আলোচনার কোনো কথাই তারা প্রকাশ করলে না।
দিন তাদের কেটে চলল শঙ্কার আর একটা অজানিত বিভীষিকার মধ্য দিয়ে। কিন্তু বিমানকে

তারা কোনো কথাই জানালে না। একদিন শমিতা নমিতাকে ডেকে বল্লে ঃ “দ্যাখ সে নমিতা! কি অদ্ভুত কাণ্ড !

এ কদিন ধরে তারা সর্বক্ষণই সচকিত ছিল। শমিতার ডাক শুনে নমিতা সঙ্গে সঙ্গে তার ঘরে চলে এল। শমিতা কিছু না বলে শুধু দেয়ালে টাঙানো বিরাট আয়নাটার দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিলে। নমিতা এগিয়ে দেখলে—-আয়নাটার গায়ে একটা অস্পষ্ট কালো দাগ। সে শাড়ির আঁচল দিয়ে ওটাকে ঘষে তুলে ফেলতে চেষ্টা করলে। শমিতা বক্সে ঃ “বৃথা চেষ্টা। এ কিছুতেই উঠবে না-মনে হয়,
দাগটা আয়নার উপর নয়, একেবারে ভেতরে।”
নমিতা বল্লে : “তাতে আশ্চর্য হবার কি আছে।

শমিতা একটু উত্তেজিতভাবেই বল্লে ঃ “নেই কিছু? আমাদের জন্মের আগে এ আয়না কেনা হয়েছে, কিন্তু এ পর্যন্ত এতে কোনো দাগ ছিল না, কাল পর্যন্তও এ দাগ ছিল না।”

সেদিন রাত্রিতে নমিতার চোখ জড়িয়ে এসেছে, এমন সময় তার দরজায় মৃদু পদধ্বনি আর সঙ্গে সঙ্গে শমিতার ভয়জড়িত কথা শুনতে পেল—“ঘুমিয়েছিস নমিতা? শীগগির আয়।” একলাফে বিছানা ছেড়ে নমিতা দরজা খুলে বাইরে চলে এল। শমিতার মুখ ভয়ে বিবর্ণ হয়ে

গেছে, আর আতঙ্কে সে হাত মোচড়াচ্ছে। নমিতাকে ডেকে ঘরে নিয়ে এসে আয়নাটার দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিলে। আয়নার দিকে তাকিয়ে নমিতা চর্মকে উঠল—তার মুখে-চোখেও ভয়ের রেখা দেখা দিল। আয়নার দাগটা আরও একটু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে–যেন কিসের একটা ছায়া পড়েছে! শমিতা নমিতার মুখের দিকে তাকিয়ে বনে ঃ “উপর থেকে কী যেন একটা খুলে পড়েছে, আর তারই ছায়া বলে মনে হচ্ছে—তাই নয় ?”

নমিতা দু’চোখ বন্ধ করে তার দিদিকে জড়িয়ে ধরে বলে : “আমারও তাই মনে হচ্ছে: কী ভয়ানক দিদি!

শমিতা এক্ষণে নমিতাকে সাত্বনা দিয়ে বল্পে : “ভয় কিরে? এতে তো আর কোনো ক্ষতি হচ্ছে না–যত কিছু ছায়া পড়ুক না! শেষ কথাটা বলতে গিয়ে শমিতার গলাটাও কেপে উঠল। নমিতা দিদিকে এ ঘরটা ছেড়ে দেবার, নয়তো আয়নাটা বিক্রি করে দেবার পরামর্শ দিলে। কিন্তু শমিতা বলে ঃ “কিন্তু এতে বিমানের মনে শুধু সন্দেহই জাগবে—কাজেই দরকার নেই এসব করে। শুধু খেয়াল রাখবি, বিমান যেন কিছুই বুঝতে না পারে।

কিন্তু তাদের এত চাপাচাপিই বিমানের মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিলে। তার মনে হল কোথায় যেন কী একটা গলদ ঢুকেছে! আয়নার দাগটা ক্রমেই বৃহত্তর আর স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। শমিতা পারতপক্ষে আর তার ঘরের দিকে যেতে চায় না। রাত্তিরে ঘরে আলো জ্বালতে চায় না। একদিন শমিতা নমিতা দুজনেই অন্যমনস্কভাবে তার ঘরে ঢুকে পড়তেই তাদের চোখ গিয়ে পড়ল আয়নাটার উপর। আর সঙ্গে সঙ্গেই দুজনে চিৎকার করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে হলঘর থেকে বিমান এসে উপস্থিত হল। তাদের দুজনকে এ অবস্থায় দেখে বলে ঃ “আমি কদিন ধরেই তোমাদের অদ্ভুত আচরণ লক্ষ করছি আর আড়াল থেকে তোমাদের কথা শুনছি। তোমাদের ডাক্তার দেখানো দরকার হয়ে পড়েছে, নইলে তোমাদের এ ভূত-দেখার পাগলামি সারবে না।”

শমিতা তাকে টেনে এনে আয়নার সামনে দাড় করিয়ে দিয়ে বয়ে ; ‘‘আয়নাটার দিকে তাকিয়ে দ্যাখো। দেখতে পাছ কিছু?” বিমানের চোখে লক্ষণীয় কিছুই পড়ল না। সে সোজা ঘাড় নাড়লে।

তারা সব একসঙ্গে বেরিয়ে এল। বিমান হলঘরে বসল আর ওরা নীচে নেমে গেল। শমিতা তখন ভয়ে কাঠ হয়ে রয়েছে। সে নমিতাকে বল্লে ; কিন্তু বিমান কেন আয়নায় ওকে দেখতে পেল না? ওর উপরই তো জ্যেঠাইমার রাগ ছিল বেশি। তবে কি হঠাৎ একদিন দেখা দিয়ে ডাইনিবুড়ি ওকে ভয় দেখিয়ে মারবে? তার চেয়ে চল নমিতা এক্ষুনি আয়নাটাকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেলি।”

ওদিকে হলঘরে একটুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে বিমান চুপিচুপি আবার শমিতার ঘরে গিয়ে ঢুকল।

আয়নাটার উপর চোখ পড়তেই তার সর্বাঙ্গ শিউরে উঠল।
–স্পষ্ট একটা ছায়া কড়িকাঠ থেকে
ঝুলানো—দুলছে, দুলছে। ডাক ছেড়ে চিৎকার করতে গেল সে, কিন্তু গলা দিয়ে তার আওয়াজ বেরোল না। সে দৌড়ে সামনের সিড়ি দিয়ে নেমে এল নীচে—তার বোনদের বলবে যে, সে-ও দেখেছে। কিন্তু কোথায়—তারা তো নেই!

ওরা ওদিকে পিছনের সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেছে। উপরের হলঘরে ওদের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বিমান আবার সিড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। কিন্তু ও কে সিড়ির মাথায়—সাদা থান-পরা একজন মহিলা ! সাদা থান! সাদা থান!! হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল-জ্যেঠাইমা তো সাদা থান পরতেন! ওঃ, সেই ডাইনিবুড়ি!! কিন্তু কোথায় মিলিয়ে গেল?–অবাক কান্ড তো! বিমানের বুক ধপধপ করছে—তার কান গরম হয়ে গেছে, কপাল ঘামছে।

জোর করে সে পা দুটোকে টেনে টেনে উপরে তুলছে—তারপর এগিয়ে যাচ্ছে শমিতার ঘরের দিকে। আস্তে আস্তে সে ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। শমিতা আর নমিতা জড়াজড়ি করে আয়নাটার সামনে বসে আছে। হ্যা, এবার স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে–কড়িকাঠ থেকে একটা শাড়ি ঝুলছে-—শাড়ির একটা মাথা তার জ্যেঠাইমার গলায় ফাস হয়ে আটকে আছে। বুড়ির জিবটা বেরিয়ে এসেছে—

চোখ দুটো জবাফুলের মতো লাল-মূখটা বীভৎস হয়ে গেছে দেখতে। ক্রমে আয়নার মধ্যে ছায়াটা দুলতে লাগল-— দুলছে, দুলছে। বিমানের গলা দিয়ে ক্ষীণ আওয়াজ বেরুচ্ছে : “ওঃ, তাহলে এই ব্যাপার! ডাইনিবুড়ি ফাসিতে ঝুলেছে আর তার ছায়াটা আয়নায় আটকা পড়ে গেছে।”

বিমানের উপস্থিতি তার বোনেরা লক্ষ করলে এতক্ষণে। নমিতা শমিতার কানে ফিসফিস করে বল্লে ঃ “দেখতে পেয়েছে, দাদা দেখতে পেয়েছে ঐ ছায়াটা। দ্যাখ, দ্যাখ, ছায়ামূর্তির চোখটা কেমন। ফুলে ফুলে উঠছে!”

বিমানের ক্ষীণ আওয়াজে যেন কিসের জোর লাগল—তার কথা স্পষ্টতর হয়ে উঠল ঃ এবার বাগে পেয়েছি তোমাকে ডাইনিবুড়ি! আর পালাতে দেব না—বেঁচে থাকতে তুমি জ্বালিয়ে মেরেছ; মরেও আবার জ্বালাতে এসেছ? দাঁড়াও, এবার তোমার জারিজরি বার করছি।”

এগুতে এগুতে বিমান একেবারে আয়নাটার সামনে এসে ঝুঁকে পড়ে দেখতে লাগল। ঐ তো, ঐ তো ছায়াটার চোখের পলক পড়ছে—কেমন তাকাচ্ছে!

চিৎকার করে বিমান দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেললে। তারপর একটি মুহূৰ্ত্তমাত্ৰ গা-ঝাড়া দিয়ে সে। উঠে দাঁড়াল-“চোখ দুটো তার জবাফুলের মতো। –মুখের উপর নীল শিরাগুলো ভেসে উঠল।

আবিষ্টের মতো একবার চারিদিকে তাকিয়ে হঠাৎ পিতলের ফুলদানিটা হাতে তুলে নিয়ে এলোপাথাড়ি আঘাত হানতে লাগল আয়নাটার ওপর। ঝনঝন করে আয়না টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল ঘরময়। ভূতগ্ৰস্তের মতো অট্টহাসি হাসতে হাসতে দু’পা পিছিয়ে এল বিমান-হাত থেকে তার ফুলদানিটা খসে পড়ল। বিমূঢ়, চমকিত বোনদের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল বিমান—ক্লিষ্ট হাসি। দু’হাতে সে অকস্মাৎ কপালের দুদিকের রগ দুটো টিপে ধরে তারপরই সে দুলতে লাগল—ডাইনে, বাঁয়ে! শমিতা ও নমিতা দুজনে ভয়ে-অতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। বিমান গুড়ি মেরে পড়ে গেল মেঝের উপর। দৌড়ে এসে শমিতা তাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে ডাকতে লাগল—সাড়া নেই!

গা ধরে নাড়া দিল—সবটা শরীর দুলে দুলে উঠল। প্রাণহীন বিমানের দেহটাকে ধরে লুটিয়ে লুটিয়ে কাদতে লাগল শমিতা। সম্বলহারা নমিতা চিৎকার করে উঠল ঃ “ঐ যে, ঐ যে, ডাইনিবুড়ি দেওয়ালটার গায় মিশে দাড়িয়ে আছে, ঐ যে!”

শমিতা মাথাটা তুলে অবিষ্টের মতো কাতর কণ্ঠে বলতে লাগল; ‘ন না, বিমান ডাইনিবুড়িকে হত্যা করেছে। আমি দেখেছি; নিজের চোখে দেখেছি।”

ঠাকুর-চাকর চিৎকার শুনে নীচে থেকে এসে দোরগোড়ায় জমা হয়েছে। তারা দেখতে পেল কুণ্ডলী পাকানো বিমানের দেহটাকে জড়িয়ে ধরে পড়ে আছে নমিতা, আর শমিতা ছোট্ট ছেলেকে ঘুমপাড়ানোর মতো করেই যেন বিমানের পিঠে হাত রেখে ঘুম পাড়াচ্ছে, আর শূন্য দৃষ্টিতে যেন কাকে লক্ষ করে মিনতি-মাখা কণ্ঠে বলছে; “যাও যাও ডাইনিবুড়ি, দোহাই তোমার। বিমান তোমাকে হত্যা করেছে; আমি যে নিজের চোখে দেখেছি। জ্যেঠাইমা, লক্ষ্মীটি, যাও তুমি !!”

[ August Detich লিখিত The Shera on Mimorনামক গল্পের ছায়া অবলম্বনে ]

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত