পাহাড় পুরের রহস্য

পাহাড় পুরের রহস্য

অনেকেই বলে থাকেন ভূত ব্যাপার টা নাকি একটা অনুভূতি। যাদের সেই অনুভূতি আছে তারা ভূতে বিশ্বাস করে আর যাদের সেই অনুভূতি নেই তারাও যে একেবারেই ভূতের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দিহান একথাও জোর দিয়ে বলা যায় না। মোদ্দা কথা হল পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষই কম বেশি ভূতে বিশ্বাস গ্রস্ত। এবারে আসি অনুভূতি প্রসঙ্গে। পাঠকরা কখনও চিন্তা করে দেখছেন কি, মাঝরাতে কোনও অপরিচিত আওয়াজে গায়ের লোম কেন খাড়া হয়ে ওঠে বা অন্ধকার ঘরে লণ্ঠন বা হ্যারিকেনের আলোয় হটাৎ কোনও ছায়া দেখে বুকটার ছাঁৎ করে ওঠা, এসবই কোনও না কোনও অতিপ্রাকৃত অনুভূতি কে কেন্দ্র করে। এরকম লোকের ওভাব নেই যারা তাদের বয়সের কোনও না কোনও সময় বন্ধু বান্ধব মহলে বাজী রেখেছেন, বাজী হারলে রাত বারটায় শ্মশান বা কবরখানা ঘুরে আসবেন। এত কিছু থাকতে শেষ পর্যন্ত শ্মশান বা কবরখানা কেন? উত্তর টা বোধহয় আমাদের সকলেরই জানা। মুখে আমরা যতই যুক্তি তক্ক কপচাই না কেন, ঐ জায়গায় গিয়ে পড়লে তখন আর রামনাম (ধর্ম ভেদে ভিন্ন) ছাড়া গতি থাকেনা। রাত বারটার শ্মশাণে বা কবরখানায় যদি নিতান্তই অসহায় একটি পেঁচা বা শেয়াল ডেকে ওঠে তখন, নিউটন এর কটাল আর পেঁচার বিজ্ঞানসম্মত নামের চেয়ে অনেক বেশি ইম্পরট্যান্ট ইষ্টঠাকুরের নাম হয়ে দারায়।

ছোটবেলা থেকেই ডানপিটে ছিলাম। ভূতে অবিশ্বাস না করলেও অকারণ ভয় পাওয়া আমার ধাতে ছিলনা। সে কারনেই ক্লাস ফাইভ এ থাকতে, একা একাই এক ঝড়জলের রাতে স্টেশন চলে গিয়েছিলাম। হাফইয়ারলী পরীক্ষা দিয়ে দাদুর বাড়ী বেড়াতে গিয়েছি। হটাৎ খবর এল আমার দাদুর আপন ভাই খুব অসুস্থ। উনি ময়নাগুড়ি থাকেন। সকালের ট্রেন ধরে আমার মা আর দাদু চলে গেলেন। রাতের ট্রেনেই ফিরে আসার কথা। সেদিন সন্ধ্যে থেকেই আকাশের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করল। থেকে থেকে এলোমেলো হাওয়া বইছে আর ঘন ঘন মেঘ ডাকছে। দু একবার খুব জোরে কোথাও বাজ পড়লো একেবারে কড় কড় আওয়াজ করে। রাত তখন ১০ টা। দুর্যোগ আরও বেড়েছে। মা আর দাদু তখনো ফেরেন নি। দিদাও দুশ্চিন্তা করছিলেন এত ঝড় জলে ওরা ফিরবে কি করে। বাড়ী থেকে স্টেশন এর দূরত্ব খুব বেশি না হলেও যাওয়ার রাস্তা টি খুব সুখকর ছিলনা আর তখনকার দিনেত নয়ই। দুপাশে ঘন বাঁশঝাড়, ছোট ছোট পুকুর, মোড়াম বেছানো রাস্তা আর রাস্তার আসে পাসে খুব একটা বসতিও ছিলনা। তারপর সেই ঝড়জল এর বর্ষণমুখর রাত। তখন বাড়ীতে বাড়ীতে কারেন্ট এলেও রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট বসেনি। চারিদিকে ধু ধু অন্ধকার। আর সেই রাতে তো যেন গোটা নরকপুরিটাই নেমে এসেছিল ধরণীর বুকে। একদিকে তিরের ফলার মতো বৃষ্টি আর তার সাথে বিদ্যুতের ঘন ঘন ঝলকানি আর কান ফাটানো বজ্রধবনি। গাছগুলো যেন সবকটা মাটি থেকে উপড়ে আসতে চাইছিল। উফফফফ কি ভয়ানক ছিল সেই রাত। সেই রাতে ক্লাস ফাইভে পরা একটি ছেলে রেইনকোট পরে সাথে ছাতা নিয়ে মা আর দাদুকে আনতে গিয়েছিল পাছে তারা বৃষ্টিতে ভিজে যায়। বলা বাহুল্য এই ভালো কাজের কোনও পুরস্কার তো জোটেইনি আর স্টেশন ভরা লোকের সামনে মা সপাটে গালে একটি চড় কষিয়ে বলেছিলেন যদি রাস্তায় কিছু হয়ে যেত। তখন এতসব ইগো ফিগো কিছু ছিলনা কাজেই কিছুদিনের মধ্যেই সব ভুলে গিয়েছিলাম, যদিও পরে দিদার কাছে জেনেছিলাম আমার মাতৃভক্তির এই পুরস্কার দেওয়ার সুবাদে মা সারারাত কেঁদেছিলেন।

কালের নিয়মে বড় হতে থাকলাম। কিন্তু ভূত আর ভূতের ভয় পাওয়ার থেকে কেন জানি অজানাই রয়ে গেলাম। অনেক চেষ্টা করতাম রাতে ইংলিশ হরর মুভি দেখে একটু ভয় পাওয়ার। রাতে খাওয়ার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা হরর স্টোরি পড়তাম। কিন্তু তবুও কেন জানিনা সেই আকাঙ্ক্ষিত অনুভূতি টা আনতে পারতাম না। খালি মনে হত সবই অভিনয় আর গল্প। এর কোনও বাস্তব সারবত্তা নেই। একসময় সত্যি সত্যিই ভাবতাম ভূত বলে কি সত্যিই কিছু হয়? নাকি সবকিছুই মানুষের অবচেতন মনের কল্পনা। এভাবেই উনিশটা বসন্ত পার করে ফেললাম। ঘটনাটা তখনকার যখন আমি কলেজে পড়ি। জলপাইগুড়িতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিঙ পড়ছি। শিলিগুড়িতে বাড়ী হওয়ার সুবাদে ডেলী প্যাসেনজারি করতাম কয়েকজন বন্ধু মিলে। শিলিগুড়ি থেকে জলপাইগুড়ি মেরেকেটে দেড় ঘণ্টার বাসরাস্তা, তাই হস্টেলে থাকার দরকার হয়নি আমাদের। তবে হস্টেল সতীর্থ দের অণুরোধে উপরোধে অনেক বারই হস্টেল এ থেকেছি। রাতভর দেদার হইহুল্লোড় আর খানাপিনা। যেসময় ক্লাস অফ থাকত, বন্ধুদের সাথে কাছাকাছি রমণীয় স্থান গুলো ঘুরে আসার একটা চল ছিল। বেশীরভাগ সময়ই আমরা যারা শিলিগুড়ি থেকে আসতাম, তারাই একসাথে যেতাম। কখন কখনও হস্টেল এর বন্ধুরা বা জলপাইগুড়ির স্থানীয় বন্ধুরা সঙ্গী হত। আমাদের কলেজের খুব কাছেই ছিল দেবী চৌধুরানীর কালী মন্দির। স্থানটি ছিল অতিশয় মনোরম। অনেকটা জায়গা জুড়ে মন্দিরের সীমানা। মন্দিরের সীমানা ঘেঁসে বয়ে গেছে করলা নদী। এই নদী দিয়েই নাকি দেবী চৌধুরানীর বজরা চলত। মন্দিরের ভেতর থেকে নাকি সুড়ঙ্গ কাটা ছিল সরাসরি নদীতে যাওয়ার জন্য। মন্দিরের ভেতরে প্রচুর গাছগাছালী আর সাথে বড় বড় গাছের নীচে বসার বেদী। অনেকটা জঙ্গল জঙ্গল মনে হত। আমরা মাঝে মাঝেই ওখানে গিয়ে আড্ডা মারতাম। বেশ চলছিল আমার কলেজ লাইফ। এক এক সময় মনে হত এর থেকে ভাল কলেজ লাইফ হয়ত আর কিছুই হতে পারে না। কে জানত কিছুদিনের মধ্যেই আমার জীবনে এমন কিছু একটা ঘটতে চলেছে যার প্রভাব হয়ত মন মস্তিষ্ক থেকে আর কোনোদিনই মুছে ফেলা যাবে না। দিনটা ছিল শুক্রবার। আর সব দিনের মতই একটা দিন। সময়টা ছিল সেপ্টেম্বর এর মাঝামাঝি। কিছুদিনের মধ্যেই পূজোর ছুটি পরে যাবে। বাতাসে একটা পূজো পূজো গন্ধ। গরম ও তেমন একটা নেই। এককথায় আদর্শ একটা দিন। সারাদিন নামমাত্র পড়াশোনা আর দেদার হইচই আর আড্ডা মেরে যখন বাসস্ট্যান্ডে এসে পৌঁছেছি তখন শুনলাম|

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত