ভুতুরে বাড়ি

ভুতুরে বাড়ি

রায়হান বন্ধুদের সাথে নদীর পাড়ে খেলতেছে। অর্নব এসেই বলে-ভাইয়া! ভাইয়া! আম্মু ডাকে। জলদি বাসায় যেতে বলেছে। রায়হান বলল- যা পড়ে যামু। খেলতাছি না! অর্নব রায়হানের ছোট ভাই।অর্নব চুপচাপ বাসায় চলে গেলো। আজ কেন জানি কারোই খেলতে ভালো লাগছে না।তাই সবাই এক এক করে চলে গেলো। রায়হান নদীর ধারে কিছুক্ষণ একা বসে থেকে বাসায় চলে আসে।

বাসায় আসতেই রায়হানের আম্মু চিল্লাইয়া উঠল। কিরে তুই কি শুরু করছোত? সারাদিন ঘুইরা বেরাস আর মাইনসের ক্ষতি করোস! রায়হান চুপ। রায়হানের মা বলতেই আছে! তোরা নাকি করিম মিয়ার নাউ ভাংছোত? রায়হান আমি কি একা ভাংছিনি! আবার কথা কস! তুই ওইখানে আছিলি ক্যান? এর পর একটা লাঠি নিয়ে রায়হানকে তার মা মারতে থাকে। রায়হান কাদতেঁ থাকে।

হঠাৎ রায়হান তার মায়ের কাছ থেকে লাঠি নিয়ে যায়। কি তোর এত বড় সাহস তুই আমার হাত থেকে লাঠি কাইড়্যা নেস! এই বলে আরো কয়েকটা থাপ্পড় মারে। এর মধ্যে বাড়িতে রায়হানের বাবা বাড়ি আসে। এসেই বলে- কি হইছে পোলাডারে মারতাছো ক্যা? রায়হানের মা রায়হানের বাবা কে দেখে বলে অর্নব রায়হান দেখ তোর বাবা আইছে। এবলেই রায়হানের বাবার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে ঘরে নিয়ে যায়। রায়হানের বাবা ঢাকা থাকে। কোনো কিছু না জানিয়েই বাসায় চলে এসেছে।

রায়হান তার বাবাকে দেখে মাইর খাওয়ার ব্যাথা ভুলে গেলো। অর্নব আর রায়হান বাবার কাছে গিয়ে বলে-বাবা! বাবা! আমাদের জন্য কি এনেছো? আনছি আনছি বাবা।এবলে ব্যাগ থেকে দুজনের জন্য দুইটা ঘড়ি বের করে দিলো। রায়হান আর অর্নব ঘড়ি পেয়ে খুব খুশি। রায়হান গ্রামের সবাইকে তার ঘড়িটা দেখিয়ে বেরাচ্ছে। রাত্রে সবাই একসাথে খেতে বসেছে।

রায়হানের বাবা বললো- ওদের লেখাপড়া কেমন চলছে? রায়হানের মা বলল-রায়হান তো পড়েই না। আর অর্নব ভালোই পড়ে। রায়হানের বাবা বলল এবার ওদেরকে নিয়ে ঢাকা চলে যাবো। তোমাদের জন্য ঢাকায় বাসা ঠিক করে এসেছি। রায়হানের মা-কি বলো!আগে তো কিছু বললা না! কবে যাবে? রায়হানের বাবা-তোমাদের সারপ্রাইজ দিলাম। কেন তুমি খুশি হউনি? রায়হানের মা-খুশি হইছি মানে অনেক খুশি হইছি। পোলা দুইটারে ঢাকা নিয়া ভালো স্কুলে ভর্তি করুম।

রায়হান আর অর্নব খুব খুশি। রায়হান তার সব বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিলো। সবাই মন খারাপ করে বসে আছে। রায়হান ছিলো ওদের দলের প্রধান। রায়হান যা বলতো সবাই তাই শুনতো। আজ রায়হান চলে যাচ্ছে তা যেনো কেউ মেনেই নিতে পারছে না। সবার মন খারাপ হলেও রায়হান ঢাকা যাওয়ার আনন্দে উতফুল্ল।

সবাইকে বিদায় জানিয়ে আনন্দে নাচতে নাচতে পরিবারের সবার সাথে ঢাকা চলে আসলো। ঢাকার দালানকোঠা দেখে রায়হান অভাগ হলো। এত বড় বড় বাড়ি! রায়হানরা ছতলা বিল্ডিং এর দুতলায় বাসা নিয়েছে। এত বড় বাসায় থাকবে ভাবতেই রায়হান আনন্দে নেচে উঠে। রায়হানের বাবা একজন ছোট ব্যবসায়ী। রায়হান প্রথম কয়েকদিন ভালোই কাটালো ঢাকায়। কিন্তু কিছুদিন পর থেকে তার মনে হতে লাগলো সে বন্দী। এই বন্দী ঢাকায় তার আর মন বসে না। সারাদিন বসে বসে গ্রামের বন্ধুদের কথা ভাবে। মনে পড়ে যায় অনেক স্মৃতি! কিছুদিন পরে রায়হান আর অর্নবকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়।

রায়হান বড় তাই ওকে নার্সারিতে ভর্তি করা হয়। আর অর্নবকে প্লেতে ভর্তি করে। কিন্তু রায়হান আর অর্নব এক মাসেই খুব ভালো লেখাপড়া করায় তাদেরকে স্কুল পরিবর্তন করে ক্লাস ওয়ান ও প্লে শ্রেনীতে ভর্তি করা হয়। স্কুলে রায়হানের অনেক বন্ধু হয়। রায়হান আস্তে আস্তে ঢাকার সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়। তবুও যখন একা খুব নীরবতা অনুভব করে তখনই গ্রামের সেই বন্ধুদের কথা মনে পড়ে যায়। রায়হান তিন বছরে একবারও গ্রামে যায়নি। কিন্তু হঠাৎ.রায়হানের মামার বিয়ে ঠিক হওয়ায় হাজারো ব্যস্ততার মাঝে রায়হানের পরিবার গ্রামে আসতে বাধ্য হয়। রায়হান অনেক দিন পর তার সেই পুরনো বন্ধুদের সাথে সাক্ষাত করে। সবাই কেমন যেন পাল্টে গেছে।

রায়হান আগের মত ওদেরকে ডেকে বিভিন্ন খেলার কথা বললেও ওরা ওতটা আগ্রহ দেখায় না। তাই রায়হান মন খারাপ করে বসে থাকে। হঠাৎ রাতুল এসে বলে তোর কি আমাদের কথা একবারও মনে পড়ে নাই। তিনটা বছর আমাদের ছেড়ে খুব ভালোই ছিলি তাই না! রায়হান বলে-দেখ বন্ধু হয়তো অনেক নতুন বন্ধু পেয়েছি কিন্তু ওরা তোদের মত নয়। তিনটা বছর সত্যিই তোদের অনেক মিস করেছি। তার পর আবার রায়হান তার সেই পুরনো বন্ধুত্ব ফিরে পায়। রায়হান সবাইকে ডেকে একদিন বিকালে বলে। বন্ধু চল আমরা কোনো পুরনো ভুতুড়ে বাড়িতে ঘুরে আসি। সবাই বলে ভুতুড়ে বাড়ি তো পাশের গ্রামেই আছে।

আমরা কেউ ওদিকে যাই না। কিন্তু রায়হান সবাইকে বলে চল না যাই। দেখি ভুত কিরকম! সবাই বলে না ভাই এটা সম্ভব নয় তুই যা। আমরা যামু না। কিন্তু রায়হান যাবেই। অবশেষে রাতুল,রাব্বি,শাকিল আর রায়হানের মামতো ভাই অনিক যেতে রাজি হয়। তো ওরা বাকী সবাইকে বলে দেখ!আমরা ওইবাসায় গেছি তা যেন কেউ কিছুতেই বুঝতে না পারে!! রায়হান ও তার বন্ধুরা যে বাসায় যাবে।

সে বাসাটা অনেক পুরনো রাজ বাড়ি। এ বাড়ি সম্পর্কে অনেকে অনেক কথা বলে। এবাড়িকে অভিশপ্ত বাড়ি বলা হয়। এ বাড়ির রহস্য কারো জানা নেই। তবে সবার একই কথা এটা পরিত্যক্ত বাড়ি এখানে ভুত আছে। কিন্তু রায়হান ভুতে বিশ্বাসী নয়। ওর সাথে যারা যাবে এরাও ভুতের ভয় করে না। রায়হান ও তার বন্ধুরা মিলে বিকেলে ওই পুরনো বাড়ির দিকে রওনা করলো। বাড়ির সামনে আসলো সন্ধ্যার পরে।

বাড়িটা সত্যিই কেমন যেন অদ্ভুত ধরনের্। তাছাড়া বাড়ির চারপাশে নীরবতা বিরাজ করে। রায়হানরা বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। বাড়ির ভেতর ঢুকতেই সবাই কেমন যেন অন্য রকম অনুভব করল। সবারই কেমন যেন ভয় লাগতেছিলো।ওরা সবাই মিলে বাড়িটা ঘুরে দেখতে লাগলো। কিন্তু হঠাৎ দেখলো একটা রুমেরে দরজা লাল সুতা দিয়ে বাধা। তো রায়হানের বন্ধু রাসেল একটান দিয়ে সুতাটা ছিড়ে ফেললো। দরজা খুলতেই কেমন যেন গরম হাওয়া লাগলো গায়ে।

সবাই রুমে ঢুকতেই একটা পচা গন্ধ পেলো। এত তীব্র গন্ধ যা কেউ কখনই পায়নি। সবাই রুম হতে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লো। কিন্তু সবাই বাড়িতে বিভিন্ন শব্দ শুনতে পেলো। ভয়ে সবাই অস্থির্। সবাই বাড়ি হতে বেরিয়ে পড়তে চাইলেও কেউ এক পাও বাড়াইতে পারলো না। সবাই ভয়ে জড় হয়ে গেলো। হঠাৎ দেখতে পেলো বিশাল লম্বা একটা লোক,যার গা দিয়ে রক্ত পুজ বের হচ্ছে,সেই লোকটি ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। গন্ধের তীব্রতা বাড়তে লাগলো।

সবাই তাদের জড়তা কাটিয়ে পালাতে আপ্রাণ চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না। এরই মধ্যে কয়েকজন সেন্সলেস হয়ে গেছে। রায়হান দিক বেদিক ছুটতে চেষ্টা করছে। রায়হান ছূটতে ছুটতে একটা দরজার সাথে আঘাত পেয়ে সেন্সলেস হয়ে যায়। তারপর কি পিচাশী কাজ ঘটেছে তা কেউ জানে না। রায়হান দুদিন পর জ্ঞান ফিরে পায়। রায়হান যখন ওর সাথের সবার খবর নেয়।

তখন জানতে পারে সবাই ঠিক আছে কিন্তু রাসেলকে খুজে পাওয়া যায়নি। সবাই যখন সেরাতের ঘটনা জানতে চায়। রায়হান তখন তার দেখা কাহিনী সবাইকে বলে। রায়হান ও তার বন্ধুদের বিভিন্ন ফকির ও হুজুর দেখানো হয়। কিন্তু রাসেলকে কেউ খুজে পায়নি। বেচেঁ আছে না মরে গেছে! রাসেলের সাথে কি ঘটেছে তা সবারই অজানা রয়ে গেছে।

রায়হান আজও সেই ভুতুড়ে বাড়ির কথা মনে করে আতংকিত হয়। নিজেকে বড় অসহায় মনে করে।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত