এক দুই

এক দুই

জীবন হচ্ছে প্রেসার কুকার।

কথাটার সত্যতা অনুভব করলাম আমি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর। বছরে তিনটা সেমিস্টার। প্রতি সেমিস্টারে মিনিমাম চার পাচটা সাবজেক্ট। অন্তত দুটো ল্যাব। মিডটার্ম আর ফাইনাল সব মিলিয়ে আনন্দের জন্য জীবনে তিল ঠাই আর নাহিরে।

সবচাইতে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হয় সেদিন যেদিন দেখা যায় যে পরেরদিন ফিজিক্সের মত একটা কঠিন বিষয়ের এসাইনমেন্ট প্রেজেন্টেশন জমা দেবার শেষ দিন আর এখন পর্যন্ত কিছুই কমপ্লিট হয়নি।

লাইব্রেরী রাত আটটার পর বন্ধ করে দেওয়া হয় কিন্তু আমরা গ্রুপ্সটাডির কথা বলে দারোয়ান মামার হাতে চা পান বাবদ কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে আজ রাতের জন্য লাইব্রেরীতে থাকার ব্যাবস্থা করে ফেললাম।

সবমিলিয়ে পাচটা গ্রুপের বিশজন মিলে রাত বারোটার পরেও লাইব্রেরীতে বসে আছি। বাইরে প্রচন্ড বৈশাখী ঝড়। আর পাঁচতলা এক লাইব্রেরীতে আমরা বিশজন পোলাপান।

আমাদের মধ্যে আবার ছয়টা মেয়েও আছে। কাল সকাল নয়টায় এসাইনমেন্ট আর প্রেজেন্টেশন জমা দিয়ে রুমে যাব সবাই। গল্পও করতে করতে ঝড়ের বেগে টাইপ করছি। হাতের আঙুল ব্যাথা হয়ে গেছে। মাথা উচু করে ঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত একটা বাজে।

আমার পাশে বসে আছে আসলাম। সে বিরক্ত গলায় বলল, “মামা সব মিলায়ে মাত্র তেরোটা নাম্বারের জন্য এত খাটা লাগে?”

আমি ওর চাইতেও বেশী বিরক্ত, “হারামজাদা কথা বন্ধ। তাড়াতাড়ি টাইপ কর”।

পাশের টেবিলে সুমন তার গার্লফ্রেন্ড মুন্নীর সাথে বসে নিচু গলায় গল্পও করছে। আমার সামনে বসা পারভেজ

স্বগোতক্তি করলো, “শালা ওদের লাইফই লাইফ আমাদেরটা ধইঞ্চা”।
আমি বিরক্তই হলাম। হিসহিস করে বললাম, “কথা বলিস না। কাজ কর”।

আমি রাত জাগতে পারি না। রাত জাগতে হলে আমার মেজাজ ঠিক থাকে না। গ্রুপের তিনটা ছেলেই গর্ধভ এদের কাছ থেকে গালি ছাড়া কাজ আদায় করানো দুস্কর।

রাত প্রায় দেড়টার দিকে টানা টাইপ করার পর আমার বাথরুম পেল। আসলামকে একবার ইশারা দিলাম। সে টেবিলের নিচ থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার এগিয়ে দিল আমার দিকে।

ও দুটো সন্তপর্ণে পকেটে ভরে নিয়ে আমি বাথরুমের দিকে হাঁটা দিলাম। পাশের টেবিল থেকে নুহা বলল, “এই

তাড়াতাড়ি বের হবি। আমারও যেতে হবে। আর বাথরুম গান্ধা করবি না।
ওর দিকে একটা ভস্মদৃষ্টি দেবার ব্যার্থ চেষ্টা করে বাথরুমে ঢুকে গেলাম।

সিগারেটটা জ্বালিয়ে হাই কমোডের উপরে বসতেই কারেন্ট চলে গেল। আমি প্রমাদ গুণলাম। এখনও এসাইনমেন্ট অনেকটাই বাকি। বাইরে প্রচন্ড চিৎকার বিশেষ করে মেয়েগুলোর। ঝড় বৃষ্টির রাত কারেন্ট গেছে তো কি হইছে? জেনারেটর আছে নীচতলায় জেনারেটর চালিয়ে দিয়ে আয়। তা না। অহেতুক চিল্লাবে। সবচাইতে বিরক্ত লাগলো যখন ছেলেগুলাও চিৎকারে যোগ দিল। ফাইজলামির একটা লিমিট আছে। ভয়ানক ছোটাছুটি শুরু হয়েছে ভিতরে। আমার মেজাজ আরও খারাপ হল। এই রাতেও হারামজাদাগুলোর ফুর্তি কমে না।

আমি অন্ধকার বাথরুমে বসেই আরো একটা সিগারেট ধরালাম। হঠাত চিৎকারের শব্দ কমে গেল। এখন ভেতরটা পুরো নিস্তব্ধ। শব্দ বলতে শুধু হাওয়ার মাতামাতি আর থেকে থেকে বাজ পড়ার শব্দ।

আমি সিগারেটের অবশিষ্টাংশ কমোডে ফেলে ফ্ল্যাশ করে দিলাম। বাথরুমের দরজা খুলে কালিগোলা অন্ধকারে প্রথম কদম ফেলতেই কিছুর সাথে পা বেঁধে হুড়মুড় করে পড়লাম আমি। সারা শরীরে চিটচিটে তরল কিছু একটা মেখে গেল আমার।

প্রথমে ভাবলাম হয়তো পানি।
গন্ধটা ভাবনা দূর করে দিল আমার।
আঁশটে গন্ধ। পুরো লাইব্রেরীর মেঝে ভেসে যাচ্ছে রক্তে।

আতংক কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি ঠিক সেই মুহুর্তে হাড়ে হাড়ে টের পেলাম আমি। ঠেলে বমি চলে এল আমার। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে আবার হাত পা ছড়িয়ে পড়ে গেলাম। সেই মুহুর্তে বাজ পড়ল প্রচন্ড শব্দে। ঘরের ভেতরটা এক ঝলকের জন্য পরিষ্কার দেখতে পেলাম আমি। ঘরের ভেতর সব কিছু উল্টে পালটে আছে। তারই ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আমার উনিশ সহপাঠির মৃতদেহ। তাদের শরীর থেকে বেরিয়ে আসা রক্তেই সয়লাব হয়ে আছে মেঝেটা।

লাইটার জ্বালালাম আমি। পাশেই পড়ে থাকা কণিকার লাশটা দেখতে পেলাম। শরীরের মাংস খামচে খুবলে তোলা। পেট চিঁড়ে ফেলেছে। এমনকি চোখদুটোও খুবলে তোলা। আরেকটূ সামনে গিয়ে আশরাফের লাশটা দেখলাম আমি। সবার একই অবস্থা। আতংকে হিম হয়ে গেলাম। উনিশটা লাশের সাথে একা এক ঘরে আছি এই চিন্তাটাই তো অসম্ভব। আর তার চেয়েও বড় কথা এদের এভাবে মারলো কে?

তখনই একটা শব্দ পেলাম আমি। ধীর পদক্ষেপে হেঁটে আসবার। আমি লাইটার নিভিয়ে লাশগুলোর সাথে চুপ করে শুয়ে রইলাম। টের পেলাম রক্তের ওপর দিয়ে ছপছপ শব্দ তুলে আমার দিকেই আসছে পায়ের শব্দটা।
আবার বাজ পড়তেই পায়ের মালিককে দেখলাম আমি।

শীর্ণ এক বৃদ্ধা। হাড্ডীসার চামড়ার ওপর ছেড়া কাপড় পড়া। ঝুকে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে সে। চোখ নেই বৃদ্ধার। চোখের জায়গায় শ্রেফ শুন্য দুটো কোটর। একটা হাত আমার দিকে বাড়ালো সে।
খনখনে কন্ঠে সে বলল, “এক, দুই।”

তারপরই তার দুটো আঙুল ধেয়ে এল আমার চোখের দিকে।

গল্পের বিষয়:
ফ্যান্টাসি

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত